জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যুক্তরাষ্ট্র কি একাই হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে পারবে

প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১৩: ০২
এআই জেনারেটেড ছবি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ালেও হরমুজ প্রণালি এখনো কার্যত অচল। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে যায়। কিন্তু ইরান সরাসরি প্রচলিত অবরোধ না দিয়েও এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ড্রোন, উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র, সমুদ্র-মাইন এবং দ্রুতগতির ছোট নৌযান ব্যবহার করে তারা ঝুঁকির মাত্রা এতটাই বাড়িয়েছে যে, বিমা কোম্পানি ও জাহাজমালিকেরা এখন এই রুট এড়িয়ে চলছেন। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, আর প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ সরবরাহ আটকে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় ট্যাঙ্কার চলাচলের কথা বলেছেন। ঝুঁকি বিমার প্রস্তাবও দিয়েছেন। একই সঙ্গে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ন্যাটো সদস্যদেশ, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি চীনের কাছেও নৌ-সহায়তা চেয়েছেন। কিন্তু কেউই সাড়া দিচ্ছে না।

ট্রাম্পের জোট গঠনের প্রচেষ্টা ফল দিচ্ছে না

হরমুজ খুলে দিতে ট্রাম্প প্রশাসন যে মিত্র খুঁজছে, তা এখন আর গোপন নয়। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন, যারা এই প্রণালির সুবিধাভোগী, তাদের এগিয়ে আসা উচিত। সহযোগিতা না পেলে তিনি ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া শীতল।

ট্রাম্প যে জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, তা এখন পর্যন্ত খুব একটা ফল দিচ্ছে না। জাপান জানিয়েছে, পাহারাযুক্ত জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে তারা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। অস্ট্রেলিয়া স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা হরমুজে জাহাজ পাঠাবে না। ফ্রান্স বলেছে, তারা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকবে, তবে হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না। যুক্তরাজ্য বলছে, তারা বিষয়টি নিয়ে নিবিড়ভাবে ভাবছে, কিন্তু এখনো কোনো অঙ্গীকার দেয়নি। চীন শুধু উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো সীমিত লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে নামতে চাইছে না। অন্যদিকে ভারত, তুরস্ক, ফ্রান্স ও ইতালির মতো কিছু দেশ সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করার পথ খুঁজছে। ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যেও বড় ধরনের অনীহা রয়েছে। কারণ তারা এই সংঘাতে স্পষ্ট কৌশল, নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং দ্রুত সমাপ্তির বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা দেখতে পাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এমনকি একটি জোট গঠিত হলেও হরমুজের মতো সংকীর্ণ ও উচ্চ-ঝুঁকির সামুদ্রিক করিডরে সেটি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সহজ হবে না। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি একাই এগোয়, তবে নৌবাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে, সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা চালাতে হবে, এবং মার্কিন হতাহতের আশঙ্কাও বাড়বে।

হরমুজের পরিবেশ অত্যন্ত কঠিন

নৌবিশ্লেষক ও ইরান বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র একা এ কাজ করতে পারবে না। অন্তত নিরাপদ, টেকসই এবং বড় ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তো নয়ই।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেক্সান্দ্রু হুডিস্টিয়ানু বলেন, একতরফা মার্কিন অভিযানের সামনে বড় বাধা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একা নামলে পরিবেশটি অত্যন্ত কঠিন হবে। তার ভাষায়, যুদ্ধকালীন এই ধরনের হুমকির মধ্যে এই জলপথে চলাচল করা খুবই নিষ্ঠুর ও বিপজ্জনক ব্যাপার। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র, সম্ভাব্য মাইন এবং মানববিহীন হামলা ব্যবস্থার মধ্যে জাহাজ খুব সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের বড় সুবিধা দিয়েছে। কারণ উপকূলরেখা খুব কাছে, আর জাহাজ চলাচলের পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ। তার মতে, ইরান এই পথকে এমন এক বিপজ্জনক করিডরে পরিণত করেছে, যেখান থেকে তেহরান অনুমতি না দিলে জাহাজের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

জাহাজ পাহারা দেওয়ার প্রশ্নে হুডিস্টিয়ানু বলেন, এটি হবে ব্যয়বহুল একটি ব্যবস্থা। এতে অংশ নেওয়া বিদেশি যুদ্ধজাহাজ ইরানের হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। আর তাতে আরও বেশি দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে। তার মতে, প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, কিন্তু প্রশ্ন হলো—তার জন্য কত সময় এবং কত সম্পদ লাগবে। তাড়াহুড়া করে এগোতে গেলে তা পুরো মিশন এবং বৃহত্তর অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্টের নিকোলাস কার্ল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আইআরজিসির দ্রুতগতির ও নমনীয় নৌ-ক্ষমতা এখনো বেসামরিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিন সিবিএসকে বলেছেন, সামরিকভাবে প্রণালি খুলে দেওয়ার উপায় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেছেন যে, চ্যালেঞ্জের পরিমাণ অত্যন্ত বড়।

ইরানের শক্তি এখন তার অসম কৌশলে

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের প্রচলিত নৌবহরের বড় অংশ ধ্বংস করেছে। বহু মাইন পাতা জাহাজও অকার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে হুমকি শেষ। কারণ ইরানের হাতে এখনো রয়েছে এমন সব কম খরচের, মোবাইল এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য উপকরণ, যেগুলো সংকীর্ণ এই জলপথে বড় শক্তিকে আটকে দিতে পারে।

চ্যাথাম হাউস, ইউরেশিয়া গ্রুপ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে পুরো জলপথ দখল করতে হবে না। তাদের শুধু এতটাই ঝুঁকি তৈরি করতে হবে, যাতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। উপকূল থেকে ছোড়া ড্রোন, মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র, ছোট আক্রমণ-নৌকা এবং সীমিত মাইন ব্যবহারের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। ফলে সামরিকভাবে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও তেহরান এখনো বৈশ্বিক বাজারে বড় ধাক্কা দেওয়ার ক্ষমতা ধরে রেখেছে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের গ্রেগরি ব্রিউ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরও উপকূলীয় এলাকায় আরও বেশি দমনমূলক অভিযান দরকার। তার মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখন ড্রোন। ইরানের হাতে এগুলো প্রচুর আছে এবং সহজে ছোড়া যায়। তাই উপকূলীয় অবস্থানগুলো আরও দুর্বল না করা পর্যন্ত জাহাজ পাহারা শুরু করলেও তা যথেষ্ট নিরাপদ হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র স্টাডিজ সেন্টারের জ্যারেড মন্ডশাইন আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, একতরফাভাবে হরমুজ খুলে দেওয়ার সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আদৌ আছে কি না, সেটিই এখন স্পষ্ট নয়।

জাহাজ পাহারা নয়, দরকার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ-অভিযান

হরমুজে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা মানে কেবল কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো নয়। এটি হবে বহুস্তরবিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান।

লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের সম্পাদক-ইন-চিফ রিচার্ড মেইডের মতে, সাধারণ ধরনের একটি পাহারা ব্যবস্থার জন্যও অন্তত ৮ থেকে ১০টি ডেস্ট্রয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এই সামর্থ্য দিয়েও হয়তো একসঙ্গে মাত্র ৫ থেকে ১০টি ট্যাঙ্কারকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে। তাতেও যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিকতার মাত্র একটি ছোট অংশই ফিরতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক নৌ কর্মকর্তা জেনিফার পার্কার বলেছেন, বড় ট্যাঙ্কারগুলো পাহারাদার যুদ্ধজাহাজের জন্যই নতুন সমস্যা তৈরি করে। কারণ এসব জাহাজের কারণে নিরাপত্তা কাভারেজে অন্ধ এলাকা বা ব্লাইন্ড স্পট তৈরি হয়। তাই শুধু জাহাজ দিয়ে হবে না; লাগবে হেলিকপ্টার, আগাম সতর্কীকরণ বিমান, নজরদারি ড্রোন এবং স্থলভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌ-ক্যাপ্টেন কার্ল শুস্টারের মতে, আকাশপথে আগাম সতর্কীকরণ এবং উপকূলের ভেতরে থাকা মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মে হামলা চালানোও বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, হরমুজ খুলে দেওয়া শেষ পর্যন্ত কেবল সামুদ্রিক নিরাপত্তার মিশন থাকবে না; এটি উপকূলীয় যুদ্ধ-অভিযানে পরিণত হবে।

এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কলিন কোহ প্রশ্ন তুলেছেন, সব হুমকি কি আদৌ নির্মূল করা সম্ভব? তার মতে, ইরানের সব ছোট নৌযান, মোবাইল প্ল্যাটফর্ম ও বিচ্ছিন্ন আক্রমণক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা বাস্তবে খুবই কঠিন।

হরমুজ এখন ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার

আলেক্সান্দ্রু হুডিস্টিয়ানুর ভাষায়, ইরান এখন শুধু আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাকেই প্রভাবিত করছে না, বরং পুরো ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকে আলোচনার টেবিলে টেনে আনছে।

ট্রাম্প চাইলে উপকূলে বোমা হামলা চালিয়ে যেতে পারেন, ইরানের নৌযানও ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের প্রায় সবারই মত, যুক্তরাষ্ট্র একা হরমুজ প্রণালিকে নির্ভরযোগ্যভাবে খোলা রাখতে পারবে না। এর জন্য একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক জোট দরকার, অথচ তেমন কোনো জোট গঠনের স্পষ্ট লক্ষণ এখনো নেই। ফলে একক মার্কিন অভিযান মানে হবে বাড়তি প্রাণহানি, বেশি ব্যয়, এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা।

এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ইরানের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও তারা এমন এক অবস্থান তৈরি করেছে, যেখানে খুব সামান্য ব্যয়ে বৈশ্বিক বাজারে বড় চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র একা হরমুজ প্রণালি নির্ভরযোগ্যভাবে খোলা রাখতে পারবে না। চেষ্টা করলে সেটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং সম্ভাব্যভাবে বিপর্যয়কর অভিযানে পরিণত হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এখন শুধু হরমুজ খোলা যাবে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি প্রয়োজনীয় জোট গড়তে পারবে, নাকি আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে। সেই উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে এই যুদ্ধের শেষ কোথায় গিয়ে থামবে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস

সম্পর্কিত