ভাইরাসের চরিত্র বদলায়নি, টিকা ও মায়ের বুকের দুধেই রুখে দেওয়া সম্ভব হাম

ড. তাহমিদ আহমেদ
ড. তাহমিদ আহমেদ

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

গত প্রায় ছয় মাস ধরে দেশে হামের এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব আমরা লক্ষ্য করছি। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে প্রায় ১ হাজার শিশু। একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। তাহলে হঠাৎ কেন এই বিপর্যয়? একজন চিকিৎসক ও গবেষক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণে এই পরিস্থিতির পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।

প্রথমত, হামের মহামারির মূল কারণ হলো টিকার ঘাটতি। বিজ্ঞান বলে, কোনো একটি জনগোষ্ঠীর (বিশেষ করে শিশুদের) মধ্যে হামের টিকার কভারেজ বা আওতা যদি ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে সেখানে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বা মহামারির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। মাঝখানে কোনো কারণে টিকার সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, মূলত সেটাই এই মহামারির পথ তৈরি করে দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আমরা দেখছি আক্রান্তদের মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের সংখ্যা অনেক বেশি। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, ৯ মাসের নিচে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় না। কারণ, ধরে নেওয়া হয় এই বয়সে শিশুরা মায়ের বুকের দুধ পান করবে এবং সেখান থেকেই তারা হামের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে বর্তমানে ‘এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং’ বা জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করানো শিশুর হার মাত্র ৫৫ শতাংশ। অথচ এটি অন্তত ৮০ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। এই হার একেবারেই বাড়ছে না। মায়ের বুকের দুধ থেকে শিশুর যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পাওয়ার কথা ছিল, সেটি না পাওয়ায় ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে।

হামের মহামারির মূল কারণ হলো টিকার ঘাটতি। বিজ্ঞান বলে, কোনো একটি জনগোষ্ঠীর (বিশেষ করে শিশুদের) মধ্যে হামের টিকার কভারেজ বা আওতা যদি ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে সেখানে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বা মহামারির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

তৃতীয়ত, অপুষ্টি একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশে অনেক মা নিজেই অপুষ্টির শিকার। মায়ের পুষ্টিহীনতা তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নবজাতকের ওপর। পাশাপাশি, যেসব শিশু আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে, তারা হামে আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। অপুষ্টির কারণে তাদের শরীর থেকে ইনফেকশন সারতে অনেক বেশি সময় লাগছে এবং রোগের তীব্রতাও মারাত্মক আকার ধারণ করছে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, হাম হঠাৎ করে এত মরণঘাতী হয়ে উঠল কেন? এটি কি ভাইরাসের নতুন কোনো ধরন বা মিউটেশন? আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর বিজ্ঞানীরা হামের এই ভাইরাসটির ডিএনএ সিকোয়েন্সিং বা জিনগত বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ভাইরাসের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন বা মিউটেশন হয়নি। এটি সেই পুরোনো পরিচিত স্ট্রেইন, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়াচ্ছে। সুতরাং, আমাদের কাছে থাকা প্রচলিত হামের টিকাতেই এটি সম্পূর্ণ নিরাময় ও প্রতিরোধ সম্ভব।

১৮ কোটির বেশি জনসংখ্যার একটি দেশে হঠাৎ এমন মহামারি দেখা দিলে হাসপাতালগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ পড়াটাই স্বাভাবিক। ৬ মাসের মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার শিশুর চিকিৎসার ভার নেওয়া আমাদের হাসপাতালগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে আশার কথা হলো, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জোরদার পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্রুততম সময়ে হামের টিকা ও ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহ করে তা শিশুদের দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আইসিডিডিআর,বি-এর পক্ষ থেকেও আমরা সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা করছি, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভাইরাসের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন বা মিউটেশন হয়নি। এটি সেই পুরোনো পরিচিত স্ট্রেইন, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়াচ্ছে। সুতরাং, আমাদের কাছে থাকা প্রচলিত হামের টিকাতেই এটি সম্পূর্ণ নিরাময় ও প্রতিরোধ সম্ভব।

টিকা দেওয়ার সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগে। তবে আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি, হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগী ভর্তির হার আগের তুলনায় কিছুটা কমতে শুরু করেছে। আশা করা যায়, আগামী কিছুদিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে।

তবে এই প্রাদুর্ভাব থেকে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কিছু শিক্ষা নেওয়া জরুরি। শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে আমাদের মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা (প্রাইমারি হেলথকেয়ার) ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে সচেতনতা বৃদ্ধিতে। বিশেষ করে, ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো সহজ অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার সম্পর্কে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।

পরিশেষে মনে রাখতে হবে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। তাই কোনো শিশু আক্রান্ত হলে তাকে অবশ্যই অন্য শিশুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বা নিরাপদে রাখতে হবে। সরকারের চলমান টিকাদান কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ এবং মায়ের বুকের দুধ পানের বিষয়ে সামাজিক সচেতনতাই পারে আমাদের শিশুদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে।

  • ড. তাহমিদ আহমেদ: স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত