আসাদ উল্লাহ

‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে,
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,
কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।’
-ওমর খৈয়াম
বই সম্পর্কে পারস্যের কবি ওমর খৈয়ামের কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন এডওয়ার্ড ফিটজেজেরাল্ড। প্রথম শুনেছিলাম ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক মাহবুবুল আলম স্যারের কাছ থেকে। স্যার নিজেও কবি। এখনো কবিতা লেখেন। কবিতার বই প্রকাশ করেন। ক্লাসে পড়ানোর সময়ে উদ্ধৃতি হিসেবে খুব রোম্যান্টিক কিছু কবিতার লাইন আমাদেরকে নিয়মিত শোনাতেন। যেমন, কবি জন ডানের কবিতা থেকে বলতেন,
‘For God's sake hold your tongue, and let me love.’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর বাংলা করেছিলেন— দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্।
ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।
পরে অবশ্য অনেক সমালোচনা হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথ সেকালের শালিনতা রক্ষার খাতিরে অনুবাদে কবিতার মর্মার্থ থেকে সরে গিয়েছিলেন।
তার মুখে শোনা ওমর খৈয়ামের কবিতার এডওয়ার্ড ফিটজেজেরাল্ড কর্তৃক অনুবাদ করা কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ ছিল:
“Here with a Loaf of Bread beneath the Bough,
A Flask of Wine, a Book of Verse -and Thou
Beside me singing in the Wilderness –
And Wilderness is Paradise e now.”
আমাদের মুখে মুখে তখন কবিতার চরণগুলো ঘুরত। যদিও প্রেম, ভালবাসা, এমনকি বই সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। কান্তি চন্দ্র ঘোষের অনুবাদটাও আমাদের পছন্দের:
সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়
খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়!
মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর–
সেইতো সখি স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর!
কবিতাটি মুলত ওমর খৈয়াম কর্তৃক স্বর্গের বর্ণনা। কবি বেহেশতের সরঞ্জামাদির মনোজ্ঞ বর্ণনা দিতে গিয়ে বই রাখতে ভোলেননি।
লেখার শুরুতে দেওয়া কবিতার উদ্ধৃতি আমি প্রথম পড়ি সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে। আজকের মতো সৈয়দ মুজতবা আলীর যুগেও বই কেনা ও পড়ার ব্যাপারে বাঙালির অনাগ্রহের কমতি ছিল না। এই প্রবন্ধে তিনি আঙুল দিয়ে বই কেনা বিষয়ে আমাদের অনাগ্রহগুলো দেখিয়েছেন। লিখেছেন, ‘বই কিনে কেউ কখনো দেউলিয়া হয় না’। সেইসঙ্গে বই চুরির কথাও এসেছে।
প্রত্যেকেরই শৈশব, কৈশোর বা যৌবনে চুরির ইতিহাস থাকে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে প্রতিবেশীর স্ত্রী এসে দুর্গাকে একটি পুঁতির মালা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করেন। আর সেই চুরির প্রবণতাকে উৎসাহ দেওয়ার অপরাধে সর্বজয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেন। দুর্গা যথারীতি সেই অভিযোগকে অস্বীকার করে। দুর্গার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার কাশী যাওয়ার সময়ে গোছগাছ করতে গিয়ে অপু দুর্গার একান্ত সংগ্রহের ঝাঁপিতে চুরি করা মালাটিকে আবিষ্কার করে। দুর্গার লজ্জাকে ঢাকার জন্যে অপু মালাটিকে ছুড়ে ফেলে পুকুরের কচুরিপানার ভেতরে। বিস্মৃতির অতলে ডুবে যায় দুর্গা ও তার মালা।
এবার আমার বই চুরির গল্প বলি।
১৯৮৩ সাল। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ঠিক আগের সময়। চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। এই সময়ে একদিন রাতে টিভিতে হারম্যান মেলভিলের ‘মবিডিক’ দেখানো হলো। কোনো এক শনিবারে। মনে আছে ডিউক, সাহেল ও আমি তিনজনে মিলে ছবিটা দেখেছিলাম। হাউজের চিত্তবিনোদন কক্ষে। অসাধারণ ছবি। কিন্ত শুধু মুভি দেখে মন ভরল না। পরীক্ষার শেষ দিনে আমি কলেজ লাইব্রেরিতে চলে গেলাম। বইটা খুঁজে বের করলাম। ১৮৫১ সনে প্রকাশিত। শতাব্দী পুরনো। শেষের দিকে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে গেছে। তবুও বইতে লেখা প্রথম শব্দাবলী ‘Call Me Ishmael.’ আমার মধ্যে সম্মোহনের সৃষ্টি করল। মনে হলো, উপন্যাসের শুরু হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বাক্য এইটি। A Tale of Two Cities-এর ‘It was the best of times, it was the worst of time’-এর মতো। বইটিকে নিজের করে পাওয়ার প্রবল বাসনা চেপে বসল আমার ভেতরে। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা শেষে সবাই চিরদিনের মতো ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে যাব। আর ফিরে আসা হবে না। বইটি বাইরের দোকানে পাওয়া যাবে কিনা তাও নিশ্চিত নই। সুতরাং শৈশব ও কৈশোরের সমস্ত পবিত্রতা বিসর্জন দিয়ে জানালা দিয়ে সবার অলক্ষ্যে বইটিকে লাইব্রেরির বাইরে ফেলে দিলাম।
তবে চুরির পরবর্তী অবস্থা আমার জন্যে সুখকর হয়নি। হাউজে ফিরে যাবার পর রাতে সাহেল আর ডিউককে বইটা দেখালাম। দুজনেই মনে মনে খুশি। কিন্তু তারা দুজনেই বইটা আমার আগে বা পরে পড়বে বলে দাবি করে বসল। আমি দিতে না চাইলে কলেজ কর্তৃপক্ষেকে চুরির কথা জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলো। সুতরাং সিদ্ধান্ত হলো ডিউক কলেজ থেকে চলে যাবার আগেই বইটা পড়ে শেষ করবে। সেই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত পড়তে বুঝতে পারে। সে পড়ার পর বইটা নিয়ে বাড়িতে যাব আমি। আমার পড়া শেষ হলে ডাকযোগে সাহেলের কাছে পাঠাব।
সাহেলকে আমি বইটা পড়তে দিইনি। কলেজ থেকে চলে যাবার পর আসলে ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগই ছিল না। দুজনেই বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। সেখানে প্রশিক্ষণ আর পানিশমেন্টের তোড়ে বইটির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। সুতরাং বইটা আমার কাছেই রয়ে গিয়েছিল অনেক বছর। অনেকবার পড়ার চেষ্টা করেছি। খুব কঠিন ভাষা। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের মতো। এতে ‘সিটোলজি’ নামে একটা বিশাল অধ্যায় আছে। বিভিন্ন ধরনের তিমির ভ্রূণ, প্রকার, বাইবেলে তিমি মাছের বর্ণনাতে ভরপুর। পড়ে শেষ করার আগেই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ১৯৯৩ সনে বইটা আমার কাছ থেকে কী করে যেন হারিয়ে যায়।
উপন্যাসটি সম্পূর্ণ পুরুষালী ধাঁচের। কোনো নারী চরিত্র নেই। শুনেছি উপন্যাসটি মেলভিলের জীবদ্দশায় তাঁর জন্যেও হয়রানীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ের পাঠকরা নারীর ভালবাসাহীন এই উপন্যাসকে পছন্দ করেনি। ফলে মেলভিলকে উপন্যাস লেখা বাদ দিয়ে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করতে হয়েছিলো। অথচ মেলভিল নিজেও জানতেন যে তাঁর লেখাগুলোর ভেতরে সর্বশ্রেষ্ঠ লেখা এটাই। শুধু গত শতাব্দীর শেষের দিকেই স্বীকৃত হয় যে, ‘মবি ডিক’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি। এটা রোমান্টিসিজম ও আমেরিকান রেনেসাঁর প্রতীক।
উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে মবি ডিক নামক বিশাল এক তিমি মাছকে নিয়ে। লেখক ইসমায়েল নামের এক যুবক নাবিক হিসেবে প্রথম পুরুষে বর্ণনা করেছেন তাঁর সমুদ্র ভ্রমণ ও তিমি শিকারের কাহিনি। প্রধান চরিত্র ক্যাপ্টেন আহাব নামের জাহাজের নাবিক। সে মবি ডিক নামের প্রকাণ্ডদেহী এক সাদা তিমি শিকারের নেশায় ঘুরে বেড়ায় সমুদ্রে। এই তিমির কাছে কয়েক বছর আগে তার একটি পা হারিয়েছে। সমুদ্রের জলরাশি তন্ন তন্ন করে সে খুঁজে বেড়ায় তিমিটিকে। প্রতিশোধ নেবার জন্যে। তাঁর একগুঁয়েমিপনা নিজের ও জাহাজের অন্যান্যদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। বেঁচে থাকে শুধু ইশমায়েল। অন্যদেরকে কাহিনি শোনানোর জন্যে।
২০০২ সনে সিয়েরালিওনে জাতিসংঘ মিশন করার সময়ে ছুটির যাত্রাবিরতিতে লন্ডনের এইচ এম ভির শোরুম থেকে আবার বইটা কিনি। এখনো আছে আমার কাছে। অবোধ্য কোনো কারণে বইটির প্রতি আমার আসক্তি মবি ডিকের প্রতি ক্যাপ্টেন আহাবের আসক্তির মতো।

‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে,
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,
কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।’
-ওমর খৈয়াম
বই সম্পর্কে পারস্যের কবি ওমর খৈয়ামের কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন এডওয়ার্ড ফিটজেজেরাল্ড। প্রথম শুনেছিলাম ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক মাহবুবুল আলম স্যারের কাছ থেকে। স্যার নিজেও কবি। এখনো কবিতা লেখেন। কবিতার বই প্রকাশ করেন। ক্লাসে পড়ানোর সময়ে উদ্ধৃতি হিসেবে খুব রোম্যান্টিক কিছু কবিতার লাইন আমাদেরকে নিয়মিত শোনাতেন। যেমন, কবি জন ডানের কবিতা থেকে বলতেন,
‘For God's sake hold your tongue, and let me love.’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর বাংলা করেছিলেন— দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্।
ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।
পরে অবশ্য অনেক সমালোচনা হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথ সেকালের শালিনতা রক্ষার খাতিরে অনুবাদে কবিতার মর্মার্থ থেকে সরে গিয়েছিলেন।
তার মুখে শোনা ওমর খৈয়ামের কবিতার এডওয়ার্ড ফিটজেজেরাল্ড কর্তৃক অনুবাদ করা কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ ছিল:
“Here with a Loaf of Bread beneath the Bough,
A Flask of Wine, a Book of Verse -and Thou
Beside me singing in the Wilderness –
And Wilderness is Paradise e now.”
আমাদের মুখে মুখে তখন কবিতার চরণগুলো ঘুরত। যদিও প্রেম, ভালবাসা, এমনকি বই সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। কান্তি চন্দ্র ঘোষের অনুবাদটাও আমাদের পছন্দের:
সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়
খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়!
মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর–
সেইতো সখি স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর!
কবিতাটি মুলত ওমর খৈয়াম কর্তৃক স্বর্গের বর্ণনা। কবি বেহেশতের সরঞ্জামাদির মনোজ্ঞ বর্ণনা দিতে গিয়ে বই রাখতে ভোলেননি।
লেখার শুরুতে দেওয়া কবিতার উদ্ধৃতি আমি প্রথম পড়ি সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে। আজকের মতো সৈয়দ মুজতবা আলীর যুগেও বই কেনা ও পড়ার ব্যাপারে বাঙালির অনাগ্রহের কমতি ছিল না। এই প্রবন্ধে তিনি আঙুল দিয়ে বই কেনা বিষয়ে আমাদের অনাগ্রহগুলো দেখিয়েছেন। লিখেছেন, ‘বই কিনে কেউ কখনো দেউলিয়া হয় না’। সেইসঙ্গে বই চুরির কথাও এসেছে।
প্রত্যেকেরই শৈশব, কৈশোর বা যৌবনে চুরির ইতিহাস থাকে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে প্রতিবেশীর স্ত্রী এসে দুর্গাকে একটি পুঁতির মালা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করেন। আর সেই চুরির প্রবণতাকে উৎসাহ দেওয়ার অপরাধে সর্বজয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেন। দুর্গা যথারীতি সেই অভিযোগকে অস্বীকার করে। দুর্গার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার কাশী যাওয়ার সময়ে গোছগাছ করতে গিয়ে অপু দুর্গার একান্ত সংগ্রহের ঝাঁপিতে চুরি করা মালাটিকে আবিষ্কার করে। দুর্গার লজ্জাকে ঢাকার জন্যে অপু মালাটিকে ছুড়ে ফেলে পুকুরের কচুরিপানার ভেতরে। বিস্মৃতির অতলে ডুবে যায় দুর্গা ও তার মালা।
এবার আমার বই চুরির গল্প বলি।
১৯৮৩ সাল। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ঠিক আগের সময়। চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। এই সময়ে একদিন রাতে টিভিতে হারম্যান মেলভিলের ‘মবিডিক’ দেখানো হলো। কোনো এক শনিবারে। মনে আছে ডিউক, সাহেল ও আমি তিনজনে মিলে ছবিটা দেখেছিলাম। হাউজের চিত্তবিনোদন কক্ষে। অসাধারণ ছবি। কিন্ত শুধু মুভি দেখে মন ভরল না। পরীক্ষার শেষ দিনে আমি কলেজ লাইব্রেরিতে চলে গেলাম। বইটা খুঁজে বের করলাম। ১৮৫১ সনে প্রকাশিত। শতাব্দী পুরনো। শেষের দিকে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে গেছে। তবুও বইতে লেখা প্রথম শব্দাবলী ‘Call Me Ishmael.’ আমার মধ্যে সম্মোহনের সৃষ্টি করল। মনে হলো, উপন্যাসের শুরু হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বাক্য এইটি। A Tale of Two Cities-এর ‘It was the best of times, it was the worst of time’-এর মতো। বইটিকে নিজের করে পাওয়ার প্রবল বাসনা চেপে বসল আমার ভেতরে। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা শেষে সবাই চিরদিনের মতো ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে যাব। আর ফিরে আসা হবে না। বইটি বাইরের দোকানে পাওয়া যাবে কিনা তাও নিশ্চিত নই। সুতরাং শৈশব ও কৈশোরের সমস্ত পবিত্রতা বিসর্জন দিয়ে জানালা দিয়ে সবার অলক্ষ্যে বইটিকে লাইব্রেরির বাইরে ফেলে দিলাম।
তবে চুরির পরবর্তী অবস্থা আমার জন্যে সুখকর হয়নি। হাউজে ফিরে যাবার পর রাতে সাহেল আর ডিউককে বইটা দেখালাম। দুজনেই মনে মনে খুশি। কিন্তু তারা দুজনেই বইটা আমার আগে বা পরে পড়বে বলে দাবি করে বসল। আমি দিতে না চাইলে কলেজ কর্তৃপক্ষেকে চুরির কথা জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলো। সুতরাং সিদ্ধান্ত হলো ডিউক কলেজ থেকে চলে যাবার আগেই বইটা পড়ে শেষ করবে। সেই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত পড়তে বুঝতে পারে। সে পড়ার পর বইটা নিয়ে বাড়িতে যাব আমি। আমার পড়া শেষ হলে ডাকযোগে সাহেলের কাছে পাঠাব।
সাহেলকে আমি বইটা পড়তে দিইনি। কলেজ থেকে চলে যাবার পর আসলে ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগই ছিল না। দুজনেই বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। সেখানে প্রশিক্ষণ আর পানিশমেন্টের তোড়ে বইটির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। সুতরাং বইটা আমার কাছেই রয়ে গিয়েছিল অনেক বছর। অনেকবার পড়ার চেষ্টা করেছি। খুব কঠিন ভাষা। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের মতো। এতে ‘সিটোলজি’ নামে একটা বিশাল অধ্যায় আছে। বিভিন্ন ধরনের তিমির ভ্রূণ, প্রকার, বাইবেলে তিমি মাছের বর্ণনাতে ভরপুর। পড়ে শেষ করার আগেই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ১৯৯৩ সনে বইটা আমার কাছ থেকে কী করে যেন হারিয়ে যায়।
উপন্যাসটি সম্পূর্ণ পুরুষালী ধাঁচের। কোনো নারী চরিত্র নেই। শুনেছি উপন্যাসটি মেলভিলের জীবদ্দশায় তাঁর জন্যেও হয়রানীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ের পাঠকরা নারীর ভালবাসাহীন এই উপন্যাসকে পছন্দ করেনি। ফলে মেলভিলকে উপন্যাস লেখা বাদ দিয়ে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করতে হয়েছিলো। অথচ মেলভিল নিজেও জানতেন যে তাঁর লেখাগুলোর ভেতরে সর্বশ্রেষ্ঠ লেখা এটাই। শুধু গত শতাব্দীর শেষের দিকেই স্বীকৃত হয় যে, ‘মবি ডিক’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি। এটা রোমান্টিসিজম ও আমেরিকান রেনেসাঁর প্রতীক।
উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে মবি ডিক নামক বিশাল এক তিমি মাছকে নিয়ে। লেখক ইসমায়েল নামের এক যুবক নাবিক হিসেবে প্রথম পুরুষে বর্ণনা করেছেন তাঁর সমুদ্র ভ্রমণ ও তিমি শিকারের কাহিনি। প্রধান চরিত্র ক্যাপ্টেন আহাব নামের জাহাজের নাবিক। সে মবি ডিক নামের প্রকাণ্ডদেহী এক সাদা তিমি শিকারের নেশায় ঘুরে বেড়ায় সমুদ্রে। এই তিমির কাছে কয়েক বছর আগে তার একটি পা হারিয়েছে। সমুদ্রের জলরাশি তন্ন তন্ন করে সে খুঁজে বেড়ায় তিমিটিকে। প্রতিশোধ নেবার জন্যে। তাঁর একগুঁয়েমিপনা নিজের ও জাহাজের অন্যান্যদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। বেঁচে থাকে শুধু ইশমায়েল। অন্যদেরকে কাহিনি শোনানোর জন্যে।
২০০২ সনে সিয়েরালিওনে জাতিসংঘ মিশন করার সময়ে ছুটির যাত্রাবিরতিতে লন্ডনের এইচ এম ভির শোরুম থেকে আবার বইটা কিনি। এখনো আছে আমার কাছে। অবোধ্য কোনো কারণে বইটির প্রতি আমার আসক্তি মবি ডিকের প্রতি ক্যাপ্টেন আহাবের আসক্তির মতো।

কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের একটি কবিতার দুটি পংক্তি—‘খোদা আমাকে মানুষ বানালো, আমি হতে চেয়েছিলাম বই।’ হ্যাঁ একজন সংবেদনীল, সৃষ্টিপ্রবণ মানুষের কাছে বইয়ের অস্তিত্ব একটা মানব জনমের চেয়েও অধিক মূল্যবান।
১৩ মিনিট আগে
ক্লাস সিক্সে পড়ি, সে সময়ে এক আত্মীয়ের বাড়ি গেলাম। বুকশেলফে রাখা বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখছি, চোখ পড়ল কালবেলা নামে এক উপন্যাসের ওপর। হাতে নিতেই প্রায় ছোঁ মেরে আমার আত্মীয় বইটি তুলে নিলেন। ‘এসব বড়দের বই, পড়লে মানে বুঝবে না এসবের’। এভাবেই আমাদের অনেকের ‘বড়দের বই’য়ের সঙ্গে পরিচয়।
১ ঘণ্টা আগে
জেমস বন্ড চরিত্রের স্রষ্টা, প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিং ১৯৫৬ সালে ‘কীভাবে বেস্টসেলার বই লিখতে হয়’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, বেস্টসেলার বই লেখার খুব সহজ একটা রেসিপি আছে। সেটি হচ্ছে পৃষ্ঠা ওলটানোর কৌশল। অর্থাৎ গল্পটি এমনভাবে বলতে হবে, যাতে পাঠক পরের পৃষ্ঠা ওলটাতে বাধ্য হয়।
৩ ঘণ্টা আগে
ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর দশম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
৬ ঘণ্টা আগে