ফয়সাল ইকবাল

২০২২ সাল। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে পিনপতন নীরবতা ও একই সঙ্গে চাপা উত্তেজনা। মাত্র কয়েক মিনিট আগে আর্জেন্টিনার জালে বল ঢুকিয়ে ১-১ গোলের সমতায় ফিরেছে সৌদি আরব। আবার এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই সৌদি আরবের আকস্মিক আক্রমণ--বক্সের ডান পাশ থেকে মিডফিল্ডার নেওয়া নাওয়াফ আল-আবিদের অ্যাটেম্পট মিস হওয়ার পর বল এসে পড়ে সালেম আল-দাউসারির পায়ে। এরপর বলটা চমৎকারভাবে ঘুরিয়ে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও পাপু গোমেজকে বোকা বানিয়ে হালকা বামদিকে ডি বক্সের দাগের কাছ থেকে নিকোলাস ওটামেন্ডির স্লাইড ট্যাকেল উপেক্ষা করে করলেন সেই সিনেমাটিক পাওয়ারফুল কারলিং শর্ট এবং সেই অবিশ্বাস্য গোল!
পুরো মাঠ জুড়ে তখন সৌদি ভক্তদের চরম আশ্চর্যজনক উত্তেজনা এবং আর্জেন্টাইন ভক্তদের গহিন নীরবতা। এমন মাহেন্দ্রক্ষণে ধারাভাষ্যকার খলিল আল বালুশি নিজের ভিতরের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসকে আর সংবরণ করতে না পেরে তিনি বলে উঠলেন, ‘‘আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ (৬ বার), ইতিহাসে লিখে রাখো এইদিন (৩ বার)। লুসাইল স্টেডিয়ামে তোমরা ইতিহাস গড়লে! এ কী অবাক করা বিস্ময়কর মুহূর্ত! এ কি উন্মাদনা! আমি আমার অন্তরের গভীর থেকে, অন্তরের গভীর থেকে বলছি, একজন গর্বিত আরব হিসাবে, এই দ্বিতীয় গোলটি চমৎকার ও অসাধারণ! ‘অসম্ভব’ বলে কোনো শব্দ সৌদি আরব ও আরবের অভিধানে নেই। হে আল্লাহ (৩ বার), হচ্ছেটা কী! সালেমের বিদ্যুৎগতির শট! তার আবেগ ও মন থেকে দেওয়া শট! সালেম, হে সালেম (৩ বার), এ এক অসম্ভব কাণ্ড...”
বিশ্বায়নের এই জমানায় এমন মুহূর্ত আর আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, খলিলের চরম উচ্ছ্বাস ও আবেগ ভরা কণ্ঠের উচ্চারণ দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মানুষজন আবার ভিন্নভাবে আবিষ্কার করতে থাকে আরবি ভাষার ফুটবল ধারাভাষ্যের জগতকে।
ফুটবল দুনিয়ায় ধারাভাষ্যে তিনটি প্রসিদ্ধ ধারার মধ্যে একটি এখন আরবি ধারাভাষ্য। ইউরোপিয়ান ও বিশেষত ইংলিশ ধারাভাষ্যকারদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা খেলার নানান তথ্য, ট্যাকটিক্স, স্ট্র্যাটেজি ও বিশ্লেষণধর্মী কথা বলেন এবং আবেগ প্রকাশে তারা বেশ পরিমিত। স্প্যানিশ ও ইতালিয়ান ধারা একটু দ্রুত স্বরে ধারাভাষ্য করলেও খুব উঁচু আওয়াজে করে না। ফ্রেঞ্চরা শুদ্ধভাষী ও বাগ্মিতার জন্য পরিচিত। রুশ-জার্মানরা ব্রিটিশদের মতোই বিশ্লেষণধর্মী ও পরিমিত ভঙ্গিতে ধারাভাষ্য প্রদান করে।
অন্যদিকে লাতিন ধারা মূলত আবেগ, চরম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, শব্দ বড় করে টেনে টেনে বলার মাধ্যমে পরিবেশকে উন্মাদনায় ভরপুর করে ফেলার জন্য প্রসিদ্ধ। ব্রাজিলের ধারাভাষ্যকারদের ‘গোওওওওল’ বলে উন্মাদনায় ফেটে পড়ার সাথে গোটা দুনিয়া পরিচিত। আর্জেন্টাইন ধারাভাষ্যও চরম উচ্ছ্বাস প্রকাশের জন্য পরিচিত। গোল হলেই শেষ দম পর্যন্ত ‘গোওওওল’ বলতে থাকা সেই পরিচিত ধারাভাষ্যকার আন্দ্রেজ কান্তোর কিন্তু আর্জেন্টাইন। লাতিন আমেরিকায় ফুটবল আবেগ, উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনার নাম। ফুটবল এখানে যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ধারাভাষ্যেও এই অনুভূতির প্রকাশ ও রূপান্তর ঘটে।
আরবি ধারাভাষ্যকে বলা যায় ইউরোপের শান্ত বিশ্লেষণধর্মিতা ও লাতিনের উচ্ছ্বসিত ধারার একটি সমন্বিত রূপ। আরবি ধারা খেলার মধ্যে যেমন নানান স্ট্র্যাটেজি, ট্যাকটিক্স ও বিশ্লেষণে ব্যতিব্যস্ত থাকে, ঠিক তেমনি ম্যাচের টানটান উত্তেজনাকর মুহূর্তে হয়ে ওঠে অশান্ত; আরবি ধারাভাষ্যকাররা যেন হয়ে ওঠেন মাঠের দর্শকদের বাঁধভাঙা উল্লাসের তরজমা।
আরবি ফুটবল ধারাভাষ্যের যাত্রা শুরু গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। তবে এর আধুনিক উত্থান শুরু হয় ৯০ এর দশকে, সৌদিতে আরব বিশ্বের বেসরকারি টিভি নেটওয়ার্ক ও চ্যানেল এআরটি (আরব রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন নেটওয়ার্ক)-এর মাধ্যমে। তারা বড় বড় টুর্নামেন্টের স্বত্ব কিনে গোটা আরব স্যাটেলাইটে প্রচার করতে থাকে। ২০০৬-এর বিশ্বকাপে আরবের পাশাপাশি ইউরোপ আমেরিকাতেও চ্যানেলটির সম্প্রচারণা চালায়। ফলে ইউরোপ আমেরিকার আরব প্রবাসীসহ পশ্চিমাদের কাছেও ছোট পরিসরে এর পরিচিতি ও প্রসার ঘটে। পরে ২০১০-এর পর এই প্রতিষ্ঠানটিকে আল জাজিরা স্পোর্টর্স কিনে নেয়। কয়েক বছর পর বিশ্ববাজারে বেইন স্পোর্টর্স নামে আত্মপ্রকাশ করে। তারা ইউরোপিয়ান লীগের ম্যাচের স্বত্ব কিনে আরবিতে ধারাভাষ্য শুরু করার পর ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে গোটা দুনিয়ায় এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
আরবি ধারাভাষ্যের কথা বললেই একজন ব্যক্তির নাম অনিবার্যভাবে এসে পড়ে, দর্শক ও শ্রোতাদের রুচিভেদ সত্ত্বেও যিনি আরব বিশ্বে ধারাভাষ্যের মাধ্যমে সবার মন জয় করেছেন। হ্যাঁ, বলছিলাম তিউনিসিয়ান ইসাম শাওয়ালির কথা। তাঁর ক্যারিয়ার ৯০-এর দশকে এআরটি-এর অধীনে শুরু হলেও খ্যাতিলাভ হয় ২০০৬ সালে আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফ্রেঞ্চ ফুটবল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানকে নিয়ে তাঁর চমৎকার ধারাভাষ্য থেকে।
২০০৬-এর ফ্রান্স বনাম ইতালির ফাইনাল ম্যাচেও ইসাম ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন। প্রাণবন্ত শক্তি, জাদুময়ী ও কাব্যিক বাকভঙ্গিমা, ধারাভাষ্যের মধ্যে গভীর জীবনবোধসম্পন্ন কথাবার্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রসঙ্গে শাওয়ালির সাহসী শব্দচয়ন ইত্যাদির জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত। খেলার মধ্যে প্যান-আরব ধারণা প্রচার, ডিকলোনিয়ালিটি ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ দর্শকদের মাঠের মধ্যেই মাঠের বাইরের জগতের সাথে দর্শককে সংযুক্ত করে। নামজাদা প্রায় সব ভাষ্যকারেরই নিজস্ব কিছু সিগনেচার বাচনভঙ্গি ও বাক্য থাকে; এসব নিয়ে তাঁকে একটি পডকাস্টে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ট্রেন্ডের পিছনে দৌড়াই না, আমার মুখ থেকে যা আসে, সেটা তাৎক্ষণিক আল্লাহর তরফ থেকে আসে। আমার কোনো কাগজে প্রস্তুতি থাকে না, এগুলো আমার সাথে সাথে মস্তিষ্কে আসে এবং আমি বলতে থাকি।’
প্রসিদ্ধ ধারাভাষ্যকারদের মধ্যে আরো আছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফারিস আওয়াদ। তিনিও তাঁর সুন্দর কণ্ঠ ও বাগ্মিতার জন্য বেশ নাম করেছেন। বিখ্যাত কানাডিয়ান গেম কোম্পানি ইএ (EA)-এর ফুটবল গেম ফিফা এইটিন থেকে আরবি ভাষার ক্ষেত্রে তার ধারাভাষ্যের ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এফসি টুয়েন্টি সিক্স (FC 26) ও তার মোবাইল ভার্সনেও আরবি ধারাভাষ্যে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। আরও রয়েছেন ওমানের খলিল আল বালুশী, আলজেরিয়ার সাবেক ফুটবলার ও সাংবাদিক হাফিজ দারাজি, ফাহাদ আল ওতাইবি, জাপানি গেম কোম্পানি কোনামি তাদের ফুটবল গেম পিইএস/ই-ফুটবল-এ শুরু থেকেই তার আরবি ধারাভাষ্য ব্যবহার করছে। এ ছাড়াও মিশরের মাহমুদ বকর, আলি মোহাম্মদ আলিসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
কী কী বিষয় আরবি ফুটবল ধারাভাষ্যকে জনপ্রিয় ও মানুষের মনে জায়গা করে দিয়েছে? এটাকে আমরা দুই ভাগে বিবেচনা করতে পারি। প্রথম ভাগটা ভাষার সাউন্ড থেকে যে নন-ভোকাল যোগাযোগ বা অনুভূতি মানুষের মধ্যে আদান-প্রদান হয়, সেটাকে বলতে পারি। এটা বেশ মানবিক। এর জন্য কোনো প্রচলিত. মৌখিক ভাষা জানতে হয় না, আরবি বোঝেনা এমন ব্যক্তি অনুভব করতে পারে। সেটা হলো ধারাভাষ্যকারদের উচ্ছ্বসিত অভিব্যক্তি ও বাকভঙ্গিমার স্বরের তারের মধ্যে দিয়ে সঞ্চালিত হওয়া অন্তর্নিহিত আবেগ। এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয়, যা অ-আরব বা অন্য ভাষাভাষীও মানবিক অনুভূতির জায়গা থেকে উপভোগ করতে পারছে।
দ্বিতীয় ভাগ আছে সরাসরি আরবি ভাষার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়, যা আরবিভাষী বা ভাষাটি জানে এমন কেউ অনুভব করতে পারে। সেগুলো হলো ধারাভাষ্যকারদের উপস্থিত অন্তমিল-সম্পন্ন কাব্যসুলভ কথা; ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে ক্লাসিক ও আব্বাসি-সহ বিভিন্ন যুগের কবিতা বা আরবি সাহিত্যের এলিমেন্ট বা মেটাফোরকে কনটেক্সচুয়ালাইজ করার মুহূর্ত এবং বিভিন্ন চতুর ওয়ার্ডপ্লে এক ভিন্নমাত্রার আনন্দ ও স্বাদ দেয়।
এসব উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের সমাহার অসংখ্য ম্যাচের ধারাভাষ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও আমরা এবারের বিশ্বকাপের দিকে একটু নজর দিতে পারি। ওয়ার্ডপ্লে করার উদাহরণ রাউন্ড অফ ৩২-এ জার্মানি বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচের টাইব্রেকারে জার্মানি ডিফেন্ডার জোনাথন টাহ পেনাল্টি মিস করলে ধারাভাষ্যকার বলে ওঠেন,“তাহ ওয়া তাহাতিল আলমানিয়া”, অর্থাৎ টাহ জার্মানিকে লাইনচ্যুত করল। আরবিতে ‘তাহ’ ক্রিয়ার অর্থ (মরুভূমিতে) পথ হারানো বা দিকভ্রান্ত হওয়া ইত্যাদি। এখানে টাহ-এর পেনাল্টি মিস করার সাথে তিনি উপস্থিত ওয়ার্ডপ্লে করলেন। আর এই কাজটা ধারাভাষ্যকাররা কোনো স্পেশালিটি ছাড়া হরহামেশাই করে থাকেন। অন্ত্যমিল করে কথা বলাটাও তাদের কাছে ডালভাতের মতো।
রাউন্ড অফ ৩২-এর আরেক হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ ইংল্যান্ড বনাম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর ম্যাচেও কঙ্গোর ম্যাচ শুরু হতেই ডিফেন্ডার এমবেম্বার লং পাস লুফে নিয়ে স্ট্রাইকার ব্রায়ান সিপেঙ্গার নাটকীয় পয়লা গোলের পর ইসাম শাওয়ালি নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “...পয়লা গোল! এক শূন্য, সিপেঙ্গার পায়ে! ইতিহাসকে বলব আমি, এই টুর্নামেন্টে কোনো দল ইংল্যান্ডকে আগে দেয়নি; কিন্তু এখানে তারা (কঙ্গো) গোল দিয়ে এগিয়ে গেল! আপনাদের শোনাচ্ছিলাম আফ্রিকান প্রতিরোধ ও ঘানার হিম্মতের কথা, এখন শোনাবো লিওপার্ড বা চিতাবাঘের লায়ন্স বা সিংহ শিকারের কথা। এই এক শূন্য গোল, (কঙ্গোর) স্বাধীনতা দিবসে লুমাম্বার স্মরণে কঙ্গোর চিতাবাঘরা গোলের খাতা খুলল।”
এই ম্যাচেই হাফ টাইমের আগে ইউয়ান উইসা আরেকটা গোলের ক্লোজ অ্যাটেম্পট মিস হলে ইসাম ছন্দ মিলিয়ে বলেন, “ইয়া উইসা, ইয়া উইসা, ইয়া উইসা, ইংল্যান্ত্রা বিস সানি তাকুন হাবিসা”, অর্থাৎ ‘হে উইসা, তুমি তো ইংল্যান্ডকে আরেকটি গোল দিয়ে বন্দি করে ফেলতে!’
আজ থেকে তিন বছর আগে রমজান মাসে এক এল ক্লাসিকোর ম্যাচে কারিম বেনজেমার পেনাল্টির সময় ধারাভাষ্যকার যে হাজিরি কবিতা আওড়ান, সেটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পেনাল্টির সময় ধারাভাষ্যকার বলেন, “রমজান মাসে, কারিম (অর্থাৎ বেনজেমা) রোজা রেখেছে, আর কারিম এখন ইফতারি করছে বিপক্ষের জালে গোল দিয়ে।”
ম্যাচে গোলের পর কাব্যিক ঢঙের কথা এক অনবদ্য সৃষ্টি। মেসির এক গোলের পর ইসাম শাওয়ালি বলছেন, ‘‘সংগীতের ভাষায় তুমি মাওয়াল (এক ধরনের শোকগাঁথা সংগীত), কবিতার ভাষায় তুমি কাফিয়া (অন্ত্যমিল), বিচারের ভাষায় তুমি অপরাধী, রাজনীতির ভাষায় তুমি বিস্ফোরক মাইন।”
এ ছাড়াও বিভিন্ন ধারাভাষ্যকারদের কিছু সিগনেচার স্টাইল আছে, যেগুলো আরো অন্য মাত্রায় নিয়ে যায় খেলা দেখাকে। যেমন, গোল দিলে ''ইয়া রাব্বাহ্", দীর্ঘস্বরে কিংবা আশ্চর্যবোধ প্রকাশে বারবার ‘‘আল্লাহ’’, একাধারে ‘বা-বা-বা-বা-বা’ কিংবা ‘ইয়া বাবা’ বলা, ‘মেশ মুমকিন’ (সম্ভব নয়), ‘মুস্তাহিল’ (অসম্ভব) বলা, জটিল ম্যাচে শেষে কামব্যাক করাকে স্প্যানিশ শব্দ ‘‘রিমোন্তাদা’’ বলে ব্যক্ত করা ইত্যাদি শুধু আরব বিশ্বে নয়, এখন গোটা দুনিয়ার ফুটবল শব্দকোষের অংশ হয়ে গেছে। আরবি ভাষার মেটাফোরের ব্যবহার খেলার সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
ধারাভাষ্যকারদের জবানে বল হয়ে যায় এমন মেহবুবা বা ‘প্রিয়তমা’, যার পিছনে ২২ জন প্রেমিক দৌড়াচ্ছে, গোলদাতা ম্যাচের ও গোলের পরিস্থিতি ভেদে হয়ে উঠে ‘মরুভূমির নায়ক’; কখনো বনের রাজা ‘সিংহ’, কখনো ‘গাদ্দার’ কিংবা ‘জলদস্যু’, কখনো ডি-বক্স হয়ে যায় ‘কেল্লা’; লং রেঞ্জের দ্রুতগতির শট হয়ে যায় ‘রকেট’, সুন্দর প্লে-মেকিং হয়ে যায় ‘গিটার বাজানোর’ সাদৃশ্য, ম্যাচে ঝুঁকি নিয়ে খেলা হয়ে যায় ‘আগুন নিয়ে খেলা’; রিয়াল মাদ্রিদের কামব্যাকের তুলনা হয় ‘রাজার নিজ সিংহাসনে অধিবেশনের সঙ্গে; উয়েফার ট্রফির সাথে নাকি রিয়ালের সম্পর্ক পরিণত হয় নাকি ‘রোমান্টিক প্রেমের’; বার্সেলোনার জয়জয়কার ম্যাচ হয়ে যায় ‘ক্যাম্প ন্যুয়ে ভূমিকম্প’।
এমন অসংখ্য মেটাফোরে ছেয়ে থাকে আরবি ফুটবলের ধারাভাষ্য। বিভিন্ন তারকা প্লেয়াররাও ভূষিত হয় নানান খেতাবে। রোনালদো হয়ে যায় ‘কিংবদন্তি’ বা ‘দুর্ধর্ষ’, মেসি হয়ে যায় ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য’ বা ‘প্রলয়ংকরী’, এরিক হাল্যান্ড হয় ‘ট্যাংক মানব’, রিয়াদ মাহরেজ হয়ে যায় ‘মরুর দুলাল’।
লেখায় কথাগুলো পড়তে মামুলি মনে হলেও ম্যাচের সময়ে তাদের ধারাভাষ্যের ভঙ্গি ও স্বর দর্শককে মোহাবিষ্ট করে, ম্যাচের মধ্যকার উত্থান-পতনে আন্দোলিত করে। তাঁদের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ও জাদুকরী শব্দ ও বাক্যমালা আপনাকে দেবে এক অন্যরকম সিনেমাটিক অনুভূতি, যেটিতে তারা বেশ পারঙ্গমতা ও মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
ম্যাচের স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি গোলের সময় বাঁধভাঙা উল্লাস প্রকাশ, ম্যাচের প্রত্যেকটি অ্যাটেম্পট, আক্রমণ ও প্রতিরোধকে টানটান উত্তেজনার সাথে উল্লেখ করে দর্শকদের খেলার সারপ্রাইজ ও প্রত্যাশার মধ্যে রাখা, গোল মিস হলে মাঝে মাঝে চা-কফির দোকানে মানুষ প্লেয়ারকে সম্বোধন করে যে ধাঁচে কথা বলে, সেভাবেও প্লেয়ারকে সম্বোধন করে কথা বলার মাধ্যমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক সুতায় গাঁথা, কথার জাদু দিয়ে এভাবে দর্শককে অন্য পর্যায়ের আনন্দ ও এনার্জির সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারা যেমন এই ধারাভাষ্যকারদের মুন্সিয়ানা, ঠিক তেমনই এখানেই অন্তর্নিহিত রয়েছে আরবি ভাষার ব্যাপ্তি ও শক্তি।
লেখক: সেন্টার ফর ইসলামিকেট এশিয়ার রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট

২০২২ সাল। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে পিনপতন নীরবতা ও একই সঙ্গে চাপা উত্তেজনা। মাত্র কয়েক মিনিট আগে আর্জেন্টিনার জালে বল ঢুকিয়ে ১-১ গোলের সমতায় ফিরেছে সৌদি আরব। আবার এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই সৌদি আরবের আকস্মিক আক্রমণ--বক্সের ডান পাশ থেকে মিডফিল্ডার নেওয়া নাওয়াফ আল-আবিদের অ্যাটেম্পট মিস হওয়ার পর বল এসে পড়ে সালেম আল-দাউসারির পায়ে। এরপর বলটা চমৎকারভাবে ঘুরিয়ে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও পাপু গোমেজকে বোকা বানিয়ে হালকা বামদিকে ডি বক্সের দাগের কাছ থেকে নিকোলাস ওটামেন্ডির স্লাইড ট্যাকেল উপেক্ষা করে করলেন সেই সিনেমাটিক পাওয়ারফুল কারলিং শর্ট এবং সেই অবিশ্বাস্য গোল!
পুরো মাঠ জুড়ে তখন সৌদি ভক্তদের চরম আশ্চর্যজনক উত্তেজনা এবং আর্জেন্টাইন ভক্তদের গহিন নীরবতা। এমন মাহেন্দ্রক্ষণে ধারাভাষ্যকার খলিল আল বালুশি নিজের ভিতরের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসকে আর সংবরণ করতে না পেরে তিনি বলে উঠলেন, ‘‘আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ (৬ বার), ইতিহাসে লিখে রাখো এইদিন (৩ বার)। লুসাইল স্টেডিয়ামে তোমরা ইতিহাস গড়লে! এ কী অবাক করা বিস্ময়কর মুহূর্ত! এ কি উন্মাদনা! আমি আমার অন্তরের গভীর থেকে, অন্তরের গভীর থেকে বলছি, একজন গর্বিত আরব হিসাবে, এই দ্বিতীয় গোলটি চমৎকার ও অসাধারণ! ‘অসম্ভব’ বলে কোনো শব্দ সৌদি আরব ও আরবের অভিধানে নেই। হে আল্লাহ (৩ বার), হচ্ছেটা কী! সালেমের বিদ্যুৎগতির শট! তার আবেগ ও মন থেকে দেওয়া শট! সালেম, হে সালেম (৩ বার), এ এক অসম্ভব কাণ্ড...”
বিশ্বায়নের এই জমানায় এমন মুহূর্ত আর আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, খলিলের চরম উচ্ছ্বাস ও আবেগ ভরা কণ্ঠের উচ্চারণ দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মানুষজন আবার ভিন্নভাবে আবিষ্কার করতে থাকে আরবি ভাষার ফুটবল ধারাভাষ্যের জগতকে।
ফুটবল দুনিয়ায় ধারাভাষ্যে তিনটি প্রসিদ্ধ ধারার মধ্যে একটি এখন আরবি ধারাভাষ্য। ইউরোপিয়ান ও বিশেষত ইংলিশ ধারাভাষ্যকারদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা খেলার নানান তথ্য, ট্যাকটিক্স, স্ট্র্যাটেজি ও বিশ্লেষণধর্মী কথা বলেন এবং আবেগ প্রকাশে তারা বেশ পরিমিত। স্প্যানিশ ও ইতালিয়ান ধারা একটু দ্রুত স্বরে ধারাভাষ্য করলেও খুব উঁচু আওয়াজে করে না। ফ্রেঞ্চরা শুদ্ধভাষী ও বাগ্মিতার জন্য পরিচিত। রুশ-জার্মানরা ব্রিটিশদের মতোই বিশ্লেষণধর্মী ও পরিমিত ভঙ্গিতে ধারাভাষ্য প্রদান করে।
অন্যদিকে লাতিন ধারা মূলত আবেগ, চরম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, শব্দ বড় করে টেনে টেনে বলার মাধ্যমে পরিবেশকে উন্মাদনায় ভরপুর করে ফেলার জন্য প্রসিদ্ধ। ব্রাজিলের ধারাভাষ্যকারদের ‘গোওওওওল’ বলে উন্মাদনায় ফেটে পড়ার সাথে গোটা দুনিয়া পরিচিত। আর্জেন্টাইন ধারাভাষ্যও চরম উচ্ছ্বাস প্রকাশের জন্য পরিচিত। গোল হলেই শেষ দম পর্যন্ত ‘গোওওওল’ বলতে থাকা সেই পরিচিত ধারাভাষ্যকার আন্দ্রেজ কান্তোর কিন্তু আর্জেন্টাইন। লাতিন আমেরিকায় ফুটবল আবেগ, উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনার নাম। ফুটবল এখানে যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ধারাভাষ্যেও এই অনুভূতির প্রকাশ ও রূপান্তর ঘটে।
আরবি ধারাভাষ্যকে বলা যায় ইউরোপের শান্ত বিশ্লেষণধর্মিতা ও লাতিনের উচ্ছ্বসিত ধারার একটি সমন্বিত রূপ। আরবি ধারা খেলার মধ্যে যেমন নানান স্ট্র্যাটেজি, ট্যাকটিক্স ও বিশ্লেষণে ব্যতিব্যস্ত থাকে, ঠিক তেমনি ম্যাচের টানটান উত্তেজনাকর মুহূর্তে হয়ে ওঠে অশান্ত; আরবি ধারাভাষ্যকাররা যেন হয়ে ওঠেন মাঠের দর্শকদের বাঁধভাঙা উল্লাসের তরজমা।
আরবি ফুটবল ধারাভাষ্যের যাত্রা শুরু গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। তবে এর আধুনিক উত্থান শুরু হয় ৯০ এর দশকে, সৌদিতে আরব বিশ্বের বেসরকারি টিভি নেটওয়ার্ক ও চ্যানেল এআরটি (আরব রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন নেটওয়ার্ক)-এর মাধ্যমে। তারা বড় বড় টুর্নামেন্টের স্বত্ব কিনে গোটা আরব স্যাটেলাইটে প্রচার করতে থাকে। ২০০৬-এর বিশ্বকাপে আরবের পাশাপাশি ইউরোপ আমেরিকাতেও চ্যানেলটির সম্প্রচারণা চালায়। ফলে ইউরোপ আমেরিকার আরব প্রবাসীসহ পশ্চিমাদের কাছেও ছোট পরিসরে এর পরিচিতি ও প্রসার ঘটে। পরে ২০১০-এর পর এই প্রতিষ্ঠানটিকে আল জাজিরা স্পোর্টর্স কিনে নেয়। কয়েক বছর পর বিশ্ববাজারে বেইন স্পোর্টর্স নামে আত্মপ্রকাশ করে। তারা ইউরোপিয়ান লীগের ম্যাচের স্বত্ব কিনে আরবিতে ধারাভাষ্য শুরু করার পর ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে গোটা দুনিয়ায় এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
আরবি ধারাভাষ্যের কথা বললেই একজন ব্যক্তির নাম অনিবার্যভাবে এসে পড়ে, দর্শক ও শ্রোতাদের রুচিভেদ সত্ত্বেও যিনি আরব বিশ্বে ধারাভাষ্যের মাধ্যমে সবার মন জয় করেছেন। হ্যাঁ, বলছিলাম তিউনিসিয়ান ইসাম শাওয়ালির কথা। তাঁর ক্যারিয়ার ৯০-এর দশকে এআরটি-এর অধীনে শুরু হলেও খ্যাতিলাভ হয় ২০০৬ সালে আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফ্রেঞ্চ ফুটবল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানকে নিয়ে তাঁর চমৎকার ধারাভাষ্য থেকে।
২০০৬-এর ফ্রান্স বনাম ইতালির ফাইনাল ম্যাচেও ইসাম ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন। প্রাণবন্ত শক্তি, জাদুময়ী ও কাব্যিক বাকভঙ্গিমা, ধারাভাষ্যের মধ্যে গভীর জীবনবোধসম্পন্ন কথাবার্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রসঙ্গে শাওয়ালির সাহসী শব্দচয়ন ইত্যাদির জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত। খেলার মধ্যে প্যান-আরব ধারণা প্রচার, ডিকলোনিয়ালিটি ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ দর্শকদের মাঠের মধ্যেই মাঠের বাইরের জগতের সাথে দর্শককে সংযুক্ত করে। নামজাদা প্রায় সব ভাষ্যকারেরই নিজস্ব কিছু সিগনেচার বাচনভঙ্গি ও বাক্য থাকে; এসব নিয়ে তাঁকে একটি পডকাস্টে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ট্রেন্ডের পিছনে দৌড়াই না, আমার মুখ থেকে যা আসে, সেটা তাৎক্ষণিক আল্লাহর তরফ থেকে আসে। আমার কোনো কাগজে প্রস্তুতি থাকে না, এগুলো আমার সাথে সাথে মস্তিষ্কে আসে এবং আমি বলতে থাকি।’
প্রসিদ্ধ ধারাভাষ্যকারদের মধ্যে আরো আছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফারিস আওয়াদ। তিনিও তাঁর সুন্দর কণ্ঠ ও বাগ্মিতার জন্য বেশ নাম করেছেন। বিখ্যাত কানাডিয়ান গেম কোম্পানি ইএ (EA)-এর ফুটবল গেম ফিফা এইটিন থেকে আরবি ভাষার ক্ষেত্রে তার ধারাভাষ্যের ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এফসি টুয়েন্টি সিক্স (FC 26) ও তার মোবাইল ভার্সনেও আরবি ধারাভাষ্যে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। আরও রয়েছেন ওমানের খলিল আল বালুশী, আলজেরিয়ার সাবেক ফুটবলার ও সাংবাদিক হাফিজ দারাজি, ফাহাদ আল ওতাইবি, জাপানি গেম কোম্পানি কোনামি তাদের ফুটবল গেম পিইএস/ই-ফুটবল-এ শুরু থেকেই তার আরবি ধারাভাষ্য ব্যবহার করছে। এ ছাড়াও মিশরের মাহমুদ বকর, আলি মোহাম্মদ আলিসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
কী কী বিষয় আরবি ফুটবল ধারাভাষ্যকে জনপ্রিয় ও মানুষের মনে জায়গা করে দিয়েছে? এটাকে আমরা দুই ভাগে বিবেচনা করতে পারি। প্রথম ভাগটা ভাষার সাউন্ড থেকে যে নন-ভোকাল যোগাযোগ বা অনুভূতি মানুষের মধ্যে আদান-প্রদান হয়, সেটাকে বলতে পারি। এটা বেশ মানবিক। এর জন্য কোনো প্রচলিত. মৌখিক ভাষা জানতে হয় না, আরবি বোঝেনা এমন ব্যক্তি অনুভব করতে পারে। সেটা হলো ধারাভাষ্যকারদের উচ্ছ্বসিত অভিব্যক্তি ও বাকভঙ্গিমার স্বরের তারের মধ্যে দিয়ে সঞ্চালিত হওয়া অন্তর্নিহিত আবেগ। এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয়, যা অ-আরব বা অন্য ভাষাভাষীও মানবিক অনুভূতির জায়গা থেকে উপভোগ করতে পারছে।
দ্বিতীয় ভাগ আছে সরাসরি আরবি ভাষার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়, যা আরবিভাষী বা ভাষাটি জানে এমন কেউ অনুভব করতে পারে। সেগুলো হলো ধারাভাষ্যকারদের উপস্থিত অন্তমিল-সম্পন্ন কাব্যসুলভ কথা; ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে ক্লাসিক ও আব্বাসি-সহ বিভিন্ন যুগের কবিতা বা আরবি সাহিত্যের এলিমেন্ট বা মেটাফোরকে কনটেক্সচুয়ালাইজ করার মুহূর্ত এবং বিভিন্ন চতুর ওয়ার্ডপ্লে এক ভিন্নমাত্রার আনন্দ ও স্বাদ দেয়।
এসব উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের সমাহার অসংখ্য ম্যাচের ধারাভাষ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও আমরা এবারের বিশ্বকাপের দিকে একটু নজর দিতে পারি। ওয়ার্ডপ্লে করার উদাহরণ রাউন্ড অফ ৩২-এ জার্মানি বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচের টাইব্রেকারে জার্মানি ডিফেন্ডার জোনাথন টাহ পেনাল্টি মিস করলে ধারাভাষ্যকার বলে ওঠেন,“তাহ ওয়া তাহাতিল আলমানিয়া”, অর্থাৎ টাহ জার্মানিকে লাইনচ্যুত করল। আরবিতে ‘তাহ’ ক্রিয়ার অর্থ (মরুভূমিতে) পথ হারানো বা দিকভ্রান্ত হওয়া ইত্যাদি। এখানে টাহ-এর পেনাল্টি মিস করার সাথে তিনি উপস্থিত ওয়ার্ডপ্লে করলেন। আর এই কাজটা ধারাভাষ্যকাররা কোনো স্পেশালিটি ছাড়া হরহামেশাই করে থাকেন। অন্ত্যমিল করে কথা বলাটাও তাদের কাছে ডালভাতের মতো।
রাউন্ড অফ ৩২-এর আরেক হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ ইংল্যান্ড বনাম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর ম্যাচেও কঙ্গোর ম্যাচ শুরু হতেই ডিফেন্ডার এমবেম্বার লং পাস লুফে নিয়ে স্ট্রাইকার ব্রায়ান সিপেঙ্গার নাটকীয় পয়লা গোলের পর ইসাম শাওয়ালি নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “...পয়লা গোল! এক শূন্য, সিপেঙ্গার পায়ে! ইতিহাসকে বলব আমি, এই টুর্নামেন্টে কোনো দল ইংল্যান্ডকে আগে দেয়নি; কিন্তু এখানে তারা (কঙ্গো) গোল দিয়ে এগিয়ে গেল! আপনাদের শোনাচ্ছিলাম আফ্রিকান প্রতিরোধ ও ঘানার হিম্মতের কথা, এখন শোনাবো লিওপার্ড বা চিতাবাঘের লায়ন্স বা সিংহ শিকারের কথা। এই এক শূন্য গোল, (কঙ্গোর) স্বাধীনতা দিবসে লুমাম্বার স্মরণে কঙ্গোর চিতাবাঘরা গোলের খাতা খুলল।”
এই ম্যাচেই হাফ টাইমের আগে ইউয়ান উইসা আরেকটা গোলের ক্লোজ অ্যাটেম্পট মিস হলে ইসাম ছন্দ মিলিয়ে বলেন, “ইয়া উইসা, ইয়া উইসা, ইয়া উইসা, ইংল্যান্ত্রা বিস সানি তাকুন হাবিসা”, অর্থাৎ ‘হে উইসা, তুমি তো ইংল্যান্ডকে আরেকটি গোল দিয়ে বন্দি করে ফেলতে!’
আজ থেকে তিন বছর আগে রমজান মাসে এক এল ক্লাসিকোর ম্যাচে কারিম বেনজেমার পেনাল্টির সময় ধারাভাষ্যকার যে হাজিরি কবিতা আওড়ান, সেটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পেনাল্টির সময় ধারাভাষ্যকার বলেন, “রমজান মাসে, কারিম (অর্থাৎ বেনজেমা) রোজা রেখেছে, আর কারিম এখন ইফতারি করছে বিপক্ষের জালে গোল দিয়ে।”
ম্যাচে গোলের পর কাব্যিক ঢঙের কথা এক অনবদ্য সৃষ্টি। মেসির এক গোলের পর ইসাম শাওয়ালি বলছেন, ‘‘সংগীতের ভাষায় তুমি মাওয়াল (এক ধরনের শোকগাঁথা সংগীত), কবিতার ভাষায় তুমি কাফিয়া (অন্ত্যমিল), বিচারের ভাষায় তুমি অপরাধী, রাজনীতির ভাষায় তুমি বিস্ফোরক মাইন।”
এ ছাড়াও বিভিন্ন ধারাভাষ্যকারদের কিছু সিগনেচার স্টাইল আছে, যেগুলো আরো অন্য মাত্রায় নিয়ে যায় খেলা দেখাকে। যেমন, গোল দিলে ''ইয়া রাব্বাহ্", দীর্ঘস্বরে কিংবা আশ্চর্যবোধ প্রকাশে বারবার ‘‘আল্লাহ’’, একাধারে ‘বা-বা-বা-বা-বা’ কিংবা ‘ইয়া বাবা’ বলা, ‘মেশ মুমকিন’ (সম্ভব নয়), ‘মুস্তাহিল’ (অসম্ভব) বলা, জটিল ম্যাচে শেষে কামব্যাক করাকে স্প্যানিশ শব্দ ‘‘রিমোন্তাদা’’ বলে ব্যক্ত করা ইত্যাদি শুধু আরব বিশ্বে নয়, এখন গোটা দুনিয়ার ফুটবল শব্দকোষের অংশ হয়ে গেছে। আরবি ভাষার মেটাফোরের ব্যবহার খেলার সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
ধারাভাষ্যকারদের জবানে বল হয়ে যায় এমন মেহবুবা বা ‘প্রিয়তমা’, যার পিছনে ২২ জন প্রেমিক দৌড়াচ্ছে, গোলদাতা ম্যাচের ও গোলের পরিস্থিতি ভেদে হয়ে উঠে ‘মরুভূমির নায়ক’; কখনো বনের রাজা ‘সিংহ’, কখনো ‘গাদ্দার’ কিংবা ‘জলদস্যু’, কখনো ডি-বক্স হয়ে যায় ‘কেল্লা’; লং রেঞ্জের দ্রুতগতির শট হয়ে যায় ‘রকেট’, সুন্দর প্লে-মেকিং হয়ে যায় ‘গিটার বাজানোর’ সাদৃশ্য, ম্যাচে ঝুঁকি নিয়ে খেলা হয়ে যায় ‘আগুন নিয়ে খেলা’; রিয়াল মাদ্রিদের কামব্যাকের তুলনা হয় ‘রাজার নিজ সিংহাসনে অধিবেশনের সঙ্গে; উয়েফার ট্রফির সাথে নাকি রিয়ালের সম্পর্ক পরিণত হয় নাকি ‘রোমান্টিক প্রেমের’; বার্সেলোনার জয়জয়কার ম্যাচ হয়ে যায় ‘ক্যাম্প ন্যুয়ে ভূমিকম্প’।
এমন অসংখ্য মেটাফোরে ছেয়ে থাকে আরবি ফুটবলের ধারাভাষ্য। বিভিন্ন তারকা প্লেয়াররাও ভূষিত হয় নানান খেতাবে। রোনালদো হয়ে যায় ‘কিংবদন্তি’ বা ‘দুর্ধর্ষ’, মেসি হয়ে যায় ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য’ বা ‘প্রলয়ংকরী’, এরিক হাল্যান্ড হয় ‘ট্যাংক মানব’, রিয়াদ মাহরেজ হয়ে যায় ‘মরুর দুলাল’।
লেখায় কথাগুলো পড়তে মামুলি মনে হলেও ম্যাচের সময়ে তাদের ধারাভাষ্যের ভঙ্গি ও স্বর দর্শককে মোহাবিষ্ট করে, ম্যাচের মধ্যকার উত্থান-পতনে আন্দোলিত করে। তাঁদের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ও জাদুকরী শব্দ ও বাক্যমালা আপনাকে দেবে এক অন্যরকম সিনেমাটিক অনুভূতি, যেটিতে তারা বেশ পারঙ্গমতা ও মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
ম্যাচের স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি গোলের সময় বাঁধভাঙা উল্লাস প্রকাশ, ম্যাচের প্রত্যেকটি অ্যাটেম্পট, আক্রমণ ও প্রতিরোধকে টানটান উত্তেজনার সাথে উল্লেখ করে দর্শকদের খেলার সারপ্রাইজ ও প্রত্যাশার মধ্যে রাখা, গোল মিস হলে মাঝে মাঝে চা-কফির দোকানে মানুষ প্লেয়ারকে সম্বোধন করে যে ধাঁচে কথা বলে, সেভাবেও প্লেয়ারকে সম্বোধন করে কথা বলার মাধ্যমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক সুতায় গাঁথা, কথার জাদু দিয়ে এভাবে দর্শককে অন্য পর্যায়ের আনন্দ ও এনার্জির সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারা যেমন এই ধারাভাষ্যকারদের মুন্সিয়ানা, ঠিক তেমনই এখানেই অন্তর্নিহিত রয়েছে আরবি ভাষার ব্যাপ্তি ও শক্তি।
লেখক: সেন্টার ফর ইসলামিকেট এশিয়ার রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট
.png)

‘কৌতুক অভিনেতা’ বললেই সবার আগে দিলদারের নাম মাথায় আসে। তাঁকে সবাই ভালোবেসে ‘হাসির রাজা’ বলতেন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকদের মনে আনন্দের ঢেউ। একের পর এক হাততালিতে মুখর হয়ে উঠত সিনেমা হল। তবে সেই সোনালি দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি। ২০০৩ সালের ১৩ জুলাই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান।
১৯ ঘণ্টা আগে
শহীদুল্লাহ দেখেছিলেন বাঙালি জাতি নিজের ভাষার ইতিহাস অন্যের চোখে দেখতে অভ্যস্ত, নিজের ইতিহাসও অন্যের ভাষায় বলে ও লেখে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি সেই প্রচলিত ধারাকে ভেঙেছিলেন। বাংলা ভাষাকে তাই শুধু গবেষণার বিষয় করেননি; তিনি একে গবেষণার ভাষাও করে তুলতে চেয়েছিলেন।
১ দিন আগে
পাবলো নেরুদা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের একজন হিসেবে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়।
১২ জুলাই ২০২৬
ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয়, ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। চার বছর ধরে এর জন্য সারা পৃথিবী যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, ভবিষ্যদ্বাণী আর তর্কাতর্কিতে। অথচ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় না। তবুও কেন এ খেলাকে ঘিরে এত আবেগ?
১১ জুলাই ২০২৬