গাজা থেকে শুরু করে ইরানের বিধ্বস্ত স্কুল—রক্তের দাগ আজ সর্বত্র। আমরা হয়তো বড় কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় আছি, কিন্তু সংঘাতের আগুন ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক মহাদেশে। প্রথাগত যুদ্ধের সংজ্ঞা আজ বদলে গেছে। কামানের গোলার চেয়ে এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর সাইবার হামলা অনেক বেশি শক্তিশালী। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের মনে আজ গভীর প্রশ্ন জাগছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি তবে চলছে?
স্ট্রিম ডেস্ক

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের ‘শাজারেহ তাইয়্যেবেহ’ স্কুলে আঘাত হানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্কুলে হামলার ঘটনায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়ে শিশু। আহত হয়েছে আরও অন্তত ৯৫ জন। এই খবর শুনেই যেকোনো সুস্থ মানুষের গা শিউরে ওঠার কথা। অথচ আমরা কেমন যেন ভাবলেশহীন, আমাদের মনে কোনো বড় ঝড় উঠছে না। কারণটা খুব সহজ; গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের লাশ বের করে আনার দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা মৃত্যুতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই নির্মম সহনশীলতাই হলো আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
পৃথিবীর মানুষ যখন ‘তীয় বিশ্বযুদ্ধ’ কল্পনা করে, তখন তাদের চোখে ভেসে ওঠে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাদা-কালো আর্কাইভের ছবি। রেডিওতে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। লাখ লাখ ইউনিফর্ম পরা সৈন্যের কুচকাওয়াজ। সাগরে বিশাল রণতরীর বহর। আর পারমাণবিক মাশরুমের মতো ধোঁয়ার কুণ্ডলী।
যেহেতু এসব দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে নেই, তাই আমরা আরামদায়ক কিন্তু বিপজ্জনক বিভ্রমের মধ্যে আছি। আমরা ভাবছি পৃথিবী শান্তিতে আছে। কিন্তু গভীর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আমাদের এক হাড়হিম করা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাস্তবতা হলো, আমরা ইতিমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে আছি।
ঐতিহাসিকভাবে ‘বিশ্বযুদ্ধ’ বলতে এমন সর্বাত্মক সংঘাতকে বোঝায়, যেখানে বিশ্বের প্রধান পরাশক্তিগুলো একাধিক মহাদেশজুড়ে দুটি বা তার বেশি বিপরীতমুখী জোটে বিভক্ত হয়ে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বা অক্সফোর্ড ডিকশনারির সংজ্ঞানুযায়ী, এই যুদ্ধের ব্যাপ্তি, তীব্রতা এবং প্রভাব হয় বৈশ্বিক। কিন্তু একুশ শতকে এসে বিশ্বযুদ্ধের এই প্রথাগত সংজ্ঞা অচল হয়ে পড়েছে। ১৯৯৯ সালে দুই চীনা সামরিক কৌশলবিদ চিয়াও লিয়াং এবং ওয়াং শিয়াংসুই তাদের বিখ্যাত বই ‘আনরেস্ট্রিকটেড ওয়ারফেয়ার’ বা ‘সীমাহীন যুদ্ধ’-এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আগামী দিনের যুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিকের বিভাজনরেখা মুছে যাবে। তাদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে সৈনিকের চেয়ে হ্যাকার, কামানের গোলার চেয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ভূখণ্ড দখলের চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দতৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন আলাদা, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ‘সংযুক্তি’ বা কানেক্টিভিটির মধ্যে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক দেশ আরেক দেশকে বিচ্ছিন্ন করে বা অবরোধ দিয়ে হারাত। আর এখনকার যুদ্ধে এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে, ইন্টারনেটে এবং প্রযুক্তিতে যুক্ত থেকেও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর পরিচালক মার্ক লিওনার্ড একে ‘দ্য এজ অব আনপিস’ বা ‘অশান্তির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই যুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই, কারণ এটি ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর অঞ্চলে সংঘটিত হয়—যা শান্তিও নয়, আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধও নয়। আগের যুদ্ধগুলোতে বিজয় মানে ছিল শত্রুর রাজধানী দখল করা; আর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় মানে হলো শত্রুর সিস্টেম বা ব্যবস্থাকে—তা বিদ্যুৎ গ্রিড হোক বা ব্যাংকিং খাত—ভেতর থেকে অচল করে দেওয়া। তাই এবারের যুদ্ধ ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত।
যুদ্ধ চলছে। কিন্তু তার ধরন আমাদের কল্পনার সঙ্গে মিলছে না। আধুনিক যুদ্ধের স্থাপত্য বদলে গেছে। মিউচুয়ালি অ্যাসিওর্ড ডেস্ট্রাকশন বা ‘এমএডি’ (MAD) মতবাদ অনুযায়ী পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে পারে না। কারণ তাতে উভয় পক্ষেরই ধ্বংস নিশ্চিত। তাই তারা বেছে নিয়েছে ভিন্ন পথ।
বিশ্বজুড়ে এখন চলছে ছায়াযুদ্ধ বা শ্যাডো ওয়ার। চলছে প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক জবরদস্তি, সাইবার নাশকতা আর স্থানীয় সংঘাত। যুদ্ধের ময়দান এখন আর শুধু মানচিত্রের ভূখণ্ড নয়। সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির কারখানা, সাইবার স্পেস বা ইন্টারনেট জগৎ—সবই এখন রণাঙ্গন। আমরা বহু-মেরু বা মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থার যন্ত্রণাদায়ক জন্মের সাক্ষী হচ্ছি। দুঃখজনক হলো, এই যুদ্ধ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। আর ইতিহাসবিদদের পক্ষে পুরোপুরি বুঝে উঠতেও অনেক সময় লাগবে।
এই নতুন বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ফোরক ফ্রন্ট হলো মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের স্বপ্নের মতো ঢেলে সাজাতে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে ইসরায়েল। গণহত্যা, দুর্ভিক্ষ আর আগ্রাসন দিয়ে গাজা তথা ফিলিস্তিনকে ধ্বংস করেও ইসরায়েল থামেনি। তাদের পরবর্তী টার্গেট এ অঞ্চলে তাদের দৃশ্যমান সবচেয়ে বড় বাধা ইরান। হত্যা, সাইবার হামলা আর ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স-এর মাধ্যমে এই লড়াই চলত। হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি আর ইরাক-সিরিয়ার মিলিশিয়ারা ছিল এর ঘুঁটি। কিন্তু এখন সেই প্রক্সি যুদ্ধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের ‘বারো দিনের যুদ্ধ’ ছিল উত্তেজনার এক নতুন ধাপ।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই দশকের বেশি সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ছুটছেন। ওয়াশিংটন থেকে জাতিসংঘের মঞ্চে তিনি বিষয়টি নাটকীয়ভাবে তুলে পেয়েছেন। অবশেষে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সেই মুহূর্ত এসে গেছে অর্থাৎ নেতানিয়াহু যে যুদ্ধকে অনিবার্য বলতেন তা শুরু হয়েছে।
এই যুদ্ধে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল একা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক শক্তি পাশে আছে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেন। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সার্বভৌম ভূখণ্ডে বোমা ফেলা হলো। ইরান এরই মধ্যে হামলার জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ—বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ জানায়, যুদ্ধকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া বিপজ্জনক। এতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব উসকানি পেতে পারে।
অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষকেরা বলছেন, ন্যাটোর সদস্য দেশ তুরস্কের ওপর হামলা এই যুদ্ধকে এক ভয়াবহ মোড়ে নিয়ে যেতে পারে। তুরস্কের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৩০০ মাইলের সীমান্ত রয়েছে। ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলার অর্থ হলো জোটের ‘যৌথ প্রতিরক্ষা অনুচ্ছেদ’ (অনুচ্ছেদ-৫ নামে পরিচিত) সক্রিয় হওয়া, যা ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশকেই সরাসরি এই যুদ্ধে টেনে আনতে পারে।
ন্যাটো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়নি। তবে এক বিবৃতিতে ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট তুরস্ককে লক্ষ্যবস্তু করার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান এই অঞ্চলজুড়ে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ন্যাটো তুরস্কসহ সকল মিত্র দেশের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে। আমাদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী রয়েছে।’
প্রথাগত বিশ্বযুদ্ধের মতো এখানে মরুভূমিতে লাখ লাখ সৈন্যের মার্চ নেই। আছে স্টেলথ বোমারু বিমান, ব্যালিস্টিক মিসাইল আর ড্রোনের ঝাঁক। তাই বিশ্ব একে ‘বিশ্বযুদ্ধ’ বলতে দ্বিধা করছে। কিন্তু ভুলে যাবেন না, এতে জড়িয়ে আছে একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি, রাশিয়া ও চীন যাকে সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। তারা লড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধ আসলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ভিত্তিপ্রস্তর।
মধ্যপ্রাচ্য যখন পুড়ছে, দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রও ভয়াবহ। দুই পরমাণু শক্তিধর ভারত-পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান এক ঐতিহাসিক ফাটলের মুখে। এই অঞ্চল বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাতের এক বিশাল ফ্রন্ট। এখানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে আছে।

২০২৫ সালের মে মাসে বিশ্ববাসী আতঙ্কিত হয়ে দেখেছিল ভারত ও পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক সংঘাত। ভারতশাসিত কাশ্মীরে এক জঙ্গি হামলার জেরে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে। পাকিস্তানের ভূখণ্ডে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। পাকিস্তানও পাল্টা জবাব দেয়। চার দিনের সেই সংঘাতে প্রথমবারের মতো দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে ড্রোন যুদ্ধ দেখা যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ মে যুদ্ধবিরতি হয়, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক ফাটলটি রয়েই গেছে। দুই দেশ এখন দীর্ঘ ও গভীর এক হাইব্রিড যুদ্ধে আটকে আছে।
একই সঙ্গে পাকিস্তান তার পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত। ইতিহাসের এক অদ্ভুত উলটপুরাণে কাবুলের তালেবান সরকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এখন মুখোমুখি। টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবানের আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের জেরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। আফগান বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা চালালে পাকিস্তান বিমানবাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও অন্যান্য প্রশ্নে বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তানি নেতৃত্ব একে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে।
এখানেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল রূপ দেখা যায়। একাধিক ও পরস্পরবিরোধী যুদ্ধ। পাকিস্তান পূর্বে ভারতের বৈরিতা আর পশ্চিমে তালেবানের আগ্রাসনের চাপে পিষ্ট। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সীমান্ত বিরোধ নয়। এগুলো অত্যন্ত মারণঘাতী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সংঘাত। যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করছে, গণ-অভিবাসন ঘটাচ্ছে এবং পরাশক্তিগুলোকে পক্ষ নিতে বাধ্য করছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের নজিরবিহীন ও নিয়ম ভাঙার প্রকৃতি সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় লাতিন আমেরিকার ঘটনায়। আগের বিশ্বযুদ্ধগুলোতে পশ্চিম গোলার্ধ ছিল সরাসরি সংঘাতের বাইরে। কিন্তু আধুনিক যুগে বিশ্ব আধিপত্যের লড়াইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই।
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলুট রিজলভ’-এর মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে নিয়ে আসে। কারাকাসের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে মাদুরোকে তুলে আনা হয় নিউইয়র্কে। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়।

এই ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বা ওয়েস্টফালিয়ান সিস্টেমের পুরোপুরি বাইরে। ভেনেজুয়েলার মিত্ররা একে ‘ অপহরণ’ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে নিন্দা জানিয়েছে। মাদুরোর অধীনে ভেনেজুয়েলা রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে শারীরিকভাবে সরিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বুঝিয়ে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক আইনের পুরোনো নিয়ম এখন আর খাটে না। এটি হাইব্রিড যুদ্ধের চরম রূপ—যেখানে দেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করেও সামরিক শক্তি ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূ-রাজনীতি বদলে দেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার সংঘাতগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো বর্তমান পরাশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো) এবং সংশোধনবাদী বা রিভিশনিস্ট ব্লকের (রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়া) মধ্যকার বৃহত্তর লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এই বৈশ্বিক সংঘাতের রক্তাক্ত কেন্দ্রবিন্দু। এই যুদ্ধ আমাদের এফপিভি কামিকাজে ড্রোন, এআই-সহায়তায় টার্গেটিং এবং হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলের আতঙ্কের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে। লাখ লাখ গোলার ব্যবহার আর লাখ লাখ হতাহতের ঘটনা ঘটছে। যদিও ডনবাসের পরিখায় মার্কিন বা ইউরোপীয় সৈন্যরা সরাসরি মরছে না, তবুও ন্যাটোর গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, অস্ত্র উৎপাদন ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার বিরুদ্ধে পুরোদস্তুর যুদ্ধে লিপ্ত।

অন্যদিকে ইউরেশীয় ভূখণ্ডের অপর প্রান্তে চীন তাইওয়ান জয়ের জন্য নিরলস অভিযান চালাচ্ছে। প্রথাগত চিন্তার মানুষেরা মনে করে চীনা জাহাজ তাইপেইর উপকূলে ভিড়লেই কেবল যুদ্ধ শুরু হবে। আসলে তাইওয়ানের যুদ্ধ ইতিমধ্যেই চলছে। চীন কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, সাইবার নাশকতা, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ এবং ক্রমাগত সামরিক ঘেরাওয়ের কৌশল ব্যবহার করছে। নজিরবিহীন সামরিক মহড়া, আকাশসীমা লঙ্ঘন ও ‘কোয়ারেন্টাইন’ মহড়ার মাধ্যমে বেইজিং ধীরে ধীরে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বকে শ্বাসরোধ করে মারছে।
তাছাড়া সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নিয়ে চলা ‘চিপ ওয়ার’ এক ধরনের টোটাল ইকোনমিক ওয়ারফেয়ার বা সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ। চিপ হলো একুশ শতকের তেল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনের কাছে উচ্চমানের চিপ যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা চীনের সামরিক আধুনিকায়নকে পঙ্গু করার অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। আগের শতাব্দীতে এমন অর্থনৈতিক অবরোধের জবাবে তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ বেধে যেত।
এই বিশাল সব সংঘাতের বাইরেও অসংখ্য ছোট কিন্তু ধ্বংসাত্মক প্রক্সি যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে দাবানল জিইয়ে রেখেছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এক বিশৃঙ্খল রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। জান্তাবিরোধী মিলিশিয়ারা কনজ্যুমার ড্রোন বা সাধারণ ড্রোনকে মারণাস্ত্র বানিয়ে সামরিক একনায়কতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের সীমান্ত ও সম্পদের স্বার্থে তটস্থ।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল ও সুদানে চলছে চরম সহিংসতা। এগুলো কেবল স্থানীয় গৃহযুদ্ধ নয়, এগুলো সম্পদ ও প্রক্সির লড়াই। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান ও রাশিয়া (ওয়াগনার গ্রুপ বা আফ্রিকা কর্পসের মাধ্যমে) এই সংঘাতে অস্ত্র ও অর্থ জোগাচ্ছে। সোনা, ইউরেনিয়াম ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি (পিএমসি) এবং মিলিশিয়ারা রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর জায়গা নিচ্ছে। এর ফলে পরাশক্তিগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে কিন্তু দায় অস্বীকার করার সুযোগ পাচ্ছে।
কেন অনেকেই একে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বলতে নারাজ? কারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব প্যাটার্ন বা ছক খোঁজে। আর এই যুদ্ধ ১৯৩৯ সালের ছকের সঙ্গে মিলছে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিল সর্বাত্মক। দেশগুলো তাদের পুরো অর্থনীতিকে যুদ্ধের কাজে লাগাত। তরুণদের বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে পাঠানো হতো। তারা জাতীয় পতাকার নিচে লড়াই করত।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য হলো হাইব্রিডাইজেশন বা সংকরায়ন এবং ‘প্লসিবল ডিনায়েবিলিটি’ বা বিশ্বাসযোগ্যভাবে অস্বীকার করার সুযোগ। পরাশক্তিগুলো এখন আর যুদ্ধ ঘোষণা করে না। তারা চালায় ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’, ‘সন্ত্রাসবিরোধী হামলা’ বা ‘টার্গেটেড কাইনেটিক এক্সট্রাকশন’। পদাতিক বাহিনী জড়ো করার বদলে তারা আদর্শিক ও ব্যবহারযোগ্য মিলিশিয়াদের অর্থায়ন করে। কোনো শহরের কারখানা ধ্বংস করতে বোমা ফেলার বদলে তারা র্যানসমওয়্যার হামলা চালিয়ে পাইপলাইন, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র অচল করে দেয়।

তাছাড়া এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মাত্রা নজিরবিহীন। মার্কিন ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, সার্বভৌম সম্পদ জব্দ করা এবং লিথিয়াম বা কোবাল্টের মতো খনিজ দখলের প্রতিযোগিতা—এসবই রক্তপাতহীন কিন্তু গভীর প্রভাববিস্তারকারী বৈশ্বিক যুদ্ধ। হুথিরা যখন লোহিত সাগরে জাহাজ আটকায়, তখন তারা শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়ছে না। তারা এমন এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে যা পশ্চিমে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায়। তারা আসলে পশ্চিমবিরোধী ব্লকের সামুদ্রিক প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুসারে, গত তিন বছরে বিভিন্ন যুদ্ধ ও হামলায় বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০-১২ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে অনেক সময় লাগবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে যা পুরোপুরি বোঝা আরও কঠিন হবে। কোনো নির্দিষ্ট ‘ভি-ই ডে’ (ইউরোপ বিজয় দিবস) বা ‘ভি-জে ডে’ (জাপান বিজয় দিবস) থাকবে না। দখল করার মতো কোনো বার্লিন নেই। কোনো যুদ্ধজাহাজের ডেকে বসে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার মতো কোনো সম্রাটও নেই।
যেহেতু এই যুদ্ধ সামরিক, অর্থনৈতিক, সাইবার ও মনস্তাত্ত্বিক—নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে, ফলে এই লড়াই ধীর গতির বা ‘স্লো বয়েল’ হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে। এট্রিশন বা ক্ষয় করার যুদ্ধ প্রাকৃতিকভাবেই দীর্ঘ হয়। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়ার সংঘাতগুলো কয়েক সপ্তাহে জেতার জন্য নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে শত্রুকে রক্তক্ষরণ করানোর জন্য তৈরি। যুদ্ধরত পক্ষগুলো ক্রমাগত উত্তেজনার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে চাইছে।
লাতিন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অপহরণ, ভারত-পাকিস্তানের মিসাইল হামলা, কাবুলে পাকিস্তানি বিমান হামলা, ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা, ইউক্রেনের পরিখায় অনন্ত হত্যাযজ্ঞ আর তাইওয়ানের শ্বাসরোধকারী অবরোধ—এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ট্র্যাজেডি নয়। এগুলো একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরস্পরসংযুক্ত প্রেসার ভালভ বা চাপের মুখ।
আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বেঁচে আছি। এই যুদ্ধ মিলিশিয়াদের যুদ্ধ, ন্যারেটিভের যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞার যুদ্ধ—স্থায়ী সেনাবাহিনীর যুদ্ধ নয়। অ্যালগরিদমের যুদ্ধ, পরমাণু বোমার নয়। টার্গেটেড বা নির্দিষ্ট হত্যার যুদ্ধ, ভূখণ্ড দখলের নয়। প্রক্সি রাষ্ট্রের যুদ্ধ, গ্র্যান্ড অ্যালায়েন্স বা মহাজোটের নয়।
ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা হয়তো সহজেই বলতে পারবেন কখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। কিন্তু তারা অবাক হবে এটা ভেবে যে, আমরা যারা এর মধ্যে বেঁচে ছিলাম, তাদের বুঝতে এত দেরি হলো কেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের ‘শাজারেহ তাইয়্যেবেহ’ স্কুলে আঘাত হানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্কুলে হামলার ঘটনায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়ে শিশু। আহত হয়েছে আরও অন্তত ৯৫ জন। এই খবর শুনেই যেকোনো সুস্থ মানুষের গা শিউরে ওঠার কথা। অথচ আমরা কেমন যেন ভাবলেশহীন, আমাদের মনে কোনো বড় ঝড় উঠছে না। কারণটা খুব সহজ; গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের লাশ বের করে আনার দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা মৃত্যুতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই নির্মম সহনশীলতাই হলো আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
পৃথিবীর মানুষ যখন ‘তীয় বিশ্বযুদ্ধ’ কল্পনা করে, তখন তাদের চোখে ভেসে ওঠে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাদা-কালো আর্কাইভের ছবি। রেডিওতে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। লাখ লাখ ইউনিফর্ম পরা সৈন্যের কুচকাওয়াজ। সাগরে বিশাল রণতরীর বহর। আর পারমাণবিক মাশরুমের মতো ধোঁয়ার কুণ্ডলী।
যেহেতু এসব দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে নেই, তাই আমরা আরামদায়ক কিন্তু বিপজ্জনক বিভ্রমের মধ্যে আছি। আমরা ভাবছি পৃথিবী শান্তিতে আছে। কিন্তু গভীর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আমাদের এক হাড়হিম করা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাস্তবতা হলো, আমরা ইতিমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে আছি।
ঐতিহাসিকভাবে ‘বিশ্বযুদ্ধ’ বলতে এমন সর্বাত্মক সংঘাতকে বোঝায়, যেখানে বিশ্বের প্রধান পরাশক্তিগুলো একাধিক মহাদেশজুড়ে দুটি বা তার বেশি বিপরীতমুখী জোটে বিভক্ত হয়ে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বা অক্সফোর্ড ডিকশনারির সংজ্ঞানুযায়ী, এই যুদ্ধের ব্যাপ্তি, তীব্রতা এবং প্রভাব হয় বৈশ্বিক। কিন্তু একুশ শতকে এসে বিশ্বযুদ্ধের এই প্রথাগত সংজ্ঞা অচল হয়ে পড়েছে। ১৯৯৯ সালে দুই চীনা সামরিক কৌশলবিদ চিয়াও লিয়াং এবং ওয়াং শিয়াংসুই তাদের বিখ্যাত বই ‘আনরেস্ট্রিকটেড ওয়ারফেয়ার’ বা ‘সীমাহীন যুদ্ধ’-এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আগামী দিনের যুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিকের বিভাজনরেখা মুছে যাবে। তাদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে সৈনিকের চেয়ে হ্যাকার, কামানের গোলার চেয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ভূখণ্ড দখলের চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দতৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন আলাদা, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ‘সংযুক্তি’ বা কানেক্টিভিটির মধ্যে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক দেশ আরেক দেশকে বিচ্ছিন্ন করে বা অবরোধ দিয়ে হারাত। আর এখনকার যুদ্ধে এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে, ইন্টারনেটে এবং প্রযুক্তিতে যুক্ত থেকেও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর পরিচালক মার্ক লিওনার্ড একে ‘দ্য এজ অব আনপিস’ বা ‘অশান্তির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই যুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই, কারণ এটি ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর অঞ্চলে সংঘটিত হয়—যা শান্তিও নয়, আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধও নয়। আগের যুদ্ধগুলোতে বিজয় মানে ছিল শত্রুর রাজধানী দখল করা; আর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় মানে হলো শত্রুর সিস্টেম বা ব্যবস্থাকে—তা বিদ্যুৎ গ্রিড হোক বা ব্যাংকিং খাত—ভেতর থেকে অচল করে দেওয়া। তাই এবারের যুদ্ধ ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত।
যুদ্ধ চলছে। কিন্তু তার ধরন আমাদের কল্পনার সঙ্গে মিলছে না। আধুনিক যুদ্ধের স্থাপত্য বদলে গেছে। মিউচুয়ালি অ্যাসিওর্ড ডেস্ট্রাকশন বা ‘এমএডি’ (MAD) মতবাদ অনুযায়ী পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে পারে না। কারণ তাতে উভয় পক্ষেরই ধ্বংস নিশ্চিত। তাই তারা বেছে নিয়েছে ভিন্ন পথ।
বিশ্বজুড়ে এখন চলছে ছায়াযুদ্ধ বা শ্যাডো ওয়ার। চলছে প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক জবরদস্তি, সাইবার নাশকতা আর স্থানীয় সংঘাত। যুদ্ধের ময়দান এখন আর শুধু মানচিত্রের ভূখণ্ড নয়। সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির কারখানা, সাইবার স্পেস বা ইন্টারনেট জগৎ—সবই এখন রণাঙ্গন। আমরা বহু-মেরু বা মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থার যন্ত্রণাদায়ক জন্মের সাক্ষী হচ্ছি। দুঃখজনক হলো, এই যুদ্ধ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। আর ইতিহাসবিদদের পক্ষে পুরোপুরি বুঝে উঠতেও অনেক সময় লাগবে।
এই নতুন বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ফোরক ফ্রন্ট হলো মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের স্বপ্নের মতো ঢেলে সাজাতে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে ইসরায়েল। গণহত্যা, দুর্ভিক্ষ আর আগ্রাসন দিয়ে গাজা তথা ফিলিস্তিনকে ধ্বংস করেও ইসরায়েল থামেনি। তাদের পরবর্তী টার্গেট এ অঞ্চলে তাদের দৃশ্যমান সবচেয়ে বড় বাধা ইরান। হত্যা, সাইবার হামলা আর ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স-এর মাধ্যমে এই লড়াই চলত। হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি আর ইরাক-সিরিয়ার মিলিশিয়ারা ছিল এর ঘুঁটি। কিন্তু এখন সেই প্রক্সি যুদ্ধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের ‘বারো দিনের যুদ্ধ’ ছিল উত্তেজনার এক নতুন ধাপ।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই দশকের বেশি সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ছুটছেন। ওয়াশিংটন থেকে জাতিসংঘের মঞ্চে তিনি বিষয়টি নাটকীয়ভাবে তুলে পেয়েছেন। অবশেষে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সেই মুহূর্ত এসে গেছে অর্থাৎ নেতানিয়াহু যে যুদ্ধকে অনিবার্য বলতেন তা শুরু হয়েছে।
এই যুদ্ধে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল একা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক শক্তি পাশে আছে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেন। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সার্বভৌম ভূখণ্ডে বোমা ফেলা হলো। ইরান এরই মধ্যে হামলার জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ—বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ জানায়, যুদ্ধকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া বিপজ্জনক। এতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব উসকানি পেতে পারে।
অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষকেরা বলছেন, ন্যাটোর সদস্য দেশ তুরস্কের ওপর হামলা এই যুদ্ধকে এক ভয়াবহ মোড়ে নিয়ে যেতে পারে। তুরস্কের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৩০০ মাইলের সীমান্ত রয়েছে। ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলার অর্থ হলো জোটের ‘যৌথ প্রতিরক্ষা অনুচ্ছেদ’ (অনুচ্ছেদ-৫ নামে পরিচিত) সক্রিয় হওয়া, যা ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশকেই সরাসরি এই যুদ্ধে টেনে আনতে পারে।
ন্যাটো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়নি। তবে এক বিবৃতিতে ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট তুরস্ককে লক্ষ্যবস্তু করার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান এই অঞ্চলজুড়ে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ন্যাটো তুরস্কসহ সকল মিত্র দেশের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে। আমাদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী রয়েছে।’
প্রথাগত বিশ্বযুদ্ধের মতো এখানে মরুভূমিতে লাখ লাখ সৈন্যের মার্চ নেই। আছে স্টেলথ বোমারু বিমান, ব্যালিস্টিক মিসাইল আর ড্রোনের ঝাঁক। তাই বিশ্ব একে ‘বিশ্বযুদ্ধ’ বলতে দ্বিধা করছে। কিন্তু ভুলে যাবেন না, এতে জড়িয়ে আছে একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি, রাশিয়া ও চীন যাকে সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। তারা লড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধ আসলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ভিত্তিপ্রস্তর।
মধ্যপ্রাচ্য যখন পুড়ছে, দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রও ভয়াবহ। দুই পরমাণু শক্তিধর ভারত-পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান এক ঐতিহাসিক ফাটলের মুখে। এই অঞ্চল বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাতের এক বিশাল ফ্রন্ট। এখানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে আছে।

২০২৫ সালের মে মাসে বিশ্ববাসী আতঙ্কিত হয়ে দেখেছিল ভারত ও পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক সংঘাত। ভারতশাসিত কাশ্মীরে এক জঙ্গি হামলার জেরে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে। পাকিস্তানের ভূখণ্ডে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। পাকিস্তানও পাল্টা জবাব দেয়। চার দিনের সেই সংঘাতে প্রথমবারের মতো দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে ড্রোন যুদ্ধ দেখা যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ মে যুদ্ধবিরতি হয়, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক ফাটলটি রয়েই গেছে। দুই দেশ এখন দীর্ঘ ও গভীর এক হাইব্রিড যুদ্ধে আটকে আছে।
একই সঙ্গে পাকিস্তান তার পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত। ইতিহাসের এক অদ্ভুত উলটপুরাণে কাবুলের তালেবান সরকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এখন মুখোমুখি। টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবানের আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের জেরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। আফগান বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা চালালে পাকিস্তান বিমানবাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও অন্যান্য প্রশ্নে বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তানি নেতৃত্ব একে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে।
এখানেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল রূপ দেখা যায়। একাধিক ও পরস্পরবিরোধী যুদ্ধ। পাকিস্তান পূর্বে ভারতের বৈরিতা আর পশ্চিমে তালেবানের আগ্রাসনের চাপে পিষ্ট। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সীমান্ত বিরোধ নয়। এগুলো অত্যন্ত মারণঘাতী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সংঘাত। যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করছে, গণ-অভিবাসন ঘটাচ্ছে এবং পরাশক্তিগুলোকে পক্ষ নিতে বাধ্য করছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের নজিরবিহীন ও নিয়ম ভাঙার প্রকৃতি সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় লাতিন আমেরিকার ঘটনায়। আগের বিশ্বযুদ্ধগুলোতে পশ্চিম গোলার্ধ ছিল সরাসরি সংঘাতের বাইরে। কিন্তু আধুনিক যুগে বিশ্ব আধিপত্যের লড়াইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই।
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলুট রিজলভ’-এর মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে নিয়ে আসে। কারাকাসের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে মাদুরোকে তুলে আনা হয় নিউইয়র্কে। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়।

এই ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বা ওয়েস্টফালিয়ান সিস্টেমের পুরোপুরি বাইরে। ভেনেজুয়েলার মিত্ররা একে ‘ অপহরণ’ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে নিন্দা জানিয়েছে। মাদুরোর অধীনে ভেনেজুয়েলা রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে শারীরিকভাবে সরিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বুঝিয়ে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক আইনের পুরোনো নিয়ম এখন আর খাটে না। এটি হাইব্রিড যুদ্ধের চরম রূপ—যেখানে দেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করেও সামরিক শক্তি ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূ-রাজনীতি বদলে দেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার সংঘাতগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো বর্তমান পরাশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো) এবং সংশোধনবাদী বা রিভিশনিস্ট ব্লকের (রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়া) মধ্যকার বৃহত্তর লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এই বৈশ্বিক সংঘাতের রক্তাক্ত কেন্দ্রবিন্দু। এই যুদ্ধ আমাদের এফপিভি কামিকাজে ড্রোন, এআই-সহায়তায় টার্গেটিং এবং হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলের আতঙ্কের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে। লাখ লাখ গোলার ব্যবহার আর লাখ লাখ হতাহতের ঘটনা ঘটছে। যদিও ডনবাসের পরিখায় মার্কিন বা ইউরোপীয় সৈন্যরা সরাসরি মরছে না, তবুও ন্যাটোর গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, অস্ত্র উৎপাদন ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার বিরুদ্ধে পুরোদস্তুর যুদ্ধে লিপ্ত।

অন্যদিকে ইউরেশীয় ভূখণ্ডের অপর প্রান্তে চীন তাইওয়ান জয়ের জন্য নিরলস অভিযান চালাচ্ছে। প্রথাগত চিন্তার মানুষেরা মনে করে চীনা জাহাজ তাইপেইর উপকূলে ভিড়লেই কেবল যুদ্ধ শুরু হবে। আসলে তাইওয়ানের যুদ্ধ ইতিমধ্যেই চলছে। চীন কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, সাইবার নাশকতা, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ এবং ক্রমাগত সামরিক ঘেরাওয়ের কৌশল ব্যবহার করছে। নজিরবিহীন সামরিক মহড়া, আকাশসীমা লঙ্ঘন ও ‘কোয়ারেন্টাইন’ মহড়ার মাধ্যমে বেইজিং ধীরে ধীরে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বকে শ্বাসরোধ করে মারছে।
তাছাড়া সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নিয়ে চলা ‘চিপ ওয়ার’ এক ধরনের টোটাল ইকোনমিক ওয়ারফেয়ার বা সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ। চিপ হলো একুশ শতকের তেল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনের কাছে উচ্চমানের চিপ যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা চীনের সামরিক আধুনিকায়নকে পঙ্গু করার অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। আগের শতাব্দীতে এমন অর্থনৈতিক অবরোধের জবাবে তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ বেধে যেত।
এই বিশাল সব সংঘাতের বাইরেও অসংখ্য ছোট কিন্তু ধ্বংসাত্মক প্রক্সি যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে দাবানল জিইয়ে রেখেছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এক বিশৃঙ্খল রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। জান্তাবিরোধী মিলিশিয়ারা কনজ্যুমার ড্রোন বা সাধারণ ড্রোনকে মারণাস্ত্র বানিয়ে সামরিক একনায়কতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের সীমান্ত ও সম্পদের স্বার্থে তটস্থ।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল ও সুদানে চলছে চরম সহিংসতা। এগুলো কেবল স্থানীয় গৃহযুদ্ধ নয়, এগুলো সম্পদ ও প্রক্সির লড়াই। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান ও রাশিয়া (ওয়াগনার গ্রুপ বা আফ্রিকা কর্পসের মাধ্যমে) এই সংঘাতে অস্ত্র ও অর্থ জোগাচ্ছে। সোনা, ইউরেনিয়াম ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি (পিএমসি) এবং মিলিশিয়ারা রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর জায়গা নিচ্ছে। এর ফলে পরাশক্তিগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে কিন্তু দায় অস্বীকার করার সুযোগ পাচ্ছে।
কেন অনেকেই একে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বলতে নারাজ? কারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব প্যাটার্ন বা ছক খোঁজে। আর এই যুদ্ধ ১৯৩৯ সালের ছকের সঙ্গে মিলছে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিল সর্বাত্মক। দেশগুলো তাদের পুরো অর্থনীতিকে যুদ্ধের কাজে লাগাত। তরুণদের বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে পাঠানো হতো। তারা জাতীয় পতাকার নিচে লড়াই করত।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য হলো হাইব্রিডাইজেশন বা সংকরায়ন এবং ‘প্লসিবল ডিনায়েবিলিটি’ বা বিশ্বাসযোগ্যভাবে অস্বীকার করার সুযোগ। পরাশক্তিগুলো এখন আর যুদ্ধ ঘোষণা করে না। তারা চালায় ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’, ‘সন্ত্রাসবিরোধী হামলা’ বা ‘টার্গেটেড কাইনেটিক এক্সট্রাকশন’। পদাতিক বাহিনী জড়ো করার বদলে তারা আদর্শিক ও ব্যবহারযোগ্য মিলিশিয়াদের অর্থায়ন করে। কোনো শহরের কারখানা ধ্বংস করতে বোমা ফেলার বদলে তারা র্যানসমওয়্যার হামলা চালিয়ে পাইপলাইন, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র অচল করে দেয়।

তাছাড়া এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মাত্রা নজিরবিহীন। মার্কিন ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, সার্বভৌম সম্পদ জব্দ করা এবং লিথিয়াম বা কোবাল্টের মতো খনিজ দখলের প্রতিযোগিতা—এসবই রক্তপাতহীন কিন্তু গভীর প্রভাববিস্তারকারী বৈশ্বিক যুদ্ধ। হুথিরা যখন লোহিত সাগরে জাহাজ আটকায়, তখন তারা শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়ছে না। তারা এমন এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে যা পশ্চিমে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায়। তারা আসলে পশ্চিমবিরোধী ব্লকের সামুদ্রিক প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুসারে, গত তিন বছরে বিভিন্ন যুদ্ধ ও হামলায় বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০-১২ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে অনেক সময় লাগবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে যা পুরোপুরি বোঝা আরও কঠিন হবে। কোনো নির্দিষ্ট ‘ভি-ই ডে’ (ইউরোপ বিজয় দিবস) বা ‘ভি-জে ডে’ (জাপান বিজয় দিবস) থাকবে না। দখল করার মতো কোনো বার্লিন নেই। কোনো যুদ্ধজাহাজের ডেকে বসে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার মতো কোনো সম্রাটও নেই।
যেহেতু এই যুদ্ধ সামরিক, অর্থনৈতিক, সাইবার ও মনস্তাত্ত্বিক—নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে, ফলে এই লড়াই ধীর গতির বা ‘স্লো বয়েল’ হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে। এট্রিশন বা ক্ষয় করার যুদ্ধ প্রাকৃতিকভাবেই দীর্ঘ হয়। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়ার সংঘাতগুলো কয়েক সপ্তাহে জেতার জন্য নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে শত্রুকে রক্তক্ষরণ করানোর জন্য তৈরি। যুদ্ধরত পক্ষগুলো ক্রমাগত উত্তেজনার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে চাইছে।
লাতিন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অপহরণ, ভারত-পাকিস্তানের মিসাইল হামলা, কাবুলে পাকিস্তানি বিমান হামলা, ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা, ইউক্রেনের পরিখায় অনন্ত হত্যাযজ্ঞ আর তাইওয়ানের শ্বাসরোধকারী অবরোধ—এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ট্র্যাজেডি নয়। এগুলো একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরস্পরসংযুক্ত প্রেসার ভালভ বা চাপের মুখ।
আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বেঁচে আছি। এই যুদ্ধ মিলিশিয়াদের যুদ্ধ, ন্যারেটিভের যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞার যুদ্ধ—স্থায়ী সেনাবাহিনীর যুদ্ধ নয়। অ্যালগরিদমের যুদ্ধ, পরমাণু বোমার নয়। টার্গেটেড বা নির্দিষ্ট হত্যার যুদ্ধ, ভূখণ্ড দখলের নয়। প্রক্সি রাষ্ট্রের যুদ্ধ, গ্র্যান্ড অ্যালায়েন্স বা মহাজোটের নয়।
ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা হয়তো সহজেই বলতে পারবেন কখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। কিন্তু তারা অবাক হবে এটা ভেবে যে, আমরা যারা এর মধ্যে বেঁচে ছিলাম, তাদের বুঝতে এত দেরি হলো কেন।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মীয় রুপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা।
৯ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
১৩ ঘণ্টা আগে
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বুধবার (৪ মার্চ) জানিয়েছে, ইরান থেকে তুরস্কের আকাশসীমার দিকে ধাবমান একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা ন্যাটোর আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
১৪ ঘণ্টা আগে
মার্কিন সামরিক বাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানের এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
১ দিন আগে