leadT1ad

ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

বিশ্বকাপের প্যারাডক্স: মার্কিন সাংস্কৃতিক আধিপত্য কি শেষের পথে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ১৮: ৫২
ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ফুটবল বিশ্বকাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে একই সময়ে খেলা দেখতে বসে, তার নিজের স্থানীয় সময় যা-ই হোক না কেন। পৃথিবীর সবার ভাষা ও সংস্কৃতি আলাদা হলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা একই। ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের থিম সংগুলোতেও ফুটে উঠেছে সেই বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীক। ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, ইতালীয় ও জাপানি ভাষার মিশেলে তৈরি গানগুলো গেয়েছেনও বিভিন্ন দেশের তারকা শিল্পীরা।

এত কিছু দেখে মনে হতে পারে, পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈশ্বিক হয়ে গেছে। আবার বিশ্বকাপের ফাইনাল যখন যুক্তরাষ্ট্রে, তখন অনেকেই ভাবতে পারেন, বিশ্ব সংস্কৃতির কেন্দ্র এখনও আমেরিকাই।

কিন্তু বাস্তবতা উল্টো।

বিশ্বকাপের মতো কিছু বড় আয়োজন বাদ দিলে মানুষ বিনোদনের জন্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিজের সংস্কৃতিকেই বেছে নিচ্ছে। পৃথিবী যত বেশি ‘গ্লোবাল ভিলেজের’ দিকে ঝুঁকছে, মানুষ তত বেশি নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক কনটেন্টের দিকে ঝুঁকছে। ফলে একসময় যাকে ‘আমেরিকান পপ সংস্কৃতির বিশ্ব’ বলা হতো, সেটি ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।

প্ল্যাটফর্ম একই, কনটেন্ট ভিন্ন জিনিস

স্পটিফাই, নেটফ্লিক্স, ইউটিউব বা অ্যাপ স্টোর—এসব প্ল্যাটফর্ম এখন পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির কারণে মনে হয়েছিল সবাই ধীরে ধীরে একই ধরনের গান শুনবে, একই সিরিজ দেখবে, একই গেম খেলবে।

কিছু ক্ষেত্রে সেটি ঘটেছেও। টেইলর সুইফট, মিস্টারবিস্ট কিংবা রোবলক্সের মতো বৈশ্বিক তারকা ও ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

কিন্তু এই শীর্ষ স্তরের নিচে চিত্রটা একেবারেই আলাদা। মানুষ এখন ক্রমেই নিজেদের দেশের শিল্পী, নিজেদের ভাষার গান এবং নিজেদের অঞ্চলের বিনোদন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলকে ধরা যায়। গত সপ্তাহে দেশটির সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম হওয়া ১০০ শিল্পীর মধ্যে ৯৬ জনই ছিলেন ব্রাজিলিয়ান। অর্থাৎ ব্রাজিলের মানুষ এখন মূলত নিজেদের দেশের শিল্পীদেরই শুনছে।

খেলাধুলাও খুব বেশি বৈশ্বিক নয়

বিশ্বকাপের সময় পুরো পৃথিবী ফুটবলে মেতে ওঠে। কিন্তু এই উন্মাদনা স্থায়ী নয়। বছরের বাকি সময়ে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের স্থানীয় বা জাতীয় দল নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। নিউইয়র্কের একজন ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে বিশ্বকাপের চেয়ে স্থানীয় বাস্কেটবল দল নিউইয়র্ক নিকস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশেও ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা থাকলেও এর একটি বড় অংশ সাময়িক, খেলা শেষ হয়ে গেলেই তারা আর এই বিষয়ে তেমন মাথা ঘামান না।

আবার, আমেরিকান বাস্কেটবল বা ফুটবল সেই দেশে খুবই জনপ্রিয় হলেও এসব খেলা বৈশ্বিকভাবে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া লিগ এনএফএলের সম্প্রচার আয়ের ৯৮ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে সফল ক্রীড়া ব্র্যান্ডগুলোর একটিও মূলত নিজ দেশের দর্শকদের ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় গল্প খোঁজে নেটফ্লিক্স

একসময় বিশ্বের প্রায় সব বড় সিনেমা ও টিভি অনুষ্ঠান আমেরিকাকেন্দ্রিক ছিল। হলিউডই ছিল বৈশ্বিক বিনোদনের রাজধানী।

কিন্তু এখন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজনসহ বড় স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দেশে স্থানীয় গল্প, রূপকথা বা উপকথা নিয়ে সিরিজ ও অনুষ্ঠান তৈরি করছে। কারণ তারা বুঝেছে, মেক্সিকোর দর্শক মেক্সিকোর গল্প দেখতে চায়, কোরিয়ার দর্শক কোরিয়ার গল্প দেখতে চায়। এজন্যই এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ভারতীয়, স্প্যানিশ বা মেক্সিকান—এসব ভাষায় অনেক সিরিজ ও সিনেমা বানাচ্ছে।

এ কারণেই গত ছয় বছরে নতুন স্ট্রিমিং কনটেন্ট তৈরিতে উত্তর আমেরিকার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

অ্যালগরিদমও মানুষকে স্থানীয় কনটেন্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে

আগে কোন গান জনপ্রিয় হবে বা কোন শিল্পী বিখ্যাত হবে, তা অনেকাংশে নির্ধারণ করত রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যম। এখন সেই কাজ করছে অ্যালগরিদম। ইউটিউব, টিকটক বা স্পটিফাই মানুষের পছন্দ বিশ্লেষণ করে নতুন কনটেন্ট সাজেস্ট করে। ফলে একজন বাংলাদেশি ব্যবহারকারীর সামনে যে ভিডিও আসে, একজন ব্রাজিলিয়ান বা জার্মান ব্যবহারকারীর সামনে তা নাও আসতে পারে। প্ল্যাটফর্মগুলো অ্যালগরিদমের কারণে ‘লোকেশন’ বা ‘রিজিওন’ অনুযায়ীই কনটেন্ট সাজেস্ট করে।

ফলাফল হলো, মানুষ বৈশ্বিক কনটেন্টের পাশাপাশি নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির কনটেন্টও সহজে খুঁজে পাচ্ছে।

কেন এমন হচ্ছে

এর একটি বড় কারণ হলো বিনোদন তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার খরচ অনেক কমে গেছে। একসময় বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হতে হলে বড় স্টুডিও, রেকর্ড কোম্পানি বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হতো। এখন একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই কেউ গান, ভিডিও বা গেম তৈরি করে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এই প্রবণতাকে আরও সহজ ও অংশগ্রহণমূলক করেছে। ভবিষ্যতে আরও ছোট ছোট দর্শকগোষ্ঠীর জন্যও আলাদা কনটেন্ট তৈরি করা সহজ হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ কী

গত এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র শুধু অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির কারণে প্রভাবশালী ছিল তাই-ই না। হলিউড, পপ মিউজিক, টেলিভিশন ও ভিডিও গেমের মাধ্যমেও তারা বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছিল।

এই সাংস্কৃতিক প্রভাবই ছিল তাদের সফট পাওয়ার। কিন্তু এখন সেই জায়গায় নতুন প্রতিযোগীরা উঠে আসছে। সংগীতে ব্রাজিল, টেলিভিশনে দক্ষিণ কোরিয়া এবং গেমিংয়ে চীন দ্রুত নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে।

আমেরিকা এখনও ইউটিউব, অ্যাপ স্টোর কিংবা বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মালিক। কিন্তু মানুষ কী দেখবে, কী শুনবে বা কী খেলবে—সেই সিদ্ধান্তের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আগের মতো নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চাইলেই নিজেদের মতো অ্যালগরিদম সেট করতে পারে না, এটি ব্যবহারকারীর ওপর বেশি নির্ভর করে।

বিশ্বকাপের আসল প্যারাডক্স

বিশ্বকাপের মতো আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবী এখনও একসঙ্গে আনন্দ করতে পারে। তবে এটি সামনে আনে অন্য এক বাস্তবতা।

প্রযুক্তি মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে, কিন্তু একই সংস্কৃতির মধ্যে আটকে রাখেনি। মানুষ এখন আরও বেশি করে নিজেদের ভাষা, নিজেদের গল্প এবং নিজেদের সংস্কৃতির দিকে ফিরে যাচ্ছে।

তাই বিশ্বকাপের ফাইনালে হয়তো বিশ্বের সব চোখ থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। কিন্তু বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও সফট পাওয়ারের নতুন খেলায় এখন আর একক কোনো দেশের আধিপত্য নেই। খেলা এখন অনেক বেশি বহুমুখী, আর প্রতিযোগিতাবহুল।

(দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250

সম্পর্কিত