মে দিবসের পুনর্পাঠ: ইতিহাস থেকে বর্তমান শ্রম বাস্তবতা

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১৩: ৪৪
এআই জেনারেটেড ছবি

আঠারো শতকের শেষের দিকে শিল্পায়নের দ্রুত বিস্তারের ফলে শ্রমিকরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ, স্বল্প মজুরি ও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হতো। এর বিরুদ্ধে তারা ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা নিজের জন্য’—এই দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে লক্ষাধিক শ্রমিক ধর্মঘট করে। ৪ মে হে-মার্কেট স্কোয়ারের সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের গুলিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এরপর শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন ও বিতর্কিত বিচারে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এই ঘটনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলো ১ মে শ্রমিকদের অধিকার দিবস ঘোষণা করে; যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ‘মে দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই প্রেক্ষাপটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতির ইতিহাস।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পায়নের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকরা মানবিক কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকরা সংগঠিত হতে থাকে; যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।

মে দিবসের চেতনা ও পুনর্বিবেচনা

মে দিবস বর্তমান সমাজের অসাম্য, নীতি ও বাস্তবতাকে মূল্যায়নের একটি মানদণ্ড। শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্নে আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। অতীতে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলেই শ্রমিক অধিকার সম্পর্কে ধারনা প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে অনেক শ্রমিক আজও ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নটি সমাপ্ত অধ্যায় নয়; একটি চলমান প্রক্রিয়া।

আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার মানবসম্পদ বিভাগে কর্মরত আলাউদ্দিন মোহাইমিন প্রশ্ন তোলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক কর্মপরিবেশের দাবিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? আইনে অনেক কিছু থাকলেও সেগুলো অনেকক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন করা যায় না।

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি একটি শিল্পকারখানায় আইনি পরামর্শক হিসেবে চাকরি করছি। আমি মনে করি, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব স্তরে জবাবদিহি ও ন্যায্যতার চর্চা নিশ্চিত না করলে শ্রমিকের অধিকার কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না।’

প্রযুক্তির অগ্রগতি, নতুন শ্রম ও বাস্তবতা

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিস্তার শ্রমের কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মুক্তবাজারভিত্তিক কাজের ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও, শ্রমিকদের জীবনে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিও বেড়েছে। রাইড-শেয়ারিং, ফুড ডেলিভারি ও অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতে কর্মরতরা সাধারণত স্থায়ী কর্মচারী নন। ফলে তারা বেতন, পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও চাকরির নিরাপত্তার মতো সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। এতে আয় ও কর্মস্থলের স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদি জীবন পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে।

আশরাফুল আলম রাইড শেয়ারিং করেন। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পান্থপথ আসতে আসতে তাঁর সঙ্গে কথা হলো। আশরাফুল আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘সারা দিন রাস্তাঘাটে চলি, অনিরাপদ জীবনযাপন করি ভাই। কখন এক্সিডেন্ট হয়, বলতে পারি না। অথচ আমার কোনো বিমা নাই। এক পয়সা ভেভিংস নাই।’

এখন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় কাজের অনেক কিছুই অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়—কোন কাজ কে পাবে, কত পারিশ্রমিক পাবে এবং কাজের মূল্যায়ন কেমন হবে, তা প্রযুক্তিই নির্ধারণ করে। ফলে শ্রমিকদের ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয় এবং সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যায়।

আয়ের অনিশ্চয়তাও একটি বড় সমস্যা। কাজ প্রজেক্টভিত্তিক বা স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় আয় সবসময় পরিবর্তনশীল থাকে। এতে আর্থিক স্থিতিশীলতা তৈরি করা কঠিন হয়। অনেকেই বেশি আয়ের জন্য অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য হন, যা তাদের জীবন ও বিশ্রারের ভারসাম্য নষ্ট করে।

এসব খাতে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগও সীমিত। বিচ্ছিন্ন ও প্ল্যাটফর্মনির্ভর কাজের কারণে যৌথভাবে দাবি তোলা কঠিন হয়। প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়ন কাঠামোও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শ্রমিকরা প্রায় একা হয়ে পড়ে, এবং দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি ও মুক্তবাজার যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। তাই এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় শ্রমের ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত