বন্যার বিপর্যয়ের পর নেপালের এখন যা প্রয়োজন

লেখা:
লেখা:
দীক্ষা সুবেদী

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ৪৫
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট অঞ্চলে আঘাত হানা আকস্মিক বন্যার পাঁচ দিন পরও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ৪ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া বিপুলসংখ্যক মরদেহ সামলাতেও হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

এই দুর্যোগ আমার নিজের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমার স্বামীর গ্রামের পুরো এলাকা বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাঁর স্বজনেরা অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন।

সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি জলবায়ু নিয়ে সচেতনতা ও নীতিগত পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করেছি। আমি নীতিনির্ধারণী বৈঠকে অংশ নিয়েছি, হিমবাহের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছি এবং হিমালয় অঞ্চলের জনগোষ্ঠীগুলো যে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ—সে বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনায় বক্তব্য দিয়েছি।

আমি ভেবেছিলাম, কী ঝুঁকিতে রয়েছে তা আমি বুঝি। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আমি যে ভয়াবহতা ও হতাশা দেখেছি, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন।

আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই বিপদ এখনো শেষ হয়নি। প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকেই লেন্দে খোলায় একের পর এক বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। এর ফলে ভুটে কোশি-ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় হঠাৎ করে বিপুল পানি, পাথর ও পলি নেমে আসে। এই ধসের ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে, যা আবারও এরকম বন্যা ঘটাতে পারে।

বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি নেপাল। এখানে উষ্ণতা ধীরে ধীরে আসে না বরং কয়েক মিনিটের মধ্যে উপত্যকার ওপর পানির ও কাদার দেয়াল হয়ে আছড়ে পড়ে।

প্রাথমিক ধসটি নেপালের পক্ষে বাস্তবিক অর্থেই ঠেকানো সম্ভব ছিল না। কিন্তু এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা দেখিয়ে দিয়েছে, পরিবর্তিত জলবায়ুর বাস্তবতায় দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নেপালের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

দেশটিকে এখন জরুরি ভিত্তিতে উচ্চঝুঁকির পার্বত্য করিডোরগুলোতে হিমবাহ ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে। এই মুহূর্তে কর্তৃপক্ষকে অস্থিতিশীল হিমবাহ, ভূমিধসে আটকে থাকা হ্রদ এবং নদীর গতিপথগুলো চিহ্নিত ও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সেন্সরগুলো মেরামত করতে হবে এবং পাহাড়ি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নিচের দিকে থাকা জনপদগুলোর মধ্যে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

উজানের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং নদীর গতিপথ পরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এর মধ্যে চীনের সঙ্গে সীমান্তপারের তথ্য বিনিময়, ঝুঁকি বিবেচনায় অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং অস্থিতিশীল হিমবাহ, পাহাড়ি ঢাল ও সাময়িকভাবে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষের বাঁধগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণও থাকতে হবে।

কখন মানুষকে সরিয়ে নিতে হবে, তার স্পষ্ট নির্দেশনা, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র এবং একাধিক সতর্কীকরণ মাধ্যম—যেমন মুঠোফোনে খুদে বার্তা, সাইরেন ও স্থানীয় রেডিও—এখনই চালু করতে হবে। এতে দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা বাড়তে থাকলেও মানুষকে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া সম্ভব হবে।

হিমালয় অঞ্চলটির উষ্ণতা বাড়ার ফলে আমাদের বরফমণ্ডল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে—হিমবাহ, হিমবাহের হ্রদ এবং পাহাড়ের ঢাল সবই এর আওতায়। প্রতি বছর রেকর্ড তাপমাত্রার নতুন নতুন নজির তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে।

তাই আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি আমাদের জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোও দরকার। দরকার স্থানীয় মানুষের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা অভিযোজন ও দুর্যোগ প্রস্তুতি; ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করা মানুষদের সঙ্গে এবং তাদের নেতৃত্বেই তা তৈরি হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য--বিশেষ করে, নদীর ভাটির দিকে বসবাসকারী মানুষের জন্য অর্থবহ বিনিয়োগ করতে হবে।

প্রাথমিক ধসটি নেপালের পক্ষে বাস্তবিক অর্থেই ঠেকানো সম্ভব ছিল না। কিন্তু এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা দেখিয়ে দিয়েছে, পরিবর্তিত জলবায়ুর বাস্তবতায় দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নেপালের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

আমাদের এমন সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সরকারি স্থাপনা দরকার, যেগুলো বন্যা, ভূমিধস এবং পাহাড়ি এলাকার অন্যান্য ধারাবাহিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারে। স্থানীয় মানুষের নেতৃত্বে অভিযোজনের আওতায় স্থিতিশীল সরকারি সেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জীবিকা রক্ষা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার সহায়তাও থাকতে হবে, যাতে দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই ভাটির দিকের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলো প্রয়োজনীয় সম্পদ পেতে পারে।

নেপাল একা এসব করতে পারবে না। বিশ্বের ধনী দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে; বর্তমান জলবায়ু সংকটের জন্য তাদের দায়ও সবচেয়ে বেশি। তাই তারা যেন শুধু নিজেদের মৃত নাগরিকদের নেপাল থেকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া এবং প্রতীকী সমর্থন জানানোর মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না রাখে।

এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে এবং ভবিষ্যতের বিপদ মোকাবিলা করতে আমাদের যে অর্থ দরকার, তা যেন আমরা পাই—তাদের এখন তা নিশ্চিত করতে হবে।”

জলবায়ু তহবিলের অর্থ কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, বরং এখনই প্রদান করা উচিত। নেপালের ‘ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা তহবিল’ থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে সরাসরি ও সময়মতো সহায়তা পৌঁছানো যায়; তাদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয়। এই অর্থ হতে হবে সম্পূর্ণ নতুন অর্থ—বিদ্যমান কোনো সহায়তাকে নতুন নামে চালিয়ে দেওয়া যাবে না; আর তা ঋণ হিসেবে নয়, বরং অনুদান হিসেবে দিতে হবে। এই তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়াটি হতে হবে সহজ ও দ্রুত; এটি যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলনের সময়সীমার বেড়াজালে আটকে না পড়ে।

বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি নেপাল। এখানে উষ্ণতা ধীরে ধীরে আসে না বরং কয়েক মিনিটের মধ্যে উপত্যকার ওপর পানির ও কাদার দেয়াল হয়ে আছড়ে পড়ে।

আমরা দয়া চাইছি না। আমরা জলবায়ু ন্যায়বিচার দাবি করছি—এমন একটি সংকটের কারণে যে দুর্ভোগ আমাদের পোহাতে হচ্ছে, সেটির জন্য ক্ষতিপূরণ চাইছি, যদিও এই সংকট তৈরিতে আমাদের ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে।

বিশ্বের ধনী দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে; বর্তমান জলবায়ু সংকটের জন্য তাদের দায়ও সবচেয়ে বেশি। তাই তারা যেন শুধু নিজেদের মৃত নাগরিকদের নেপাল থেকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া এবং প্রতীকী সমর্থন জানানোর মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না রাখে।

এই দুর্যোগের ক্ষতিপূরণ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে নেপালের মানুষ বিদেশি অর্থের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হয়ে থাকবে। দুর্যোগে আক্রান্ত নিজেদের মানুষকে সহায়তা করতে নেপালের সমাজ ইতিমধ্যেই সংগঠিত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের সাড়া ছিল দ্রুত ও স্পষ্ট। নেপালের বিভিন্ন জায়গায় তরুণরা ‘রাসুয়া রিলিফ গ্রুপ’ গড়ে তুলেছে। তারা সম্পদ সংগ্রহ করছে, সহায়তার সমন্বয় করছে এবং তথ্য যাচাই ও পরিবেশন করছে।

আমি যখন এই লেখা লিখছি, তখন বিপুলসংখ্যক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার জন্য নাম নিবন্ধন করছে। তা এই শক্তিশালী বার্তা দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তরুণরা শুধু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের মধ্যে নেই, তারাই এই সংকটে সবার আগে এগিয়ে আসছে। কেউ তাদের দায়িত্ব দেয়নি, তবু সংকটের মুহূর্তে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছে।

সাত বছর আগে আমি প্রথমবার তরুণ জলবায়ুকর্মীদের একটি বৈঠকে অংশ নিয়েছিলাম। তখন জানতাম না, কেউ আমার কথা শুনবে কি না। আজ এই প্রজন্মকে চোখের সামনে সংগঠিত হতে দেখা—অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের চেয়েও দ্রুত ও কার্যকরভাবে আমাকে মনে করিয়ে দেয়, গত কয়েক বছরের কাজ বৃথা যায়নি।

রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ে যা ঘটেছে, সেখান থেকে মানুষ যদি একটি শিক্ষা নেয়, তা হলো- জলবায়ু নিয়ে কাজ কেবল নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা আর নীতিনির্ধারণী সম্মেলনের মধ্যে আটকে থাকতে পারে না। এমন সব বৈঠকে, যেখানে আলোচনা ধীরগতিতে এগোয়, যেন অলস নদীর মতো ঘুরে ঘুরে চলে, সেখানে বসেই জলবায়ু নিয়ে কাজ শেষ করা যাবে না।

আমাদের নেতারা যখন পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বসবেন, তখন তরুণ এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সেই টেবিলে জায়গা দিতে হবে। হয়তো তাদের কথা শুনলেই আমরা পরবর্তী দুর্যোগ থেকে নিজেদের বাঁচানোর পথ খুঁজে পাব।

(লেখাটি আল-জাজিরা থেকে অনুদিত)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত