স্ট্রিম ডেস্ক

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র খরা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকের মনে গভীর শঙ্কা। প্রখর রোদে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, তাদের জীবন ও কৃষির প্রধান ভিত্তি ভূগর্ভস্থ পানি; সেটিই দ্রুত কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল বরেন্দ্র। সেখানে কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে কৃষিকাজ করা হয়। গভীর নলকূপের মাধ্যমে একসময় খরাপ্রবণ এই এলাকায় সারা বছর ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হয়েছে। কিন্তু এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশেরও বেশি এলাকা ইতোমধ্যে গুরুতর পানিসংকটে রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ৪৮ বছর বয়সী আতাউর রহমান বংশ পরম্পরায় কৃষিকাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন পাইপ অনেক বেশি গভীরে বসাতে হচ্ছে। এত গভীরে যাওয়ার পরও আগের মতো পানি পাওয়া যায় না।’
বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের পানি ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ফলে এলাকাজুড়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। অনেক গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে নলকূপ থেকেও পর্যাপ্ত খাবার পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
পার্শ্ববর্তী তিলিবাড়ী গ্রামের ৪০ বছর বয়সী কৃষক শ্রীমতি শব্দরানী বলেন ‘অনেক সময় নলকূপ চালালেও পানি ওঠে না। আমরা ভেবেছি মোটরটা হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে।’
পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় গত বছর সরকার রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার প্রায় ৫ হাজার গ্রামকে আগামী এক দশকের জন্য ‘পানিসংকটপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন। এই ঘোষণা অনুযায়ী, এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি শুধু পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, সেচ ও শিল্পকারখানার কাজে তা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে অনেক কৃষক বিপাকে পড়েন। কারণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই তারা বীজ, সার ও জমি প্রস্তুতের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকার দুই বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সংকট ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানি সংকট নিয়ে গবেষণা করা ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দুহা বলেন, ‘কৃষকদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।’
বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু সমতল ভূমিতে কৃষিকাজ বরাবরই চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। এখানে বৃষ্টিপাত কম এবং অনিয়মিত। অন্যদিকে এই অঞ্চলের এঁটেল মাটি সহজে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না এবং দ্রুত তাপ শোষণ করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৯৮০-এর দশক থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে। এর ফলে সেচব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।
এই সেচব্যবস্থা ফসলের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিপুল সংখ্যক কৃষক বছরজুড়ে চাষাবাদ করতে পারেন। তবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বিশেষ করে উচ্চফলনশীল বোরো ধান চাষ করতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। কারণ এটি একটি শীতকালীন ধানের জাত।
কৃষকদের জন্য এই ভয় এড়ানো অসম্ভব। সেচের পানি না পেলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন অব্যাহত থাকলে কৃষির ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়বে।
কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘এভাবে পানি তুলতে আমাদের খারাপ লাগে। কিন্তু আমাদের আর কী করার আছে? সেচ ছাড়া চাষাবাদ করা যায় না। আর চাষাবাদ না করলে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।’
আতাউর রহমানের ভয়, ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের জন্য শুধু কৃষিকাজ করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর স্কুলপড়ুয়া ছেলে সম্প্রতি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেছে। পরিবারের জীবিকার জন্য কৃষির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকায় আতাউর চান ছেলে মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকুক। তবে তিনি একই সঙ্গে ছেলেকে কম্পিউটারে দক্ষতা বাড়াতে এবং কৃষির বাইরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে নিতে উৎসাহিত করছেন।
অন্যদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নারীদের শ্রমের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শব্দরানীর দিন শুরু হয় একেবারে সূর্য ওঠার আগে এবং তা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। সারাদিন তাঁকে মাঠ ও বাড়ির কাজের মধ্যে ছোটাছুটি করতে হয়। তিনি ধানের চারা রোপণ, মাটি বহন, গবাদিপশুর যত্ন নেন। পাশাপাশি রান্নাবান্না ও সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্বও পালন করেন। ফলে পানির সংকট তার মতো নারীদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শব্দরানীর পরিবার নিজেদের জমি ও বর্গাচাষের জমিতে ধান, ভুট্টা, মসুর, সরিষা ও বিভিন্ন সবজি চাষ করে। পাশাপাশি আয় বাড়ানোর জন্য হাঁস, মুরগি ও গবাদিপশুও পালন করে। তবে সেচের খরচ বাড়তে থাকা এবং ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষিকাজ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, ‘আগে এক ঘণ্টা সেচের পানির জন্য ৯০ টাকা দিতে হতো। এখন দিতে হয় ১২০ টাকা। সারের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। কিন্তু ফসলের উৎপাদন কমে গেছে।’

বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক কৃষক এখন এমন সব ফসল ফলানোর দিকে ঝুঁকছেন, যেগুলো সেচ কম লাগে। তারপরও সেচের পানির সংকট কমছে না। কৃষকেরা গভীর নলকূপের সঙ্গে সংযুক্ত প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে ঘণ্টাভিত্তিক পানি কিনে থাকেন। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও চাপ কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় অনেক কম পানি পাচ্ছেন তারা। ২৭ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ আসিফ বলেন, ‘এখন বেশি টাকা দিয়েও আগের মতো পানি পাওয়া যায় না।’
এলাকার অনেক তরুণ ইতিমধ্যে কাজের সন্ধানে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে চলে গেছেন। আসিফের সবচেয়ে বেশি ভয় তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের ২০ বছর হতে হতে এই এলাকার জমির চেহারা অনেক বদলে যাবে। কখনও কখনও মনে হয়,পানির জন্য মানুষের সংগ্রাম এতটাই তীব্র হবে যে একসময় তা যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।’
সেই ভয় ও হতাশার অনুভূতিই এই অঞ্চলে কাজ করা গবেষক ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাকে আরও মজবুত করেছে। সম্প্রতি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের নেতৃত্বে, গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং বোরো ধান চাষের বিস্তার আগামী দুই দশকের মধ্যে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির মজুতকে সংকটজনক পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ব্র্যাক সহনশীল কৃষি ও পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা বিষয়ে প্রায় আড়াই হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দিতে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করে। এতে ‘অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং’ (এডব্লিউডি) পদ্ধতির মতো প্রযুক্তি শেখানো হয়। এই পদ্ধতিতে ধানক্ষেত সবসময় পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় না, বরং কয়েক দিন শুকিয়ে যাওয়ার পর আবার সেচ দেওয়া হয়, যা ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। ব্র্যাক এখনও কৃষকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্র্যাকের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে শুধু নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ালেই হবে না। এর জন্য পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ফসল, জলবায়ু সহায়ক কৃষি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে।
পানির সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নারীদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন আলী। তাঁর মতে, পানির অভাবের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি প্রায়ই নারীদেরই পোহাতে হয়। তিনি বলেন, ‘সবার জন্য সমান পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে, সম্প্রদায়ের সহনশীলতা বাড়াতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পানি সেবা ব্যবস্থাপনায় লিঙ্গ-সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।’
অনেক কৃষকের মতে, সমাধান মাটির নিচে নয়, বরং ওপরেই রয়েছে। তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং এমন পুকুর পুনর্খননের ওপর জোর দিচ্ছেন, যেখানে শুষ্ক মৌসুমেও সেচের জন্য পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে। কৃষাণী শব্দরানী বলেন, পুকুরগুলো আরও গভীর করে খনন করা হলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুকনো মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা যেত। পানি সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ আমি দেখি না।’
এদিকে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিকল্প সেচব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২৫ লাখ হেক্টরের (৬.২ মিলিয়ন একর) বেশি কৃষিজমি অনাবাদি থেকে যেতে পারে, যার ফলে ফসল উৎপাদন প্রায় ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন কমে যাবে। ইতিমধ্যে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও বারবার জলবায়ুজনিত ধাক্কায় জর্জরিত পরিবারগুলোর জন্য এমন ফসলহানি ঋণের বোঝা বাড়াতে পারে, অভিবাসন ত্বরান্বিত করতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে আরও গভীর করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ কেবল ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ করা নয়, বরং এর সমাধান এমনভাবে করা যাতে সেই কৃষক সম্প্রদায়কে তা পরিত্যাগ করতে না হয়। যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই জমিতে চাষাবাদ করে আসছে এবং যাদের অস্তিত্ব এর ওপরেই নির্ভরশীল।
(গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র খরা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকের মনে গভীর শঙ্কা। প্রখর রোদে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, তাদের জীবন ও কৃষির প্রধান ভিত্তি ভূগর্ভস্থ পানি; সেটিই দ্রুত কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল বরেন্দ্র। সেখানে কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে কৃষিকাজ করা হয়। গভীর নলকূপের মাধ্যমে একসময় খরাপ্রবণ এই এলাকায় সারা বছর ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হয়েছে। কিন্তু এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশেরও বেশি এলাকা ইতোমধ্যে গুরুতর পানিসংকটে রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ৪৮ বছর বয়সী আতাউর রহমান বংশ পরম্পরায় কৃষিকাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন পাইপ অনেক বেশি গভীরে বসাতে হচ্ছে। এত গভীরে যাওয়ার পরও আগের মতো পানি পাওয়া যায় না।’
বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের পানি ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ফলে এলাকাজুড়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। অনেক গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে নলকূপ থেকেও পর্যাপ্ত খাবার পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
পার্শ্ববর্তী তিলিবাড়ী গ্রামের ৪০ বছর বয়সী কৃষক শ্রীমতি শব্দরানী বলেন ‘অনেক সময় নলকূপ চালালেও পানি ওঠে না। আমরা ভেবেছি মোটরটা হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে।’
পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় গত বছর সরকার রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার প্রায় ৫ হাজার গ্রামকে আগামী এক দশকের জন্য ‘পানিসংকটপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন। এই ঘোষণা অনুযায়ী, এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি শুধু পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, সেচ ও শিল্পকারখানার কাজে তা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে অনেক কৃষক বিপাকে পড়েন। কারণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই তারা বীজ, সার ও জমি প্রস্তুতের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকার দুই বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সংকট ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানি সংকট নিয়ে গবেষণা করা ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দুহা বলেন, ‘কৃষকদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।’
বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু সমতল ভূমিতে কৃষিকাজ বরাবরই চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। এখানে বৃষ্টিপাত কম এবং অনিয়মিত। অন্যদিকে এই অঞ্চলের এঁটেল মাটি সহজে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না এবং দ্রুত তাপ শোষণ করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৯৮০-এর দশক থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে। এর ফলে সেচব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।
এই সেচব্যবস্থা ফসলের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিপুল সংখ্যক কৃষক বছরজুড়ে চাষাবাদ করতে পারেন। তবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বিশেষ করে উচ্চফলনশীল বোরো ধান চাষ করতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। কারণ এটি একটি শীতকালীন ধানের জাত।
কৃষকদের জন্য এই ভয় এড়ানো অসম্ভব। সেচের পানি না পেলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন অব্যাহত থাকলে কৃষির ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়বে।
কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘এভাবে পানি তুলতে আমাদের খারাপ লাগে। কিন্তু আমাদের আর কী করার আছে? সেচ ছাড়া চাষাবাদ করা যায় না। আর চাষাবাদ না করলে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।’
আতাউর রহমানের ভয়, ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের জন্য শুধু কৃষিকাজ করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর স্কুলপড়ুয়া ছেলে সম্প্রতি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেছে। পরিবারের জীবিকার জন্য কৃষির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকায় আতাউর চান ছেলে মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকুক। তবে তিনি একই সঙ্গে ছেলেকে কম্পিউটারে দক্ষতা বাড়াতে এবং কৃষির বাইরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে নিতে উৎসাহিত করছেন।
অন্যদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নারীদের শ্রমের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শব্দরানীর দিন শুরু হয় একেবারে সূর্য ওঠার আগে এবং তা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। সারাদিন তাঁকে মাঠ ও বাড়ির কাজের মধ্যে ছোটাছুটি করতে হয়। তিনি ধানের চারা রোপণ, মাটি বহন, গবাদিপশুর যত্ন নেন। পাশাপাশি রান্নাবান্না ও সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্বও পালন করেন। ফলে পানির সংকট তার মতো নারীদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শব্দরানীর পরিবার নিজেদের জমি ও বর্গাচাষের জমিতে ধান, ভুট্টা, মসুর, সরিষা ও বিভিন্ন সবজি চাষ করে। পাশাপাশি আয় বাড়ানোর জন্য হাঁস, মুরগি ও গবাদিপশুও পালন করে। তবে সেচের খরচ বাড়তে থাকা এবং ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষিকাজ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, ‘আগে এক ঘণ্টা সেচের পানির জন্য ৯০ টাকা দিতে হতো। এখন দিতে হয় ১২০ টাকা। সারের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। কিন্তু ফসলের উৎপাদন কমে গেছে।’

বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক কৃষক এখন এমন সব ফসল ফলানোর দিকে ঝুঁকছেন, যেগুলো সেচ কম লাগে। তারপরও সেচের পানির সংকট কমছে না। কৃষকেরা গভীর নলকূপের সঙ্গে সংযুক্ত প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে ঘণ্টাভিত্তিক পানি কিনে থাকেন। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও চাপ কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় অনেক কম পানি পাচ্ছেন তারা। ২৭ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ আসিফ বলেন, ‘এখন বেশি টাকা দিয়েও আগের মতো পানি পাওয়া যায় না।’
এলাকার অনেক তরুণ ইতিমধ্যে কাজের সন্ধানে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে চলে গেছেন। আসিফের সবচেয়ে বেশি ভয় তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের ২০ বছর হতে হতে এই এলাকার জমির চেহারা অনেক বদলে যাবে। কখনও কখনও মনে হয়,পানির জন্য মানুষের সংগ্রাম এতটাই তীব্র হবে যে একসময় তা যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।’
সেই ভয় ও হতাশার অনুভূতিই এই অঞ্চলে কাজ করা গবেষক ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাকে আরও মজবুত করেছে। সম্প্রতি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের নেতৃত্বে, গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং বোরো ধান চাষের বিস্তার আগামী দুই দশকের মধ্যে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির মজুতকে সংকটজনক পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ব্র্যাক সহনশীল কৃষি ও পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা বিষয়ে প্রায় আড়াই হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দিতে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করে। এতে ‘অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং’ (এডব্লিউডি) পদ্ধতির মতো প্রযুক্তি শেখানো হয়। এই পদ্ধতিতে ধানক্ষেত সবসময় পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় না, বরং কয়েক দিন শুকিয়ে যাওয়ার পর আবার সেচ দেওয়া হয়, যা ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। ব্র্যাক এখনও কৃষকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্র্যাকের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে শুধু নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ালেই হবে না। এর জন্য পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ফসল, জলবায়ু সহায়ক কৃষি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে।
পানির সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নারীদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন আলী। তাঁর মতে, পানির অভাবের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি প্রায়ই নারীদেরই পোহাতে হয়। তিনি বলেন, ‘সবার জন্য সমান পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে, সম্প্রদায়ের সহনশীলতা বাড়াতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পানি সেবা ব্যবস্থাপনায় লিঙ্গ-সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।’
অনেক কৃষকের মতে, সমাধান মাটির নিচে নয়, বরং ওপরেই রয়েছে। তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং এমন পুকুর পুনর্খননের ওপর জোর দিচ্ছেন, যেখানে শুষ্ক মৌসুমেও সেচের জন্য পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে। কৃষাণী শব্দরানী বলেন, পুকুরগুলো আরও গভীর করে খনন করা হলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুকনো মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা যেত। পানি সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ আমি দেখি না।’
এদিকে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিকল্প সেচব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২৫ লাখ হেক্টরের (৬.২ মিলিয়ন একর) বেশি কৃষিজমি অনাবাদি থেকে যেতে পারে, যার ফলে ফসল উৎপাদন প্রায় ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন কমে যাবে। ইতিমধ্যে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও বারবার জলবায়ুজনিত ধাক্কায় জর্জরিত পরিবারগুলোর জন্য এমন ফসলহানি ঋণের বোঝা বাড়াতে পারে, অভিবাসন ত্বরান্বিত করতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে আরও গভীর করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ কেবল ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ করা নয়, বরং এর সমাধান এমনভাবে করা যাতে সেই কৃষক সম্প্রদায়কে তা পরিত্যাগ করতে না হয়। যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই জমিতে চাষাবাদ করে আসছে এবং যাদের অস্তিত্ব এর ওপরেই নির্ভরশীল।
(গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)
.png)

বিশ্বরাজনীতির পুরোনো ছক যেন দ্রুত ভেঙে পড়ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর টানাপোড়েন সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা ও নতুন মেরুকরণ।
৮ ঘণ্টা আগে
আধুনিক বিশ্বে শরণার্থী সংকট সামলানোর একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলো নিজের দেশে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার বদলে অন্য দেশকে অর্থ দিয়ে তাদের সেখানে রাখতে চাইছে। ফলে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া শুধু মানবিক দায়িত্বের বিষয় থাকছে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীত
১৪ আগস্ট ২০২৬
ভারতে ছাত্রদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আপাতত থেমেছে। শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। দিল্লির যন্তর মন্তর পরিষ্কার করা হয়েছে। দেয়ালের গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ও যেন আপাতত নিজেদের পর্ব শেষ করেছে। অন্যদিকে বিজেপি আবার সংসদে নিজেদের বিল পাস করানোর কাজে ফিরেছে।
১২ আগস্ট ২০২৬
চতুর্থবারের মতো ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে ভারত। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। এবার সম্মেলনের পাশাপাশি আয়োজিত আউটরিচ সেশনগুলোও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
১২ আগস্ট ২০২৬