জন্মদিনে শ্রদ্ধা
মাহজাবিন নাফিসা

সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টিজগত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত তাঁর সিনেমার ভাষা, মানবিকতা বা গল্প বলার দক্ষতার কথাই আগে বলি। কিন্তু তাঁর কাজকে ভেতর থেকে বুঝতে চাইলে যে দিকটি আলাদা করে সামনে আসে, তা হলো—ভ্রমণ। তিনি ছিলেন এক গভীর কৌতূহলী, পর্যবেক্ষণকারী ও ভ্রমণকারী। সেই ভ্রমণ তাঁর গল্প, চরিত্র ও সিনেমার গঠনকে নির্ধারণ করেছে বারবার।
ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে সত্যজিতের। সেসব জায়গা কোনো না কোনোভাবে স্থান করে নিয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার আগে তাঁদের গড়পারের যে বাড়ি ছিল, সেই কথাই যেন উঠে এসেছে ফেলুদার বিখ্যাত লালমোহন বাবুর বাড়িতে। তাঁর গড়পারের বাড়িটিও তো দাদামশায়ের আমলের। আবার, ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’র সিনেমা ডিরেক্টর পুলক ঘোষাল ও তো ‘এক্স গড়পাড়!’
খুব অল্প বয়সে সোদপুরে গঙ্গার ধারে কিংবা গিরিডিতে কাটানো কিছু মুহূর্ত তাঁর মনে স্থায়ী হয়ে যায়। এই স্মৃতিগুলোই পরে ব্যক্তিগত পর্যায় ছাপিয়ে হয়ে গেছে প্রফেসর শঙ্কুর বাসস্থান। তাঁর বাড়ি ও আশপাশের সব বর্ণনা নিজের সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা। এভাবেই শৈশবের দেখা প্রকৃতি ও পরিবেশ সত্যজিতের গল্পের ভিত গড়ে দিয়েছে। তাঁর কাছে ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয় বরং সেই জায়গাকে নিজের ভেতরে ধারণ করা।
এই ধারণাটিই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর লোকেশন ব্যবহারে। সত্যজিতের সিনেমায় স্থান কখনোই শুধু পটভূমি নয় বরং নিজেই একটি চরিত্র হয়ে ওঠে। ‘পথের পাঁচালি’-তে গ্রামবাংলার যে নির্মোহ, জীবন্ত চিত্র আমরা দেখি, তা শুধুই সাহিত্যিক উৎস থেকে নেওয়া নয়। লোকেশন খুঁজতে গিয়ে তাঁর নিজের দেখা, নিজের শেখা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বোড়াল গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, তাকেই পর্দায় রূপ দিয়েছেন একেবারে জীবন্ত বাস্তবতায়।
এই জায়গা-নির্ভর সৃষ্টির সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ দেখা যায় ফেলুদা সিরিজে। সত্যজিতের একমাত্র পুত্র সন্দীপ রায়ের কথায়, ‘বাবা যেখানে যেখানে গিয়েছেন, ফেলুদাও সেখানে গিয়েছে।’ এই মন্তব্যটি নিছক কাকতালীয় নয়, রায়ের সৃষ্টিশীল পদ্ধতিরই ইঙ্গিত। লখনৌ, দার্জিলিং, রাজস্থান বা বেনারস—প্রতিটি জায়গা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা, আর সেই অভিজ্ঞতাই গল্পের শরীর তৈরি করেছে। তিনি ১৯৭০-এর দশকে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ ছবির জন্য লখনৌয়ে কাজ করেছেন। ‘সোনার কেল্লা’-তে রাজস্থানের মরুভূমি যেমন রহস্যের আবহ তৈরি করে, তেমনই লখনৌয়ের ভুলভুলাইয়া ছাড়া বাদশাহী আংটি কল্পনাই করা যায় না। এখানে স্থান কেবল প্রেক্ষাপট নয়, বরং রহস্যের চালিকাশক্তি।
একইভাবে ‘অপরাজিত’-র শুটিং করতে গিয়ে তিনি বেনারসের ঘাট বা সরু গলি চষে ফেলেছিলেন বলে লিখেছেন সন্দীপ রায়। এই অভিজ্ঞতাই পরে ফেলুদাকে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর বেনারসে নিয়ে ফেলেছে। তিনি গল্প ঠিক করে স্থান নয়, নতুন কোনো জায়গায় গেলে সেই জায়গাকে ঘিরে গল্প লিখতেন।
সত্যজিতের সিনেমাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর শুটিং করতে গিয়ে জয়সলমীরের যে কেল্লাকে তিনি ‘হাল্লা রাজার দুর্গ’ বানিয়েছিলেন, সেটিই পরে আবার অন্য গল্পে ‘সোনার কেল্লা’ হয়ে ফিরে আসে। একই লোকেশন, ভিন্ন কাহিনি—কিন্তু দু’ক্ষেত্রেই জায়গাটি গল্পের কেন্দ্রে। আবার সিমলার কুফরিতে তোলা বরফের দৃশ্য থেকেই তাঁর মাথায় ফেলুদার বাক্স রহস্য-এর ক্লাইম্যাক্সের সেই বরফ ঘেরা স্থান ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তি দেখায়, সত্যজিতের কাছে ভ্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা নয়, এটি একধরনের সঞ্চয়, যা তিনি বারবার ব্যবহার করেছেন।
কৈশোরে হাজারিবাগ ও রাজরাপ্পার জঙ্গল ভ্রমণ তাঁর মনে যে গভীর ছাপ ফেলেছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘অরণ্যের দিন-রাত্রি’-সহ বিভিন্ন লোকেশনে। এখানে জঙ্গল শুধু পরিবেশ নয়। মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব, একাকিত্ব ও আত্মসমীক্ষার জায়গা। একইভাবে পুরী ছিল তাদের ধরাবাঁধা বেড়ানোর জায়গা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয়—‘হত্যাপুরী’।
সত্যজিতের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল দার্জিলিং। এজন্যই তো ফেলুদাকে প্রথমেই দার্জিলিংয়ে যেতে হয়েছে। এছাড়াও সেখানেই পরে আরও একটি গল্প আছে। সিকিমের ওপর এক তথ্যচিত্র করার পরেই লেখেন ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’। ‘হীরক রাজার দেশে’র একটা দৃশ্য নিতে তিনি নেপাল গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনি লেখেন, ‘যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে’।
ছোটবেলায় অসংখ্যবার তিনি গিয়েছেন লখনৌতে। তাই ফেলুদাকেও ‘বাদশাহী আংটি’ নিয়ে যেতে হলো সেখানে। সত্যজিৎ ‘যখন ছোট ছিলাম’ বইয়ে লিখেছেন, ‘নবাবদের শহরের বড়া ইমামবাড়া, ছোটা ইমামবাড়া, ছত্তর মঞ্জিল, দিলখুশার বাগান—এসব যেন মনটাকে নিয়ে যেত আরব্যোপন্যাসের দেশে। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগত বড়া ইমামবাড়ার ভিতরের গোলকধাঁধা ভুলভুলাইয়া। রেসিডেন্সির ভগ্নস্তূপের দেয়ালে কামানের গোলার গর্তে সিপাহি বিদ্রোহের চেহারাটা যেন স্পষ্ট দেখতে পেতাম।’
আজীবন চোখের সামনে বাঘ দেখার ইচ্ছা তাঁর লেখাগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতি তাঁর টান ছিল অন্যরকম! ছিন্নমস্তার মন্দির, ডুয়ার্সের জঙ্গল বা অজন্তা ও ইলোরার গুহা—সত্যজিৎ বারবার নিজের ভ্রমণের জায়গাগুলোকে ঘিরেই তাঁর কাজ করেছেন।
বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব বা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি অনেকবার দেশের বাইরেও গিয়েছেন। ১৯৮২-তে চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে ম্যানিলা যাওয়ার পথে একদিন হংকংয়ে ছিলেন সত্যজিৎ। ফিরেই ফেলুদাকে দাঁড় করালেন সেখানে। নিজের প্রিয় শহর লন্ডনেও নিয়ে গিয়েছেন ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’কে।
সত্যজিতের শহরকেন্দ্রিক সিনেমা বা লেখায় ও কলকাতার নিজস্ব এক বর্ণনা আছে। কাহিনির প্রয়োজনে বর্ণনা নয়, বরং প্রতিবারই কলকাতা শহর যেন নিজেই একটি চরিত্র, তাঁকে ঘিরেই গড়ে ওঠে কাহিনি। প্রতিটি স্থানের আলাদা ঐতিহাসিক বিবরণ এমনভাবে দেন যেন চোখের সামনে ভেসে উঠে।
সত্যজিতের সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, তাঁর চরিত্রগুলো অনেক সময় জায়গা থেকেই জন্ম নেয়। তিনি আগে লোকেশনকে কল্পনা করতেন, তারপর সেখানে চরিত্র বসাতেন। তিনি আগে জায়গা মাথায় নিয়ে তাঁকে ঘিরে পরে চরিত্র সাজাতেন। তাঁর কাছে স্থান ও তাঁর গুরুত্বই ছিল প্রধান, চরিত্ররা আসতেন সহকারী হিসেবে। তাই তাঁর প্রতিটি রচনাই তাঁর ভ্রমণের কোনো একটি স্থানকে ঘিরে, চরিত্রকে ঘিরে নয়।
জীবনের শেষদিকে অসুস্থতার কারণে যখন তাঁকে স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়, তখন এই ভ্রমণ-নির্ভর সৃষ্টির প্রবাহে এক ধরনের বাধা পড়ে। বদ্ধ পরিবেশে শুটিং করা তাঁর খুবই অপছন্দের কাজ ছিল। তাঁর এই কথাই আমরা শুনি তার বানানো শেষ সিনেমা ‘আগন্তুক’-এর মনোমোহন মিত্রের মুখে। তিনি ভ্রমণের নেশায় ঘর ছেড়ে, স্বজন ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন পৃথিবীর পথে। বিদায় মুহূর্তে নাতিকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন কূপমন্ডূক না হতে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, জীবন থেকে চির বিদায় নেওয়ার আগে মনোমোহনের মুখ দিয়ে সত্যজিৎ স্বয়ং ভাবী প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।
সত্যজিৎ রায়ের ভ্রমণপ্রিয়তা কোনো ব্যক্তিগত শখ ছিল না, ছিল তাঁর সৃষ্টির ভিত্তি। তিনি জায়গাকে দেখতেন, বুঝতেন, আর সেই অভিজ্ঞতাকে গল্পে রূপ দিতেন। তাই তাঁর সিনেমা বা গল্প পড়া মানে শুধু কাহিনি জানা নয়—একটি জায়গাকে নতুন করে দেখা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর সৃষ্টিকে অনন্য করে তুলেছে, আর আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে তাঁর এক ভিন্ন, পরিচয়—একজন নির্মাতা হিসেবে নয়, বরং একজন ভ্রমণকারী হিসেবে, যিনি আজীবন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে ভ্রমণে উৎসাহী করতে চেয়েছেন।
তথ্যসূত্র: সত্যজিৎ রায়ের বই ‘যখন ছোট ছিলাম’, লখনৌতে দেওয়া সন্দীপ রায়ের বক্তৃতা, কলকাতাভিত্তিক ওয়েবজিন ‘কুলায় ফেরা’ ও টাইমস অব ইন্ডিয়া

সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টিজগত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত তাঁর সিনেমার ভাষা, মানবিকতা বা গল্প বলার দক্ষতার কথাই আগে বলি। কিন্তু তাঁর কাজকে ভেতর থেকে বুঝতে চাইলে যে দিকটি আলাদা করে সামনে আসে, তা হলো—ভ্রমণ। তিনি ছিলেন এক গভীর কৌতূহলী, পর্যবেক্ষণকারী ও ভ্রমণকারী। সেই ভ্রমণ তাঁর গল্প, চরিত্র ও সিনেমার গঠনকে নির্ধারণ করেছে বারবার।
ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে সত্যজিতের। সেসব জায়গা কোনো না কোনোভাবে স্থান করে নিয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার আগে তাঁদের গড়পারের যে বাড়ি ছিল, সেই কথাই যেন উঠে এসেছে ফেলুদার বিখ্যাত লালমোহন বাবুর বাড়িতে। তাঁর গড়পারের বাড়িটিও তো দাদামশায়ের আমলের। আবার, ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’র সিনেমা ডিরেক্টর পুলক ঘোষাল ও তো ‘এক্স গড়পাড়!’
খুব অল্প বয়সে সোদপুরে গঙ্গার ধারে কিংবা গিরিডিতে কাটানো কিছু মুহূর্ত তাঁর মনে স্থায়ী হয়ে যায়। এই স্মৃতিগুলোই পরে ব্যক্তিগত পর্যায় ছাপিয়ে হয়ে গেছে প্রফেসর শঙ্কুর বাসস্থান। তাঁর বাড়ি ও আশপাশের সব বর্ণনা নিজের সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা। এভাবেই শৈশবের দেখা প্রকৃতি ও পরিবেশ সত্যজিতের গল্পের ভিত গড়ে দিয়েছে। তাঁর কাছে ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয় বরং সেই জায়গাকে নিজের ভেতরে ধারণ করা।
এই ধারণাটিই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর লোকেশন ব্যবহারে। সত্যজিতের সিনেমায় স্থান কখনোই শুধু পটভূমি নয় বরং নিজেই একটি চরিত্র হয়ে ওঠে। ‘পথের পাঁচালি’-তে গ্রামবাংলার যে নির্মোহ, জীবন্ত চিত্র আমরা দেখি, তা শুধুই সাহিত্যিক উৎস থেকে নেওয়া নয়। লোকেশন খুঁজতে গিয়ে তাঁর নিজের দেখা, নিজের শেখা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বোড়াল গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, তাকেই পর্দায় রূপ দিয়েছেন একেবারে জীবন্ত বাস্তবতায়।
এই জায়গা-নির্ভর সৃষ্টির সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ দেখা যায় ফেলুদা সিরিজে। সত্যজিতের একমাত্র পুত্র সন্দীপ রায়ের কথায়, ‘বাবা যেখানে যেখানে গিয়েছেন, ফেলুদাও সেখানে গিয়েছে।’ এই মন্তব্যটি নিছক কাকতালীয় নয়, রায়ের সৃষ্টিশীল পদ্ধতিরই ইঙ্গিত। লখনৌ, দার্জিলিং, রাজস্থান বা বেনারস—প্রতিটি জায়গা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা, আর সেই অভিজ্ঞতাই গল্পের শরীর তৈরি করেছে। তিনি ১৯৭০-এর দশকে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ ছবির জন্য লখনৌয়ে কাজ করেছেন। ‘সোনার কেল্লা’-তে রাজস্থানের মরুভূমি যেমন রহস্যের আবহ তৈরি করে, তেমনই লখনৌয়ের ভুলভুলাইয়া ছাড়া বাদশাহী আংটি কল্পনাই করা যায় না। এখানে স্থান কেবল প্রেক্ষাপট নয়, বরং রহস্যের চালিকাশক্তি।
একইভাবে ‘অপরাজিত’-র শুটিং করতে গিয়ে তিনি বেনারসের ঘাট বা সরু গলি চষে ফেলেছিলেন বলে লিখেছেন সন্দীপ রায়। এই অভিজ্ঞতাই পরে ফেলুদাকে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর বেনারসে নিয়ে ফেলেছে। তিনি গল্প ঠিক করে স্থান নয়, নতুন কোনো জায়গায় গেলে সেই জায়গাকে ঘিরে গল্প লিখতেন।
সত্যজিতের সিনেমাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর শুটিং করতে গিয়ে জয়সলমীরের যে কেল্লাকে তিনি ‘হাল্লা রাজার দুর্গ’ বানিয়েছিলেন, সেটিই পরে আবার অন্য গল্পে ‘সোনার কেল্লা’ হয়ে ফিরে আসে। একই লোকেশন, ভিন্ন কাহিনি—কিন্তু দু’ক্ষেত্রেই জায়গাটি গল্পের কেন্দ্রে। আবার সিমলার কুফরিতে তোলা বরফের দৃশ্য থেকেই তাঁর মাথায় ফেলুদার বাক্স রহস্য-এর ক্লাইম্যাক্সের সেই বরফ ঘেরা স্থান ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তি দেখায়, সত্যজিতের কাছে ভ্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা নয়, এটি একধরনের সঞ্চয়, যা তিনি বারবার ব্যবহার করেছেন।
কৈশোরে হাজারিবাগ ও রাজরাপ্পার জঙ্গল ভ্রমণ তাঁর মনে যে গভীর ছাপ ফেলেছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘অরণ্যের দিন-রাত্রি’-সহ বিভিন্ন লোকেশনে। এখানে জঙ্গল শুধু পরিবেশ নয়। মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব, একাকিত্ব ও আত্মসমীক্ষার জায়গা। একইভাবে পুরী ছিল তাদের ধরাবাঁধা বেড়ানোর জায়গা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয়—‘হত্যাপুরী’।
সত্যজিতের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল দার্জিলিং। এজন্যই তো ফেলুদাকে প্রথমেই দার্জিলিংয়ে যেতে হয়েছে। এছাড়াও সেখানেই পরে আরও একটি গল্প আছে। সিকিমের ওপর এক তথ্যচিত্র করার পরেই লেখেন ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’। ‘হীরক রাজার দেশে’র একটা দৃশ্য নিতে তিনি নেপাল গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনি লেখেন, ‘যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে’।
ছোটবেলায় অসংখ্যবার তিনি গিয়েছেন লখনৌতে। তাই ফেলুদাকেও ‘বাদশাহী আংটি’ নিয়ে যেতে হলো সেখানে। সত্যজিৎ ‘যখন ছোট ছিলাম’ বইয়ে লিখেছেন, ‘নবাবদের শহরের বড়া ইমামবাড়া, ছোটা ইমামবাড়া, ছত্তর মঞ্জিল, দিলখুশার বাগান—এসব যেন মনটাকে নিয়ে যেত আরব্যোপন্যাসের দেশে। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগত বড়া ইমামবাড়ার ভিতরের গোলকধাঁধা ভুলভুলাইয়া। রেসিডেন্সির ভগ্নস্তূপের দেয়ালে কামানের গোলার গর্তে সিপাহি বিদ্রোহের চেহারাটা যেন স্পষ্ট দেখতে পেতাম।’
আজীবন চোখের সামনে বাঘ দেখার ইচ্ছা তাঁর লেখাগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতি তাঁর টান ছিল অন্যরকম! ছিন্নমস্তার মন্দির, ডুয়ার্সের জঙ্গল বা অজন্তা ও ইলোরার গুহা—সত্যজিৎ বারবার নিজের ভ্রমণের জায়গাগুলোকে ঘিরেই তাঁর কাজ করেছেন।
বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব বা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি অনেকবার দেশের বাইরেও গিয়েছেন। ১৯৮২-তে চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে ম্যানিলা যাওয়ার পথে একদিন হংকংয়ে ছিলেন সত্যজিৎ। ফিরেই ফেলুদাকে দাঁড় করালেন সেখানে। নিজের প্রিয় শহর লন্ডনেও নিয়ে গিয়েছেন ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’কে।
সত্যজিতের শহরকেন্দ্রিক সিনেমা বা লেখায় ও কলকাতার নিজস্ব এক বর্ণনা আছে। কাহিনির প্রয়োজনে বর্ণনা নয়, বরং প্রতিবারই কলকাতা শহর যেন নিজেই একটি চরিত্র, তাঁকে ঘিরেই গড়ে ওঠে কাহিনি। প্রতিটি স্থানের আলাদা ঐতিহাসিক বিবরণ এমনভাবে দেন যেন চোখের সামনে ভেসে উঠে।
সত্যজিতের সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, তাঁর চরিত্রগুলো অনেক সময় জায়গা থেকেই জন্ম নেয়। তিনি আগে লোকেশনকে কল্পনা করতেন, তারপর সেখানে চরিত্র বসাতেন। তিনি আগে জায়গা মাথায় নিয়ে তাঁকে ঘিরে পরে চরিত্র সাজাতেন। তাঁর কাছে স্থান ও তাঁর গুরুত্বই ছিল প্রধান, চরিত্ররা আসতেন সহকারী হিসেবে। তাই তাঁর প্রতিটি রচনাই তাঁর ভ্রমণের কোনো একটি স্থানকে ঘিরে, চরিত্রকে ঘিরে নয়।
জীবনের শেষদিকে অসুস্থতার কারণে যখন তাঁকে স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়, তখন এই ভ্রমণ-নির্ভর সৃষ্টির প্রবাহে এক ধরনের বাধা পড়ে। বদ্ধ পরিবেশে শুটিং করা তাঁর খুবই অপছন্দের কাজ ছিল। তাঁর এই কথাই আমরা শুনি তার বানানো শেষ সিনেমা ‘আগন্তুক’-এর মনোমোহন মিত্রের মুখে। তিনি ভ্রমণের নেশায় ঘর ছেড়ে, স্বজন ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন পৃথিবীর পথে। বিদায় মুহূর্তে নাতিকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন কূপমন্ডূক না হতে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, জীবন থেকে চির বিদায় নেওয়ার আগে মনোমোহনের মুখ দিয়ে সত্যজিৎ স্বয়ং ভাবী প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।
সত্যজিৎ রায়ের ভ্রমণপ্রিয়তা কোনো ব্যক্তিগত শখ ছিল না, ছিল তাঁর সৃষ্টির ভিত্তি। তিনি জায়গাকে দেখতেন, বুঝতেন, আর সেই অভিজ্ঞতাকে গল্পে রূপ দিতেন। তাই তাঁর সিনেমা বা গল্প পড়া মানে শুধু কাহিনি জানা নয়—একটি জায়গাকে নতুন করে দেখা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর সৃষ্টিকে অনন্য করে তুলেছে, আর আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে তাঁর এক ভিন্ন, পরিচয়—একজন নির্মাতা হিসেবে নয়, বরং একজন ভ্রমণকারী হিসেবে, যিনি আজীবন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে ভ্রমণে উৎসাহী করতে চেয়েছেন।
তথ্যসূত্র: সত্যজিৎ রায়ের বই ‘যখন ছোট ছিলাম’, লখনৌতে দেওয়া সন্দীপ রায়ের বক্তৃতা, কলকাতাভিত্তিক ওয়েবজিন ‘কুলায় ফেরা’ ও টাইমস অব ইন্ডিয়া

সম্পর্ক নিয়ে আমাদের সবারই অনেক স্বপ্ন থাকে। আমরা চাই ভালোবাসার মানুষটি আমাদের পাশে থাকুক। কিন্তু বাস্তবে কি সব সময় এমন হয়? দেখা যায়, সম্পর্কে গভীর ভালোবাসা থাকার পরও দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্বই ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভাঙন ধরায়।
১৫ ঘণ্টা আগে
ছুটির দিনগুলোতে টাকার চিন্তা যেন নতুন করে চাপ তৈরি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন।
২১ ঘণ্টা আগে
আঠারো শতকের শেষের দিকে শিল্পায়নের দ্রুত বিস্তারের ফলে শ্রমিকরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ, স্বল্প মজুরি ও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হতো। এর বিরুদ্ধে তারা ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা নিজের জন্য’—এই দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
১ দিন আগে
ঘুমানোর আগে অতীতের ভুল মনে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজেরই অংশ। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
২ দিন আগে