জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যামিলি ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: বিটুইন মেমোরিজ অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর একটি অধ্যায়ের অনুবাদ। বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা স্ট্রিমের জন্য অনুবাদ করবেন জি এইচ হাবীব। এবার প্রকাশিত হলো তৃতীয় কিস্তি।
জি এইচ হাবীব

সম্ভবত এই আলাপের পরপরই আমাদের সেই চতুর প্রতিবেশী সে স্থান ত্যাগ করেছিলেন। তারপর, বাবা সম্ভবত আপনমনে বিড়বিড় করছিলেন, কে তাঁর কথা শুনতে পাবে, বা না পাবে সেটা না ভেবেই, ‘লোকটা নিজেই একটা ঠক, সে অন্যকে কী করে চোর বলে মনে করে? লোকটার সাহস আছে!’ আমার মনে আছে, এর মধ্যে মা এসে এই দৃশ্যে অবতীর্ণ হলেন। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি নিজের সাথে কথা বলছেন, নাকি আপনার ছেলের সাথে?’
স্পষ্ট বিরক্তির সঙ্গে বাবা জবাব দিলেন, ‘তা নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না!’ যদিও মা মোটেই বিরক্তির কোনো কারণ ঘটাননি। মা-ও পাল্টা জবাব দিতে দেরি করলেন না। বললেন, ‘আহা, আমাকে বলেন আপনি। অন্যের রাগ আমার ওপর ঝাড়বেন না।’ বাবা অবশেষে বলতে বাধ্য হলেন, ‘ওই যে, আমাদের সেই প্রতিবেশী, স্থানীয় পরিষদ সদস্য।’
তারপর বাবা নরম হয়ে, যা ঘটেছে তার সবিস্তার বর্ণনা করলেন। এবার মায়ের চোটপাটের পালা। আর তিনি কালবিলম্ব না করে মনের ক্ষোভ ঝাড়লেন, ‘আপনাকে আমি বহুবার বলেছি গাঁয়ের ওসব গায়েনদের বাসায় না ডাকতে, গানের জলসা না বসাতে। তাছাড়া, ওসব আসরে যারা আসে তাঁদের আপনি চেনেনও না। এখান থেকে ফেরার পর তাঁরা কে কী করে তা আপনি জানেন না। আমি বলে দিচ্ছি, এই লোকগুলো একসময় আপনাকে ডোবাবে। অবশ্য আমি এ-ও জানি যে লোকে তাঁদের বউদের কথা শোনে না। তবে যখন শোনে ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে যায়।’
বাবা নিজেকে বাঁচানোর জন্য সেই একই কথা বললেন, যা তিনি একটু আগে প্রতিবেশীকে বলেছিলেন; ‘আমার কাছে যারা আসে তাঁরা সবাই ভালো লোক। আল্লাহকে ভয় পায়।’ আমি জানি নানা বিষয়ে আমার মা-বাবার মতের মিল হতো না, এবং সেসবের মধ্যে ছিল কাছারি বাড়ি, গান-বাজনা, আর জিকির-করা দল। পরে সেদিন আমার চাচারাও সেই প্রভাবশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে বাবার গণ্ডগোলের ব্যাপার নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আমার কৈশোরে এই ঘটনাটি পরিবারে প্রায়ই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠত। আমি জানতাম বাবা সেই প্রতিবেশীর সঙ্গে মিশতেন না। এবং বার্ধক্যে পৌঁছেও তিনি মাঝে মধ্যে গান-বাদ্যের আসর বসাতেন। এটা সম্ভবত তাঁর মরমী ডিএনএ-র মধ্যেই দৃঢ়ভাব প্রোথিত ছিল। জীবনের গোটা সময়জুড়েই তিনি আধ্যাত্মিক বিষয়ে নানা কৌতূহলের পরিচয় রেখে গেছেন।
আমার মা ছিলেন ধার্মিক পরিবারের সন্তান। তাঁর পরিবারের লোকজন সহজ-সরল পথে আল্লাহর ইবাদত করতেন, ঠিক যেভাবে কঠোরভাবে শরিয়তে বলা আছে। তিনি সময়মত নামাজ পড়তেন, রমজানে রোজা রাখতেন এবং দান খয়রাত করতেন। তবে, বেড়ে ওঠার গোড়ার দিনগুলোতে তিনি কৃচ্ছ্রতাসাধন বা কঠোর তপস্যা, ভক্তিমূলক গান ও অন্তহীন ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। সত্যি বলতে, আমার নানা ছিলেন সুফিদের মতো দেখতে একজন শ্মশ্রুধারী মানুষ, কিন্তু মরমী ব্যাপার-স্যাপারে তিনি বিশ্বাস করতেন না। আমার জানা ছিল যে তাঁর একজন পীর ছিলেন, একজন আধ্যাত্মিক পথ নির্দেশক, মাঝে মাঝে তিনি তাঁর কাছে আসতেন।
আর অন্যদিকে, আমার বাবা ছিলেন দাঁড়ি-গোফ কামানো একজন মানুষ, যিনি প্রায়ই গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনায় নিমগ্ন থাকতেন। আধ্যাত্মিক লক্ষ্যে বা অভিপ্রায়ে গান-বাদ্য করা নানা পছন্দ করতেন না; সুফি ঘরানার লোকজন যদিও কাজটা প্রায়ই কর।ন, কিন্তু গোঁড়া মুসলমানেরা সেটা পছন্দ করেন না। আমার বাবা সুফিদের মাজারে যাতায়াত করতেন, যদিও আমার নানার সেটা পছন্দ ছিল না। তাঁর বিবেচনায় কাজটা ছিল মাজার পূজার শামিল, যা কিনা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা দুজন একই আধ্যাত্মিক পথের পথিক না হওয়া সত্বেও, শ্বশুরের প্রতি আমার বাবার অসম্ভব শ্রদ্ধা ছিল।
আমাদের বাড়িতে ধর্মীয় বইপত্রের ভালো সংগ্রহ ছিল, সেখানে বিভিন্ন হিন্দুশাস্ত্রেরও কিছু গ্রন্থ ছিল। নানা কিছু ইসলামী কিতাব পড়তে ভালবাসলেও, দার্শনিক উপদেশমূলক বইপত্রে তাঁর আগ্রহ ছিল না। তিনি মনে করতেন, ‘ইসলাম সরাসরি আল্লাহর কাছে যাওয়ার বা পৌঁছানোর কথা বলে। কোনো মধ্যস্থতাকারী, বা মধ্যপন্থার কথা বলে না।’ আমার মা একবার কথাচ্ছলে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, আমার নানার বিশ্বাসের বিপরীতে আমার বাবার বোঝাপড়া ছিল রুমি ও ফরিদ উদ্দীনের আত্তারের মরমীবাদ অব্দি বিস্তৃত, যা তিনি মাঝে মধ্যে রাজু চাচার সঙ্গে ভাগ ক’রে নিতেন; তবে, বিষয়টি আমার নানার বিশ্বাসের পরিপন্থী ছিল।
আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন ভাবতাম আমার বাবা আর কিছুটা হলেও আমার মা, রাজু চাচা, পারিবারিক মৌলভী সাহেব, কল্কিতে টান দেয়া দরবেশকুল, আর নানা, ঠিক কী নিয়ে আলাপ করছেন? আমি কি তার কোনো জবাব পাবো? হয়ত পাবো, কিন্তু খুব সম্ভবত পাবো না। আমি দেখলাম তাঁরা সবাই কেমন যেন বিভ্রান্ত, যদিও তার মাত্রাভেদ রয়েছে, অথবা আমি নিজেও তাই। আসলে দোষটা বোধহয় সেই কচি বয়েসে বিষয়টা সম্পর্কে আমার অজ্ঞতার। আত্মত্যাগ বা আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক শক্তির ধারণা ছিল তখনো আমার নাগালের বাইরে। আমি যখন নবম বা দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, একটু বুঝিয়ে বলবেন কেন আপনি বেশিরভাগ সময় এত আত্মমগ্ন থাকেন?’ মাঝে মাঝে তিনি কয়েক ঘণ্টা ধরে নামাজ পড়তেন, তবে শুয়ে বসে সময় কাটানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। তিনি খুব হাঁটতেন; মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারতেন তিনি, আমাকেও তাই করতে বলতেন: মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত ট্রেন বা নৌকা ভ্রমণ ছাড়া বেশির ভাগ সময় হেঁটে হেঁটেই তিনি বহু সুফি মাজারে যেতেন। সূর্য ওঠার আগেই বিছানা ছাড়তেন তিনি, বাইরে বারান্দায় গিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন, যাতে ভেতরে আমার মায়ের বা আমার ছোটো ভাই-বোনদের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। আমি বাইরে কাছারি ঘরে থাকতে শুরু করার পর থেকে আমার আরো খানিকটা স্বাধীনতা জোটে। অন্তত, মাঝে মাধ্যে মাঝ রাত অব্দি জেগে গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে পারতাম, যদিও আমার বাবা সেটা মোটেই পছন্দ করতেন না। তবে বাবা জানতেন আমি কী করছি। আমরা রাতে যে হারিকেনটা জ্বালিয়ে পড়তাম সেটার কেরোসিনের স্তর দেখেই তিনি আমার কর্মকাণ্ড বুঝতে পারতেন।
আমার মনে আছে, যখন আমি প্রথম বাবাকে তাঁদের আধ্যাত্মিক বিতর্ক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, তিনি আমার কথায় গুরুত্ব দেননি। তবে সম্ভবত কয়েক মাস পরে, যখন তিনি আগের চাইতে আরেকটু হালকা মেজাজে ছিলেন, তখন আমি ফের কথাটা পাড়ি। কিন্তু আমার বাবা দপ করে জ্বলে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওসব ঐশী ব্যাপারে তুমি কেন মাথা ঘামাচ্ছো? তুমি তো ঠিক মতো নামাজই পড়ো না; মৌলভী সাহেব আসেন, যান, কিন্তু তুমি কিছু শেখার ব্যাপারে কোনো গা করো না!’ আমার বাবার কথায় যুক্তি ছিল, তবে আমি তাঁকে উত্তেজিত করতে চাইনি। ‘আমার ভুল হয়েছে, আমি মৌলভী স্যারের কাছে আরো কিছু জিনিস শিখে তারপর আবার নামাজ পড়া শুরু করবো,’ এই বলে আমি আমি আমার বাবার সামনে থেকে চলে এলাম। পেছন থেকে বাবা বলে উঠলেন, ‘কথাটা তোমার মনে থাকবে আশা করি।’
আমার মনে আছে, নবম বা দশম শ্রেণি থেকে আমি নিয়মিত নামাজ পড়তে শুরু করি। তারপর একদিন, অবিশ্বাসের দ্বারপ্রান্তে থাকা আমার এক সহপাঠী আমাকে বিদ্রুপ করে। ঐশ্বরিক বিষয়াদি নিয়ে শহীদের সঙ্গে আমার কথাবার্তা আমাকে আমার বাবা, রাজু চাচা, আমার মা এবং অল্প যে ক’জনের সঙ্গে আমার পারিবারিক আলাপ ছিল, তার সব কিছু থেকে বাইরে নিয়ে গেল। আমার মনে হয়, আমার বন্ধুটির সঙ্গে আমি যখন আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গে আলাপ করতাম তখন আমার মনের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। একদিন শহীদ দুম করে বলে বসে, ‘রশীদ, তুই কি এজন্য নামাজ পড়ছিস যে দুদিন পরেই পরীক্ষা? আমার মা বলেন পরীক্ষায় ভালো করতে চাইলে আমার নামাজ-কালাম পড়া দরকার। তুই কি একথা বিশ্বাস করিস?’
আমার সহপাঠীর কথা শুনে আমার তো আক্কেল গুড়ুম। আমার মা প্রতিনিয়ত আমাকে নামাজ পড়তে বলতেন, সেই সঙ্গে এ-ও বলতেন যেন আমি পরীক্ষায় ভালো ফল-লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি। কিন্তু আমি ভাবতাম, আমি নিজে যদি খুব ভালোভাবে চেষ্টা না করি তাহলে আল্লাহ কীভাবে আমাকে সাহায্য করবেন? আমার এই বন্ধুটি ক্লাসে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কাজেই, আমাকে সে যা বলত এবং তার জবাবে আমি যা বলতাম, সে ব্যাপারে আমি খুব সতর্ক থাকতাম। তাই আমি একটু চালাকি করে উত্তর দিলাম, ‘আসলে বাবার জন্য। তুই তো তো তাঁকে জানিস। তিনি চান আমি নিয়মিত নামাজ পড়ি। আমাকে তাঁর কথা শুনতে হয়।’ আবছাভাবে মনে পড়ে, আমার কথা শুনে শহীদ নিজের বাহাদুরি দেখাতে দেরি করেনি। সে বলে ওঠে, ‘আমার বাবাও একই কাজ করেন। কিন্তু আমি তাঁকে বলে দিয়েছি আমি আসলে অজ্ঞেয়বাদী!’

সম্ভবত এই আলাপের পরপরই আমাদের সেই চতুর প্রতিবেশী সে স্থান ত্যাগ করেছিলেন। তারপর, বাবা সম্ভবত আপনমনে বিড়বিড় করছিলেন, কে তাঁর কথা শুনতে পাবে, বা না পাবে সেটা না ভেবেই, ‘লোকটা নিজেই একটা ঠক, সে অন্যকে কী করে চোর বলে মনে করে? লোকটার সাহস আছে!’ আমার মনে আছে, এর মধ্যে মা এসে এই দৃশ্যে অবতীর্ণ হলেন। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি নিজের সাথে কথা বলছেন, নাকি আপনার ছেলের সাথে?’
স্পষ্ট বিরক্তির সঙ্গে বাবা জবাব দিলেন, ‘তা নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না!’ যদিও মা মোটেই বিরক্তির কোনো কারণ ঘটাননি। মা-ও পাল্টা জবাব দিতে দেরি করলেন না। বললেন, ‘আহা, আমাকে বলেন আপনি। অন্যের রাগ আমার ওপর ঝাড়বেন না।’ বাবা অবশেষে বলতে বাধ্য হলেন, ‘ওই যে, আমাদের সেই প্রতিবেশী, স্থানীয় পরিষদ সদস্য।’
তারপর বাবা নরম হয়ে, যা ঘটেছে তার সবিস্তার বর্ণনা করলেন। এবার মায়ের চোটপাটের পালা। আর তিনি কালবিলম্ব না করে মনের ক্ষোভ ঝাড়লেন, ‘আপনাকে আমি বহুবার বলেছি গাঁয়ের ওসব গায়েনদের বাসায় না ডাকতে, গানের জলসা না বসাতে। তাছাড়া, ওসব আসরে যারা আসে তাঁদের আপনি চেনেনও না। এখান থেকে ফেরার পর তাঁরা কে কী করে তা আপনি জানেন না। আমি বলে দিচ্ছি, এই লোকগুলো একসময় আপনাকে ডোবাবে। অবশ্য আমি এ-ও জানি যে লোকে তাঁদের বউদের কথা শোনে না। তবে যখন শোনে ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে যায়।’
বাবা নিজেকে বাঁচানোর জন্য সেই একই কথা বললেন, যা তিনি একটু আগে প্রতিবেশীকে বলেছিলেন; ‘আমার কাছে যারা আসে তাঁরা সবাই ভালো লোক। আল্লাহকে ভয় পায়।’ আমি জানি নানা বিষয়ে আমার মা-বাবার মতের মিল হতো না, এবং সেসবের মধ্যে ছিল কাছারি বাড়ি, গান-বাজনা, আর জিকির-করা দল। পরে সেদিন আমার চাচারাও সেই প্রভাবশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে বাবার গণ্ডগোলের ব্যাপার নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আমার কৈশোরে এই ঘটনাটি পরিবারে প্রায়ই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠত। আমি জানতাম বাবা সেই প্রতিবেশীর সঙ্গে মিশতেন না। এবং বার্ধক্যে পৌঁছেও তিনি মাঝে মধ্যে গান-বাদ্যের আসর বসাতেন। এটা সম্ভবত তাঁর মরমী ডিএনএ-র মধ্যেই দৃঢ়ভাব প্রোথিত ছিল। জীবনের গোটা সময়জুড়েই তিনি আধ্যাত্মিক বিষয়ে নানা কৌতূহলের পরিচয় রেখে গেছেন।
আমার মা ছিলেন ধার্মিক পরিবারের সন্তান। তাঁর পরিবারের লোকজন সহজ-সরল পথে আল্লাহর ইবাদত করতেন, ঠিক যেভাবে কঠোরভাবে শরিয়তে বলা আছে। তিনি সময়মত নামাজ পড়তেন, রমজানে রোজা রাখতেন এবং দান খয়রাত করতেন। তবে, বেড়ে ওঠার গোড়ার দিনগুলোতে তিনি কৃচ্ছ্রতাসাধন বা কঠোর তপস্যা, ভক্তিমূলক গান ও অন্তহীন ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। সত্যি বলতে, আমার নানা ছিলেন সুফিদের মতো দেখতে একজন শ্মশ্রুধারী মানুষ, কিন্তু মরমী ব্যাপার-স্যাপারে তিনি বিশ্বাস করতেন না। আমার জানা ছিল যে তাঁর একজন পীর ছিলেন, একজন আধ্যাত্মিক পথ নির্দেশক, মাঝে মাঝে তিনি তাঁর কাছে আসতেন।
আর অন্যদিকে, আমার বাবা ছিলেন দাঁড়ি-গোফ কামানো একজন মানুষ, যিনি প্রায়ই গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনায় নিমগ্ন থাকতেন। আধ্যাত্মিক লক্ষ্যে বা অভিপ্রায়ে গান-বাদ্য করা নানা পছন্দ করতেন না; সুফি ঘরানার লোকজন যদিও কাজটা প্রায়ই কর।ন, কিন্তু গোঁড়া মুসলমানেরা সেটা পছন্দ করেন না। আমার বাবা সুফিদের মাজারে যাতায়াত করতেন, যদিও আমার নানার সেটা পছন্দ ছিল না। তাঁর বিবেচনায় কাজটা ছিল মাজার পূজার শামিল, যা কিনা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা দুজন একই আধ্যাত্মিক পথের পথিক না হওয়া সত্বেও, শ্বশুরের প্রতি আমার বাবার অসম্ভব শ্রদ্ধা ছিল।
আমাদের বাড়িতে ধর্মীয় বইপত্রের ভালো সংগ্রহ ছিল, সেখানে বিভিন্ন হিন্দুশাস্ত্রেরও কিছু গ্রন্থ ছিল। নানা কিছু ইসলামী কিতাব পড়তে ভালবাসলেও, দার্শনিক উপদেশমূলক বইপত্রে তাঁর আগ্রহ ছিল না। তিনি মনে করতেন, ‘ইসলাম সরাসরি আল্লাহর কাছে যাওয়ার বা পৌঁছানোর কথা বলে। কোনো মধ্যস্থতাকারী, বা মধ্যপন্থার কথা বলে না।’ আমার মা একবার কথাচ্ছলে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, আমার নানার বিশ্বাসের বিপরীতে আমার বাবার বোঝাপড়া ছিল রুমি ও ফরিদ উদ্দীনের আত্তারের মরমীবাদ অব্দি বিস্তৃত, যা তিনি মাঝে মধ্যে রাজু চাচার সঙ্গে ভাগ ক’রে নিতেন; তবে, বিষয়টি আমার নানার বিশ্বাসের পরিপন্থী ছিল।
আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন ভাবতাম আমার বাবা আর কিছুটা হলেও আমার মা, রাজু চাচা, পারিবারিক মৌলভী সাহেব, কল্কিতে টান দেয়া দরবেশকুল, আর নানা, ঠিক কী নিয়ে আলাপ করছেন? আমি কি তার কোনো জবাব পাবো? হয়ত পাবো, কিন্তু খুব সম্ভবত পাবো না। আমি দেখলাম তাঁরা সবাই কেমন যেন বিভ্রান্ত, যদিও তার মাত্রাভেদ রয়েছে, অথবা আমি নিজেও তাই। আসলে দোষটা বোধহয় সেই কচি বয়েসে বিষয়টা সম্পর্কে আমার অজ্ঞতার। আত্মত্যাগ বা আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক শক্তির ধারণা ছিল তখনো আমার নাগালের বাইরে। আমি যখন নবম বা দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, একটু বুঝিয়ে বলবেন কেন আপনি বেশিরভাগ সময় এত আত্মমগ্ন থাকেন?’ মাঝে মাঝে তিনি কয়েক ঘণ্টা ধরে নামাজ পড়তেন, তবে শুয়ে বসে সময় কাটানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। তিনি খুব হাঁটতেন; মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারতেন তিনি, আমাকেও তাই করতে বলতেন: মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত ট্রেন বা নৌকা ভ্রমণ ছাড়া বেশির ভাগ সময় হেঁটে হেঁটেই তিনি বহু সুফি মাজারে যেতেন। সূর্য ওঠার আগেই বিছানা ছাড়তেন তিনি, বাইরে বারান্দায় গিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন, যাতে ভেতরে আমার মায়ের বা আমার ছোটো ভাই-বোনদের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। আমি বাইরে কাছারি ঘরে থাকতে শুরু করার পর থেকে আমার আরো খানিকটা স্বাধীনতা জোটে। অন্তত, মাঝে মাধ্যে মাঝ রাত অব্দি জেগে গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে পারতাম, যদিও আমার বাবা সেটা মোটেই পছন্দ করতেন না। তবে বাবা জানতেন আমি কী করছি। আমরা রাতে যে হারিকেনটা জ্বালিয়ে পড়তাম সেটার কেরোসিনের স্তর দেখেই তিনি আমার কর্মকাণ্ড বুঝতে পারতেন।
আমার মনে আছে, যখন আমি প্রথম বাবাকে তাঁদের আধ্যাত্মিক বিতর্ক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, তিনি আমার কথায় গুরুত্ব দেননি। তবে সম্ভবত কয়েক মাস পরে, যখন তিনি আগের চাইতে আরেকটু হালকা মেজাজে ছিলেন, তখন আমি ফের কথাটা পাড়ি। কিন্তু আমার বাবা দপ করে জ্বলে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওসব ঐশী ব্যাপারে তুমি কেন মাথা ঘামাচ্ছো? তুমি তো ঠিক মতো নামাজই পড়ো না; মৌলভী সাহেব আসেন, যান, কিন্তু তুমি কিছু শেখার ব্যাপারে কোনো গা করো না!’ আমার বাবার কথায় যুক্তি ছিল, তবে আমি তাঁকে উত্তেজিত করতে চাইনি। ‘আমার ভুল হয়েছে, আমি মৌলভী স্যারের কাছে আরো কিছু জিনিস শিখে তারপর আবার নামাজ পড়া শুরু করবো,’ এই বলে আমি আমি আমার বাবার সামনে থেকে চলে এলাম। পেছন থেকে বাবা বলে উঠলেন, ‘কথাটা তোমার মনে থাকবে আশা করি।’
আমার মনে আছে, নবম বা দশম শ্রেণি থেকে আমি নিয়মিত নামাজ পড়তে শুরু করি। তারপর একদিন, অবিশ্বাসের দ্বারপ্রান্তে থাকা আমার এক সহপাঠী আমাকে বিদ্রুপ করে। ঐশ্বরিক বিষয়াদি নিয়ে শহীদের সঙ্গে আমার কথাবার্তা আমাকে আমার বাবা, রাজু চাচা, আমার মা এবং অল্প যে ক’জনের সঙ্গে আমার পারিবারিক আলাপ ছিল, তার সব কিছু থেকে বাইরে নিয়ে গেল। আমার মনে হয়, আমার বন্ধুটির সঙ্গে আমি যখন আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গে আলাপ করতাম তখন আমার মনের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। একদিন শহীদ দুম করে বলে বসে, ‘রশীদ, তুই কি এজন্য নামাজ পড়ছিস যে দুদিন পরেই পরীক্ষা? আমার মা বলেন পরীক্ষায় ভালো করতে চাইলে আমার নামাজ-কালাম পড়া দরকার। তুই কি একথা বিশ্বাস করিস?’
আমার সহপাঠীর কথা শুনে আমার তো আক্কেল গুড়ুম। আমার মা প্রতিনিয়ত আমাকে নামাজ পড়তে বলতেন, সেই সঙ্গে এ-ও বলতেন যেন আমি পরীক্ষায় ভালো ফল-লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি। কিন্তু আমি ভাবতাম, আমি নিজে যদি খুব ভালোভাবে চেষ্টা না করি তাহলে আল্লাহ কীভাবে আমাকে সাহায্য করবেন? আমার এই বন্ধুটি ক্লাসে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কাজেই, আমাকে সে যা বলত এবং তার জবাবে আমি যা বলতাম, সে ব্যাপারে আমি খুব সতর্ক থাকতাম। তাই আমি একটু চালাকি করে উত্তর দিলাম, ‘আসলে বাবার জন্য। তুই তো তো তাঁকে জানিস। তিনি চান আমি নিয়মিত নামাজ পড়ি। আমাকে তাঁর কথা শুনতে হয়।’ আবছাভাবে মনে পড়ে, আমার কথা শুনে শহীদ নিজের বাহাদুরি দেখাতে দেরি করেনি। সে বলে ওঠে, ‘আমার বাবাও একই কাজ করেন। কিন্তু আমি তাঁকে বলে দিয়েছি আমি আসলে অজ্ঞেয়বাদী!’

আজ ১৯ জুন, ‘ওয়ার্ল্ড স্যান্টারিং ডে’ বা ‘বিশ্ব ধীরে হাঁটা দিবস’। ‘স্যান্টারিং’ শব্দের অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের তাড়া না রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে চারপাশটা দু’চোখ ভরে দেখতে দেখতে হেঁটে বেড়ানো। ১৯৭৯ সালে ডব্লিউ টি র্যাবে মানুষের ব্যস্ততা ও ক্যালোরি পোড়ানোর ফিটনেস-আসক্তির প্রতিবাদে এই
৫ ঘণ্টা আগে
আজ ১৮ জুন আন্তর্জাতিক প্যানিক দিবস। এটি জাতিসংঘ স্বীকৃত কোনো দিবস নয়। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগ। প্যানিক অ্যাটাক, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সম্পর্কে মানুষকে জানানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
১ দিন আগে
টিকটিক! টিকটিক! জয় হোক শক্তিশালী প্রাণের, সাহসী মানুষের! যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করে সত্য, ন্যায়বিচার আর সৌন্দর্যের জন্য!
১ দিন আগে
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর তথ্যমতে, বর্তমান বিশ্বে মাথাপিছু হিসাবে বাঙালি পৃথিবীর এক নম্বর ভাতখেকো জাতি। এখন ভাবুন তো, প্রতিদিনের সেই পরিচিত ভাত-মাছের স্বাদ যদি একদম নতুন কোনো রূপে আপনার পাতে আসে? নিশ্চয়ই মন্দ লাগবে না! বোধহয় এই কারণেই জাপানি খাবার ‘সুশি’ খুব অল্প সময়েই আমাদের অনেকের পছন্দের তালিকায় জ
১ দিন আগে