জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মোতায়েন করা সৈন্য ইরানে কী করতে পারে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। স্ট্রিম গ্রাফিক।

ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় চার সপ্তাহ পার হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। তবে ইরান এ ধরনের কোনো আলোচনা চলার কথা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হাজার হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযানের মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। মার্চের শেষ সপ্তাহে এসে এই অভিযান ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক মোতায়েনে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি স্ট্রাইক গ্রুপ যুদ্ধাঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড মেরামতের জন্য ভূমধ্যসাগরে সাময়িকভাবে অকার্যকর অবস্থায় আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)–এর তথ্যমতে, ইরানের বিভিন্ন স্থানে ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)–এর সদর দপ্তর, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং নৌসম্পদ। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ১৪০টিরও বেশি ইরানি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরান প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা কার্যত ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এখন এটি সংঘাতের কেন্দ্রীয় কৌশলগত চাপের জায়গায় পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন স্থলবাহিনীর উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। হামলার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। জানুয়ারির শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন, “আমরা ইরানের দিকে একটি বড় বাহিনী পাঠাচ্ছি। অনেক জাহাজ ওই দিকে যাচ্ছে। প্রয়োজনে আমরা একটি বড় নৌবহর পাঠাব, তারপর দেখা যাবে কী হয়।” চলতি মাসের শুরুতে ‘খার্গ দ্বীপে’ মার্কিন বিমান হামলার পর ট্রাম্প বলেন, তাঁর বাহিনী সেখানে সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে দিয়েছে। ইরান যদি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে না দেয়, তবে দ্বীপটির তেল অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পেন্টাগন ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সৈন্যকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এই বাহিনী দ্রুত মোতায়েনযোগ্য হিসেবে পরিচিত। প্রশান্ত মহাসাগরের দুই প্রান্ত থেকে রওনা হওয়া দুটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’-এর সঙ্গে এই ডিভিশন যুক্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেট হেগসেথ নিশ্চিত করেছেন যে সেন্টকম তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে এই অতিরিক্ত বাহিনীর অনুরোধ করেছিল।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্কো রুবিও কংগ্রেসে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, “ইরানের ভেতরের পারমাণবিক উপাদান সুরক্ষিত করতে হতে পারে। কাউকে গিয়ে তা সংগ্রহ করতে হবে।” তবে এই দায়িত্ব কে পালন করবে, তা তিনি উল্লেখ করেননি। যদিও এখনো কোনো স্থল অভিযান অনুমোদন করা হয়নি, তবে মেরিন উভচর বাহিনী, প্যারাট্রুপার এবং ডিভিশন পর্যায়ের কমান্ড কাঠামোর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিকল্পকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করেছে।

তিন বাহিনী, এক যুদ্ধক্ষেত্র
উপসাগরে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত বাহিনী তিনটি আলাদা ইউনিট নিয়ে গঠিত। এদের যাত্রাপথ ও সময়সূচিও ভিন্ন। প্রথমটি ‘ট্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ’, যা ইউএসএস ট্রিপোলি এবং ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটকে কেন্দ্র করে গঠিত। ১৩ মার্চ জাপানের সাসেবো থেকে রওনা হয়ে ইউনিটটি মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করে ২৩ মার্চ ডিয়েগো গার্সিয়ায় পৌঁছায়। মার্চের শেষ বা এপ্রিলের শুরুতে এটি সেন্টকম অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে।

দ্বিতীয়টি ‘বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ’, যা ইউএসএস বক্সার এবং ১১তম মেরিন ইউনিট নিয়ে গঠিত। এটি ১৯-২০ মার্চের মধ্যে সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছে এবং প্রায় ২২ হাজার ২০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধাঞ্চলে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তৃতীয়টি হলো ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সদস্যের একটি ইউনিট, যা উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে পাঠানো হয়েছে। দুটি মেরিন গ্রুপ মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক মোতায়েন হবে। এয়ারবর্ন বাহিনী যুক্ত হলে মোট অতিরিক্ত সেনাসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার।

ইউএসএস ট্রিপোলি ও ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট
ইউএসএস ট্রিপোলি হলো ‘আমেরিকা-ক্লাস’-এর একটি যুদ্ধজাহাজ, যা স্থল ও জল উভয় স্থানে আক্রমণে সক্ষম। এটি উপসাগরের দিকে যাত্রা করা দুটি মেরিন জাহাজের মধ্যে বড়। ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইউ) প্রায় ২,২০০ মেরিন ও নাবিক নিয়ে গঠিত। এটি একটি শক্তিশালী ব্যাটালিয়নকে কেন্দ্র করে তৈরি, যেখানে আর্টিলারি, অ্যাম্ফিবিয়াস যানবাহন এবং বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। ২৬১ মিটার (৮৫৬ ফুট) দীর্ঘ এবং ৪৫ হাজার টন ওজনের ইউএসএস ট্রিপোলি হালকা বিমানবাহক হিসেবেও কাজ করতে পারে। এটি এফ-৩৫বি জেট বিমান পরিচালনা করতে পারে এবং একই সঙ্গে আকাশ ও সমুদ্রপথে সেনা মোতায়েন করতে সক্ষম। এই ইউনিটটি ১৯৯৮ সালে ইরাকে ‘অপারেশন ডেজার্ট ফক্স’-এ অংশ নিয়েছিল।

ইউএসএস বক্সার এবং ১১তম এমইউ
দ্বিতীয় অ্যাম্ফিবিয়াস দলটি ইউএসএস বক্সারকে কেন্দ্র করে গঠিত। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ভিত্তিক একটি ‘ওয়াস্প-ক্লাস’ অ্যাসল্ট শিপ। ১৯ মার্চ যাত্রা করা এই বাহিনীর মোতায়েন নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ এগিয়ে আনা হয়েছে। ১১তম এমইউ প্রায় ২,২০০ মেরিন ও নাবিক নিয়ে গঠিত। তিনটি জাহাজে আরও ২,০০০ অতিরিক্ত নাবিক রয়েছেন। এই ইউনিটের উপসাগরে ব্যাপক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৯০–৯১ সালে এটি কুয়েত উপকূলে ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় এবং ২০০৪-০৫ সালে ইরাকের নাজাফ প্রদেশে অবস্থান করেছিল।

৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন
ফোর্ট ব্র্যাগভিত্তিক এই ডিভিশন দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি বাহিনীর মূল অংশ। প্রায় ৩,০০০ সৈন্যের এই ইউনিট বিশ্বের যেকোনো স্থানে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছাতে পারে। এটি মূলত বিমানবন্দর দখল করতে এবং এলাকা সুরক্ষিত করতে প্রশিক্ষিত। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ভারী ট্যাংক ছাড়া মোতায়েন হওয়ায় দীর্ঘ সময় অবস্থানের ক্ষমতা সীমিত। এই ডিভিশনের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরম্যান্ডি এবং নেদারল্যান্ডস অভিযানে অংশ নেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

মোতায়েন করা বাহিনী কী করতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সেনাবিন্যাস মূলত একটি সীমিত সময়ের সম্ভাব্য অভিযানে মনোযোগ দিচ্ছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী স্থল অভিযান নয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার সিনিয়র ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট বলেন, এই পর্যায়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণে ১ লাখ ৬০ হাজার সৈন্য প্রয়োজন হয়েছিল। বর্তমানে মোতায়েনকৃত বাহিনী (সহায়ক বাহিনী বাদে) মাত্র দুটি মেরিন ও দুটি প্যারাট্রুপার ব্যাটালিয়ন নিয়ে গঠিত, যেখানে মাত্র ৩ হাজার ৬০০ সৈন্য রয়েছে। এটি দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম হলেও ইরানের গভীরে দীর্ঘ সময় অভিযান চালাতে পারবে না।

সম্ভাব্য লক্ষ্য
বাহিনীর আকার তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এগুলো হলো—খার্গ দ্বীপ দখল বা অবরোধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক উপাদান সুরক্ষিত করা। ‘খার্গ দ্বীপ’ ইরানের ৯ শতাংশ তেল রপ্তানির কেন্দ্র হওয়ায় এটি দখল করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রুবেন স্টুয়ার্টের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা সবচেয়ে বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য।

উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনীতি
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। ২৪ মার্চ ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সাথে ১৫টি বিষয়ে শক্তিশালী সমঝোতা হয়েছে। তবে ইরান এটি অস্বীকার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “বন্ধুসুলভ কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং আমরা উপযুক্ত জবাব দিয়েছি।” এদিকে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে এসেছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ট্রাম্পের সঙ্গে এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। শেহবাজ শরিফ জানান, উভয় পক্ষ সম্মত হলে চূড়ান্ত সমাধানের জন্য আলোচনার আয়োজন করতে পাকিস্তান প্রস্তুত।

সম্পর্কিত