
বাংলাদেশ যখন জ্বালানি সংকটে হিমশিম খাচ্ছে, তখন মাটির নিচে পড়ে থাকা পুরোনো সম্ভাবনা আবারও আলোচনায় এসেছে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের যুক্তি, দেশের মাটির নিচের উচ্চমানের কয়লা ব্যবহার করা গেলে আমদানি-নির্ভরতা কমবে, সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গত বুধবার অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে বলেছেন, প্রকল্প সামনে আগানোর আগেই নিশ্চিত করতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, জীবিকা এবং পরিবেশগত কোনো ঝুঁকি এতে থাকছে কিনা।
২০ বছর আগে রক্তাক্ত আন্দোলনে থেমে যাওয়া প্রকল্পটি নতুন করে সামনে আসতেই পুরোনো প্রশ্নটি আবারও উঠেছে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ফুলবাড়ীর কয়লা কি পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি সামলে উঠতে পারবে?
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি মূলত একটি বড় কয়লা খনি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফুলবাড়ীর মাটির নিচ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের কথা রয়েছে। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা জিসিএম রিসোর্সেস। কোম্পানির হিসাবে, এলাকায় প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার সম্পদ রয়েছে। এই কয়লা ব্যবহার করে প্রায় ৬,০০০ থেকে ৬,৬০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়ন পর্যায়ে যায়নি। জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন, জীবিকা, ভূগর্ভস্থ পানি ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এসব বিষয়ই প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ।
ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা সামনে আসার পর স্থানীয় মানুষের বড় আপত্তি ছিল জমি ও বসতভিটা হারানোর আশঙ্কা। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় কৃষিজমির পরিমাণও ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট খনি প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। পরে আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার ছয় দফা সমঝোতা করে। এর মধ্যে ছিল এশিয়া এনার্জিকে প্রত্যাহার এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার অঙ্গীকার।
ফলে খনি প্রকল্পের পাশাপাশি ফুলবাড়ী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি ও জনসম্পৃক্ততার একটি রাজনৈতিক অধ্যায়।
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি জোগানে কমেনি আমদানি-নির্ভরতা। একই সময়ে গ্যাসের ঘাটতি ও এলএনজির উচ্চমূল্য জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ও এলএনজি আমদানির বাড়তি ব্যয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি করছে।
ফুলবাড়ীর প্রকল্পের উদ্যোক্তা জিসিএম রিসোর্সেসের দাবি, সেখানে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার সম্পদ রয়েছে এবং পূর্ণ উৎপাদনে বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন টন থার্মাল কয়লা উৎপাদন করা সম্ভব। কোম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী এই কয়লা ব্যবহার করে প্রায় ৬,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লা খননকে পরিবেশবান্ধব বলা কঠিন। আধুনিক প্রযুক্তি ক্ষতি কমাতে পারে, কিন্তু শূন্যে নামিয়ে আনতে পারে না। ফুলবাড়ীর প্রস্তাবিত খনি হবে বড় আকারের ওপেন-পিট মাইন। অর্থাৎ, কয়লার স্তরে পৌঁছাতে ওপরের বিপুল পরিমাণ মাটি সরাতে হবে। প্রকল্পের মোট খনি-এলাকা প্রায় ৫,১৯৩ হেক্টর। কোম্পানির পরিকল্পনায় এক সময়ে এর একটি অংশে সরাসরি খনন চলবে এবং পরে ধাপে ধাপে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে। কয়লার স্তর থেকে পানি সরিয়ে খনন চালাতে হলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর প্রভাব কৃষি, স্থানীয় জলাধার এবং আশপাশের বাস্তুতন্ত্রে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংসদেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানি ও জীববৈচিত্র্যের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন কৃষিজমি। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশই কৃষিজমি। তাই শুধু ‘খনির গর্ত’ নয়, জমি অধিগ্রহণ, বসতি সরানো, রাস্তা ও অবকাঠামো পুনর্বিন্যাস সব মিলিয়েই পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গত বুধবারের অধিবেশনে স্পষ্ট করেছেন,স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে কয়লা খনন করা হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আয়-রোজগার যেন বন্ধ না হয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তারা যেন এই প্রকল্প থেকে সুফল পান সে বিষয়েও বলেছেন।
প্রকল্পের উদ্যোক্তা জিসিএমের হিসাবে, প্রস্তাবিত খনি এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ২,৩০০ আদিবাসী মানুষ রয়েছেন বলে কোম্পানির হিসাব। কোম্পানি বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনমান উন্নত ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, স্থানীয় মানুষ তার বাড়ি হারালে আরেকটি বাড়ি বানিয়ে দেবে সরকার। এতেই কি পুনর্বাসনের দায়িত্ব শেষ হবে? কৃষক কৃষিজমি হারালে তার আয় কীভাবে হবে? নতুন জায়গায় পানি, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও পরিবহন থাকবে কি? কৃষিকাজ হারানো মানুষ কী কাজ করবেন? ক্ষতিপূরণ এককালীন হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা পুনর্গঠনের ব্যবস্থা থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর এখনো কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
সরকারের ঘোষিত অবস্থান মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর পুনর্বাসন, জীবিকা সুরক্ষা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে নতুন করে মূল্যায়নের কথাও বলা হচ্ছে। তবে ফুলবাড়ী প্রকল্পের মতো একটি বড় ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি প্রকল্প শুধু আশ্বাসে নয়, বাস্তবায়নের আগেই কিছু বিষয় স্পষ্ট ও আবশ্যিক হওয়া জরুরি। যেমন-
প্রথমত, পুরোনো পরিবেশগত সমীক্ষা দিয়ে বর্তমান বাস্তবতা বিচার না করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন ও স্বাধীন এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইএসআইএ) করা। কারণ দুই দশকে ফুলবাড়ীর জনসংখ্যা, কৃষি, পানিসম্পদ, জলবায়ু ও স্থানীয় অবকাঠামো সবই বদলে গেছে।
দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানির ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি। কয়লা উত্তোলনে পানির স্তর কতটা নামতে পারে, কৃষি ও স্থানীয় জলাধারে কী প্রভাব পড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই ক্ষতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর আগে জানা দরকার।
তৃতীয়ত, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টি আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। অর্থাৎ,কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, জমির মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, কত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, কোথায় পুনর্বাসন হবে এবং হারানো জীবিকা কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে এসব পরিকল্পনা প্রকল্প শুরুর আগেই প্রকাশ্যে আনা উচিত।
চতুর্থত, স্থানীয় মানুষের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া। ফুলবাড়ীর ২০০৬ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মানুষের আস্থা ছাড়া বড় জ্বালানি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই শুধু মতামত নেওয়া নয়, পরিকল্পনা, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশগত নজরদারির প্রতিটি ধাপে স্থানীয় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার।
ফুলবাড়ীর কয়লা বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটে একটি সম্ভাব্য দেশীয় উৎস। কিন্তু এটিকে ‘সহজ সমাধান’ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব শুধু কয়লার দামে শেষ হয় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমি হারানো কৃষক, উচ্ছেদ হওয়া পরিবার, ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত দায়।
আধুনিক প্রযুক্তি, ধাপে ধাপে খনন, ভূমি পুনরুদ্ধার, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর পরিবেশগত নজরদারি ক্ষতির মাত্রা কমাতে পারে। প্রকল্প উদ্যোক্তার পরিকল্পনায় পুনর্বাসন, কৃষি উন্নয়ন ও বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, ফুলবাড়ীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কয়লা উত্তোলনের পর সেই ভূমি, পানি, কৃষি ও মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ থাকে তার ওপর।
.png)
-f85749.jpeg)
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের দুই মাসও বাকি নেই। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দলগুলোর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়। জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে তাঁর লিকুদ পার্টির সমর্থন কমছে। প্রধান বিরোধী দল দিন
২১ ঘণ্টা আগে
একই মঞ্চে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এমন দৃশ্য বিশ্ব রাজনীতি পরিবর্তনের একটি বড় বার্তা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান, পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর নেতারা। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এব
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাসের শুরুতে বেতন হাতে এলেই স্বস্তি ফেরে কর্মজীবীদের জীবনে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয় না। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, বাজার-সদাই, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত, চিকিৎসার খরচ ইত্যাদি নানা খাতে এক এক করে বেতনের বড় অংশ চলে যায়।
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে নভেম্বর পর্যন্ত এশিয়া ও ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাতিল করেছে কাতার এনার্জি। এর ফলে বাংলাদেশসহ আমদানিকারক দেশগুলোতে সংকট আরও বাড়বে। ইউরো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে যে সরবরাহ বাতিলের এই প্রক্রিয়া অক্টোবর পর্যন
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬