ভাইভার নম্বর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, কী চাইছে সরকার?

মঈনুল রাকীব
মঈনুল রাকীব

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চাকরি খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয়। ১৯৭১-এ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল যে ঘোষণাপত্রের আলোকে সেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল প্রধান অভিলক্ষ্য। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের মুক্তির লড়াই শুরু হয়েছিল এদেশের মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি না দেওয়া, নাগরিকদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রনীতি এবং নাগরিকদের জনমতকে মূল্যায়ন না করায়। লক্ষ মানুষের রক্ত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ হবে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসহ সমস্ত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা—এমনই ছিল প্রত্যাশা।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত নাগরিকদের সুযোগ, সুবিধা প্রাপ্তির ন্যায়সংগত কোনো কাঠামো দাঁড় করানো যায়নি। এখানে এখনো শ্রমিক ও কৃষক তার শ্রম ও ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীগণ মুনাফালোভী পুঁজিবাদীদের কাছে জিম্মি। আর চাকরিতে প্রবেশে সাম্য ও স্বচ্ছতার অভাবের পাশাপাশি রয়েছে আন্তঃচাকরি বৈষম্য।

মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকার পরেও বাংলাদেশের গণবিরোধী রাজনীতি ও জনবিরোধী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নাগরিকদের রুটি-রুজির ন্যায়সম্মত কোনো টেকসই নিয়ম করতে পারেনি৷ এ কারণে সীমিত পর্যায়ে এদেশের সরকারি চাকরি ছাড়া বেসরকারি খাতে সামাজিক নিরাপত্তার ধারণা গড়ে ওঠেনি৷ আবার, কেউ যে স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা করবে সেই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশও এদেশে বিনির্মাণ করা যায়নি। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের উৎপাতের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নানা অসম নীতিও ক্ষুদ্র ও স্বল্পপুঁজির ব্যবসায়ীদের টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনা।

এই রাষ্ট্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও সামাজিক নিরাপত্তা বলতে যা বোঝায় তা পায় কেবল সরকারি চাকরিজীবীগণ। তাদের চাকরির নিশ্চয়তা আছে; কেউ চাইলেই যেকোনো সময় তাদের চাকরিচ্যুত করতে পারেনা; তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও রাষ্ট্র চিকিৎসা, শিক্ষাসহ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়। এছাড়া চাকরিজীবন শেষে পেনশনসহ নানা সুবিধাও দেওয়া হয়। এ কারণেই কর্মক্ষম শিক্ষিত তারুণদের অধিকাংশের প্রথম পছন্দ সরকারি চাকরি।

সরকারি চাকরিতেও আন্তঃচাকরি বৈষম্য আছে। তবুও এখানে মানসিক স্বস্তি ও সামাজিক মূল্যায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেসরকারি চাকরির চেয়ে অধিক। আবার রাষ্ট্র বিসিএস-এর কিছু ক্যাডারদের সামন্ততান্ত্রিক সময়ের মতো অধিক সুবিধা দিয়েছে। ফলে চাকরিপ্রত্যাশীদের দৃষ্টিকেন্দ্র হয় ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করা। যদিও বিসিএস ক্যাডারদের মধ্যেও ক্যাডারভেদে বৈষম্য রয়েছে। আবার, রাজস্ব-অরাজস্ব অথবা মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের বাইরের চাকরির মধ্যে সুযোগ ও সুবিধার বৈষম্য রয়েছে!

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কিছুতেই এমন কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি আনা যাবেনা যেখানে মৌখিক পরীক্ষা পুরো পরীক্ষার ফলাফলকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম নম্বর বা ‘কাট মার্ক’ কমানোও যুক্তিসঙ্গত নয়। মৌখিক এবং লিখিত পরীক্ষায় কাছাকাছি বা সমান নম্বর কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না বলেই মনে করি।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতে যথাযোগ্য বেতন-ভাতা বা চাকরির নিশ্চয়তা না থাকার পাশাপাশি অমানবিক চাপের আলোচনাও রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি বা বেসরকারি কোথাও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রের ‘সাম্য’ তথা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে সমতা, ‘মানবিক মর্যাদা’ তথা মানুষ হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাপনের জন্য সম্মানজনক অবস্থান এবং ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ তথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও সুবিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা এখানে অনুপস্থিত।

এ সত্ত্বেও সরকারি চাকরিতে অন্ততপক্ষে সামাজিক নিরাপত্তা ও কথিত ‘স্ট্যাটাস’ তুলনামূলক বেশি থাকায় এই চাকরির প্রতি অধিক ঝোঁক শিক্ষিত তরুণ ও তরুণীদের। এ কারণেই চাকরিতে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু এ দেশের মানুষের চিরআকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার একটি। কারণ, এর মাধ্যমে মামা-চাচা অথবা পয়সা-কড়ি অথবা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক তদবির ছাড়া একজন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলে বা মেয়ে স্বনির্ভর রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পারে৷ আর এক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত পরীক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও এটি ফল পরিবর্তন করতে সক্ষম এবং মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভার থেকে অধিক উত্তম পদ্ধতি বলে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কিছুতেই এমন কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি আনা যাবেনা যেখানে মৌখিক পরীক্ষা পুরো পরীক্ষার ফলাফলকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম নম্বর বা ‘কাট মার্ক’ কমানোও যুক্তিসঙ্গত নয়। মৌখিক এবং লিখিত পরীক্ষায় কাছাকাছি বা সমান নম্বর কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না বলেই মনে করি।

এমনিতে বাংলাদেশ কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) এর (নেতিবাচক উদাহরণ থাকা স্বত্বেও) নিয়োগ ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠে। এর মধ্যে যদি ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে নিয়োগ বোর্ডের ক্ষমতা বাড়ানো হয়, তবে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভায় ১০ নম্বরের স্থলে তিন ভাগে ২৫, ৪০ ও ৫০ নম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি (‘সরকারি কর্মচারী নিয়োগে ভাইভা নম্বর বাড়ছে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত’, ডেইলি স্টার বাংলা, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

এ খবরে আরও বলা হয়, ১১ ও ১২ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভা নম্বর ৪০০% বৃদ্ধি করে ১০ নম্বর থেকে ৫০ করা হয়েছে। একই গ্রেডের লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে মাত্র ১০ বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আরও বিপজ্জনক এবং চাকরিপ্রত্যাশী মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এই গ্রেডে বর্তমানে যেখানে লিখিত পরীক্ষায় ৫০% নম্বর পেয়ে পাশ করতে হয়, প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা ১৫% কমিয়ে ৩৫% করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করার জন্য ৪০% বা ২০ নম্বর পেতে হবে। বিদ্যমান বিধিমালায় ১৩, ১৪, ১৫ ও ১৬ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভা ও লিখিত পরীক্ষার নম্বর যথাক্রমে ১০ ও ৯০। প্রস্তাবিত বিধিমালায় এসব গ্রেডের পরীক্ষার নম্বর প্রস্তাব করা হয়েছে যথাক্রমে ৪০ ও ৬০।

এখানে লিখিত পরীক্ষায় পাশ নম্বর বর্তমানে ৫০% হলেও প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা কমিয়ে মৌখিক ও লিখিত উভয় ক্ষেত্রে ৪০% করা হয়েছে (‘সরকারি নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ছে, সরকারের যুক্তি কী, ঝুঁকি যেখানে’, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, দৈনিক প্রথম আলো)। অথচ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অধিক পাশ নম্বর থাকা মেধা যাচাইয়ের জন্য তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

দেশের ক্ষমতাহীন তবে সংখ্যাগুরু মানুষের সন্তানদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ এনে দেয় নিজ যোগ্যতায় প্রাপ্ত একটি সরকারি চাকরি। সেই চাকরিতে প্রবেশের সুযোগের সমতার প্রশ্নে দেশের সাধারণ মানুষ কখনোই নীরব থাকেনা। ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থান হয়েছে এই চাকরির সংবেদনশীলতা তৎকালীন আওয়ামী লীগের সরকার বুঝতে দেরি করায়।

বিদ্যমান বিধিমালায় ১৭ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভা ও লিখিত পরীক্ষার নম্বর যথাক্রমে ১০ ও ৪০। প্রস্তাবিত বিধিমালায় এই চারটি গ্রেডে ভাইভা ও লিখিত পরীক্ষার জন্য যথাক্রমে ২৫ ও ২৫ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে মৌখিক পরীক্ষা ও লিখিত পরীক্ষায় হুবহু একই নম্বর রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে যা নিঃসন্দেহে স্বচ্ছ নিয়োগের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

যদিও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়, বরং দক্ষ-যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতেই সরকার সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু তার এই কথায় অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কোনো সচেতন মানুষের বিশ্বাস আসার প্রশ্নই আসেনা। ব্যক্তিগতভাবে আমি চাকরিপ্রার্থী যত শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি তার সবাইই মৌখিক নম্বর বৃদ্ধি করার চিন্তাকে সাধুবাদ জানায়নি। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। ফেসবুকেও তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

নতুন পদ্ধতি যদিও সরকারপক্ষের একাংশের নিকট ইতিবাচক সিদ্ধান্ত কিন্তু সরকারের কল্যাণ চায় এমন অনেকেই এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সন্তোষজনক ধারণা পোষণ করেন বলে মনে হচ্ছেনা। কারণ, ফাঁকফোকর ও বৈষম্য করার কোনো সুযোগ থেকে গেলে তা যেকোনো ব্যক্তির ওপর বেইনসাফের কারণ হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রার্থী ১১ ও ১২ তম গ্রেডের চাকরির লিখিত পরীক্ষায় ১০০ এর মধ্যে ৩৫ নম্বর পেয়ে কোনো মতে পাশ করলো, আর অন্য আরেক প্রার্থী পেলো ৬০ নম্বর। এখন, লিখিত পরীক্ষায় ৩৫ পাওয়া প্রার্থী যদি মৌখিকে ৫০ এ ৫০ নম্বর পান তাহলে তার মোট নম্বর হয়ে যাবে ৮৫। অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ পাওয়া পরীক্ষার্থী মৌখিকে গড়পড়তা ২০ নম্বর পেলেও তুলনামূলক দুর্বল প্রার্থীর কাছে হেরে যেতে পারেন। আর যেখানে অল্প কিছু প্রার্থী নেওয়া হবে সেখানে পছন্দের প্রার্থী রেখে বাকিদের ভাইভায় অকৃতকার্য করার আশঙ্কাও থেকে যায়।

এভাবে নানাভাবে নম্বর কম ও বেশি করে কারসাজি করার সন্দেহ জন্ম নেওয়ার উপলক্ষ্য তৈরি হতে পারে যদি প্রস্তাবিত ‘‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও ইহাদের আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাসমূহের ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মান বণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। যদিও এমনটাই যে হবে তা নিশ্চিত নয়, তবে এটা অনেক নেতিবাচক বিষয়ের একটা সম্ভাব্য ‘সিনারিও’।

যদি এই প্রস্তাবনা কোনো রাজনীতিকের মাথা থেকে এসে থাকে তবে তিনি সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনুধাবন করতে অক্ষম। আর এই গণবিরোধী চিন্তা কোনো আমলা বা টেকনোক্রেটিক ব্যক্তির নিকট থেকে আসে তাহলে নিঃসন্দেহে এটি আমলাদেরই প্রভাববলয় বৃদ্ধি করার নতুন একটি পরিকল্পনা ছাড়া কিছু নয়। আর এটি সরকারকে বড় ধরনের বিপদে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

ভাইভা বোর্ডের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিলে সেখানে থাকা দুর্নীতিবাজ, লোভী বা দলীয় ব্যক্তিরা সহজেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবেন। তারা নিজেদের পছন্দের লোকদের চাকরি দেবেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এমনটি ঘটবেই। বিশ্বাস না হলে স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাইভানির্ভর নিয়োগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেখুন। দেখবেন, যোগ্যদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার অসংখ্য নজির রয়েছে। এর মূল কারণ হলো, ভাইভা বোর্ডে মেধাকে মূল্যায়ন না করে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া। সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই তারা নির্দ্বিধায় বলবেন যে, সম্পূর্ণ ভাইভানির্ভর বা ভাইভায় বেশি নম্বর থাকা নিয়োগ প্রক্রিয়া কখনোই স্বচ্ছ হতে পারে না।

ভাইভা বোর্ডের হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করলে এবং এই বোর্ডে কোনোভাবে নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তি বা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি নিবেদিত অথবা অবৈধ অর্থের প্রতি লোভাতুর ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি থাকলে সে বা তারা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবেন। তারা নিজেদের পছন্দের লোকদের নিয়োগ দিতে সচেষ্ট হবে। আমার পর্যবেক্ষণ এবং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এমনটি ঘটবেই।

দুঃখজনক হলেও সত্য স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত নাগরিকদের সুযোগ, সুবিধা প্রাপ্তির ন্যায়সংগত কোনো কাঠামো দাঁড় করানো যায়নি। এখানে এখনো শ্রমিক ও কৃষক তার শ্রম ও ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীগণ মুনাফালোভী পুঁজিবাদীদের কাছে জিম্মি। আর চাকরিতে প্রবেশে সাম্য ও স্বচ্ছতার অভাবের পাশাপাশি রয়েছে আন্তঃচাকরি বৈষম্য।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত ৮ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরে যেভাবে ভাইভায় অধিক নম্বর রাখার মধ্যে ‘কল্যাণ’ দেখেছেন তা বাস্তবসম্মত চিন্তার প্রকাশ নয় বলেই মনে করি। শুরুতেই তিনি বলেছেন, ‘ভাইভা যেহেতু সাবজেকটিভ, তাই সেখানে কারসাজি বা পছন্দের কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি’। এই কথা ছাড়া বাকি অধিকাংশ যুক্তি ও বাস্তবতার নিরিখে খুবই গণবিরোধী কথা। তিনি বলেন, ‘চাকরির জন্য শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। একজন প্রার্থীর অন্যান্য যোগ্যতা ও অ্যাপটিটিউডও (সহজাত দক্ষতা) বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।’

কিন্তু বইয়ের জ্ঞানের বাইরের জ্ঞান তো তিনি ভাইভায় বেশি নম্বর দিয়ে নিশ্চিত করতে পারবেন এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভাইভায় সবাইকে একই প্রশ্ন করা হবে এমন নিশ্চয়তাও নেই। সুতরাং, জ্ঞানের নানা শাখা প্রশাখা, টেকনিক্যাল ও বাস্তবজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে একই প্রশ্নে সবার লিখিত বা ব্যবহারি পরীক্ষা গ্রহণ করা মৌখিকনির্ভরতার চেয়ে তুলনামূলক অধিক উত্তম পদ্ধতি। আবারও বলি, মৌখিক পরীক্ষায় সবাইকে একই প্রশ্ন করা হবে এই নিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা কি দিতে পারবেন?

ভাইভা পদ্ধতিতে অনিয়মের আশঙ্কা থাকলে সেটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার পর্যালোচনার মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি, অথচ এ পর্যালোচনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ভাইভানির্ভর নিয়োগপ্রক্রিয়ার সামষ্টিক অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, ‘সরকার বিশ্বাস করেছে যে এ ধরনের মার্কিংয়ের মাধ্যমে আরও ভালো নিয়োগ সম্ভব এবং আইনগতভাবেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকার বেআইনি কিছু করেনি, আইনগতভাবে করতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা এবং সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, কোনো কিছু ‘আইনগতভাবে সিদ্ধান্ত’ নিলেই তা ন্যায্য ও গণবান্ধব হবে এর কোনো তাত্ত্বিক বা প্রায়োগিক ভিত্তি নেই। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারও একপাক্ষিক নির্বাচনসহ অন্যায্য কোটা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য ‘আইনের দোহাই’ দিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষকে সাম্য ও ন্যায়বিচার এর নিশ্চয়তা না দিয়ে ‘আদালত দেখানো’ ন্যায়সংগত গণতান্ত্রিক আচরণ নয়।

আমি চাকরিপ্রত্যাশী অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা অধিকাংশই বেশ শঙ্কিত এই ভাইভায় অধিক নম্বর রাখা নিয়ে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক সম্ভাবনার ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরের নিচে মন্তব্যগুলোও দেখা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, পূর্ণাঙ্গ সত্য জানতে মাঠ পর্যায় থেকে সরাসরি শিক্ষার্থী অথবা চাকরিপ্রত্যাশীদের মতামত নিন। সচেতন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এবং শিক্ষকসমাজ সবাই সচিব কমিটির সভায় ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ভীষণ অসন্তুষ্ট।

যারা প্রধানমন্ত্রী বা এ সরকারকে মৌখিক নম্বর বৃদ্ধি করার এই পরামর্শ দিয়েছেন তারা দেশের কল্যাণ চান এমনটা ভাবার সুযোগ দেখি না। একইসঙ্গে তারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন বলেই মনে করি। ইতিমধ্যে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এবং আওয়ামী ভাবাপন্ন অনেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারকে ‘ছাত্রস্বার্থবিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।

ছাত্রদের অসন্তোষজনিত বিক্ষোভকে যেকোনো সময় আগুনে রূপান্তরিত করার বহু রাজনৈতিক পক্ষ সক্রিয় থাকে। রাজনৈতিক অভিলাষে তখন দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। মৌখিক নম্বর বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত এ কারণেই কিছুতেই বাস্তবায়ন করা যাবেনা। বরং বিদ্যমান ভাইভার নম্বর দরকার হয় আরও কমিয়ে দেওয়া যায় অথবা যা আছে তাই রাখা যায়। দরকার হলে লিখিত নম্বর বৃদ্ধি করা যায় অথবা ব্যবহারিক নম্বর যুক্ত করা যায়। কিন্তু মৌখিক নম্বরনির্ভর নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক করা যাবেনা। যে পদ্ধতিতে মেধার অবমূল্যায়ন হতে পারে তাকে স্বাভাবিক করা কিছুতেই উত্তম সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তাই কিছুতেই মৌখিক পরীক্ষার নম্বর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হবেনা।

ছাত্রদের অসন্তোষজনিত বিক্ষোভকে যেকোনো সময় আগুনে রূপান্তরিত করার বহু রাজনৈতিক পক্ষ সক্রিয় থাকে। রাজনৈতিক অভিলাষে তখন দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। মৌখিক নম্বর বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত এ কারণেই কিছুতেই বাস্তবায়ন করা যাবেনা। বরং বিদ্যমান ভাইভার নম্বর দরকার হয় আরও কমিয়ে দেওয়া যায় অথবা যা আছে তাই রাখা যায়।

মনে রাখতে হবে, চাকরি এদেশের দুঃখী জনগণের জীবনে খুবই সংবেদনশীল বিষয়৷ এই চাকরি পাওয়ার সুযোগে বৈষম্য থাকার কারণে ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে বড় ধরনের কোটা সংস্কারবিষয়ক আন্দোলন হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা রক্ত দিয়েছে। অভিভাবকরা মাঠে নেমেছে। ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষ। যে সাধারণ নাগরিকের অবৈধ টাকা নেই, রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা নেই, প্রভাব নেই তাদের কাছে সৃজনশীলতা ও মেধাজনিত নিজ যোগ্যতাই শক্তি। আর বাংলাদেশে মেধা বিকাশের জন্য, মেধার স্বাক্ষর রাখার জন্য, মেধার যথাযথ মূল্যায়নের জন্য নিরপেক্ষভাবে গৃহীত লিখিত পরীক্ষার চেয়ে উত্তম কোনো পদ্ধতি এই ৫৫ বছরে এখনো উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়নি।

দেশের ক্ষমতাহীন তবে সংখ্যাগুরু মানুষের সন্তানদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ এনে দেয় নিজ যোগ্যতায় প্রাপ্ত একটি সরকারি চাকরি। সেই চাকরিতে প্রবেশের সুযোগের সমতার প্রশ্নে দেশের সাধারণ মানুষ কখনোই নীরব থাকেনা। ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থান হয়েছে এই চাকরির সংবেদনশীলতা তৎকালীন আওয়ামী লীগের সরকার বুঝতে দেরি করায়। নির্বাচিত বিএনপি সরকার একই পথে হেঁটে সেই ভুল করা কিছুতেই সমীচীন হবেনা। চাকরিজনিত কারণে সূত্রপাত ঘটা একটি রক্তাক্ত গণ অভ্যুত্থানের পরের নির্বাচিত সরকার চাকরিতে প্রবেশে বৈষম্য তৈরি হতে পারে এমন কোনো নীতির মধ্যে কেন ইতিবাচকতা খুঁজবে? এই ঝুঁকি কেন নেবে? বিএনপি'র যারা শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের লোকেদের দ্রুত বোঝাতে হবে যেন কিছুতেই ছাত্রস্বার্থবিরোধী এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা না হয়।

১১ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিতেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ আগে থেকেই অংশগ্রহণ করেন। আর ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিএনপি সরকার নতুন ‘৯ম জাতীয় পে স্কেল’ ঘোষণা করায় শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির প্রতি আরও অধিক আগ্রহী হচ্ছেন। সুতরাং, চাকরিতে সব ধরনের অস্বচ্ছতা ও বৈষম্যকে উচ্ছেদ করে শতভাগ ফেয়ার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

অহেতুক চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, অস্থিতিশীলতা অথবা অবিশ্বাস প্রবেশ করালে তা সরকারের জন্য মজবুত কোনো নীতিনির্ধারণী ভিত্তি তৈরি করবেনা। বরং, দেশের তরুণ প্রজন্ম যদি মেধার ভিত্তিতে শতভাগ নিজ যোগ্যতায় এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পেশাজীবনে প্রবেশ করে মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার নিশ্চয়তা পায় সেটি সমাজকে শান্ত রাখবে, সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে, রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান নানা শঙ্কা-আতঙ্ক-সংশয় দূর করবে এবং বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

  • লেখক: মঈনুল রাকীব, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত