স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করা হোক অগ্রাধিকার

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ২৩: ৫৮
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনের প্রায় দু’জন স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে অক্ষম। সংখ্যায় বললে, প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। এটা ছোট পরিসংখ্যান নয়; একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল পাকিস্তান আমাদের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে।

সুখবর এটুকুই, পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। ২০১৭ সালে এই সংকটে ছিল দেশের ৬২.৮ শতাংশ মানুষ। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৩৮.৬ শতাংশে। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কারণে এটা সম্ভবপর হয়েছে। কিন্তু অগ্রগতিটি যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন একজন মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবারের খরচ ২০১৭ সালের ৩.০৯ থেকে দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ ডলারে। আয় বাড়লেও দামের এই ঊর্ধ্বগতি সুফল অনেকটাই খেয়ে ফেলছে। দুধ, মাছ, মাংস ও ফলের দাম এখনো সাধারণের নাগালের বাইরে। ভাত-আলুতে পেট ভরলেও শরীর কিন্তু পুষ্টি পায় না।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অনেক পুরোনো হলেও লক্ষ্যভেদে দুর্বল। প্রকৃত অভাবীর কাছে সহায়তা পৌঁছানোর আগেই তালিকায় নাম ওঠে প্রভাবশালীদের। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনার একটি অদ্ভুত বৈষম্য এ প্রতিবেদনেও ধরা পড়েছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে দ্রুত প্রতিফলিত হয়। কিন্তু দাম কমলে তার সুফল পৌঁছাতে সময় লাগে অনেক বেশি। এর অর্থ, মধ্যস্বত্বভোগী আর সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি সাধারণ ভোক্তা। বাজার তদারকির দুর্বলতা সংকটটিকে দীর্ঘায়িত করছে।

কৃষি উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতায় প্রচুর খাদ্য বিনষ্ট হয়। শাকসবজি, ফলের ক্ষেত্রে অপচয় ভয়াবহ। ঠিকমতো সংরক্ষণাগার আর হিমাগার না থাকায় কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না, ভোক্তাও সস্তায় কিনতে ব্যর্থ। লাভ তুলে নেয় তৃতীয় পক্ষ।

এমন সংকট থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ব্রাজিলের উদাহরণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ‘ফোমে জিরো’ বা ক্ষুধামুক্তি কর্মসূচি এবং পরবর্তীতে বলসা ফ্যামিলিয়া প্রকল্প দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরাসরি নগদ সহায়তা দিয়েছে। শর্ত ছিল সন্তানদের স্কুলে পাঠানো ও টিকা দেওয়ানো। এক দশকে ব্রাজিলে চরম দারিদ্র্য ও অপুষ্টি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল স্বচ্ছ তালিকাভুক্তি এবং সরাসরি নগদ হস্তান্তর, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কম থাকে।

রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। দেশটি কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিমা ও পুষ্টি কর্মসূচি একসঙ্গে চালু করে শিশু অপুষ্টির হার দ্রুত কমিয়ে এনেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পুষ্টি বার্তা পৌঁছানো সাফল্যের বড় কারণ। ভিয়েতনামের গল্পও আকর্ষণীয়। নব্বইয়ের দশকে কৃষি সংস্কার আর ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহ দিয়ে তারা খাদ্য উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়েছে। এতে দেশটি খাদ্য আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারকে পরিণত হয়। উৎপাদন বাড়ায় দামও থাকে নাগালে।

বাংলাদেশের জন্য পথ স্পষ্ট। প্রথমত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকাভুক্তি স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে অপচয় কমে ও কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়। তৃতীয়ত, বাজার তদারকি শক্তিশালী করে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, যাতে বিশ্ববাজারে দাম কমলে সুফল দ্রুত পৌঁছায়। চতুর্থত, পুষ্টি শিক্ষা প্রসারে বিনিয়োগ দরকার, যাতে সীমিত আয়েও পরিবার সুষম খাদ্য বেছে নিতে পারে।

স্বাস্থ্যকর খাবার বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিশুরা কতটা পুষ্টি পাচ্ছে, তার ওপর। সরকারের উচিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া। সংখ্যা কমলেও ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত থাকাটা মোটেও স্বস্তির নয়। সংকট মোকাবিলায় দ্রুতই দরকার সমন্বিত ও সাহসী পদক্ষেপ। বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ডসহ নতুন কিছু উদ্যোগও নিয়েছে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে। কর্মসংস্থান আর আয় বর্ধনের অঙ্গীকারও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিভোগের সামর্থ্য বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

Ad 300x250

সম্পর্কিত