
উত্তমকুমারকে নিয়ে বলতে গেলে সাধারণত একই জায়গায় ফিরে আসতে হয়—‘মহানায়ক’, ‘রোম্যান্টিক হিরো’। যেন তাঁর জীবনটা শুরুই হয়েছিল খ্যাতি দিয়ে। অথচ বাস্তবের উত্তমকুমারের গল্পটা ঠিক উল্টো।
একসময় টালিগঞ্জের লোকজন উত্তমকুমারকে ডাকত ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বলে। একের পর এক ছবি ব্যর্থ হচ্ছিল, কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছিল, এমনকি একসময় চলচ্চিত্র ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর উত্তমকুমার সফলতার মুখ দেখলেন, ধীরে ধীরে স্থায়ী জায়গা করে নিলেন মানুষের মনে। কিন্তু এই সফলতার পেছনে তাঁর জীবনের অন্য দিকগুলো অনেকসময় ঢাকা পড়ে যায়।
বাঙালির চেনা ছকের ‘নায়ক উত্তমকুমারের’ ব্যক্তিগত জীবনে আছে নানান উত্থান-পতন। সংসারের অশান্তি আছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে, সহকর্মীর সঙ্গে মনোমালিন্য আছে, নিজের ইমেজ নিয়ে প্রবল সচেতনতা আছে। এমনকি একজন সাংবাদিকের লেখা পছন্দ না হওয়ায় মানহানির আইনি পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।

উত্তমকুমারকে ঘিরে ভক্তদের এত জনশ্রুতি আছে যে সবকিছুকে সত্য ধরে নেওয়া কঠিন। কিছু ঘটনা স্মৃতিকথা ও সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, আবার কিছু ঘটনা বছরের পর বছর ধরে মুখে মুখে ছড়িয়েছে।
টলিউডের স্বর্ণযুগের কথা উঠলে উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রসঙ্গ আসবেই। একের পর এক ছবির সাফল্য, পর্দায় তাঁদের অসাধারণ রসায়ন মিলিয়ে খুব অল্প সময়েই দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন তাঁরা।
‘সপ্তপদী’র কৃষ্ণেন্দু কিংবা ‘হারানো সুর’-এর রিনা ব্রাউন চরিত্রগুলো আজও বাঙালির মনে গেঁথে আছে। উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের পর্দার প্রেম দর্শকেরা যেমন উপভোগ করেছেন, তেমনই পর্দার আড়ালে তাঁদের সম্পর্ক নিয়েও কৌতূহল ছিল তুঙ্গে।
সেই কৌতূহল থেকেই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন। কানাঘুষো শুরু হয়, পর্দার প্রেম কি বাস্তব জীবনেও জায়গা করে নিয়েছিল? উত্তম-সুচিত্রার মধ্যে গোপন সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন নানা কথা শোনা গেলেও দুজনের কেউই কখনও প্রকাশ্যে এমন দাবিকে স্বীকৃতি দেননি।
তবে ১৯৫৪ সালে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ মুক্তির সময় সেই জল্পনা নতুন করে উত্তাপ পায়। ছবির প্রচারের জন্য তৈরি পোস্টারে লেখা হয়েছিল, ‘অগ্নিপরীক্ষা, অন্তর্নিহিত ভালোবাসার সাক্ষী’। উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের নাম ও স্বাক্ষরের সঙ্গে এমন একটি বাক্য স্বাভাবিকভাবে দর্শকের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। পর্দার প্রেম কি তবে বাস্তবের গল্পও? প্রশ্ন উঠতে শুরু করে চারদিকে।
বিষয়টি দুই তারকার পরিবারেও অস্বস্তি তৈরি করেছিল বলে বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী এবং সুচিত্রা সেনের স্বামী দিবানাথ সেনও এই প্রচারকে ভালো চোখে দেখেননি বলে দাবি করা হয়েছে। তবে উত্তম বা সুচিত্রা—কেউই প্রকাশ্যে এই বিতর্কের ব্যাখ্যা দেননি।

এমন কথাও শোনা যায়, পোস্টারে থাকা বিতর্কিত বাক্যটির নিচে সুচিত্রা সেন নিজেও স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
উত্তমকুমারের ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় গৌরী দেবী ও সুপ্রিয়া দেবীকে ঘিরে।
উত্তম ও গৌরী দেবীর বিয়ের সাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের একমাত্র সন্তান গৌতমের জন্ম ১৯৫১ সালে। উত্তমের অভিনয়জীবন তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরে তিনি তারকা হয়ে ওঠেন, আর সংসারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।
উত্তমের নিজের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, অভিনয়ের কাজ নিয়ে তাঁর আগ্রহ আর গৌরীর আগ্রহের মধ্যে পার্থক্য ছিল।
এরপর আসে সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়ার সঙ্গে উত্তমের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়। দুজনের একসঙ্গে কাজও চলছিল। পরে উত্তম গৌরী দেবীর সংসার ছেড়ে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। ১৯৬৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি ময়রা স্ট্রিটের সুপ্রিয়ার বাড়িতে চলে যান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

সুপ্রিয়া দেবীর স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ১৯৬২ সালের ২ ডিসেম্বর ধর্মীয় রীতিতে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু গৌরী দেবীর সঙ্গে উত্তমের আইনগত বিচ্ছেদ হয়নি। ফলে সেই বিয়ে রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয়নি। এই সম্পর্ক নিয়ে তখন সমাজে প্রচুর সমালোচনা হয়েছিল।
দর্শকের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ প্রেমিক; ব্যক্তিজীবনে তিনি এমন সম্পর্ক বেছে নিয়েছিলেন, যা সেই সময়ের সামাজিক নিয়মে সহজে গ্রহণ করার মতো ছিল না। তবে উত্তম-সুপ্রিয়ার সম্পর্ককে শুধু ‘বিতর্কিত প্রেম’ বলে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সুপ্রিয়া দেবীর নিজের স্মৃতিকথা এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্ব, কাজের সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার কথাও উঠে এসেছে। জীবনের শেষ প্রায় ১৭ বছর তাঁরা একসঙ্গে কাটিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখানেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের চেয়ে গুঞ্জনই বেশি।
উত্তমকুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিংবদন্তির মতো। উত্তমের ঠোঁটে হেমন্তের কণ্ঠ, দর্শকের কাছে এই জুটি প্রায় অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছিল। ‘হারানো সুর’, ‘শাপমোচন’সহ একাধিক ছবিতে তাঁদের কাজ মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। তাই পরবর্তী সময়ে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে।

এই দূরত্বের কারণ নিয়ে একাধিক গল্প আছে। একটি প্রচলিত গল্পে উত্তম ও গৌরী দেবীর বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের কথা আসে। সেখানে হেমন্তের কোনও মন্তব্য উত্তমকে আহত করেছিল বলে দাবি করা হয়। আরেকটি গল্পে অভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরে দুই পরিবারের মনোমালিন্যের কথা বলা হয়। তবে এগুলোর কোনওটাকেই নিশ্চিত কারণ বলা যায় না।
তবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো, ১৯৬২ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় প্রথম হিন্দি ছবি ‘বিস সাল বাদ’ সাফল্য পায়। সেই সাফল্যের পর পরিচালক বীরেন নাগের সঙ্গে উত্তমকুমারকে নায়ক করে ‘শর্মিলি’ তৈরির পরিকল্পনা করেন হেমন্ত। নায়িকা হিসেবে ভাবা হয়েছিল ওয়াহিদা রেহমানকে। উত্তমের সঙ্গে আলোচনাও এগিয়েছিল, এমনকি একটি সর্বভারতীয় পত্রিকায় ছবিটির বিজ্ঞাপনও প্রকাশিত হয়। ঠিক হয়েছিল, আসানসোলের কয়লাখনিতে উত্তমকে নিয়ে ছবির প্রথম দফার শুটিং শুরু হবে।
কিন্তু শুটিং শুরুর একেবারে আগে উত্তম জানিয়ে দেন, তিনি আর ছবিটিতে অভিনয় করবেন না। কেন তিনি সরে দাঁড়িয়েছিলেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও একমত তথ্য পাওয়া যায় না। ঘটনায় হেমন্ত গভীরভাবে আহত হন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও লেখায় উল্লেখ আছে। এই ঘটনার পর দু’জনের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয় বলে প্রচলিত আছে এবং কিছু সময়ের জন্য থেমে যায় কলকাতার বাংলা সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় ‘উত্তম-হেমন্ত’ জুটি।
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা এত বেশি ছিল যে তাঁকে সবসময়ই নিজের ইমেজ নিয়ে সচেতন থাকতে হতো। সাংবাদিক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় ‘স্টেটসম্যান’-এর হয়ে উত্তমকুমারের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত তারকা-সাক্ষাৎকারের বাইরে গিয়ে অন্য উত্তমকে তুলে ধরা। উত্তম তাঁর পড়াশোনা, জীবনযাপন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে কথা বলেন। কিন্তু সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর তাঁর কথার অর্থ পাল্টে যায়।

সেই রিপোর্টের প্রতিবাদে উত্তমকুমারের পক্ষ থেকে মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়ে উকিলের চিঠি পাঠানো হয়েছিল। রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে এমন দাবি পাওয়া যায়। তবে শেষ পর্যন্ত মামলা আর এগোয়নি।
এই ঘটনা উত্তমকুমারের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তিনি নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নিয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। দর্শকের কাছে তাঁর তৈরি করা ছবিটা তিনি সহজে নষ্ট হতে দিতে চাইতেন না।
পর্দায় তিনি ছিলেন নিখুঁত প্রেমিক। বাস্তবে তাঁর দাম্পত্যে সমস্যা হয়েছে। পর্দায় সুচিত্রার সঙ্গে তাঁর প্রেম দেখে দর্শক মুগ্ধ হয়েছে, বাস্তবে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয়েছে গুঞ্জন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল অসাধারণ, আবার সেই সম্পর্কেও দূরত্ব এসেছে। সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আবার সেই সাক্ষাৎকার নিয়ে মানহানির আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন।
উত্তমকুমারের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হয়তো এখানেই, পর্দায় আমরা তাঁকে যতটা চিনি, বাস্তবের উত্তম তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
.png)

কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুর নয় বছর পূর্ণ হলো আজ ২১ আগস্ট। এই বিশেষ দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন ঢালিউডের শীর্ষ নায়ক শাকিব খান। পোস্টে শাকিব খান লেখেন, নায়করাজকে হারানোর শূন্যতা আজও তিনি সমানভাবে অনুভব করেন। তাঁর ভাষায়, রাজ্জাক শুধু একজন কিংবদন্তি
২১ আগস্ট ২০২৬
আজকের দিনে একটি ভাইরাল ভিডিও, একটি রিয়েলিটি শো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্টই যথেষ্ট হতে পারে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু নায়ক রাজ্জাকের সময়ে এই শর্টকাটের কোনো সুযোগ ছিল না। দর্শক প্রথমে তাঁকে একটি চরিত্রে দেখতেন, তারপর আরেকটিতে, তারপর আরও একটিতে—আর এই পুনরাবৃত্তির ভেতর
২১ আগস্ট ২০২৬
১৯৬৪ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে যে তরুণটি চলচ্চিত্রে জায়গা খুঁজছিলেন, মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনিই হয়ে উঠলেন ‘বেহুলা’র নায়ক। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ, নতুন চলচ্চিত্রের ভাষা, বাণিজ্যিক সিনেমার উত্থান—সবকিছুর মধ্য দিয়েই রাজ্জাকের ক্যারিয়ার এগিয়েছে। প্রায়
২১ আগস্ট ২০২৬
‘আশা ছিল ভালোবাসা ছিল’, ‘সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা’, ‘মেরে সপ্নো কি রানি’, ‘রূপ তেরা মস্তানা’ কিংবা ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কণ্ঠশিল্পী বলিউডের কিংবদন্তি কিশোর কুমার। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর গান আজও মানুষের মনে একই রকম জনপ্রিয়। রোমান্টিক গানে যেমন শ্রোত
০৪ আগস্ট ২০২৬