জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

‘নীড় সন্ধানী’ আনোয়ার পাশা

এআই জেনারেটেড ছবি

আনোয়ার পাশার (১৯২৮-৭১) ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ (১৯৭৩ প্রকাশকাল) উপন্যাস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন চিত্রের এক অনন্য দলিল। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর যে-নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনি, এর নজির পাওয়া যায় এই উপন্যাসে।

আনোয়ার পাশা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়ে এই উপন্যাস রচনা করেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে নিজেও এই হত্যাযজ্ঞের নির্মম শিকার হন। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া তার ভাগ্যে জোটেনি। যেমন নীড় জোটেনি তার ‘নীড় সন্ধানী’ (১৯৬৮) উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রবিউল হাসান চৌধুরীর ক্ষেত্রে।

আনোয়ার পাশার এই উপন্যাসটি দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের পশ্চিমবঙ্গকে বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক পাঠের ক্ষেত্রে ‘নীড় সন্ধানী’ উপন্যাসের বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িকতার চিত্র তুলে ধরে আনোয়ার পাশা রচনা করেন ‘নীড় সন্ধানী’ (১৯৬৮) উপন্যাস। ১৯৪৭ সালের পর ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের যে-সকল মুসলমান পাকিস্তানে যায়নি, ভারতে তাদের পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা নিয়েই এই উপন্যাস। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রবিউল হাসান চৌধুরী ওরফে হাসানকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে আখ্যান।

১৯৫১ সালে পাকিস্তানের রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ পাশ করে হাসান পুনরায় ভারতে ফিরে এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ ক্লাশে ভর্তি হয়। ভারতে ফিরে আসার কারণ হিসেবে তার মনে হয়েছিল, ‘...এটা কাপুরুষতা। অতগুলো মুসলমান ওখানে [পশ্চিমবঙ্গে] পড়ে রইল, আর আমি কেবল নিজের প্রাণটি নিয়ে পালিয়ে বাঁচলাম…এটা অতি নিষ্ঠুর রকমের স্বার্থপরতাও বটে।’

জয়া চ্যাটার্জীর তথ্যমতে, দেশভাগের পর ‘পশ্চিমবঙ্গে ৫০ লাখের বেশি মুসলিম থেকে যায়। এ সংখ্যা ছিল নতুন প্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং নতুন ভারতের সব মুসলিমের মধ্যে শতকরা ১৫ ভাগ।’

হাসানের পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত সুখকর হয়নি। নবগঠিত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক সংকট হাসানের জীবনে চরম পরিণতি টেনে আনে। তার মায়ের আগ্রহ ছিল পাকিস্তানে যাওয়ার—‘কবে হিন্দুরা আমাদের বেইজ্জতীর একশেষ করে দেবে বাবা! তার চেয়ে সম্পত্তি বিনিময় করে চল আমরা ওদেশে চলে যাই।’ হাসান তাতে সায় দেয়নি। মুর্শিদাবাদের পৈতৃক ভিটায় সে ফিরে আসে। পৈতৃক ভিটায় ফিরে আসার এই বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত থাকে আত্মপরিচয়। ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে যে-সকল বিষয় মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, স্থায়ী ঠিকানা তার মধ্যে অন্যতম—যা নির্ধারণের মাপকাঠি হলো পৈতৃক ভিটা। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে এই স্থায়ী ঠিকানা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয় অগণিত মানুষ। যাদের মধ্যে মুসলমানেরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে চলে আসে এবং হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। এই ‘আসা-যাওয়ার মাঝে’ ভিটেমাটি যারা ছাড়ে না, পরবর্তী পর্যায়ে তারা যে-ধরনের ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়, তারই অন্যতম বয়ান হলো ‘নীড় সন্ধানী’ উপন্যাস।

আনোয়ার পাশা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ অঞ্চলকে এই আখ্যানের স্থান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আনোয়ার পাশার নীড়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, এই মুর্শিদাবাদ তাঁর নিজেরও জন্মভূমি। অতঃপর তিনি রাজশাহী কলেজে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক কোর্সে ভর্তি হন। পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৫১ সালে পুনরায় পশ্চিমবঙ্গে ফিরে গিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিনি ১৯৫৮ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। তারপর ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাধীনতা বিরোধীরা তাঁকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায় এবং মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছে হত্যা করে।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হাসানের মধ্যে রাজশাহী কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত যে চিত্র লক্ষ করা যায়, তা আনোয়ার পাশার স্মৃতি থেকে ঊৎসারিত। ফলে এটিকে ঔপন্যাসিকের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বয়ান হিসেবে ধরা যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে এম এ ভর্তি হওয়ার পর নিজ গ্রামে একটি বাড়ি বানানো শুরু করে হাসান। এই বাড়ির প্রসঙ্গ ধরেই উপন্যাসের সূত্রপাত। উপন্যাসে দেখা যায়, ‘১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট তারিখে এই বাড়িতে যে তালা পড়েছে, আজ একমাস পরেও কেউ তা খুলতে আসেনি।’ তখন প্রশ্ন জাগে, বাড়ি আসলে কী? খুব সহজভাবে বলা যায়, বাড়ি হলো একধরনের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। উপন্যাসে বাড়িটি তালাবদ্ধ হওয়ার ঘটনাই উপন্যাসে ফ্লাশব্যাকে তুলে ধরা হয়েছে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কারমাইকেল হোস্টেলের সিট পাওয়া নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার মুখোমুখি হয় হাসান। মুসলমান হওয়ার কারণে তাকে নিয়ে ক্লাসের সহপাঠীরা মন্তব্য করে—‘... আমাদের ক্লাশে আবার মুসলমান ঢুকেছে নাকি!’ এরকম মন্তব্য হাসানের মনে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। দেশভাগের পর মুসলমানেরা ভারত ছেড়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রে তার আবাস ও পরিচয় গড়ে তুলবে, সেক্ষেত্রে ভারত হবে শুধু হিন্দুদের রাষ্ট্র—এরকম ভাবনা থেকেই ছাত্রটি বলেছে, ‘আবার মুসলমান ঢুকেছে’। যে হিন্দু ছাত্রটি এই মন্তব্যটি করেছে, সাতচল্লিশের দেশভাগের রাজনীতির সঙ্গে সে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু মনে মনে বিভাজনের রাজনীতি পোষণ করে; যা বিভক্ত জাতীয় চেতনার একটি রূপ।

এই উক্তির মাধ্যমে দেশভাগের পরে ভারতে মুসলমানের সংকট বোঝা যায়। সেক্ষেত্রে যে সব মুসলমান তাদের পৈতৃক ভিটামাটি ও জন্মভূমি ভারতে এবং তা ছেড়ে যায়নি, তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রসংখ্যা কমে যাওয়ায় কারমাইকেল হোস্টেল থেকে তাদের স্থানান্তর করে তা হিন্দু হোস্টেল বানানোর পরিকল্পনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। হিন্দুপাড়ায় মুসলমান ছেলেদের হোস্টেল করার বিষয়েও স্থানীয় হিন্দু অধিবাসীরা প্রবল আপত্তি তোলে। মুসলমান ছাত্রদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়। একই হোস্টেলে হিন্দু-মুসলমান ছাত্র থাকার প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও আপত্তি তৈরি হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘ছোঁয়াছুঁয়িতে জাত যায় এমন হিন্দুরাই তো আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ।’

এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়—দাড়ি থাকার কারণে হাসানের রাজশাহী কলেজের সহপাঠী মালেককে যখন পুলিশের হেনস্থার মুখোমুখি হতে হয়। মালেকের দাড়ি ও পাঞ্জাবির কারণে তাকে মুসলমান এবং তার বোন সাজেদা কপালে টিপ পরার কারণে তাকে হিন্দু মনে করে পুলিশ আটক করে। কারণ হিসেবে পুলিশ জানায় যে, হিন্দুমেয়েকে নিয়ে মুসলমান ছেলে পালিয়ে যাচ্ছে। হাসান এ বিষয়ে পুলিশকে সাফাই দিলেও তাকে কেউ একজন বলে, ‘তা নেড়েদের জন্য আপনারই বা এত মাথা-ব্যথা কেন মশায়?’ এরকম পরিস্থিতিতে পুলিশ মালেকের কাছে টাকা দাবি করে এবং হাসানের উদ্দেশে বলে, ‘হামি তো হিন্দু আছে বাবুজি। ওই লোক মুসলমান আছে।’ যেহেতু মালেকের ধর্মীয় পরিচয় মুসলমান তাই তার কাছ থেকে এভাবে টাকা আদায় করার মধ্যে পুলিশ সদস্যটির কোনো সংকোচ নেই। উপরন্তু সে তার ধর্মীয় পরিচয় ‘হিন্দু’ এটাকে ব্যবহার করে।

এখানে দেশভাগ পরবর্তী জাতীয়তার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় ‘সংখ্যাগুরু’ ও ‘সংখ্যালঘু’ ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; যা একটি রাষ্ট্রের নাগরিককে সুযোগ সুবিধা ও পরিচিতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘প্রথম শ্রেণি’, ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’র মতো ক্যাটাগরিতে বিভাজিত করে। এখানে ধর্মকে সে অর্থে ব্যবহার করেছে পুলিশ সদস্যটি। হাসান পুলিশকে টাকা দেয় এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী মালেক পায়জামার পরিবর্তে ধুতি পরে ও দাড়ি কেটে সীমান্ত পার হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। দেশভাগ পরবর্তীকালে মুসলমান মালেকের এই পরিস্থিতি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মুসলমান হওয়ার কারণে সে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এ ধরনের ভয় ও শঙ্কা থেকে মুসলমান থেকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার দুটি ঘটনা লক্ষ করা যায় উপন্যাসে।

প্রথম ঘটনা: একজন মুসলমান পুরুষ হিন্দু বিধবা এক নারীকে দ্বিতীয় বিবাহ করে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছে। পঞ্চাশের দাঙ্গার সময়ে হিন্দু মহাসভার গুন্ডারা তাকে জেরা করে। হালিম এই ঘটনা সম্পর্কে হাসানকে বলে, ‘হিন্দু মহাসভার গুন্ডারা তার বাড়ি আক্রমণ করেছিল সব জেনেশুনেই। তার দ্বিতীয় স্ত্রী যে হিন্দু কন্যা সেটা তারা জানত।’ গুন্ডারা লোকটিকে প্রশ্ন করলে, সে বলে, তারা হিন্দু। গুন্ডাদের সর্দার লোকটিকে জেরা করে এভাবে:

‘আমরাও সেটা শুনিছি। কিন্তু নেড়েদের বিশ্বাস কি?’

‘বিশ্বাসের পরিচয় কীভাবে দিতে হবে বলুন?’

‘তোমার প্রথম পক্ষের স্ত্রী, ছেলে-পিলে সব তো এখনো মোচলমানই আছে!’

‘তাদেরকে তো জোর করে আমার ধর্মে নিয়ে আসতে পারিনে।’

‘তবে তাদেরকে বাড়ি করে দিয়েছিস ক্যান? সম্পত্তির ভাগ দিয়েছিস ক্যান?’

...

‘তুমি যে খাঁটি হিন্দু তার প্রমাণ দিতে হবে?’

‘প্রমাণ দিতে রাজি আছি, বলুন আপনারা।’

‘তোমার মোচলমান ছেলেদের ধরে এনে দেব, নিজের হাতে তাদের কাটতে হবে।’

‘না পারলে?’

‘তোমাকে কাটা হবে।’

শেষ পর্যন্ত তাঁর হিন্দু স্ত্রীর চেষ্টাতেই ভদ্রলোকের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। নগদ পাঁচ হাজার টাকা এবং অঙ্গের দশ ভরি সোনার গয়না দিয়ে ঠান্ডা করা হয়েছিল গুণ্ডাদের!

উদ্ধৃতিতে বর্ণিত ঘটনায় ধর্মান্তরিত লোকটি রক্ষা পেলেও তার প্রথম স্ত্রীর সন্তানেরা সংকটে থাকে।

দ্বিতীয় ঘটনা: বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলমান ছাত্র সামসুল হিন্দু গৌরীকে বিয়ে করে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে:

সামসুলের স্ত্রী গৌরীর বাবা কোর্টে মামলা করেছিলেন এই বলে যে, তার মেয়েকে একজন মুসলমান ফুসলিয়ে বের করে নিয়ে গেছে। তারই জবাবে কোর্টে হাকিমের সামনে সামসুল বিবৃতি দিয়েছে এই বলে যে, সে আর মুসলমান নয়, তার নামও আর সামসুল নয়, এখন তার নাম বিমল এবং যথারীতি হিন্দুধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর সে গৌরীকে বিয়ে করেছে। ... সামসুলকে বিমলে রূপান্তরিত হতে হয়েছে তার জীবনের নিরাপত্তার জন্য।

উপর্যুক্ত ঘটনা দুটি থেকে বলা যায়, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দেশভাগের পর সংখ্যালঘুর ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতনের ক্ষেত্র তৈরি করে এবং তা থেকে রক্ষার জন্য সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগ ও ধর্মান্তরিত হওয়ার মতো বাস্তবতা মেনে নেয়।

লক্ষ করা যায়, মুর্শিদাবাদ মুসলিমপ্রবণ এলাকা হওয়ার ফলে সেখানে হিন্দুদের আধিক্য তৈরি করতে নানারকম সাম্প্রদায়িক ঘটনা সৃষ্টি করা হয়। উদ্দেশ্য হলো সেখান থেকে মুসলমান বিতাড়িত করে হিন্দু বসতি গড়ে তোলা। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলমানের ওপর এ ধরনের অত্যাচার প্রসঙ্গে জয়া চ্যাটার্জী তাঁর ‘দেশভাগের অর্জন’ গ্রন্থে বলেন:

পঞ্চাশ দশকের মধ্যবর্তী সময়ে যখন ভারতে মুসলিম-বিরোধী হঠকারী হত্যা ও লুণ্ঠন ছড়িয়ে পড়ে তখন শুধু পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে নয়, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ থেকেও হাজার হাজার লোক দেশত্যাগ করে। ভারত বা পাকিস্তান যেখানেই হোক, হিন্দু ও মুসলিম পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে পশ্চিমবঙ্গের ভীত-সন্ত্রস্ত মুসলিমরা তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

তখন প্রশ্ন জাগে, বাড়িঘর ছেড়ে এই মুসলমানেরা কোথায় নীড়ের সন্ধান করে? দেশভাগের আগের একটি মুসলিম প্রধান এলাকা মুর্শিদাবাদের দেশভাগ পরবর্তী সময়ে মুসলমান সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ার চিত্র উপন্যাসে উঠে এসেছে এভাবে:

মুসলমান প্রধান এই জেলাটি প্রথমে পাকিস্তান হবে বলেই ঠিক হয়েছিল, কিন্তু যেদিনই কোনো অজ্ঞাত কারণে জেলাটি হিন্দুস্তানের ভাগে পড়ে গেল, সেইদিন থেকেই এ-অঞ্চলের-সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানসিকতায় একটা আশ্চর্য পরিবর্তন এসে গেল। মুসলমানদেরকে কৃপাদৃষ্টিতে দেখতে শুরু করল তারা। গোয়ালারা তো মাঝে মাঝে প্রকাশ্যেই মুসলমানদের ক্ষেতের ফসল গরু লাগিয়ে নষ্ট করতে শুরু করে দিলো। কেউ কিছু বলতে সাহস করে না। একদিন হানিফ সহ্য করতে না পেরে তার বাঁশের লাঠি নিয়ে চলল গোয়ালাদের বাধা দিতে। গোয়ালারা ছিল তিনজন, হানিফ একা। কিন্তু হানিফের সঙ্গে লাঠি যুদ্ধে গোয়ালারা পরাস্ত হলো। একজন গোয়ালার মাথা ফেটে রক্ত বেরুতেই রণে ভঙ্গ দিয়ে দৌড় দিল তারা। এই ঘটনার পরিণতি হলো এই যে, পুলিশ এসে প্রথমেই হানিফকে না পেয়ে তার বৃদ্ধ বাপকে থানায় চালান দিল—খানাতল্লাসীর নামে জিনিসপত্র তছনছ করে সারা বাড়িতে একটা দক্ষদজ্ঞ [যজ্ঞ] কান্ড বাধিয়ে দিল।

হানিফ প্রথমে কয়েকদিন লুকিয়ে থাকার পর ধরা পড়ল। তারপর হানিফের বাপ ছাড়া পেল, কিন্তু কিছুতেই হানিফ ছাড়া পেল না হাজত থেকে। কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে সে নাকি পীড়িত হয়ে পড়ে সহসা এবং জেল-হাসপাতালে মারা যায়। সকলের ধারণা পুলিশই নাকি ঠেঙিয়ে মেরে ফেলেছে তাকে।

হানিফের ওই পরিণতির পর মুসলমানরা এখন হিন্দুদেরকে বাঘের মতো ভয় করে চলে। হিন্দুরা যত যা-ই করুক, বিশেষ কিছু বলে না তারা।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে সিরাজের বাবাকে পলাতক আসামি হতে হয়। সিরাজের বাড়ি পাকিস্তান সীমান্তবর্তী তিতিরডাঙা গ্রামে এবং সেটি মুসলমান-আধিক্য গ্রাম হওয়ায় তা হিন্দু নেতৃবৃন্দের চোখে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা সীমান্তবর্তী এলাকাটি মুসলমানশূন্য করার ফন্দি করে এবং থানায় অভিযোগ করে বলে, ‘মুসলমানরা নাকি তাদের জাত মারবার জন্য তাদের পাড়ার টিউবওয়েলের ভেতর গরুর হাড় পুরে দিয়েছে।’ এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানকার শীর্ষস্থানীয় মুসলমানদের ধরে জেলা-সদরে চালান দেওয়া শুরু করে। এ ঘটনাটি পত্রিকায় আসে এভাবে:

... তাঁরই [সিরাজের বাবার] নেতৃত্বে নাকি দশবারো জন মুসলমান নারায়ে তকবীর দিতে দিতে হিন্দু পাড়ায় গিয়ে প্রথমে টিউবওয়েলের মধ্যে গরুর হাড় পুরে দেয়, এবং পরে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে দেয়।

এই ঘটনার দায়ে সিরাজের বাবা মনুসরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ হেফাজতে তার মৃত্যু হয়।

উপন্যাসের আরেকটি ঘটনা হলো এক মুসলমান যুবক এক হিন্দু নারীকে কোর্টে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে। এর ফলে শহরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এভাবে:

এই ধরনের অধর্মাচারের ফলে হিন্দু-মানসে তীব্র বিক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং তারা সম্পূর্ণ অহিংস পন্থায় সেই বিক্ষোভ প্রকাশ করে মিছিল বের করে। মুসলমানেরাই তখন মারাত্মক রকমের বিভিন্ন অস্ত্রসহ সেই নিরস্ত্র জনতাকে আক্রমণ করে দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটায়! মুসলমানদের মধ্যে নাকি ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনিও শোনা গিয়েছিল।

এই সংবাদ প্রকাশের পরের দিন ওই পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়:

ভারতীয় মুসলমানেরা যে পাকিস্তানে বাস করে না, এই কথাটি তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিবার দায়িত্ব সরকার লইতে পারিবে কি না। সরকার সে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হইলে অগত্যা স্বাধীন দেশের নাগরিকেরাই তাহা পালনে আগাইয়া আসিবে, তখন কি সরকারের মর্যাদা বৃদ্ধি পাইবে?

উদ্ধৃতি থেকে বলা যায়, দেশভাগের পর ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমান অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। মুসলমানের এই সংকট জয়া চ্যাটার্জী তাঁর ‘দেশভাগের অর্জন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন। প্রচলিত সংকটগুলো ছিল এরকম, মুসলমানদের গরু কোরবানি বন্ধ করা, মৃতের কবর প্রদানে বাধা দেওয়া, জমি দখল করা, এমনকি ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ারও ঘটনা ঘটে। এরকম পরিপ্রেক্ষিতে উপন্যাসে দেখা যায়, হাসান এমএ পাশ করার পরেও দীর্ঘদিন চাকরিশূন্য থাকে। তাকে চাকরির ভাইভাতেও ডাকা হয় না। একটি ভাইভাতে তাকে প্রশ্ন করা হয়:

‘বি এ পাশ করেছেন দেখছি পকিস্তান থেকে, সে দেশে গিয়েছিলেন কেন?’

‘না চলে তো যাইনি, কেবল পড়াশুনা করতে গিয়েছিলাম।’

‘পড়াশুনা করতে? কেন?’ আমাদের এখানে কি আপনি পড়াশুনা করতে পারতেন না?’

...

‘আমরা কি মনে করব যে, আপনি পাকিস্তান গিয়েছিলেন সে দেশকে ভালোবাসেন বলে?’

হাসানের কোনো চাকরি হয়নি। ধর্মের ভিন্নতার কারণে দীপার সঙ্গে তার বিয়েও হয়নি। এর মধ্যে সে রাজনৈতিক অপকৌশলের শিকার হয়। বিধানসভার নির্বাচনে কমিউনিস্ট প্রার্থী রমেশ দত্তের প্রচারণায় অংশ নেয় সে এবং বিপক্ষ প্রার্থী হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের শ্যামচাঁদ হাজরা নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর হাসানের ওপর ক্ষেপে থাকে। হাসানের বন্ধু সন্তোষ বলে, ‘শ্যামচাঁদের ধারণা, মুসলিম ভোট যথেষ্ট পরিমাণ না পাওয়ার জন্যই সে হেরে গেছে এবং মুসলিম ভোট সে নাকি পায়নি তোমারই জন্য।’ এর কয়েকদিন পর হাসান কলকাতা থেকে রাতে ফিরে ঘুমায়। সকালে কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে দেখে তার বাড়ির সামনে অনেক পুলিশ। দারোগা তার বাড়ি সার্চ শুরু করে।

বাড়ি সার্চ করতে গিয়ে তারই শোবার ঘরের পাশের ঘরটি থেকে বেরিয়ে পড়ল কয়েকটি বোমা, একখানি পাকিস্তানি পতাকা এবং একখানি চাঁদা আদায়ের রসিদ বই। সে রসিদ বইয়ে লেখা আছে—‘মুর্শিদাবাদ জেলাকে পাকিস্তান করিবার উদ্দেশ্যে চাঁদা-সংগ্রহ বহি।’

এ সকল আলামত পাওয়ার দায়ে পুলিশ তাকে হাজতে পুরে দেয়। হাসানের বিরুদ্ধে মূলত রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ আনা হয়। এরকম পরিস্থিতি নিয়ে দেশভাগের পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস হাইকমান্ড মুসলমান সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে বলে:

তারা সীমান্তের অভ্যন্তরে অবিশ্বস্ত ব্যক্তির অস্তিত্ব সহ্য করবে না এবং ‘যারা ভারত ইউনিয়ন থেকে চলে যেতে চায় তাদেরকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ...’ দেওয়ার প্রস্তুতির কথা তিনি ঘোষণা করেন ...। বস্তুত যেসব মুসলিম ভারতে থেকে গিয়েছিল তাদের সবার প্রতি কংগ্রেস চ্যালেঞ্জ করেছিল— নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য প্রমাণ কর, অন্যথায় চলে যাও।

ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে হাসানকে ভারত সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রমাণের সংকটে পড়তে হয়; যা একই সঙ্গে অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সংকট।

দেশভাগ পরবর্তী রাজনীতিতে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হয়। যার প্রয়োগ নবগঠিত ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমভাবে লক্ষ করা যায়। ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে ব্যবহার করার যে চিত্র উপন্যাসে উঠে এসেছে তা অদ্যাবধি বিদ্যমান। আনোয়ার পাশা ‘নীড় সন্ধানী’ উপন্যাসে এই চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি ধর্মীয় কারণে দেশভাগের সিদ্ধান্ত ব্যক্তিকে যেভাবে ‘নীড়হারা’ করে অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সংকটে ফেলে রাষ্ট্রহীন করেছে তাও দেখিয়েছেন।

সম্পর্কিত