লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন

১৯৮৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমি চীনা ভাষা অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে বেইজিংয়ে পা রাখি। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট, যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিচিত বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি নামে।
প্রায় চার দশক পর ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি চীনে গিয়েছিলাম একটি ভাষা শিখতে; কিন্তু ফিরে পেয়েছি তার চেয়েও অনেক বড় কিছু—চীনা ভাষা, চীনা সংস্কৃতি, চীনের মানুষ এবং চীনের সঙ্গে আজীবনের সম্পর্ক।
শিক্ষার্থী হিসেবে আমার সেই যাত্রা ধীরে ধীরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পরিণত হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে চীনা ভাষা আমার কর্মজীবনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করেছে, অসংখ্য বন্ধু উপহার দিয়েছে, নতুন নতুন সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে এবং বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়ে তোলার কাজে আমাকে অবদান রাখার সুযোগ করে দিয়েছে।
চীনে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা ভাষা শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বেইজিংয়ে অধ্যয়নকালে আমি হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি সভ্যতা, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিক্ষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ এবং উন্নয়নের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।
১৯৮৮ সালের সেই প্রথম সফরের পর বহুবার চীন সফরের সুযোগ হয়েছে। এসব সফরে আমি উত্তরাঞ্চলের হারবিন থেকে দক্ষিণের হাইনান দ্বীপ পর্যন্ত ২০০-এর বেশি চীনা শহর ভ্রমণ করেছি। বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে চীনের অসাধারণ রূপান্তর প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি।
প্রতিটি সফর আমাকে চীন ও তার জনগণের প্রতি আরও আকৃষ্ট করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, দোকানদার কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবার মধ্যেই আমি আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য এবং বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ অনুভব করেছি।
চীনা ভাষা শিক্ষা আমাকে বাংলাদেশের প্রথম দিকের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দোভাষীদের একজন হিসেবে কাজ করার সুযোগ এনে দেয়। ২০০১-২০০২ সালে বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদলগুলোর বৈঠকে দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য আমার হয়।
বছরের পর বছর ধরে আমি শত শত চীনা বেসামরিক ও সামরিক নেতার সঙ্গে এবং বাংলাদেশে আগত বা কর্মরত হাজার হাজার চীনা নাগরিকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিনিয়োগকারী, প্রকৌশলী, গবেষক, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, প্রকল্প পরিচালক, প্রযুক্তিবিদ ও পর্যটক।
সামান্য হলেও আমি চেষ্টা করেছি তাঁদের বাংলাদেশে অবস্থানকে আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশিদের চীনা অংশীদারদের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে সহায়তা করতে। সব মিলিয়ে চীনা ভাষা আমার কাছে দুই দেশের মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের শক্তিশালী সেতুতে পরিণত হয়েছে।
চীনা ভাষা আমাকে যে অসংখ্য সুযোগ দিয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষকতা সবচেয়ে আনন্দদায়ক এবং তৃপ্তিদায়ক। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হওয়া ছোট্ট প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে বৃহত্তর এক শিক্ষামূলক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
২০০৮ সালে আমি স্বাধীনভাবে চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করি। ২০১১ সালে ফেসবুকে বিনামূল্যে চীনা ভাষা কোর্স শিক্ষা চালু করি। ২০১৪ সালে ইউটিউবে বিনামূল্যে পাঠদান শুরু করি। পরে ২০১৮ সালে উইচ্যাট, ২০১৯ সালে হোয়াটসঅ্যাপ এবং ২০২০ সালে জুমের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করি।
এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে অবস্থান করেই বিশ্বের ২৩টি দেশের শিক্ষার্থীদের চীনা ভাষা শেখানোর সুযোগ পেয়েছি। এ পর্যন্ত আমি ৩,৫০০-এরও বেশি শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা, ৬০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে স্পোকেন ইংলিশ এবং ৩০০-এর বেশি বিদেশি ও দেশি শিক্ষার্থীকে বাংলা ভাষা শিক্ষা দিয়েছি।
আমার অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী আজ দোভাষী, অনুবাদক, ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী, গবেষক, মেরিনার, উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। যখন কোনো শিক্ষার্থী আমাকে লিখে জানায়, ‘স্যার, আমি এখন একজন দোভাষী হিসেবে কাজ করছি,’ অথবা ‘স্যার, চীনা ভাষা শেখা আমার জীবন বদলে দিয়েছে’, তখন মনে হয় আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। একজন শিক্ষকের কাছে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
চীনা ভাষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি উপলব্ধি করি যে এই আগ্রহকে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠা করি ঝং মেং চাইনিজ একাডেমি, যেখানে এখনো আমি শিক্ষার্থীদের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
এরপর আমি উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (WSCC)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক এবং বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এটি একটি সরকারি নিবন্ধিত পাবলিক লিমিটেড সংগঠন, যার লক্ষ্য চীনা ভাষা, সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের প্রসার।
এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে আমরা ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, সেমিনার, নেটওয়ার্কিং এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
গত দুই দশকে চীনা ভাষার ব্যবহারিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের সহযোগিতা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে চীনা ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তির চাহিদা। কর্মজীবনে আমি সেই চাহিদা পূরণে সামান্য হলেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি।
আমি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, সামরিক কর্মকর্তা, মেরিনার, ব্যবসায়ী ও গবেষকদের জন্য বিশেষায়িত ভাষা প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছি। একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ চীনা ভাষা প্রশিক্ষণ এবং চীনা জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি মেরিনারদের জন্য ব্যবহারিক যোগাযোগ প্রশিক্ষণ পরিচালনার সুযোগও পেয়েছি।
এর বাইরে অনেক বাংলাদেশি ও চীনা প্রতিষ্ঠানকে দোভাষী, অনুবাদ, ভাষা সহায়তা এবং পরামর্শসেবা প্রদান করেছি। বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার বহু তরুণ-তরুণী চীনা ভাষা শিখে কর্মসংস্থান, ব্যবসা এবং উন্নত জীবনের সুযোগ অর্জন করেছে—যা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
চীনা ভাষা আমাকে লেখক ও গবেষক হিসেবেও নতুন পরিচয় দিয়েছে। চীনা ভাষা শিক্ষার ওপর একাধিক বই রচনা ও প্রকাশ করেছি। পাশাপাশি চীনা ভাষা, সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বহু নিবন্ধ প্রকাশ করেছি।
বইমেলা, প্রদর্শনী, সেমিনার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে চীনা বই, শিক্ষা উপকরণ ও সাংস্কৃতিক সম্পদ প্রচারে কাজ করেছি।
আমি বিশ্বাস করি, সংস্কৃতি মানুষকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসে। সেই বিশ্বাস থেকেই বাংলাদেশি শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের চীনা গান শেখা ও পরিবেশনায় সহায়তা করার চেষ্টা করেছি।
১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হয়েছে। আজ দুই দেশের সহযোগিতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া। আর সেই বোঝাপড়া গড়ে তুলতে ভাষার ভূমিকা অপরিসীম।
যখন বাংলাদেশিরা চীনা ভাষা শেখে এবং চীনারা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারে, তখন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়, আস্থা বাড়ে এবং বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সেই লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছি।
১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বরের সেই দিনটি থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ পথচলার দিকে তাকালে আমার মন গভীর কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। প্রায় চার দশক আগে আমি একটি ভাষা শিখতে চীনে গিয়েছিলাম। আজ মনে হয়, সেই ভাষাটিই আমার জীবনকে এক নতুন অর্থ আর নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডাব্লিউএসসিসি)

১৯৮৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমি চীনা ভাষা অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে বেইজিংয়ে পা রাখি। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট, যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিচিত বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি নামে।
প্রায় চার দশক পর ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি চীনে গিয়েছিলাম একটি ভাষা শিখতে; কিন্তু ফিরে পেয়েছি তার চেয়েও অনেক বড় কিছু—চীনা ভাষা, চীনা সংস্কৃতি, চীনের মানুষ এবং চীনের সঙ্গে আজীবনের সম্পর্ক।
শিক্ষার্থী হিসেবে আমার সেই যাত্রা ধীরে ধীরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পরিণত হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে চীনা ভাষা আমার কর্মজীবনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করেছে, অসংখ্য বন্ধু উপহার দিয়েছে, নতুন নতুন সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে এবং বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়ে তোলার কাজে আমাকে অবদান রাখার সুযোগ করে দিয়েছে।
চীনে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা ভাষা শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বেইজিংয়ে অধ্যয়নকালে আমি হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি সভ্যতা, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিক্ষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ এবং উন্নয়নের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।
১৯৮৮ সালের সেই প্রথম সফরের পর বহুবার চীন সফরের সুযোগ হয়েছে। এসব সফরে আমি উত্তরাঞ্চলের হারবিন থেকে দক্ষিণের হাইনান দ্বীপ পর্যন্ত ২০০-এর বেশি চীনা শহর ভ্রমণ করেছি। বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে চীনের অসাধারণ রূপান্তর প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি।
প্রতিটি সফর আমাকে চীন ও তার জনগণের প্রতি আরও আকৃষ্ট করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, দোকানদার কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবার মধ্যেই আমি আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য এবং বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ অনুভব করেছি।
চীনা ভাষা শিক্ষা আমাকে বাংলাদেশের প্রথম দিকের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দোভাষীদের একজন হিসেবে কাজ করার সুযোগ এনে দেয়। ২০০১-২০০২ সালে বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদলগুলোর বৈঠকে দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য আমার হয়।
বছরের পর বছর ধরে আমি শত শত চীনা বেসামরিক ও সামরিক নেতার সঙ্গে এবং বাংলাদেশে আগত বা কর্মরত হাজার হাজার চীনা নাগরিকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিনিয়োগকারী, প্রকৌশলী, গবেষক, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, প্রকল্প পরিচালক, প্রযুক্তিবিদ ও পর্যটক।
সামান্য হলেও আমি চেষ্টা করেছি তাঁদের বাংলাদেশে অবস্থানকে আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশিদের চীনা অংশীদারদের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে সহায়তা করতে। সব মিলিয়ে চীনা ভাষা আমার কাছে দুই দেশের মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের শক্তিশালী সেতুতে পরিণত হয়েছে।
চীনা ভাষা আমাকে যে অসংখ্য সুযোগ দিয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষকতা সবচেয়ে আনন্দদায়ক এবং তৃপ্তিদায়ক। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হওয়া ছোট্ট প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে বৃহত্তর এক শিক্ষামূলক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
২০০৮ সালে আমি স্বাধীনভাবে চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করি। ২০১১ সালে ফেসবুকে বিনামূল্যে চীনা ভাষা কোর্স শিক্ষা চালু করি। ২০১৪ সালে ইউটিউবে বিনামূল্যে পাঠদান শুরু করি। পরে ২০১৮ সালে উইচ্যাট, ২০১৯ সালে হোয়াটসঅ্যাপ এবং ২০২০ সালে জুমের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করি।
এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে অবস্থান করেই বিশ্বের ২৩টি দেশের শিক্ষার্থীদের চীনা ভাষা শেখানোর সুযোগ পেয়েছি। এ পর্যন্ত আমি ৩,৫০০-এরও বেশি শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা, ৬০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে স্পোকেন ইংলিশ এবং ৩০০-এর বেশি বিদেশি ও দেশি শিক্ষার্থীকে বাংলা ভাষা শিক্ষা দিয়েছি।
আমার অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী আজ দোভাষী, অনুবাদক, ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী, গবেষক, মেরিনার, উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। যখন কোনো শিক্ষার্থী আমাকে লিখে জানায়, ‘স্যার, আমি এখন একজন দোভাষী হিসেবে কাজ করছি,’ অথবা ‘স্যার, চীনা ভাষা শেখা আমার জীবন বদলে দিয়েছে’, তখন মনে হয় আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। একজন শিক্ষকের কাছে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
চীনা ভাষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি উপলব্ধি করি যে এই আগ্রহকে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠা করি ঝং মেং চাইনিজ একাডেমি, যেখানে এখনো আমি শিক্ষার্থীদের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
এরপর আমি উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (WSCC)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক এবং বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এটি একটি সরকারি নিবন্ধিত পাবলিক লিমিটেড সংগঠন, যার লক্ষ্য চীনা ভাষা, সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের প্রসার।
এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে আমরা ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, সেমিনার, নেটওয়ার্কিং এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
গত দুই দশকে চীনা ভাষার ব্যবহারিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের সহযোগিতা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে চীনা ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তির চাহিদা। কর্মজীবনে আমি সেই চাহিদা পূরণে সামান্য হলেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি।
আমি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, সামরিক কর্মকর্তা, মেরিনার, ব্যবসায়ী ও গবেষকদের জন্য বিশেষায়িত ভাষা প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছি। একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ চীনা ভাষা প্রশিক্ষণ এবং চীনা জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি মেরিনারদের জন্য ব্যবহারিক যোগাযোগ প্রশিক্ষণ পরিচালনার সুযোগও পেয়েছি।
এর বাইরে অনেক বাংলাদেশি ও চীনা প্রতিষ্ঠানকে দোভাষী, অনুবাদ, ভাষা সহায়তা এবং পরামর্শসেবা প্রদান করেছি। বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার বহু তরুণ-তরুণী চীনা ভাষা শিখে কর্মসংস্থান, ব্যবসা এবং উন্নত জীবনের সুযোগ অর্জন করেছে—যা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
চীনা ভাষা আমাকে লেখক ও গবেষক হিসেবেও নতুন পরিচয় দিয়েছে। চীনা ভাষা শিক্ষার ওপর একাধিক বই রচনা ও প্রকাশ করেছি। পাশাপাশি চীনা ভাষা, সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বহু নিবন্ধ প্রকাশ করেছি।
বইমেলা, প্রদর্শনী, সেমিনার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে চীনা বই, শিক্ষা উপকরণ ও সাংস্কৃতিক সম্পদ প্রচারে কাজ করেছি।
আমি বিশ্বাস করি, সংস্কৃতি মানুষকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসে। সেই বিশ্বাস থেকেই বাংলাদেশি শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের চীনা গান শেখা ও পরিবেশনায় সহায়তা করার চেষ্টা করেছি।
১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হয়েছে। আজ দুই দেশের সহযোগিতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া। আর সেই বোঝাপড়া গড়ে তুলতে ভাষার ভূমিকা অপরিসীম।
যখন বাংলাদেশিরা চীনা ভাষা শেখে এবং চীনারা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারে, তখন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়, আস্থা বাড়ে এবং বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সেই লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছি।
১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বরের সেই দিনটি থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ পথচলার দিকে তাকালে আমার মন গভীর কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। প্রায় চার দশক আগে আমি একটি ভাষা শিখতে চীনে গিয়েছিলাম। আজ মনে হয়, সেই ভাষাটিই আমার জীবনকে এক নতুন অর্থ আর নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডাব্লিউএসসিসি)
.png)

ইতিহাস কখনও একটি দৃশ্য থেকেও জন্ম নেয়। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তটি তেমনই এক দৃশ্য। দৃশ্যটি দেখার পর সারা দেশের মানুষ যেন একদিকে হেলে পড়েছিল।
১৮ ঘণ্টা আগে
প্রধানত ১৮৬২ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যকার ঢাকা জেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার তথ্য জানায় এই লেখাটি। সেকালে বিভিন্ন সময়ে চালের দাম কীভাবে ওঠানামা করত? তখনকার জীবনযাত্রা কেমন ছিল? সাধারণ মানুষের মজুরি কিংবা একটি বাড়ি বানানোর খরচই বা কত লাগত? জমির দাম ও খাজনা কত ছিল? সমাজে কারা ছিলেন সবচেয়ে ধনী এবং কৃষ
১৬ জুলাই ২০২৬
বালাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের সেই বিভীষিকা যখন শুরু হয়, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী সব বিদেশি সাংবাদিকদের বন্দুকের মুখে ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একজন সাংবাদিক থেকে গেলেন এই মৃত্যুপুরীতে। তিনি সায়মন ড্র
১৬ জুলাই ২০২৬
অভিনেতা বুলবুল আহমেদকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘মহানায়ক’। হয়েছেন ‘দেবদাস’, হয়েছেন ‘শ্রীকান্ত’। সত্তর ও আশির দশকে সুদর্শন নায়ক হিসেবে তিনি অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। অভিনয়জগতের সবাই তাঁকে ‘ভদ্রলোক’ হিসেবেই জানে। ২০১০ সালে ১৫ জুলাই বুলবুল আহমেদের মৃত্যুর পর গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিত্রনায়ক র
১৫ জুলাই ২০২৬