আমেরিকা, ইউরোপ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গণতন্ত্রের ঝাণ্ডা, অভিবাসীর জন্য স্বপ্নের দেশসহ বৈচিত্র্যের বিশাল ক্যানভাস। সেখানে যোগ্যতা শেষ কথা, বংশপরিচয় নয়। তবে সম্প্রতি এই চেনা ছবির আড়ালে দানা বাঁধছে প্রত্যাবাসন (রিমাইগ্রেশন) পরিকল্পনা। যে প্রত্যাবাসন ছিল উগ্র ডানপন্থীদের ফিসফাস, আজ তা নীতি-নির্ধারণী টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান সমর্থকদের চোখে, বংশপরিচয় ও ঐতিহ্য কাউকে আসল আমেরিকান করে তোলে। তবে ভারতীয় অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান ওহাইওতে রিপাবলিকান থেকে গভর্নর প্রার্থী বিবেক রামাস্বামী এই ধারণার ঘোর বিরোধী। সম্প্রতি ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’-র বার্ষিক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ঐতিহ্যবাহী আমেরিকান অন্যের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান– চিন্তা করাই আমেরিকার আদর্শের পরিপন্থী।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর শেষের পথে। রিপাবলিকান বৃত্তে ও আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপে প্রত্যাবাসনের মতো চরমপন্থী ধারণা মূলধারায় উঠে আসছে।
রিমাইগ্রেশন ও ভয়ানক বাস্তবতা
রিমাইগ্রেশন হলো, যখন কোনো অভিবাসী স্বেচ্ছায় নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যান। তবে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে উগ্র ডানপন্থী (ফার-রাইট) আন্দোলনের অভিধানে শব্দটির অর্থ– সমাজের পরিবর্তনে ঐতিহ্য, জাতীয় পরিচয় ও কঠোর নিয়মকে প্রাধান্য দেয়।
আল-জাজিরাকে উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেইডি বেইরিচ বলেছেন, উগ্র ডানপন্থীদের তত্ত্বে রিমাইগ্রেশন হলো জাতিগত নির্মূলের (এথনিক ক্লিনজিং) আধুনিক ও মার্জিত নাম। তিনি বলেন, উগ্র ডানপন্থীরা ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে ঐতিহাসিকভাবে সাদা চামড়ার মানুষের দেশ মনে করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য, এসব দেশ থেকে অন্য বর্ণের মানুষদের বের করে দেওয়া।
ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা বিভীষিকা
রিমাইগ্রেশনের আদি ধারণা পাওয়া যায় ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে জার্মানিতে। তখন নাৎসিরা জার্মানি থেকে ইহুদিদের মাদাগাস্কারে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল, যাকে তারা রিমাইগ্রেশন অভিহিত করেছিল। সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলেও, বীজ রয়ে গিয়েছিল।
ধারণাটিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করেন ফরাসি ঔপন্যাসিক রেনল্ড কামু। ২০১১ সালে নিজের বই ‘ল্য গ্র্যান্ড রিপ্লেসমেন্ট’-এ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করেন তিনি। কামুর এই তত্ত্ব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলেও, উগ্র জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
রেনল্ড কামু দাবি করেন, পশ্চিমা বিশ্বের অভিজাত শ্রেণি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান জনসংখ্যাকে অ-শ্বেতাঙ্গ, বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসীদের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করছে। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে গণহত্যা’ (জেনোসাইড বাই সাবস্টিটিউশন) অভিহিত করেছেন। কামুর মতে, গণঅভিবাসন ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ইউরোপের প্রকৃত বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপ ও উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা এখান থেকেই তাদের মতাদর্শের রসদ সংগ্রহ করেছে।
ফ্রিঞ্জ থিওরি থেকে মূলধারায়
ফ্রিঞ্জ থিওরি হলো মূলধারার বিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি বা সমাজবিজ্ঞানে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য নয়– এমন ধারণা। হেইডি বেইরিচের মতে, রিমাইগ্রেশন ধারণা জনপ্রিয় করার হোতা মার্টিন সেলনার। ৩৬ বছর বয়সী এই অস্ট্রিয়ান ‘আইডেন্টিটারিয়ান মুভমেন্ট’ নামের একটি উগ্র ডানপন্থী দলের নেতা। দলটি কট্টর অভিবাসনবিরোধী অবস্থান এবং জাতিগত জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের সমর্থক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, উগ্রবাদীদের এই আলোচনা কীভাবে হোয়াইট হাউস কিংবা ইউরোপীয় পার্লামেন্টে পৌঁছাল? হেইডি বেইরিচ বলেন, অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) মতো বিদেশ-বিদ্বেষী দল এমন ধারণাকে সমর্থন দেবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের এই নীতি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রচার করছে, এটিই বিস্ময়ের।
গত বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এক্সিওস স্টেট ডিপার্টমেন্টের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে খবর দেয়, ট্রাম্প প্রশাসন ‘প্রত্যাবাসন দপ্তর’ করার পরিকল্পনা করছে। এরপর গত ১৪ অক্টোবর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট এক্স হ্যান্ডেলের পোস্টে সরাসরি ‘রিমাইগ্রেট’ শব্দটি ব্যবহার করে। সেখানে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের লিংক দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীরা চাইলে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন।
ইউরোপের রাজনীতিতে রিমাইগ্রেশন
ইউরোপেও এই ধারণার পুনর্জাগরণ ঘটছে। অস্ট্রিয়ার উগ্র ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী ফ্রিডম পার্টির (এফপিও) নেতা হার্বার্ট কিকল এই জাগরণের অন্যতম প্রধান মুখ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচনের আগে এফপিওর নির্বাচনী ইশতেহারে কিকল ঘোষণা করেন, জনগণের চ্যান্সেলর হিসেবে আমি সেসব মানুষের প্রত্যাবাসন শুরু করব, যারা আমাদের আতিথেয়তার অধিকারকে পদদলিত করেছে।
ওই নির্বাচনে এফপিও সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করতে পারেনি। ২০২৫ সালের শুরুতে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও উদারপন্থী নিওস জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে। এফপিওকে আটকে রাখা গেলেও থামেনি রিমাইগ্রেশন নিয়ে আলোচনা।
জার্মানির সীমান্তের ওপারেও একই চিত্র। গত বছরের জানুয়ারিতে দলীয় সম্মেলনে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) নেতা অ্যালিস উইডেল নতুন অভিবাসীদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করার পক্ষে কথা বলার সময় রিমাইগ্রেশন শব্দ ব্যবহার করেন।
এরপর তো ২০২৫ সালের মে মাসে ইতালিতে প্রত্যাবাসন শীর্ষ সম্মেলন হয়। অভিবাসনবিষয়ক ওয়েবসাইট ইনফোমাইগ্রেন্টসের তথ্যে, ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৪০০ উগ্র ডানপন্থী কর্মী ও নেতা সম্মেলনে সশরীরে যোগ দেন। অথচ এক সময় এই বৈঠক গোপনে হতো।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
হেইডি বেইরিচ বলেছেন, প্রত্যাবাসন সত্যিকার অর্থে নীতি হিসেবে বাস্তবায়ন হলে, তা জাতিগত নির্মূল অভিযানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্র তৈরি করবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বা ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান, সব মিলিয়ে রিমাইগ্রেশন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। বরং এখন লাখ লাখ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা।