মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষা

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ৪৯
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর ধারণায় আবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান। তাই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে আলোচিত– বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্ন সামনে এনেছে। বাংলাদেশ কি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে?

পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা জোটে যোগ দেওয়া মানেই কারও বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ নয়। আধুনিক ভূরাজনীতিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অনেক সময় যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে যুদ্ধ প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্র যত বেশি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা তত কঠিন হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতার আলোকে মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নিছক সামরিক জোটের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনার সম্ভাব্য সুযোগ।

আলোচিত চুক্তির মূল দর্শন হলো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অর্থাৎ কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা তাকে সহযোগিতা করবে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতার আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। অর্থাৎ এটি কেবল সামরিক ব্যবস্থা নয়; সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতার কাঠামোয় পরিণত হতে পারে। যদি এই কাঠামো কার্যকর হয় এবং ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি দেশ এতে যুক্ত হয়, তাহলে এটি শুধু সামরিক সহযোগিতা নয়; বরং বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কি চিরকাল অন্যদের তৈরি করা নিরাপত্তা কাঠামোর দর্শক হয়ে থাকবে? আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ধারণা কাজ করে আসছে, তা হলো কোনো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলেই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বাস্তবতা এত সরল নয়। রাষ্ট্র যত বেশি একটি নির্দিষ্ট শক্তির ওপর নিরাপত্তা, অর্থনীতি বা কূটনীতিতে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তার কৌশলগত স্বাধীনতা তত সংকুচিত হয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই একক নির্ভরতা নয়; বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব।

এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা শক্তি। তাদের অর্থনৈতিক, জ্বালানি, সামরিক শিল্পভিত্তিক উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, এমনকি পারমাণবিক সক্ষমতা আছে। ফলে এই তিন দেশের সমন্বয় নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য কৌশলগত ও প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশকে কী দেবে? বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে বড় শক্তিগুলোর পর্যায়ে নেই। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান একদিকে যেমন কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনি আমাদের বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যেও রেখেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রয়োজন কৌশলগত ভারসাম্য। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে কোনো একটি শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

নবগঠিত এই জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে ভারত সরকারের পাশাপাশি সেখানকার গণমাধ্যম ও সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের আর্থিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগদানের ব্যাপারে ঢাকার ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশের পর বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের সাবেক সেনাকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এতে ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এই জোটের প্রভাব বিস্তার ঘটবে। ফলে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই ঢাকাকে ঘাঁটি বানিয়ে আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ছড়াতে পারে। ভারতের সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, বাংলাদেশ যোগ দিলে পাকিস্তান গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের নামে ঢাকায় প্রভাব বৃদ্ধির আরও সুযোগ পাবে। ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চিড় ধরার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে।

নয়াদিল্লি সরকার ইতিমধ্যে জানিয়েছে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানসহ জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে এমন ঘটনাগুলো তারা ‘ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছে। ভারতের মূল উদ্বেগের জায়গা পাকিস্তান। চুক্তিতে পাকিস্তানের উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশ যদি একটি আনুষ্ঠানিক যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হয়, তাহলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হতে পারে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে এতদিন পশ্চিম সীমান্তকেন্দ্রিক (পাকিস্তান) নিরাপত্তা হিসাবকে পূর্ব দিকেও সম্প্রসারণ করতে হবে। তবে নয়াদিল্লি এ ব্যাপারে এখনই কঠোর অবস্থানে যাবে বলে মনে হয় না। ভারতের কৌশল হতে পারে ঢাকাকে বোঝানো যে, কোনো সামরিক জোটে যোগদানের আগে এর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাগত পরিণতি বিবেচনা করা উচিত।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করায় ভারতের বরাবরই চেষ্টা ছিল। কিছু ক্ষেত্রে তারা সাফল্যও পেয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের প্রভাব চোখে পড়ার মতো ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরুর ঠিক আগে ইন্দিরা গান্ধী সরকার বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রবাসী সরকারের ওপর যে ৭ দফা গোপন চুক্তি চাপিয়ে দিয়েছিল; তাতেও বাংলাদেশের এই দুটি ক্ষেত্রের ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণের কথা বলা ছিল।

সেই চুক্তির দুটো অন্যতম শর্ত ছিল– প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এবং ভারত সহযোগিতা করবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রের দায়িত্ব মূলত ভারত গ্রহণ করবে। গোপন সেই চুক্তি অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেলেও ওই দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের পথ থেকে ভারত কখনও সরেনি। ভারত যে এখনও সেই মনোভাব পোষণ করে, তা তাদের আচরণের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। কাজেই বাংলাদেশ এখন এমন একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে ভারত তা সহ্য করবে কীভাবে!

সন্দেহ নেই, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে তা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের বাণিজ্য ও রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাহলে মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধির চেষ্টাকে কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা হবে?

বাংলাদেশ যদি কোনো বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা বা কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামোয় যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করে এবং এ বিষয়ে ভারতীয়রা যদি প্রকাশ্যে সতর্ক করে দিয়ে বলে যে, এমন পদক্ষেপ ‘বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক’, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে প্রশ্নটি শুধু একটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কার সঙ্গে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তুলবে, এটি তার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ার কথা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকতে পারে; সেটি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রকাশ করাও স্বাভাবিক। কিন্তু উদ্বেগ প্রকাশ এবং অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে কোনো সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা– দুইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

ভারত তার জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে তুলেছে। ভারত কোয়াডের মতো কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত এবং বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্র সংগ্রহ করে। এসব সিদ্ধান্ত ভারতের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশও ভারতের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের সিদ্ধান্তকে বাতিল করার দাবি তোলে না। তাহলে একই যুক্তি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বাংলাদেশ যদি তার জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক আধুনিকায়ন, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা কূটনৈতিক পরিসর বৃদ্ধির জন্য অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায়, সেটিও বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অংশ।

এই জোটে যোগ দিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশকে অন্য ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রের মনোভাবের প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন; যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ জড়িত। নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে ওয়াশিংটনের দিকে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র মক্কা চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে বলেছেন, তিনি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরে খুশি হয়েছেন। তিনি এটিকে ‘a big, bold, and important first step’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং তিন দেশের নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানান। বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য ইতিবাচক অবস্থানটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিবেচনা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব ও তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও মধ্যপ্রাচ্যে নিজের নিরাপত্তা প্রভাব অবশ্য ধরে রাখতে চায়। মক্কা চুক্তি যদি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ওয়াশিংটন নিছক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা হিসেবে দেখবে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ যদি চুক্তির সামরিক কাঠামোয় সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঢাকার কৌশলগত বিষয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।

চীনের প্রতিক্রিয়া সম্ভবত আরও বাস্তববাদী হবে। পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র; সৌদি আরব-তুরস্কের সঙ্গেও বেইজিংয়ের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশ যোগ দিলেই চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি অনিবার্য নয়। বরং চীন দেখবে, এই জোট শেষ পর্যন্ত কোন ভূরাজনৈতিক দিকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এসেছে নিজের কৌশলগত পরিসর আরও বিস্তৃত করার। সেই সুযোগ গ্রহণ করা হবে কিনা, তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত, বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর। এ প্রসঙ্গে মার্কিন কূটনীতিক (ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের প্রাক্তন ডেপুটি চিফ অব মিশন) জন ড্যানিলোভিচের বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ মক্কা চুক্তির অংশ হলে তুরস্ক ও পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার সুযোগ পাবে। এতে একদিকে যেমন বাড়বে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে তেমনি অত্যাধুনিক হাতিয়ারের প্রশিক্ষণ নিতে সুবিধা হবে। বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে সামরিক প্রশিক্ষণ, অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, যৌথ মহড়া ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। কোনো জোটে যোগ দেওয়ার আগে নিশ্চিত করতে হবে, এই চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে সীমাবদ্ধ করবে কি না, বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের চাপ আসবে কিনা এবং কোনো সদস্য রাষ্ট্রের সংঘাতে বাংলাদেশকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জড়িয়ে পড়তে হবে কিনা। গুরুত্বপূর্ণ হলো, চুক্তির ‘একজনের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ’ নীতিটি বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মক্কা চুক্তিকে যদি কেবল ‘মুসলিম সামরিক জোট’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে এর কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের অংশ হলেও একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র; যার ভারতসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সেই সম্পর্ক বাংলাদেশের অন্য কোনো আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

বাংলাদেশের জন্য মক্কা চুক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন তাই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, কৌশলগত বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার মানদণ্ডে হওয়া উচিত। বাংলাদেশের উচিত সামরিক জোটের অংশ হওয়ার আগে নিশ্চিত করা– মক্কা চুক্তি যেন বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, জাতিসংঘকেন্দ্রিক কূটনীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ককে সংকুচিত না করে। সেটিই হবে আত্মমর্যাদাশীল, স্বাধীন ও বাস্তববাদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিচয়। এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ এই যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত