যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন, কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৪: ০০
স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যেতে চান বা ইতোমধ্যে সেখানে পড়াশোনা করছেন এমন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) একটি চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশ করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় পাঁচ দশক ধরে চালু থাকা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে।

এর ফলে এখন থেকে এফ, জে এবং আই শ্রেণির ভিসাধারীরা আগের মতো অনির্দিষ্ট সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারবেন না। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে এবং সময় বাড়াতে হলে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে আবেদন করতে হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি কঠোর করার ধারাবাহিকতার অংশ। প্রশাসনের দাবি, এটি জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং ভিসার অপব্যবহার কমাবে। তবে সমালোচকদের মতে, নতুন নিয়ম আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে কম আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

এতদিন কী নিয়ম ছিল

১৯৭৮ সাল থেকে এফ-১ শিক্ষার্থী ভিসাধারীদের জন্য ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থা চালু ছিল। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী যতক্ষণ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কোর্সে বৈধভাবে ভর্তি থাকতেন এবং ভিসার শর্ত মানতেন, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারতেন।

এতে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও সমস্যা হতো না, কারণ থাকার অনুমতি নির্ভর করত শিক্ষার্থীর একাডেমিক অবস্থার ওপর।

ডিএইচএসের দাবি, এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু শিক্ষার্থী বারবার নতুন কোর্সে ভর্তি হয়ে বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছেন। প্রশাসনের ভাষায়, এ ধরনের ‘চিরস্থায়ী শিক্ষার্থী’ তৈরি হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতেই নতুন নিয়ম আনা হয়েছে।

নতুন নিয়মে কী কী বদলাচ্ছে

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, এখন থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্ট সময় থাকার সুযোগ পাবেন না। এফ ও জে ভিসাধারীদের জন্য থাকার অনুমতি হবে তাদের নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রমের সময় পর্যন্ত, তবে সর্বোচ্চ চার বছর।

চার বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয় আর নিজে থেকে মেয়াদ বাড়িয়ে দিতে পারবে না। শিক্ষার্থীকে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)-এর কাছে ‘এক্সটেনশন অব স্টে’ এর আবেদন করতে হবে। তখন বায়োমেট্রিক তথ্য, পটভূমি যাচাই এবং জালিয়াতি পরীক্ষা করা হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার জন্য আগে যেখানে ৬০ দিনের সময় পাওয়া যেত, এখন তা কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে।

এ ছাড়া স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিষয় পরিবর্তন বা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

এখন যারা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন তাদের কী হবে

এটি অনেকের বড় প্রশ্ন। ডিএইচএস জানিয়েছে, বর্তমানে ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থার আওতায় থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি রূপান্তরকাল থাকবে। তারা সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ হয়ে যাবেন না।

তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর তাদের অবস্থানের ওপরও সর্বোচ্চ চার বছরের সীমা প্রযোজ্য হবে এবং ভবিষ্যতে নতুন ব্যবস্থার অধীনেই থাকতে হবে। নিয়মটি ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশের ৬০ দিন পর কার্যকর হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শিক্ষার্থীদের নতুন নিয়ম বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি কী

ডিএইচএসের ভাষ্য, প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো ব্যবস্থা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এইসব নিয়ম অনির্দিষ্ট থাকার সুযোগ তৈরি করে যা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে তথ্যও নিয়মিত সরকারি তদারকি সম্ভব হচ্ছিল না। এছাড়াও কিছু শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ভর্তি হয়ে থেকে ভিসার অপব্যবহার করেছেন বলে তারা মনে করে।

নতুন ভিসানীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা কঠিন হতে পারে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
নতুন ভিসানীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা কঠিন হতে পারে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ডিএইচএস জানিয়েছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেড়েছে যে আগের ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে ১৮ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন।

সমালোচকেরা কী বলছেন

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে সরিয়ে সবকিছু কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল করলে সময়, খরচ ও অনিশ্চয়তা বাড়বে। এই নতুন নিয়মে পিএইচডি, গবেষণা বা দীর্ঘমেয়াদি ডিগ্রির শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত প্রশাসনিক ঝামেলায় পড়তে পারেন।

পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে চাকরি, নতুন ভিসা বা অন্য আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন হতে পারে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, এসব পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বদলে কানাডা, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়াকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করতে পারেন।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এর অর্থ কী

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। নতুন নিয়ম তাদের সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। যারা চার বছরের মধ্যে ডিগ্রি শেষ করবেন, তাদের ক্ষেত্রে খুব বড় পরিবর্তন নাও হতে পারে। তবে যাদের পিএইচডি, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, একাধিক ডিগ্রি বা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে, তাদের নির্ধারিত সময়ের আগেই এক্সটেনশনের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিসের পাশাপাশি সরাসরি ইউএসসিআইএসের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফলে কাগজপত্র, সময়সীমা এবং আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতি আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর চাকরি, নতুন ভিসা বা অন্য স্ট্যাটাসে পরিবর্তনের পরিকল্পনা এখন আরও আগে থেকেই করতে হবে, কারণ আগের ৬০ দিনের বদলে হাতে থাকবে মাত্র ৩০ দিন।

এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে

এটি শুধু একটি ভিসা নীতির পরিবর্তন নয়, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কীভাবে দেখছে, তারও একটি ইঙ্গিত। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসন বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাস্তবে কোনটি সত্যি হবে, তা নির্ভর করবে নতুন নিয়ম কার্যকরের পর এক্সটেনশন অনুমোদনের গতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যারা এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাবেন, তাদের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত ও সময়মতো ভিসা ব্যবস্থাপনা জরুরি হয়ে উঠছে।

তথ্যসূত্র: মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ওয়েবসাইট ও রয়টার্স

Ad 300x250

সম্পর্কিত