জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কুব্রিকের সিনেমায় যুদ্ধদর্শন—‘আমরা মৃত্যু উৎপাদন করি’

আজ চলচ্চিত্রকার স্ট্যানলি কুব্রিকের মৃত্যুবার্ষিকী। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের এই উত্তাল সময়ে তাঁর সিনেমাগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধের পেছনের চরম অমানবিকতা ও ক্ষমতার দম্ভের গল্প। ‘পাথস অব গ্লোরি’ থেকে ‘ফুল মেটাল জ্যাকেট’—তাঁর চলচ্চিত্রে যুদ্ধের যে কদর্য রূপ ফুটে উঠেছে, বর্তমান বাস্তবতায় তা কতটা প্রাসঙ্গিক?

স্ট্যানলি কুব্রিক। এআই নির্মিত ছবি

আজকের পৃথিবীতে যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের দামামা বাজছে, তখন স্ট্যানলি কুব্রিকের সিনেমাগুলো আবার নতুন করে মনে পড়ে। কারণ কুব্রিক যুদ্ধকে শুধু বন্দুক, গোলাগুলি বা জয়ের গল্প হিসেবে দেখাননি। তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধের ভেতরের অমানবিকতা, ক্ষমতার দম্ভ আর অযৌক্তিকতার নির্মম উপাখ্যান।

স্ট্যানলি কুব্রিক কেন মহান পরিচালক— এর উত্তর শুধু তাঁর বানানো সিনেমার সংখ্যা দিয়ে বোঝা যাবে না। আসলে তাঁর সিনেমা তৈরির ধরনই তাঁকে আলাদা করেছে। কুব্রিক ছিলেন খুবই নিখুঁত কাজের মানুষ, অনেকেই তাঁকে ‘পারফেকশনিস্ট’ বলতেন। প্রায় পঞ্চাশ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি মাত্র ১৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। কিন্তু সংখ্যাটা কম হলেও তাঁর প্রতিটি সিনেমা আজও যেন চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে পাঠ্যবই। কুব্রিক কোনো নির্দিষ্ট জনরা বা ঘরানায় আটকে থাকেননি। হরর থেকে সায়েন্স ফিকশন, যুদ্ধ থেকে ইতিহাস কিংবা ব্ল্যাক কমেডি—যেখানেই হাত দিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে সেই ঘরানার ধারণাই বদলে দিয়েছেন।

১৯৯৯ সালের এই দিনেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন স্ট্যানলি কুব্রিক। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর দুটি বিখ্যাত যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র—‘পাথস অব গ্লোরি’ ও ‘ফুল মেটাল জ্যাকেট’-এর আলোকে বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে নতুন করে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে।

পাথস অব গ্লোরি

১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পাথস অব গ্লোরি’ ছিল কুব্রিকের প্রথম যুদ্ধবিরোধী মাস্টারপিস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমা আমাদের দেখায়, উচ্চপদস্থ জেনারেলদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অহংকার কীভাবে সাধারণ সৈন্যদের জীবনকে তুচ্ছ করে তোলে।

সিনেমার গল্পে দেখা যায়, জেনারেল মিরো তার পদোন্নতির লোভে একটি আত্মঘাতী হামলার নির্দেশ দেন। তিনি জানেন এই মিশনে অধিকাংশ সৈন্য মারা যাবে। তবুও তিনি পিছু হটেন না। যখন মিশন ব্যর্থ হয়, তখন তিনি নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে কাপুরুষতার অভিযোগে তিনজন নিরীহ সৈন্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

স্ট্যানলি কুব্রিক। সংগৃহীত ছবি
স্ট্যানলি কুব্রিক। সংগৃহীত ছবি

আজকের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের দিকে তাকালে কি আমরা সেই জেনারেল মিরোদের ছায়া দেখতে পাই? ক্ষমতার শীর্ষে বসে থাকা নেতারা যখন যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তখন তাঁরা কি রণাঙ্গনের সৈন্যদের কথা ভাবেন? নাকি তাঁদের মাথায় থাকে কেবল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ আর ক্ষমতার সমীকরণ?

কুব্রিক দেখিয়েছেন, যুদ্ধে সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বিপক্ষের সেনাবাহিনী হয় না। শত্রু হয় নিজের পক্ষের নীতিনির্ধারকদের অবিবেচনা। কর্নেল ড্যাক্সের চরিত্রে কার্ক ডগলাস যখন জেনারেলদের এই অমানবিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন, তখন তিনি আসলে বিবেকের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ব্রায়ান ম্যাকগিনিস নামের এক মার্কিন সেনাকে পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীরা একটি হলরুম থেকে জোর করে বের করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় ম্যাকগিনিস উচ্চস্বরে বলেন, ‘কেউ ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধ করতে চায় না।’ আজকের ম্যাকগিনিস যেন কুব্রিকের সিনেমার কর্নেল ড্যাক্স চরিত্রেরই প্রতিচ্ছবি।

ফুল মেটাল জ্যাকেট

১৯৮৭ সালে মুক্তি পায় ‘ফুল মেটাল জ্যাকেট’। ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই সিনেমায় কুব্রিক দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র একটি সাধারণ মানুষকে ‘কিলিং মেশিনে’ পরিণত করে। সিনেমার প্রথমার্ধে আমরা দেখি মেরিন কোরের বুট ক্যাম্প। সেখানে ড্রিল ইনস্ট্রাক্টর সার্জেন্ট হার্টম্যান নতুন রিক্রুটদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেন, যেন তাদের ভেতর থেকে সব মানবিক অনুভূতি, দয়া-মায়া মুছে যায়। তিনি বারবার বলেন, সৈন্যদের সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো তাদের রাইফেল।

এই নিষ্ঠুর প্রশিক্ষণের মধ্যে অনেকেই মানিয়ে নিতে পারে না। প্রাইভেট পাইল নামের এক তরুণ সৈন্য ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সে উন্মাদের মতো আচরণ করে, হার্টম্যানকে গুলি করে এবং পরে নিজেও আত্মহত্যা করে।

ফুল মেটাল জ্যাকেট সিনেমার একটি দৃশ্য।
ফুল মেটাল জ্যাকেট সিনেমার একটি দৃশ্য।

কুব্রিক এখানে প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধ জয়ের জন্য কি মানুষকে অমানুষ হতেই হয়? আজকের আধুনিক যুদ্ধেও কি আমরা ড্রোন অপারেটর বা মিসাইল লঞ্চারদের একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে দেখি না? তাঁরা যখন হাজার মাইল দূর থেকে বাটন টিপে মানুষ হত্যা করে, তখন কি তাঁদের মনে কোনো কম্পন জাগে?

সিনেমার দ্বিতীয় অংশে সৈন্যরা ভিয়েতনামে যুদ্ধক্ষেত্রে যায়। সেখানে তারা এক স্নাইপারের মুখোমুখি হয়। অনেক চেষ্টার পর তারা তাকে আহত করে। কাছে গিয়ে দেখে, সেই স্নাইপার কোনো ভয়ংকর যোদ্ধা নয়—একজন কিশোরী। মেয়েটি যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তাদের কাছে মৃত্যুর জন্য অনুরোধ করে। শেষ পর্যন্ত ‘জোকার’ নামের এক সৈন্য তাকে গুলি করে। এই দৃশ্যটি যুদ্ধের নির্মম সত্যকে সামনে আনে।

কুব্রিকের লেন্স এবং বর্তমান বাস্তবতা

আজ যখন মধ্যপ্রাচ্যে মিসাইল আর ড্রোনের লড়াই চলছে, তখন কুব্রিকের এই দুটি সিনেমা আমাদের থামতে বলে। ভাবতে শেখায়। পাথস অব গ্লোরি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়—এই যুদ্ধ কার স্বার্থে? ফুল মেটাল জ্যাকেট আমাদের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখাতে বাধ্য করে—আমরা কি মানুষ, নাকি কেবল আদেশের গোলাম?

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ব্রায়ান ম্যাকগিনিস নামের এক মার্কিন সেনাকে পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীরা একটি হলরুম থেকে জোর করে বের করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় ম্যাকগিনিস উচ্চস্বরে বলেন, ‘কেউ ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধ করতে চায় না।’ আজকের ম্যাকগিনিস যেন কুব্রিকের সিনেমার কর্নেল ড্যাক্স চরিত্রেরই প্রতিচ্ছবি।

কুব্রিক বিশ্বাস করতেন, সিনেমা শুধু বিনোদনের জন্য নয়; এটি সত্যকে খুঁজে দেখার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি যুদ্ধকে মহিমান্বিত করেননি। তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধের কদর্য রূপ। তিনি দেখিয়েছেন, যুদ্ধে কোনো পক্ষই আসলে জেতে না। সবাই কিছু না কিছু হারায়। কেউ হারায় প্রাণ, কেউ হারায় মানবিকতা।

কেন কুব্রিক মহান চলচ্চিত্রকার

কুব্রিকের মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে তাঁর কারিগরি ক্ষমতায় এবং আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গিতে। ‘২০০১: আ স্পেস ওডিসি’-তে তিনি এমন সব ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস ব্যবহার করেছিলেন, যা ১৯৬৮ সালের প্রযুক্তিতে ছিল অকল্পনীয়। ‘ব্যারি লিন্ডন’ সিনেমায় তিনি কৃত্রিম আলো বর্জন করে কেবল মোমবাতির আলোয় শুট করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, যার জন্য তাঁকে নাসার বিশেষ লেন্স ব্যবহার করতে হয়েছিল। তাঁর বিখ্যাত ‘ওয়ান-পয়েন্ট পারসপেক্টিভ’ বা সিমেট্রিক্যাল শট কম্পোজিশন দর্শকদের অবচেতনে এক অদ্ভুত সম্মোহন তৈরি করে, যা আজও চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের গবেষণার বিষয়।

তবে কেবল কারিগরি দক্ষতাই তাঁকে বড় করেনি। কুব্রিক বড় হয়েছেন তাঁর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য। তিনি মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য সিনেমা বানাতেন না, বানাতেন অস্বস্তিতে ফেলার জন্য। মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, ভায়োলেন্স বা সহিংসতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্বকে তিনি যেভাবে পর্দায় এনেছেন, তা অতুলনীয়।

কুব্রিক কখনো দর্শকের রুচি বা বাজারের চাহিদার সঙ্গে সহজে আপস করতেন না। একটি নিখুঁত শটের জন্য তিনি অভিনেতাদের দিয়ে শতবার ‘টেক’ নিতেন, যা অনেক সময় অভিনেতাদের মানসিক সীমার বাইরে চলে যেত। কিন্তু দিনশেষে পর্দায় যা ফুটে উঠত, তা হতো কালোত্তীর্ণ। মার্টিন স্করসেসি থেকে ক্রিস্টোফার নোলান—আজকের যুগের এমন কোনো বড় নির্মাতা নেই, যিনি কুব্রিকের কাছে ঋণী নন।

কুব্রিকের মৃত্যুবার্ষিকীতে এই বার্তাই হয়তো সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে আমরা হত্যা করার নিত্যনতুন উপায় আবিষ্কার করেছি। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা কি একটুও এগোতে পেরেছি? নাকি আমরা এখনো সেই আদিম হিংস্রতার চক্রেই বন্দি হয়ে আছি? কুব্রিক নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আমাদের এই প্রশ্নগুলো করেই যাবে। যতদিন পৃথিবীতে যুদ্ধ থাকবে, ততদিন কুব্রিকের সিনেমা প্রাসঙ্গিক থাকবে।

সম্পর্কিত