বলিউড দেখায়নি, ভারতের শিক্ষা সংকট দেখিয়েছে এই ওটিটি সিরিজগুলো

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ২২: ২৭
বলিউড দেখায়নি, ভারতের শিক্ষা সংকট দেখিয়েছে এই ওটিটি সিরিজগুলো। এআই জেনারেটেড/স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট ঘিরে চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলন দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। নিট পরীক্ষার অনিয়ম ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন শুধু সাধারণ কোনো ‘দাবি মানার’ আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকটের প্রতিচ্ছবি এটি। ইতিমধ্যে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন অনেক বলিউড তারকাও। দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার হিন্দি সিনেমায় শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এসব সিনেমা ব্যাপক জনপ্রিয়ও হয়েছে। এর মধ্যে থ্রি ইডিয়টস, ছিচ্চড়ে, টুয়েলভথ ফেইল, ইংরেজি মিডিয়ামের মতো সিনেমা রয়েছে।

তবে এই সিনেমাগুলোতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যতটা না প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে কলেজ জীবনের প্রেম, বন্ধুত্ব আর বড় হয়ে ওঠার গল্প। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার নেতিবাচক দিকগুলো পর্দায় অনেকাংশে আড়ালেই ছিল। কিন্তু ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট বুঝতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। কোনো অতিনাটকীয়তা বা শিক্ষাজীবনের মধুর স্মৃতি নয় বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনই হয়েছে এসব গল্পের কেন্দ্র।

তীব্র প্রতিযোগিতা, কোচিং সংস্কৃতি, ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক প্রত্যাশার মতো বিষয়গুলো কখনও শিক্ষার্থীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছে, কখনও শিক্ষকের, কখনও শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের। এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত সিরিজ নিঃসন্দেহে ‘কোটা ফ্যাক্টরি’। নেটফ্লিক্সের এই সিরিজ ভারতের কোচিং সংস্কৃতিকে ব্যাপক আলোচনায় নিয়ে আসে। গল্পের কেন্দ্র রাজস্থানের কোটা শহর। আইআইটিতে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী এখানে আসে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পেছনে থাকে অসীম চাপ, ভয় আর অনিশ্চয়তা।

সিরিজের প্রধান চরিত্র বৈভব পান্ডে এমনই একজন শিক্ষার্থী। পুরো সিরিজে তার দুশ্চিন্তা, ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থতার ভয় আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা হাজারো পরীক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। অন্যদিকে জিতু ভাইয়া হয়ে ওঠেন এমন একজন শিক্ষক, যাকে পাশে পেতে চায় প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থী। কঠোর প্রতিযোগিতার ভিড়ে তিনি হয়ে উঠেন শিক্ষার্থীদের আশা-ভরসার জায়গা। এ শহরটিকে অনেকেই একটি ‘ফ্যাক্টরি’র সঙ্গে তুলনা করেন। এখানে স্বপ্ন নয়, তৈরি হয় পরীক্ষার যন্ত্র। স্টেশনে নামার পর থেকেই শুরু হয় কোচিং, হোস্টেল আর ভর্তি করানোর প্রতিযোগিতা। চারদিকে শুধু বিজ্ঞাপন, ভালো র‌্যাঙ্কের প্রতিশ্রুতি। সফল হওয়ার নিশ্চয়তা। অথচ এই প্রতিযোগিতার ভেতরেই হারিয়ে যায় অনেক শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক জীবন।

‘কোটা ফ্যাক্টরি’। সংগৃহীত ছবি
‘কোটা ফ্যাক্টরি’। সংগৃহীত ছবি

কোটা শহরের বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা মিল পান ঢাকার ফার্মগেট এলাকার। এখানকার ভর্তি পরীক্ষার কোচিং সেন্টারগুলো যেভাবে আমাদের আশার আলো জাগিয়েছে, তেমনি অনেক হতাশারও সাক্ষী হয়েছে দিনের পর দিন।

কোটা ফ্যাক্টরিতে দেখান রাজস্থানের সেই কোটা শহরটি অনেকের কাছে সাফল্যের প্রতীক। আবার অনেকের স্মৃতিতে এই শহর বেঁচে আছে অবসাদ আর ব্যর্থতার শহর হিসেবে। সেই গল্পে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকেই চরম সিদ্ধান্ত নেন।

কোচিং হাবের কুনহাদি, রাজীব গান্ধী নগর, মহাবীর নগর, বিজ্ঞান নগর কিংবা জওহর নগরের মতো এলাকাগুলো শিক্ষার্থীতে ভরা। সেই কোচিং সেন্টারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সারি সারি হোস্টেল। সেখানকার নিয়মও বেশ কঠোর। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরতেই হবে। কেউ ফিরতে দেরি করলে খোঁজ শুরু হয়। কারণ সবাই জানে, এই শহরে মানসিক চাপ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, এই মানসিক চাপ শিক্ষার্থীকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে।

এই সিরিজে পুলিশ কর্মকর্তার ভাষায়, কোটা যেন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষার্থীরা এখানে ভবিষ্যৎ গড়তে আসে। কিন্তু সবাই সফল হয় না। তীব্র প্রতিযোগিতা, একাকিত্ব আর প্রচণ্ড হতাশা এখানে নামে শকুনের ছায়া হয়ে। জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে। স্বপ্ন ছোঁয়ার সেই ফ্যাক্টরিতে দুঃস্বপ্নও ছুঁয়ে ফেলে অনেক শিক্ষার্থী। কিন্তু তাতে কার কী? ভর্তি পরীক্ষায় ভালো না করলে তো জীবন বৃথা।

আজ যন্তর মন্তরের আন্দোলন সিরিজের সেই গল্পগুলোকে নতুন করে সত্যি প্রমাণ করছে। হয়তো একসময় আন্দোলন শেষ হবে। হয়তো রাজনৈতিক আলোচনাও অন্যদিকে মোড় নেবে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীরা তুলেছেন, সেগুলোই একসময় দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে পথ দেখাবে।

প্রাইম ভিডিও থেকে মুক্তি পাওয়া ‘লাখোঁ মে এক’ সিরিজও দর্শকমহলে বেশ জনপ্রিয়। এখানে প্রশ্ন তোলা হয়, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন আসলে কার? শিক্ষার্থীর, নাকি পরিবারের? সিরিজটি দেখিয়েছে, অনেক তরুণ নিজের ইচ্ছার চেয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতেই বেশি ব্যস্ত। সেই থেকে জন্ম নেয় মানসিক সংকট আর একাকিত্ব। বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের পরিচয়ও হারিয়ে ফেলেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষা কীভাবে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে তা দেখায় ‘ক্র্যাশ কোর্স’। এটি ২০২২ সালে প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পেয়েছিল। কোটা শহরের দুটি বড় কোচিং সেন্টারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখানে দেখানো হয়। শিক্ষা এখানে ব্যবসায়ের বড় মাধ্যম। ভালো র্যাংক পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ দেওয়া হয়। একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার লড়াইয়ে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এমনকি কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথে পা বাড়ায়।

শিক্ষার ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে একেবারেই ভিন্ন বার্তা দেয় ‘ফিজিক্স ওয়ালাহ’। ২০২২ সালে অ্যামাজন মিনিটিভিতে মুক্তি পাওয়া এই সিরিজটি শিক্ষাবিদ আলাখ পান্ডের জীবনের কাহিনি নিয়ে নির্মিত। আলাখ পান্ডে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন দেওয়া শুরু করেন। নামি কোচিং সেন্টারগুলো তাকে বিশাল টাকার প্রস্তাব দিয়ে থামাতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা দিতে অনড় থাকেন। ইউটিউব এবং অ্যাপের মাধ্যমে কোটি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে যান। ভালো শিক্ষা শুধু বিত্তবানদের একচ্ছত্র অধিকার হতে পারে না। এই সহজ বিশ্বাসই ছিল পুরো সিরিজের মূল চালিকাশক্তি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চিত্র তুলে ধরে ‘অপারেশন এমবিবিএস’। সংগৃহীত ছবি
চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চিত্র তুলে ধরে ‘অপারেশন এমবিবিএস’। সংগৃহীত ছবি

চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চিত্র তুলে ধরে ‘অপারেশন এমবিবিএস’। ২০২০ সালে ডিআইসিই মিডিয়াতে মুক্তি পায় প্রথম মরসুমটি। নিশান্ত, সাখশী আর হুমা নামের তিন বন্ধুর গল্প বলা হয়। তারা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন এক জগতের মুখোমুখি হয়। মেডিকেল জীবনের তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ ও পড়াশোনার চাপ তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করে। ডাক্তার হওয়ার গৌরবের পেছনে যে মানসিক অবসাদ আছে, তা এই সিরিজে দেখানো হয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়া মেয়েদের গল্প তুলে ধরে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং গার্লস’। জি৫-এর এই সিরিজটি ২০১৮ সালে প্রথম মুক্তি পেয়েছিল। মাগধা, সাবরু আর কিয়ারা নামের তিন বান্ধবীর গল্প এটি। তারা এই সিরিজে একটি ড্রামা প্রজেক্ট তৈরি করার চেষ্টা চালাতে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশে প্রতিদিন নানা ধরনের লিঙ্গবৈষম্যের মুখোমুখি হয় এই তিন বান্ধবী। হোস্টেলের কঠোর নিয়ম আর ক্লাসের পড়া সামলেও তারা স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায় না।

ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রস্তুতির গল্প বলেছে ‘অ্যাসপিরান্টস’। ২০২১ সালে টিভিএফের এই সিরিজটি মুক্তি পেয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ওল্ড রাজিন্দর নগরে থাকা অভিলক্ষ্য, গুরি ও ত্রিপাঠীর গল্প এটি। বছরের পর বছর অন্ধকার ঘরে বসে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যায়। জীবনের সেরা সময়গুলো তারা বাজি রাখে পরীক্ষার পেছনে। তবুও পরীক্ষা শেষে সফলতার কোনো নিশ্চিত নিশ্চয়তা কারো থাকে না। বছরের পর বছর পড়ার পর ব্যর্থ হলে কী হয়, তা-ই দেখানো হয়েছে এই সিরিজে। ব্যর্থতাকে সঙ্গী করে আবার বাঁচতে শেখার অনন্য গল্প এটি।

আজ যন্তর মন্তরের আন্দোলন সিরিজের সেই গল্পগুলোকে নতুন করে সত্যি প্রমাণ করছে। হয়তো একসময় আন্দোলন শেষ হবে। হয়তো রাজনৈতিক আলোচনাও অন্যদিকে মোড় নেবে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীরা তুলেছেন, সেগুলোই একসময় দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে পথ দেখাবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত