ককরোচ আন্দোলন

প্রশ্নফাঁসের বিক্ষোভ থেকে নেতা, শিক্ষামন্ত্রী হয়ে নিজেও একই গাড্ডায়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১১: ২৯
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ছবি : সংগৃহীত

ভারতের ওডিশায় ১৯৯৭ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। রাজ্য সচিবালয়ের সামনে হওয়া সেই বিক্ষোভে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। মারাত্মক আহত হন সামনের সারিতে থাকা তৎকালীন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) জাতীয় সম্পাদক ধর্মেন্দ্র প্রধান।

কাকতালীয়ভাবে তিনি এখন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। আর নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে তার বিরুদ্ধেই আন্দোলনে নেমেছে ভারতের ছাত্র সমাজ। সেখানেও চড়াও হয়েছে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০ এর অধিক আন্দোলনকারী।

সময়ের পরিবর্তন তিন দশক পর আবারও আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে ওডিশা সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলন। দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস নেতা জানকী বল্লভ পট্টনায়কের নেতৃত্বাধীন ওডিশা সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আন্দোলনে নেমেছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সে সময় তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ছাত্রসংগঠন, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) জাতীয় সম্পাদক ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার সময় তিনি এবিভিপির সক্রিয় সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে দুই দফায় সংগঠনটির জাতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৭ সালে ওডিশায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্য সচিবালয়ের সামনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী বিক্ষোভে অংশ নেন। ধর্মেন্দ্র প্রধানও সেখানে ছিলেন। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের জুনিয়র এবং বর্তমানে ভুবনেশ্বরের আরএমডি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রশান্ত রাউত দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে।’

রাউত বলেন, ওই ঘটনায় পুলিশ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বেধড়ক মারপিট করে। এতে তাঁর কয়েকটি হাড় ভেঙে যায়। তিনি আরও বলেন, সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলে জনতা দলের সমর্থকরা ধর্মেন্দ্র প্রধানের ওপর হামলা চালায়। রাউতের ভাষায়, ‘ভাগ্য ভালো ছিল বলেই তিনি তখন প্রাণে বেঁচে গেছেন।’

ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই পরে বিজেপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয় হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ওডিশায় বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ধর্মেন্দ্র।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ওডিশায় সরকার গঠন করে বিজেপি। এর মধ্য দিয়ে নবীন পট্টনায়কের নেতৃত্বাধীন বিজু জনতা দলের দুই দশকের বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটে।

আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন, এবার বিরুদ্ধে ধর্মেন্দ্র

সম্প্রতি নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হাজারো শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। এতে শতাধিক বিক্ষোভকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ২১ বছর বয়সী এক তরুণীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে।

এই ঘটনার পর বিরোধী দলগুলোও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত নিট ইস্যুতে অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে বিজেপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা দাবি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে সরকার। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুও একই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

তবে, কারও বাসভবনে কিংবা সরকারি কোনো প্রশাসনিক বৈঠকখানায় আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটি বলছে, সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হলে তা যন্তর মন্তরেই প্রকাশ্যে হতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

পুলিশি লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও ধরপাকড় চালিয়েও দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন। বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বড় হচ্ছে যন্তর মন্তরের সমাবেশ। সিজেপির দাবি, এটি এখন শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিচারের দাবি নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার আন্দোলন।
সূত্র : উইয়ন, এনডিটিভি ও আলজাজিরা

Ad 300x250

সম্পর্কিত