কোটি কোটি বছর আগে ডাইনোসররা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তেলাপোকা আজও টিকে রয়েছে। এমনকি বিজ্ঞানীদের ধারণা, পারমাণবিক বিস্ফোরণের তীব্র বিকিরণ সহ্য করেও এরা বেঁচে থাকতে সক্ষম।
সমকালীন দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচ’ এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের মতো এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত যখন দেশের বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন, তখন তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি)।
২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আন্দোলনরত ছাত্রজনতাকে ‘রাজাকার’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। পরে সেই রাজাকার শব্দকে তারা শ্লোগানের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়ে বলে, ‘তুমি কে, আমি কে/ রাজাকার রাজাকার/ কে বলেছে, কে বলেছে/ স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। অভ্যুত্থান সফল হলে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।
এই ব্যঙ্গাত্মক ভাষা তাৎক্ষণিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড হওয়া অতিক্রম করে শাসক শ্রেণির প্রতি তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অনাস্থা প্রকাশ করে। কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা কাঠামো সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে অবদমিত করতে অবজ্ঞাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে। দার্শনিক স্লাভোজ জিজেকের মতে, শাসকের দেওয়া অবমাননাকর নামকে যখন শোষিতরা নিজেদের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করে পাল্টা উপহাসের অস্ত্র বানায়, তখনই ক্ষমতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। 'ককরোচ জনতা পার্টি'র আত্মপ্রকাশ যেন জিজেকের এই 'ওভার-আইডেন্টিফিকেশন' তত্ত্বেরই এক বাস্তব রূপ।
ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত বক্তব্যের প্রতিবাদেই এই অভিনব ব্যঙ্গাত্মক দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনি বেকার যুবকদের ‘পরজীবী বা তেলাপোকার’ সঙ্গে তুলনা করলে মুহূর্তের মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন অভিজিৎ দীপ নামের এক তরুণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত অভিজিৎ রাজনৈতিকভাবে বেশ সচেতন। এর আগে ভারতে তিনি আম আদমি পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় সোশ্যাল মিডিয়া পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। মূলত তাঁর এই অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সচেতনতাই আন্দোলনটিকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত বক্তব্যের প্রতিবাদেই এই অভিনব ব্যঙ্গাত্মক দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনি বেকার যুবকদের ‘পরজীবী বা তেলাপোকার’ সঙ্গে তুলনা করলে মুহূর্তের মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন অভিজিৎ দীপ নামের এক তরুণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত অভিজিৎ রাজনৈতিকভাবে বেশ সচেতন; এর আগে ভারতে তিনি আম আদমি পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় সোশ্যাল মিডিয়া পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। মূলত তাঁর এই অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সচেতনতাই আন্দোলনটিকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
ডিজিটাল ক্যাম্পেইনে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন তরুণ এই আন্দোলনের গোড়াপত্তন করায় তা কেবল তাত্ত্বিক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে এটি বিপুল সাড়া জাগায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ এই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ায় এবং নিজেদের বক্তব্য শেয়ার করতে শুরু করে।
সাংবাদিক এহসান মাহমুদের মতে, এই ডিজিটাল প্রতিরোধ এতটাই জোরালো ছিল যে, স্বয়ং প্রধান বিচারপতিও পরে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলতে বাধ্য হন যে তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ঘটনাটি মূলত বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে তরুণদের দ্রুত সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা এবং ডিজিটাল শক্তিরই এক পরোক্ষ স্বীকৃতি।
দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং কার্যকর বিরোধী দলের অভাবই ভারতে 'ককরোচ জনতা পার্টি'র মতো ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম উত্থানের মূল কারণ। বিজেপির সর্বভারতীয় আধিপত্যের মুখে কংগ্রেস বা মমতার আঞ্চলিক প্রতিরোধের মতো প্রথাগত দলগুলো ব্যর্থ হওয়ায় তরুণদের সামনে কোনো নির্ভরযোগ্য বিকল্প ছিল না।
কবি ও ভাববৈঠকির প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ রোমেল মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর এই ব্যর্থতার শূন্যতায় তরুণদের এমন নতুন উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক। তবে এই আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক ঢেউ হিসেবেই রয়ে যাবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারবে—তা দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে। মোহাম্মদ রোমেল এই শূন্যতা এবং নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনা সম্পর্কে বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিজেপি সর্বভারতে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট নিয়ে ক্ষমতায় আছে। এর বিপরীতে পুরোনো পার্টিগুলি তো কিছু করতে পারছে না। নতুন এই ইনিশিয়েটিভে কিছু একটা তো হতেই পারে। আর সেটা তো ডেফিনেটলি পজিটিভ।’
লেখক, গবেষক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এই আন্দোলনকে এস্টাবলিশমেন্টের অবজ্ঞার বিরুদ্ধে তরুণদের অনাস্থা ও বড় বিদ্রোহ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ‘অলরেডি এটা এক্সিস্টিং বড় পার্টি এবং এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে সাধারণ তরুণদের অনাস্থা হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।’
এই নামকরণের মনস্তাত্ত্বিক দিক বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘যখন আপনি মূল সমস্যা অ্যাড্রেস না করে সাধারণ মানুষকে এক ধরণের ভর্ৎসনা করবেন যে—ওরা রাজাকার এ কারণে এরকম করছে, ওরা ককরোচ এ কারণে এরকম করছে, তখন ওই যে শব্দটা দিয়ে তাদেরকে আপনি কালিমালিপ্ত করতে চাইবেন, তারা ওই শব্দটাকে ওউন করব।’ এর মাধ্যমে মূলত শোষকের তৈরি শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা হয়।
তবে এই ডিজিটাল প্রতিরোধ ভারতে মাঠপর্যায়ের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেবে কিনা, তা নিয়ে শাসনতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তিনি কিছুটা সন্দিহান। দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২২ পরবর্তী তরুণদের উত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘শ্রীলঙ্কায়, নেপালে, বাংলাদেশে যা হয়েছে ভারতে এটা বাকি আছে। সেটা হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়।’ তবে তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সংগঠিত শক্তি ও নেতৃত্বের ওপর।
সারোয়ার তুষারের মতে, ভারতের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক কাঠামোই এই রূপান্তরকে জটিল করে তোলে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা বাংলাদেশের মতো এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের চেয়ে ভারতের ফেডারেল কাঠামোর কারণে পুরো ফেডারেশন জুড়ে একসঙ্গে সংগঠিত আন্দোলন করা বেশ কঠিন। এই রাষ্ট্রীয় মডেলের কারণেই ভারতে গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা মাঠপর্যায়ে রূপ নিতে পারে না।
তবে ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন বিভিন্ন রাজ্যের তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, তারা যদি ভবিষ্যতে কোনো সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে বর্তমান এস্টাবলিশমেন্টকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, তবেই আন্দোলনের একটি বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে—যা একেবারেই সহজ নয়।
সারোয়ার তুষারের মতে, ককরোচ জনতা পার্টির প্রভাব ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানেও প্রবেশ করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের ক্ষোভের অভিন্ন ভাষাকেই প্রমাণ করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তানেও ভারতের মতোই রাজ্যগুলোর মধ্যে একধরনের বিচ্ছিন্নতা রয়েছে এবং সেখানে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কারণে কেন্দ্রভিত্তিক আন্দোলন দমন করা সহজ হয়। তবে এই সময়ে তরুণদের দিয়ে কখন কী ঘটে তা বলা যায় না।
একইভাবে এই আন্দোলনের হাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও প্রাসঙ্গিক। কবি ও গল্পকার মোহাম্মদ রোমেল এই অঞ্চলের তরুণদের বিদ্রোহের ধারাবাহিকতা বা ‘সিলসিলা’র প্রসঙ্গ টেনে জানান, বাংলাদেশ ও নেপালের গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব যেমন ভারতে পড়ার কথা, তেমনি এই নতুন আন্দোলনও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ কি না, তা এখনই পরিষ্কার করে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এদেশের তরুণরা বারবার রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তনের দাবি তুলেছে। চলমান সংকট নিয়ে সারোয়ার তুষারের মূল্যায়ন হলো, কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো থমকে থাকায় বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণের কারণেই এখানে আবারও আন্দোলন হতে পারে। সংকটটি আসলে মিটে যায়নি, আপাতত স্থগিত আছে মাত্র।
ককরোচ জনতা পার্টির মতো ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ মূলত দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। শাসক যখন শোষিতের কণ্ঠস্বর শোনার যোগ্যতা হারায়, তখন শোষিতরা শাসকের ভাষাকেই তার বিরুদ্ধে অস্ত্র বানায়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের তরুণদের এই অনাস্থা কোনো সাময়িক ঘটনা নয়। উপযুক্ত নেতৃত্ব ও সংগঠিত শক্তির মাধ্যমে এই ক্ষোভ ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে পারে। যতদিন তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও কাঠামোগত সংকট সমাধান না হচ্ছে, ততদিন এই গণ-অসন্তোষ কোনো না কোনো রূপ ধরে ফিরে আসতেই থাকবে।