আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, তবুও ইরান যেভাবে হামলা চালাচ্ছে

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

এআই দিয়ে বানানো ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সক্ষমতা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সক্ষমতা কমলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতি করার যথেষ্ট সামরিক ক্ষমতা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

শনিবার হোয়াইট হাউস জানায়, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটির নৌবাহিনী যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ইরানের আকাশসীমার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।

তবে এসব দাবির মধ্যেই সোমবার কাতার জানায়, তারা ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। একই সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও সতর্কতা জারি করে। আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি গাড়িতে আঘাত হানলে একজন নিহত হয়।

কমেছে হামলার সংখ্যা

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়। সংঘাতের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫৪১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল।

অন্যদিকে সংঘাতের ১৫তম দিনে সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোনে।

ইসরায়েলের দিকেও হামলা কমেছে। যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে প্রায় ১০০টি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করা হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা এক অঙ্কে নেমে এসেছে।

পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ প্রায় ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৬ শতাংশ কমেছে।

এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি অস্ত্র ভাণ্ডার

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছেই সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার রয়েছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। গত জুনের ১২ দিনের সংঘাতের পর তা কমে প্রায় আড়াই হাজারে নেমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলো ধ্বংস করা। স্যাটেলাইট ও রাডারব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সংকেত শনাক্ত করে এসব লঞ্চার লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, আনুমানিক ৪১০ থেকে ৪৪০টি লঞ্চারের মধ্যে প্রায় ২৯০টি অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিশাল ভৌগোলিক পরিসরের কারণে স্থলবাহিনী ছাড়া তাদের হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন।

কমেছে একসঙ্গে হামলার সক্ষমতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান এখন বড় আকারের একযোগে হামলা চালানোর সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে তারা এক বা দুইটি করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে, প্রধানত উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক বা বাণিজ্যিক অবকাঠামোর দিকে।

এ ধরনের হামলাকে অনেক বিশ্লেষক ‘হ্যারাসমেন্ট ফায়ার’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষের সতর্কতাব্যবস্থা চাপে রাখা এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।

দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল এখন যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা। তাঁদের ধারণা, উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শেষ হয়ে যেতে পারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার শেষ হওয়ার আগেই।

এ কারণে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও কমান্ড কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ করেছে এবং ক্রমেই মোবাইল লঞ্চারের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। এতে সেগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিকভাবে বড় হামলা না হলেও একটি সফল ড্রোন হামলাই নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

সস্তা ড্রোন ও অর্থনৈতিক চাপ

ইরান দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম খরচে কার্যকর ড্রোন তৈরি করছে। শাহেদ–১৩৬ ড্রোন দ্রুত ও সহজে তৈরি করা যায় এবং একসঙ্গে বহু সংখ্যায় নিক্ষেপ করা সম্ভব, যা প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলে।

এই ড্রোনগুলো তুলনামূলক ধীরগতির হলেও অনেক সময় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে এক ড্রোন হামলায় সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়। ফুজাইরাহ শিল্প এলাকায়ও ড্রোন হামলায় আগুন লাগে। একই সময়ে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে সাইরেন বেজে ওঠে ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে হামলার আশঙ্কায় শত শত জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের অসম যুদ্ধনীতির অংশ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোই তাদের কৌশল।

এরইমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে গেছে। কাতার গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে, বাহরাইনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি তাদের চালানের ওপর ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করেছে এবং ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা ইরানের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত