‘ককরোচের’ ছায়ায় ‘ব্রয়লার’: শিক্ষার্থীদের নতুন ডিজিটাল প্রতিবাদ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৯: ১৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের আদালতে দেওয়া একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছিল ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। তরুণদের একাংশকে ‘ককরোচ’ বলার প্রতিবাদে তৈরি উদ্যোগটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনলাইন থেকে রাজপথে নামে।

এবার বাংলাদেশে শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যের পর একই কৌশলে তৈরি হয়েছে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামের একটি ফেসবুক পেজ। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং পরীক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্য ঘিরে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এবার নতুন অনলাইন পরিচয় পেয়েছে।

মঙ্গলবার ঢাকার সায়েন্স ল্যাব ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। বগুড়া ও বরিশালেও কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, প্রতিকূল আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত এবং পরীক্ষা দিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।

যে মন্তব্য থেকে ক্ষোভ

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা সিটি কলেজের এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক হোয়াটসঅ্যাপে শিক্ষামন্ত্রীকে কল করেন। পরে তিনি মেয়ের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর কথা বলিয়ে দেন। সেই কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভ আরও বাড়ে। ভিডিওতে সেখানে পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে মন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘ওরা তো ফার্মের মুরগি, একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর চলে আসে।’ বিষয়টি সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।

একই ফোনালাপে শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা স্থগিতের পক্ষে ছিলেন। এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘পাঁচটা পর্যন্ত আমি মিটিং করেছি। পরীক্ষা পেছানোর ব্যাপারে কেউ রাজি হয়নি।’

পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিলেও, শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যটি দ্রুত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও ব্যঙ্গের কেন্দ্রে চলে আসে।

আজকের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে, আমি কে, ফার্মের মুরগি’ স্লোগান দেন। শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যে ব্যবহৃত ‘ফার্মের মুরগি’ শব্দবন্ধটি তাঁরা অপমান হিসেবে নিলেও, পরে সেটিকেই প্রতিবাদের ভাষায় ব্যবহার করতে শুরু করেন। এই ধারাবাহিকতায় ফেসবুকে তৈরি হয়েছে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামের একটি পেজ।

পেজটিতে কী দেখা যাচ্ছে

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ পেজটির অনুসারী সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৩০০। পেজটি ৪৯টি অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করছে। ক্যাটাগরিতে এটিকে রাজনৈতিক সংগঠন নয়, ‘পারসোনাল ব্লগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফেসবুকের পেজ ট্রান্সপারেন্সি অংশে দেখা যায়, পেজটি ১৪ জুলাই ২০২৬ তৈরি করা হয়েছে। পরিচিতিতে লেখা হয়েছে, ‘We are not insulted, We are awakened’, অর্থাৎ, ‘আমরা অপমানিত নই, আমরা জেগে উঠেছি।’

মঙ্গলবার সকালে পেজটি #stepdownmilon হ্যাশট্যাগ দিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। পোস্টে বলা হয়, শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যের প্রতিবাদে তারা একটি অনলাইন ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। এতে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের ‘আমিই ফার্মের মুরগি’ বলে ছোট ভিডিও ধারণ করে পেজটির দেওয়া ই-মেইল ঠিকানায় পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। পাঠানো ভিডিওগুলো পর্যায়ক্রমে পেজে প্রকাশের কথাও বলা হয়।

ভিডিওর শুরুতে এক তরুণ অভিযোগ করেন, করোনার সময় অনলাইন ক্লাস, অর্ধেক সিলেবাস ও অটোপাসের কারণে ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরপর তিনি বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা পেছানো হয়নি, উল্টো তাঁদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলা হয়েছে।

নিজেকে বাংলাদেশের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার একজন ভুক্তভোগী উল্লেখ করে ওই তরুণ বলেন, ‘আমি ফার্মের মুরগি।’ ভিডিওর পরের অংশে একাধিক তরুণ-তরুণীকে ধারাবাহিকভাবে একই কথা বলতে দেখা যায়। কেউ বলেন, ‘আমি ফার্মের মুরগি’, আবার কেউ বলেন, ‘হ্যাঁ, আমিও ফার্মের মুরগি।’

‘আমিই ফার্মের মুরগি’ ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি পেজটিতে বিভিন্ন এলাকার বিক্ষোভের ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে। উত্তরার আন্দোলন নিয়ে একাধিক পোস্টে শিক্ষার্থীদের জমায়েত, সড়কে অবস্থান এবং হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিতে দেখা যায়।

রংপুরের কর্মসূচির একটি ভিডিওতেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। সেখানে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘দফা এক, দাবি এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।’

ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ছায়া

‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র সঙ্গে ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির মিল স্পষ্ট। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত আদালতে দেওয়া এক মন্তব্যে কয়েকজন বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচের’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এরপর ২০২৬ সালের ১৬ মে অভিজিৎ দিপকে নামের এক ভারতীয় তরুণ ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠন করেন। অল্প সময়ের মধ্যে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী দুই কোটির বেশি হয়।

শুরুতে মিম, অ্যানিমেশন, গ্রাফিকস ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গের মাধ্যমে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শিক্ষা এবং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয় তুলে ধরে সিজেপি। পরে উদ্যোগটি অনলাইন থেকে রাজপথে নামে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ফল মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগে তারা ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে।

বাংলাদেশের নতুন পেজটির ক্ষেত্রেও কাছাকাছি কৌশল দেখা যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যে ব্যবহৃত ‘ফার্মের মুরগি’ শব্দবন্ধকে অপমান হিসেবে প্রত্যাখ্যান না করে, সেটিকেই নিজেদের সম্মিলিত পরিচয়ে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মোরগকে মাসকট বানিয়ে পেজটির নাম রাখা হয়েছে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’।

পেজটি শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করছে না, বরং অপমানসূচক একটি শব্দকে ঐক্য, প্রতিবাদ ও সংগঠনের প্রতীকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত