জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

১৮৮৫ সালের ফেরি আইন মানলে কি দুর্ঘটনা এড়ানো যেত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ২৩: ১৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে অন্তত ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং ঘাট ব্যবস্থাপনার চরম বিশৃঙ্খলা, অরক্ষিত পন্টুন এবং আইনি দুর্বলতার এক করুণ চিত্র সামনে এনেছে। বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠছে—ফেরিঘাটে এত মানুষের প্রাণহানির দায় কার? ঘাট কর্তৃপক্ষ, বাসের চালক, নাকি প্রচলিত আইনের প্রয়োগহীনতা?

যেভাবে ঘটল মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা

সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাসটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার সময় বাসে মাত্র ছয়জন যাত্রী ছিলেন। পরে পথিমধ্যে আরও অনেক যাত্রী ওঠেন। জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তারের মতে, দুর্ঘটনার সময় বাসে প্রায় ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৪জন ছেলেশিশু, ৩জন মেয়েশিশু, ১১ জন নারী এবং ৮ জন পুরুষ রয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, বাসটি ফেরিঘাটের পন্টুনে ওঠার সড়কে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন সময় একটি ফেরি এসে ঘাটে ভেড়ামাত্র বাসটি হঠাৎ চলতে শুরু করে এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি নদীতে পড়ে যায়। চালক অনেক চেষ্টা করেও গাড়িটি থামাতে পারেননি।

সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরেজমিনে দেখা গেছে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনটি অত্যন্ত পুরোনো এবং আকারে ছোট। সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হলো, পন্টুনে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী বা লোহার রেলিং নেই। এছাড়া মূল সড়ক থেকে পন্টুন পর্যন্ত সংযোগ বা অ্যাপ্রোচ সড়কগুলো বেশ ঢালু এবং খানাখন্দে ভরা। ভারী যানবাহনগুলো যখন এই ঢালু পথ দিয়ে পন্টুনে নামতে যায়, তখন তাদের ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্যের এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ছয় সদস্যের দুটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

ফেরি আইন (১৮৮৫) এবং বাস্তবতার ফারাক

দৌলতদিয়ার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে ‘বেঙ্গল ফেরিজ অ্যাক্ট, ১৮৮৫’ বা বাংলাদেশ ফেরি আইনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এই আইনটি মূলত সরকারি ও বেসরকারি ফেরিঘাটগুলোর ব্যবস্থাপনা, ইজারা এবং টোল আদায়ের নিয়মকানুন নির্ধারণ করে। তবে এত পুরনো একটি আইনে যাত্রীদের আধুনিক নিরাপত্তা বা আধুনিক যানবাহনের জন্য পন্টুনের স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড সম্পর্কে খুব বেশি সুস্পষ্ট বা যুগোপযোগী নির্দেশনা নেই।

আইনের ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (কমিশনারের অনুমোদন সাপেক্ষে) সরকারি ফেরিগুলোর ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য নিয়মকানুন তৈরি করতে পারেন। এই ধারার উপধারা (ক) এবং (খ)-তে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। দৌলতদিয়া ঘাটে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের যে বেহাল দশা আমরা দেখলাম—যেখানে ফেরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই একটি বাসকে পন্টুনের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো—তা এই আইনি নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জেলা প্রশাসন বা ঘাট কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

আইনের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি ফেরির ইজারাদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যাত্রীদের সুবিধা বা নিরাপত্তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন, তবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৫ দিনের নোটিশ দিয়ে ইজারা বাতিল করতে পারেন। দৌলতদিয়া ঘাটের পন্টুনে কোনো রেলিং বা নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকাটা যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলার প্রমাণ। আইন অনুযায়ী, এমন অরক্ষিত পন্টুন পরিচালনার জন্য ঘাট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এছাড়াও, আইনের ১৬(জ) ধারায় বলা হয়েছে, ফেরিতে চলাচলের জন্য যানের আকার, ক্রুদের সংখ্যা, যানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়ম তৈরি করা যাবে। যদিও এটি মূলত নৌযানের (ফেরির) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কিন্তু পন্টুন বা সংযোগ সড়কও এই সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার অংশ। একটি ঢালু এবং খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক দিয়ে ভারী যানবাহন ওঠানামা করানো কোনোভাবেই নিরাপদ হতে পারে না।

আইন কীভাবে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে পারত?

যদি ফেরি আইনের ১৫ এবং ১৩ নম্বর ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হতো, তবে দৌলতদিয়া ঘাটের চিত্র হয়তো ভিন্ন হতো। জেলা প্রশাসন যদি নিয়মিত তদারকি করত এবং পন্টুনে রেলিং না থাকার কারণে ঘাট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনত, তবে হয়তো এই ২৬টি প্রাণ রক্ষা পেত।

আইন অনুযায়ী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যাদের ওপর, তারা যদি তৃতীয় শ্রেণির অদক্ষ কর্মচারীদের হাতে জিরো পয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে না দিতেন, তবে হয়তো বাসটি অসময়ে ঢালু সড়কে গিয়ে দাঁড়াতে পারত না। আইনের আধুনিকায়ন না হওয়াটাও একটি বড় সমস্যা। ১৮৮৫ সালের আইনে আজকের দিনের ভারী বাস বা ট্রাক ফেরিতে তোলার সময় সংযোগ সড়কের ঢাল কতটুকু হওয়া উচিত বা পন্টুনের ধারণক্ষমতা কেমন হওয়া উচিত, তার কোনো বৈজ্ঞানিক বা আধুনিক মানদণ্ড নেই।

দৌলতদিয়ায় বাসডুবির এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, কেবল তদন্ত কমিটি গঠন আর ক্ষতিপূরণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। পুরনো ফেরি আইনকে যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে, বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

পন্টুনে রেলিং নির্মাণ, সংযোগ সড়কগুলোর সংস্কার এবং ঘাট পরিচালনায় দক্ষ লোকবল নিয়োগ না করলে এমন মৃত্যুফাঁদ থেকেই যাবে। বিআইডব্লিউটিসি-র চেয়ারম্যান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে পন্টুনে রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ২৬টি লাশের ভার নিয়ে দৌলতদিয়া ঘাট আজ যে শিক্ষা দিল, তা যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভুলে না যায়।

সম্পর্কিত