এক্সপ্লেইনার

বৃষ্টি-জলাবদ্ধতার মধ্যেও কেন পরীক্ষা, পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে কী হয়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশজুড়ে টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও তার জেরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা-বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার (১৩ জুলাই) অনুষ্ঠিত হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলা ছাড়া দেশের বাকি অঞ্চলে নির্ধারিত সময়সূচি মেনেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রশ্ন।

কুমিল্লা, নোয়াখালীর হাতিয়া, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষার্থীদের হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান পানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। কোথাও কোথাও নৌকা বা ভ্যানে চড়েও কেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, অসংখ্য শিক্ষার্থী কোমরপানি ভেঙে হলে ঢুকছেন। পরে তাঁরা ভেজা কাপড়েই তিন ঘণ্টার পরীক্ষা দিয়েছেন।

যা বলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক

রাজধানীর উত্তরার এক কলেজের পরীক্ষার্থী সোহা খাতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, টানা বৃষ্টি ও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। তিনি মনে করেন, বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।

হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থী তাসনিয়া মাহজাবিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘শনিবার বৃষ্টিতে ভিজে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। তারপর থেকে জ্বর। গতকাল জ্বর নিয়ে আবার বৃষ্টিতে ভিজে পরীক্ষা দিতে যেতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। এর জন্য দায় কি শুধুই আমার?’

এ ব্যাপারে কথা হয় রাজশাহীর শাহ মখদুম কলেজের শিক্ষক জাহিদ হাসানের সঙ্গে। তিনি টেলিফোনে স্ট্রিমকে বলেন, এইচএসসি পরীক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের একটি নির্বিঘ্ন পরিবেশে পরীক্ষার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আসলে আমাদেরই। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে আমরা যারা পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত রয়েছি, তারা কেউই দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করতে পারিনি। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। ঢাকার মালিবাগের বাসিন্দা আজমিনা সুলতানা বলেন, ‘আমার মেয়ের ফিজিক্স পরীক্ষা ছিল। ফিজিক্স পরীক্ষার নম্বর বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মেয়েটা আমার হাঁটুপানি ভেঙে পরীক্ষার হলে গিয়ে নানা দুশ্চিন্তা আর মানসিক চাপে ঠিকমতো পরীক্ষাই দিতে পারেনি। এখন এর প্রভাব পড়বে বাকি পরীক্ষাগুলোর ওপরেও।’

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তারিক-উজ-জামান মিল্টন বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রেই দুটি ভুল ছিল। সেই ভুল প্রশ্ন মেলাতে গিয়ে আমার ছেলের অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। ফলে বাকি উত্তরগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারেনি। আমাদের শিক্ষা বোর্ডগুলো এতটাই অথর্ব, দায়িত্বজ্ঞানহীন যে, তারা প্রশ্নপত্রও ঠিকমতো তৈরি করতে পারে না।

কুমিল্লায় মেয়েকে কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে যাওয়া এক অভিভাবক জেসমিন আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, একাধিক পরীক্ষায় সন্তানদের বৃষ্টি-পানি ভেঙে কেন্দ্রে যেতে হলেও এ নিয়ে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। পরীক্ষার্থীদের প্রতি সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ গণমাধ্যমে বলেন, তাঁর বোর্ডের অধীন ছয় জেলায় কেন্দ্রের সামনে ও সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও কোনো পরীক্ষাকক্ষে পানি ঢোকেনি। যারা দেরিতে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছে, তাদের বাড়তি সময় দিতে কেন্দ্রসচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, পরীক্ষা স্থগিত করা না-করার সিদ্ধান্ত স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য জেলা প্রশাসনগুলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার তথ্য দিয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে রাতের বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর প্রস্তুতির কথা বিবেচনা করে এবং পরীক্ষা বারবার স্থগিত হলে ফলাফল প্রকাশ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম ও সামগ্রিক শিক্ষা-ক্যালেন্ডার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটি আরও বলেছে, অভিন্ন প্রশ্নপত্র পদ্ধতিতে একটি বোর্ডের কারণে সব বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখাও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে তারা। একই সঙ্গে বিরূপ আবহাওয়ায় কেন্দ্রে যাতায়াতের সময় হাতে নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে রওনা হওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও দাবি

দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেকে একে অমানবিক আখ্যা দিয়ে আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছে। এই সমালোচনার একটি বড় অংশ গিয়ে পড়েছে শিক্ষামন্ত্রীর ওপর, যাঁর পদত্যাগও দাবি করেছেন কিছু ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক।

আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঢাকাসহ চার জেলায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন বলে জানা গেছে।

দুপুরের দিকে ঢাকায় শিক্ষা ভবন ঘেরাও করতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়েছে পুলিশ।

এ ছাড়া বগুড়ার সাতমাথা এলাকা, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ, কুমিল্লার কান্দিরপাড় এলাকার পূবালী চত্বরে এবং ময়মনসিংহের টাউন হল এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে কী হয়

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পরীক্ষা নেওয়া বা স্থগিত করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ভিন্ন মডেল দেখা যায়। কোথাও পূর্বনির্ধারিত সুস্পষ্ট নিয়ম অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত হয়, আবার কোথাও কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।

জাপানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে। যেমন কিয়োটো ও ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে টাইফুন বা প্রবল বৃষ্টির ক্ষেত্রে ‘স্টর্ম ওয়ার্নিং’ জারি হলে বা নির্দিষ্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ থাকলে ক্লাস ও পরীক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায়। জরুরি আবহাওয়া সতর্কতা, ঝড় সতর্কতা বা তুষারঝড় সতর্কতা জারি হলে ক্লাস ও নিয়মিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মাত্রার (যেমন সিসমিক ইনটেনসিটি ৫-৬ বা তার বেশি) ভিত্তিতে ক্লাস বাতিলের নিয়ম আছে। ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্পের পর সরকার সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য নমনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ‘সুনেউং’ সাধারণত একবার নির্ধারিত হলে পেছানো হয় না। কারণ এটি লাখো শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ২০১৭ সালে পোহাং শহরে ভূমিকম্পের পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সরকার প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষা এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়। এটি ছিল ১৯৯৪ সালে চালুর পর থেকে প্রথম স্থগিতকরণ। শিক্ষামন্ত্রী তখন বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ফিলিপাইন টাইফুন-প্রবণ হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সুস্পষ্ট ও স্তরভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নিয়ম আছে। আবহাওয়া দপ্তরের দেওয়া ‘উইন্ড সিগন্যাল’ নম্বরের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্লাস-পরীক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

পাশের দেশ ভারতে কেন্দ্রীয় বোর্ড দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালে উত্তরাখণ্ড-উত্তরপ্রদেশে বন্যায় স্কুল বন্ধ থাকলেও বড় জাতীয় পরীক্ষাগুলো স্থগিত হয়নি, যদিও স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কিছু জেলায়।

২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ানের ওয়েনচুয়ান ভূমিকম্পের পর চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত ৪০টি জেলার জন্য ভর্তি পরীক্ষা প্রায় এক মাস পিছিয়ে জুলাইয়ের শুরুতে নিয়ে গিয়েছিল।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তুষারপাতের সময়ে ‘স্নো ডে’ ঘোষণা হয়। বাসের চাকা রাস্তায় চলতে না পারলে কিংবা হেঁটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসা বিপজ্জনক হলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত