শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি গড়ে ওঠা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বাঙালি মুসলমানের মানসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। এই সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘শিখা’। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর গঠন প্রক্রিয়া কেমন ছিল? আদর্শ কারা, কর্মপন্থা কেমন ছিল?
খন্দকার শামীম আহমেদ

১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছাত্র-শিক্ষকের যৌথ প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনও সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে এঁরা এক বৃহৎ অর্থে গ্রহণ করেছিলেন। আদতে তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘শিখা’। শিখার মূলমন্ত্র হিসেবে ছাপা হতো বিখ্যাত এই লাইনটি, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এই মূলবাণীতেই নিহিত আছে সংগঠনটির উদ্দেশ্য। আবুল হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, ড. কাজী মোতাহের হোসেন, এ. এফ. এম. আবদুল হক, এ. জেড নূর আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, আবদুল কাদির, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, আবুল ফজল প্রমুখ মুক্তমনা মানুষেরা ছিলেন এই গোষ্ঠীর সদস্য। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ টিকে ছিল মোট দশ বছর (১৯২৬-১৯৩৬); শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচবছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা— শিক্ষা-সাহিত্য-স্বাস্থ্য-অর্থচিন্তা— প্রভৃতি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ।
কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’?—এর উত্তর পাওয়া যায় সম্পাদক আবুল হুসেনের ‘বার্ষিক বিবরণী’তে। যে জাতির সাহিত্য নাই তার প্রাণ নাই—আবার যে জাতির প্রাণের অভাব সে জাতির ভেতর সত্যকার সাহিত্য জন্মলাভ করতে পারে না। বাঙালি মুসলমানের সব দৈন্যের কারণ প্রাণের অভাব। আর সে অভাবের কারণ সাহিত্যের অভাব। এই সাহিত্যের অভাব ঘুচাবার জন্য, বাঙালি মুসলমানের জীবনকে সরস, সুন্দর করে তোলার জন্য; তাদের যুগ-যুগান্তরের আড়ষ্ট বুদ্ধিকে মুক্ত করে জ্ঞানের অদম্য পিপাসা জাগিয়ে দেয়ার জন্যই এই সমাজ গঠিত হয়েছিল।

কাজী আবদুল ওদুদের মতে শিখার মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং এই মন্ত্র তাঁরা পেয়েছিলেন বহু জায়গা থেকে—কামাল আতাতুর্ক, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, রোমাঁ রোলাঁ, হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর কাছ থেকে। ‘তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ’— আল্লাহর গুণাবলীতে বিষূষিত হওয়া; আল্লাহর অনন্ত সদগুণে ভূষিত হওয়ার প্রচেষ্টা অর্থাৎ মানুষের উন্নতির অন্ত নেই— এমন মত পোষণ করেন এই গোষ্ঠীর লেখকেরা।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র প্রতিষ্ঠা-সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল ইউনিয়ন কক্ষে। সভাপতিত্ব করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সভায় পাঁচ জনের ওপর ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। আবুল হুসেন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক), এ এফ এম আবদুল হক (মুসলিম হলের ছাত্র), আবদুল কাদির (ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের—বর্তমানে ঢাকা কলেজ— ছাত্র), আনোয়ার হোসেন (ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের—বর্তমানে ঢাকা কলেজ— ছাত্র), এবং আবুয্যোহা নূর আহমদ (ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র)।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র কোনো সভাপতি ছিল না। সম্পাদক ছিলেন আবুল হুসেন। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী আনোয়ারুল কাদীর, কাজী মোতাহার হোসেন নেপথ্যে থেকে সমাজের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরীও যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া এই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র বিভিন্ন অধিবেশনে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আহমদ ফজলুর রহমান, খান বাহাদুর তসদ্দুক আহমদ, মমতাজ উদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, আবদুস সালাম খা, আতাউর রহমান খান, মাহমুদ হাসান, খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান, আবুল মোজাফফর আহমদ, মোহিতলাল মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, হেমন্তকুমার সরকার, নাজির উদ্দীন আহমদ, আবদুর রব চৌধুরী, হাকিম হাবিবুর রহমান, রমেশচন্দ্র মজুমদার, মোহাম্মদ কাশেম, দিদারুল আলম, সুশীলকুমার দে, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, আকবর উদ্দীন, কামাল উদ্দীন খা, শামসুল হুদা প্রমুখ।
শিখাগোষ্ঠীর আদর্শের মানুষগণ ছিলেন হযরত মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), শেখ সাদী, রোমাঁ রোলাঁ, গ্যেটে, রামমোহন, ডিরোজিও, মোস্তফা কামাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, কাজী নজরুল ইসলাম।
‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর লেখকগণ তাঁদের চিন্তাধারাকে বাঙালি সমাজের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য তিনটি পথ—পত্র-পত্রিকা প্রকাশ, সাময়িক অধিবেশন-বার্ষিক সম্মেলন, গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ—অবলম্বন করেছিলেন।
এই সমাজের লেখকগণ তাঁদের লেখার প্রস্তুতি আগেই শুরু করেছিলেন। তরুণ-পত্র (১৯২৫) ও অভিযান পত্রিকা দুটি ছিল তাঁদের আশ্রয়। মূলত আবুল হুসেনের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হয়েছিল তরুণ-পত্র। মুহম্মদ ফজলুল করিম মল্লিক ও আহমদ হোসেন সম্পাদিত মাসিক তরুণপত্র পত্রিকার শিরোভাগে লেখা থাকত ‘উড়াও তরুণ জয়-পতাকা পাহাড় সাগর ভেদ করি।’ এই পত্রিকার মুখবাণী হিসেবে ছাপা হত, ‘যদি সত্যের থাকে বল/ তবে নির্ভয় চিতে চল।’ তরুণ-পত্রের উদ্দেশ্য ছিল বাংলার তরুণ সম্প্রদায়কে সমাজ ও দেশহিত ব্রতে উদ্বোধিত করা। সৃজনশক্তির বিকাশের মাধ্যমে নিজেকে ও সমাজকে সঞ্জীবিত করে তোলা মানবজীবনের—তরুণ জীবনের শ্রেষ্ঠসাধনা। এই পত্রিকায় আবুল হুসেন, আবুল ফজল, কাজী আবদুল ওদুদ লিখতেন।
মাসিক অভিযান পত্রিকাটির প্রকাশনার সঙ্গে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর লেখক-কর্মী এবং কাজী নজরুল ইসলাম যুক্ত ছিলেন। এর সম্পাদক (পত্রিকায় সম্পাদকের জায়গায় লেখা থাকত সারথি; কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতুর অনুসরণে এটা করা হয়েছিল) ছিলেন মোহাম্মদ কাসেম।
‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের তৎকালীন প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এ. এফ. রহমান এবং মূল সভাপতি ছিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক খানবাহাদুর তসদ্দুক আহমদ। এ সভার কাজ শুরু হয় কোরআন শরীফের সুরা ‘আল কমর’ এর এক রুকু তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। সাধারণ সভাপতি মৌলভী তসদ্দুক আহমদের অভিভাষণে শিখাগোষ্ঠীর মনন-মানসিকতার চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বাঙালি মুসলিম সাহিত্যের অভাব, মুসলিম সাহিত্যের প্রকৃতি, মুসলিম সাহিত্যের আদর্শ-ইসলাম, মুসলিম সাহিত্য গঠনের উপায়, শিক্ষার বাহন, আধুনিক ভাষা শিক্ষার আবশ্যকতা, মুসলিম সাহিত্যিকগণের কর্তব্য বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার পক্ষে বক্তব্য রাখেন; হিন্দু ও মুসলিম দুই ভাই একই ভাষা জননীর পীযূষ ধারা পান করো বলীয়ান হবে— এমন মন্তব্য করেন।
মুসলিম সাহিত্যের আদর্শ বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য হলো যে ধর্মে হযরত রসূল করিম মুহম্মদ মোস্তফা (স.)-এর ন্যায় নেতা, পথপ্রদর্শক, উপদেষ্টা আছেন, যে ধর্মে কোরান মজিদের ন্যায় অমূল্য গ্রন্থ বিদ্যমান, সেই ধর্মাবলম্বীদের দুনিয়ার পাথেয় সংগ্রহ করিবার জন্য আবার চিন্তা কিসের! বরং বাঙালি মুসলমানের জ্ঞানের ঘাটতি, সঠিকভাবে চর্চার অভাবে অনেক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভক্তিভরে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর নাম শ্রবণ করা, চোখে ‘বোসা’ (চুম্বন) দেওয়ার চাইতে তাঁর প্রকৃত জীবনী সম্বন্ধে খোঁজ রাখা জরুরি।
শিখা প্রকাশিত হয় চৈত্র ১৩৩৩ সালে (১৯২৭ সালে)। বার্ষিক শিখার মোট পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। শিখার মুখবাণী ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ শিখার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন করা। আবুল ফজল শিখা সম্পাদনার সমস্ত কৃতিত্ব ‘কর্মবীর আবুল হুসেন সাহেব’কে দিয়েছেন। বেশিরভাগ খরচও বহন করতেন তিনি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘খোশ আমদেদ’ গানটি (‘আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালি/ও চরণ ছুঁই কেমনে দুই হাতে মোর মাখা যে কালি’) দিয়ে শিখার শুরু। মুনশী হাবিবুল্লার ‘আবাহন’, পরবর্তীসময়ে কাজী নজরুল ইসলামের ‘নতুনের গান’ প্রকাশিত হয়েছিল।

শিখার পাঁচ বছরের সূচি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় বাঙালি মুসলমান সমাজের বিভিন্ন সমস্যা— শিক্ষা-সাহিত্য-সংগীত-সামাজিক-আর্থিক—নিয়ে এই গোষ্ঠী আলোচনা করেছেন। প্রতিটি লেখাই ছিল রীতিমত নতুনভাবে দেখার-চিন্তাকরার উপাদানে ভরপুর।
মুসলিম সাহিত্য নিয়ে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন সাহিত্য যদি সত্যিকার সাহিত্য হয় সে মুক্তি দিবেই—দেহের মুক্তি, মনের মুক্তি, আত্মার মুক্তি। এই তিনটি দিয়েই মানুষ। মুসলিম সাহিত্য বলতে তিনি বলেন যে আমাদের ঘর ও পর, আমাদের সুখ ও দুঃখ, আমাদের আশা ও ভরসা, আমাদের লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে যে সাহিত্য তাই আমাদের সাহিত্য। কেবল লেখক মুসলমান হলেই মুসলমান সাহিত্য হয় না। হিন্দুর সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাচ্ছে বেদান্ত ও গীতা, হিন্দু ইতিহাস ও হিন্দু-জীবনী থেকে। আমাদের সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাবে কুরআন ও হাদিস, মুসলিম ইতিহাস ও মুসলিম জীবনী থেকে। হিন্দু সাহিত্য রস সংগ্রহ করে হিন্দু সমাজ থেকে, আমাদের সাহিত্য করবে মুসলিম সমাজ থেকে। এই সাহিত্যের ভেতর দিয়েই বাংলা হিন্দু-মুসলমানের চেনা-পরিচয় হবে। চেনা হলেই ভাব হবে।
এভাবে সাহিত্য বিষয়ে স্পষ্ট এবং দিকদর্শী উদ্দিষ্ট নিয়ে শিখা আবির্ভূত হয়েছিল আজ থেকে শতবর্ষ আগে। কাজী আবদুল ওদুদের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা’, ‘বাংলার জাগরণ’, ‘বাংলা সাহিত্যের চর্চা’, ‘গ্যেটে’; আনওয়ারুল কাদিরের ‘ইংরেজি সাহিত্যে রোমান্টিক যুগ’, মোহিতলাল মজুমদারের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’, মি. ফসীহর ‘আরবী ভাষা ও কাব্য’, আবুল কাসেমের ‘আরবী কাব্য’, করুণাকণা গুপ্তার ‘বর্তমান বাংলার মহিলা ঔপন্যাসিক’, সুরেন্দনাথ মৈত্রের ‘সাহিত্যে শুচিতা’, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথ ও বৈরাগ্যবিলাস’ প্রভৃতি প্রবন্ধে সাহিত্য ও ভাষা বিষয়ক বিচিত্র-ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে।
মুসলমানের সঙ্গীতচর্চা, নাট্যাভিনয় ও শিল্পকলায় অবদানের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে আবদুল কাদেরের ‘বাঙলার লোক-সঙ্গীত’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘ সঙ্গীত চর্চায় মুসলমান’ আবদুস সালাম খাঁর ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ’, আবদুস সালামের ‘মোগল যুগের চিত্র চর্চা’, মৌলভী আবদুল মঈদ চৌধুরীর ‘স্থাপত্য চর্চায় মুসলমান’, মৌলবী মোসলেমউদ্দীন খাঁর ‘ময়মনসিংহের গীত’ প্রভৃতি প্রবন্ধে।
মুসলমান সমাজ, ধর্ম ও জাগরণ বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় শিখায়। কাজী আনোয়ারুল কাদিরের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’, শামসুল হুদার ‘হজরত মুহম্মদের প্রতিভা’, আবদুর রশীদের ‘আমাদের নবজাগরণ ও শরীয়ত’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘ধর্ম ও সমাজ’, সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদের ‘বাংলায় পীর পূজা’, ফজিলাতুন নেসার ‘নারীজীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ’, কালিকারঞ্জন কানুনগোর ‘দারার ধর্মমত’, মোখতার আহমদ সিদ্দিকীর ‘ফিকাহর উদ্ভব ও পরিণতি’, মৌলভী আকবর উদ্দীনের ‘চলার কথা’, নাজিরুল ইসলামের ‘মানব প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধি’, মৌলবী শামসুল হুদার ‘কুসংস্কারের একটা দিক’, আবুল ফজলের ‘তরুণ আন্দোলনের গতি’, ফাতেমা খানমের ‘তরুণের দায়িত্ব’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘ধর্ম ও শিক্ষা’, নাজির উদ্দীন আহমদের ‘মুসলিম জাগরণ’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘নাস্তিকের ধর্ম’ আবুজ-জোহা নূর আহমদের ‘মোহাদ্দেস প্রসঙ্গ’, শামস্ উদ্দীন আহমদের ‘মুসলিম নারীর কথা’ প্রবন্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, প্রস্তাবনা, পরামর্শ প্রকাশিত হয়।
কাজী আনোয়ারুল কাদিরের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’ প্রবন্ধটি রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে জীবনরস কীভাবে পান করবে বাঙালি মুসলমান; ইবাদতে মজা পায় না, খেতে ভাল লাগেনা; তাই অপুষ্টি এদের মনে-মগজে! যাঁরা ধর্মগুরু হওয়ার দাবী রাখেন, উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে তাঁদের অনেকের জীবন সুন্দর নয়। তাঁরা নিজেরা খুব সুস্থ চিত্ত, জ্ঞানবান, বলবান বুদ্ধিমান মানুষ নন। তাঁদের মুখের কথার দামও তাই খুব বেশী নয়। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও আমাদের মৌলবী মৌলানারা জনগণের উপযুক্ত আহার যোগাতে পারছেন না। ফলে ধর্মের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জন্মাচ্ছে না। বিয়ের ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, অনাচার ও কুসংস্কার ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজে। প্রয়োজনে একাধিক বিয়ের কথা প্রচলিত হলেও সেখানে নানা শর্ত মানার প্রয়োজন আছে। স্বল্পবিদ্যার বাঙালি মুসলমান তাই নিজের সুবিধামত অনেক বিধি বানিয়ে নিয়েছে; প্রাবন্ধিক কাজী আনোয়ারুল কাদিরের সেখানেই ক্ষোভ।
শিখার তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত পরিশিষ্ট থেকে জানা যায় যে কয়েকটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। বাংলার মুসলমান নরনারীকে বিশেষভাবে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালিকে কোরানের সহিত পরিচিত হবার জন্য অনুরোধ করা হয়। বাংলার পল্লীর বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠাগার ও গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠায় বিশেষভাবে উদ্যোগী হওয়ার জন্য দেশের কর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। বাংলার বিভিন্ন মক্তব ও মাদ্রাসায় যাতে বাধ্যতামূলক ব্যায়ামশিক্ষার ব্যবস্থা হয় তজ্জন্য গভর্নমেন্টকে অনুরোধ জানানো হয় এবং কর্মীবৃন্দকে মুসলিম ইতিহাস দর্শন ও ধর্ম বিষয়ক আরবি ও ফারসি গ্রন্থ অনুবাদ করার জন্য একটি অনুবাদ কমিটি গঠন করতে অনুরোধ করা হয়।
বাঙালি মুসলমানের শিক্ষাসমস্যা একটি ব্যাপক বিষয়। শিক্ষা নিয়েও শিখায় প্রকাশিত হয়েছিল অনেক প্রবন্ধ। মমতাজউদ্দীন আহমদের ‘শিক্ষা-সমস্যা’, আবুল হুসেনের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের শিক্ষা-সমস্যা’, আতাউর রহমানের ‘মুসলিম ভারতে শিক্ষা-চর্চা’, আবদুর রহমান খাঁয়ের ‘ইউরোপে শিক্ষার আদর্শের ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
বাঙালি মুসলমানের আর্থিক সমস্যা নিয়েও অনেকে লিখেছেন। এ.কে. আহমদ খাঁ লেখেন ‘বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাংলার মুসলমান’ শীর্ষক প্রবন্ধ। রকীবউদ্দীন আহমদের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের আর্থিক সমস্যা’, আনোয়ার হোসেনের ‘মুসলমানের আর্থিক সমস্যা’, খানবাহাদুর মৌলভী কমরুদ্দীন আহমদের ‘সমবায় আন্দোলনে মুসলমানের কর্তব্য’, রকীবউদ্দীন আহমদের ‘বাংলার লুপ্ত শিল্প, খানবাহাদুর কমরুদ্দীন আহমদের ‘কোরানে মানবের স্থান ও অর্থনীতি’, আবদুল ওহাবের ‘পাটের কথা’ প্রভৃতি প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। আবুল হুসেনের ‘আমাদের রাজনীতি’ প্রবন্ধে রাজনীতি বিষয়ে আলোচনা আছে।
সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেনের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে সাহিত্য সমাজ একদল শক্তিশালী সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল লেখক তৈরী করতে সমর্থ হয়েছে। শরীরচর্চা থেকে শুরু করে ইতিহাস, আইন এমনকি ভ্রমনের বিষয়েও কিছু প্রবন্ধ লিখিত হয়েছিল। যেমন : কাজী মোতাহার হোসেন- ‘মানব মনের ক্রমবিকাশ’, মমতাজউদ্দীন আহমদ- ‘দার্শনিক ইবনে রোশদ’, বিলায়েত আলি খাঁ- ‘ইসলাম ও শরীরচর্চা’, আবুল হুসেন- ‘স্যার সৈয়দ আহমদ’, উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য- ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনে জগৎ ও জীবন’, কামাল উদ্দীন- ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্য’, আবুল হুসেন- ‘বৃটিশ ভারতে মুসলমান আইন’, কামাল উদ্দীন- ‘সভ্যতার উত্তরাধিকার’, আলী নূর- ‘ভারতের আদর্শ’, মোহাম্মদ আবদুল ওদুদ- ‘আল বেরুনী’, আবদুল হাকিম- ‘ইউরোপে এখানে ওখানে কিছুদিন’, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ- ‘হিন্দু মুসলমানের কথা’, নাজির উদ্দীন আহমদ- ‘স্বাধীন ভারতের দাস’, মোসলেম উদ্দীন খাঁ- ‘মিলন সৌধ প্রভৃতি। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঙালি মুসলমানকে জাগাতে, ‘স্বাধীন চিন্তা’র হাওয়া নিয়ে মুসলিম সাহিত্য-সমাজের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং তারা লেখার মাধ্যমে তা করেছেন।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ তথা শিখাগোষ্ঠী চেয়েছিলেন সত্যপ্রীতি ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা সমাজের কাছে তুলে ধরতে। তারা সমাজ বলতে সমগ্র বাঙালি সমাজকেই মনে করতেন। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা, শিক্ষা-ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক সমস্যা, ললিতকলা চর্চা ও ধর্মীয় রীতিনীতির ব্যাখ্যা প্রভৃতি নিয়ে এঁরা আলোচনা করেছেন, লিখেছেন। আধুনিক জগতের চিন্তাধারার পরিপ্রেক্ষিতে এবং যুক্তিবাদের আলোকে বাঙালি মুসলমানের তৎকালীন সমাজ-চিন্তা, ধর্মচিন্তা ও মূল্যবোধের বিচার করাই ছিল ‘শিখা গোষ্ঠী’র লেখনীর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা সম্বন্ধেও এঁদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। এঁদের দৃষ্টি ছিল যুক্তিবাদীর দৃষ্টি, চিন্তা-সংস্কারের দৃষ্টি এবং সমাজ-সংস্কারের দৃষ্টি। তাঁদের ছিল রেনেসাঁর দৃষ্টি। চিন্তার গতানুগতিকতা থেকে এবং ঐতিহ্যের অন্ধ-অনুবর্তিতা থেকে তাঁরা বাঙালি মুসলিম সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন; তাঁরা চেয়েছিলেন বাঙালি মুসলমান বিশ্বজনীন চিন্তার অংশীদার হোন; আধুনিক জগতের প্রাগ্রসর সমাজ ও জাতিসমূহের সমপর্যায়ে সৃষ্টিচঞ্চল হোক বাঙালি মুসলমান। শতবর্ষ অতিবাহিত; আজও শিখার আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয়তা ম্লান হয়ে যায়নি।

১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছাত্র-শিক্ষকের যৌথ প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনও সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে এঁরা এক বৃহৎ অর্থে গ্রহণ করেছিলেন। আদতে তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘শিখা’। শিখার মূলমন্ত্র হিসেবে ছাপা হতো বিখ্যাত এই লাইনটি, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এই মূলবাণীতেই নিহিত আছে সংগঠনটির উদ্দেশ্য। আবুল হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, ড. কাজী মোতাহের হোসেন, এ. এফ. এম. আবদুল হক, এ. জেড নূর আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, আবদুল কাদির, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, আবুল ফজল প্রমুখ মুক্তমনা মানুষেরা ছিলেন এই গোষ্ঠীর সদস্য। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ টিকে ছিল মোট দশ বছর (১৯২৬-১৯৩৬); শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচবছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা— শিক্ষা-সাহিত্য-স্বাস্থ্য-অর্থচিন্তা— প্রভৃতি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ।
কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’?—এর উত্তর পাওয়া যায় সম্পাদক আবুল হুসেনের ‘বার্ষিক বিবরণী’তে। যে জাতির সাহিত্য নাই তার প্রাণ নাই—আবার যে জাতির প্রাণের অভাব সে জাতির ভেতর সত্যকার সাহিত্য জন্মলাভ করতে পারে না। বাঙালি মুসলমানের সব দৈন্যের কারণ প্রাণের অভাব। আর সে অভাবের কারণ সাহিত্যের অভাব। এই সাহিত্যের অভাব ঘুচাবার জন্য, বাঙালি মুসলমানের জীবনকে সরস, সুন্দর করে তোলার জন্য; তাদের যুগ-যুগান্তরের আড়ষ্ট বুদ্ধিকে মুক্ত করে জ্ঞানের অদম্য পিপাসা জাগিয়ে দেয়ার জন্যই এই সমাজ গঠিত হয়েছিল।

কাজী আবদুল ওদুদের মতে শিখার মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং এই মন্ত্র তাঁরা পেয়েছিলেন বহু জায়গা থেকে—কামাল আতাতুর্ক, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, রোমাঁ রোলাঁ, হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর কাছ থেকে। ‘তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ’— আল্লাহর গুণাবলীতে বিষূষিত হওয়া; আল্লাহর অনন্ত সদগুণে ভূষিত হওয়ার প্রচেষ্টা অর্থাৎ মানুষের উন্নতির অন্ত নেই— এমন মত পোষণ করেন এই গোষ্ঠীর লেখকেরা।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র প্রতিষ্ঠা-সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল ইউনিয়ন কক্ষে। সভাপতিত্ব করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সভায় পাঁচ জনের ওপর ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। আবুল হুসেন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক), এ এফ এম আবদুল হক (মুসলিম হলের ছাত্র), আবদুল কাদির (ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের—বর্তমানে ঢাকা কলেজ— ছাত্র), আনোয়ার হোসেন (ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের—বর্তমানে ঢাকা কলেজ— ছাত্র), এবং আবুয্যোহা নূর আহমদ (ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র)।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র কোনো সভাপতি ছিল না। সম্পাদক ছিলেন আবুল হুসেন। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী আনোয়ারুল কাদীর, কাজী মোতাহার হোসেন নেপথ্যে থেকে সমাজের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরীও যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া এই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র বিভিন্ন অধিবেশনে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আহমদ ফজলুর রহমান, খান বাহাদুর তসদ্দুক আহমদ, মমতাজ উদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, আবদুস সালাম খা, আতাউর রহমান খান, মাহমুদ হাসান, খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান, আবুল মোজাফফর আহমদ, মোহিতলাল মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, হেমন্তকুমার সরকার, নাজির উদ্দীন আহমদ, আবদুর রব চৌধুরী, হাকিম হাবিবুর রহমান, রমেশচন্দ্র মজুমদার, মোহাম্মদ কাশেম, দিদারুল আলম, সুশীলকুমার দে, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, আকবর উদ্দীন, কামাল উদ্দীন খা, শামসুল হুদা প্রমুখ।
শিখাগোষ্ঠীর আদর্শের মানুষগণ ছিলেন হযরত মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), শেখ সাদী, রোমাঁ রোলাঁ, গ্যেটে, রামমোহন, ডিরোজিও, মোস্তফা কামাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, কাজী নজরুল ইসলাম।
‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর লেখকগণ তাঁদের চিন্তাধারাকে বাঙালি সমাজের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য তিনটি পথ—পত্র-পত্রিকা প্রকাশ, সাময়িক অধিবেশন-বার্ষিক সম্মেলন, গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ—অবলম্বন করেছিলেন।
এই সমাজের লেখকগণ তাঁদের লেখার প্রস্তুতি আগেই শুরু করেছিলেন। তরুণ-পত্র (১৯২৫) ও অভিযান পত্রিকা দুটি ছিল তাঁদের আশ্রয়। মূলত আবুল হুসেনের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হয়েছিল তরুণ-পত্র। মুহম্মদ ফজলুল করিম মল্লিক ও আহমদ হোসেন সম্পাদিত মাসিক তরুণপত্র পত্রিকার শিরোভাগে লেখা থাকত ‘উড়াও তরুণ জয়-পতাকা পাহাড় সাগর ভেদ করি।’ এই পত্রিকার মুখবাণী হিসেবে ছাপা হত, ‘যদি সত্যের থাকে বল/ তবে নির্ভয় চিতে চল।’ তরুণ-পত্রের উদ্দেশ্য ছিল বাংলার তরুণ সম্প্রদায়কে সমাজ ও দেশহিত ব্রতে উদ্বোধিত করা। সৃজনশক্তির বিকাশের মাধ্যমে নিজেকে ও সমাজকে সঞ্জীবিত করে তোলা মানবজীবনের—তরুণ জীবনের শ্রেষ্ঠসাধনা। এই পত্রিকায় আবুল হুসেন, আবুল ফজল, কাজী আবদুল ওদুদ লিখতেন।
মাসিক অভিযান পত্রিকাটির প্রকাশনার সঙ্গে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর লেখক-কর্মী এবং কাজী নজরুল ইসলাম যুক্ত ছিলেন। এর সম্পাদক (পত্রিকায় সম্পাদকের জায়গায় লেখা থাকত সারথি; কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতুর অনুসরণে এটা করা হয়েছিল) ছিলেন মোহাম্মদ কাসেম।
‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের তৎকালীন প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এ. এফ. রহমান এবং মূল সভাপতি ছিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক খানবাহাদুর তসদ্দুক আহমদ। এ সভার কাজ শুরু হয় কোরআন শরীফের সুরা ‘আল কমর’ এর এক রুকু তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। সাধারণ সভাপতি মৌলভী তসদ্দুক আহমদের অভিভাষণে শিখাগোষ্ঠীর মনন-মানসিকতার চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বাঙালি মুসলিম সাহিত্যের অভাব, মুসলিম সাহিত্যের প্রকৃতি, মুসলিম সাহিত্যের আদর্শ-ইসলাম, মুসলিম সাহিত্য গঠনের উপায়, শিক্ষার বাহন, আধুনিক ভাষা শিক্ষার আবশ্যকতা, মুসলিম সাহিত্যিকগণের কর্তব্য বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার পক্ষে বক্তব্য রাখেন; হিন্দু ও মুসলিম দুই ভাই একই ভাষা জননীর পীযূষ ধারা পান করো বলীয়ান হবে— এমন মন্তব্য করেন।
মুসলিম সাহিত্যের আদর্শ বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য হলো যে ধর্মে হযরত রসূল করিম মুহম্মদ মোস্তফা (স.)-এর ন্যায় নেতা, পথপ্রদর্শক, উপদেষ্টা আছেন, যে ধর্মে কোরান মজিদের ন্যায় অমূল্য গ্রন্থ বিদ্যমান, সেই ধর্মাবলম্বীদের দুনিয়ার পাথেয় সংগ্রহ করিবার জন্য আবার চিন্তা কিসের! বরং বাঙালি মুসলমানের জ্ঞানের ঘাটতি, সঠিকভাবে চর্চার অভাবে অনেক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভক্তিভরে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর নাম শ্রবণ করা, চোখে ‘বোসা’ (চুম্বন) দেওয়ার চাইতে তাঁর প্রকৃত জীবনী সম্বন্ধে খোঁজ রাখা জরুরি।
শিখা প্রকাশিত হয় চৈত্র ১৩৩৩ সালে (১৯২৭ সালে)। বার্ষিক শিখার মোট পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। শিখার মুখবাণী ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ শিখার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন করা। আবুল ফজল শিখা সম্পাদনার সমস্ত কৃতিত্ব ‘কর্মবীর আবুল হুসেন সাহেব’কে দিয়েছেন। বেশিরভাগ খরচও বহন করতেন তিনি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘খোশ আমদেদ’ গানটি (‘আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালি/ও চরণ ছুঁই কেমনে দুই হাতে মোর মাখা যে কালি’) দিয়ে শিখার শুরু। মুনশী হাবিবুল্লার ‘আবাহন’, পরবর্তীসময়ে কাজী নজরুল ইসলামের ‘নতুনের গান’ প্রকাশিত হয়েছিল।

শিখার পাঁচ বছরের সূচি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় বাঙালি মুসলমান সমাজের বিভিন্ন সমস্যা— শিক্ষা-সাহিত্য-সংগীত-সামাজিক-আর্থিক—নিয়ে এই গোষ্ঠী আলোচনা করেছেন। প্রতিটি লেখাই ছিল রীতিমত নতুনভাবে দেখার-চিন্তাকরার উপাদানে ভরপুর।
মুসলিম সাহিত্য নিয়ে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন সাহিত্য যদি সত্যিকার সাহিত্য হয় সে মুক্তি দিবেই—দেহের মুক্তি, মনের মুক্তি, আত্মার মুক্তি। এই তিনটি দিয়েই মানুষ। মুসলিম সাহিত্য বলতে তিনি বলেন যে আমাদের ঘর ও পর, আমাদের সুখ ও দুঃখ, আমাদের আশা ও ভরসা, আমাদের লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে যে সাহিত্য তাই আমাদের সাহিত্য। কেবল লেখক মুসলমান হলেই মুসলমান সাহিত্য হয় না। হিন্দুর সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাচ্ছে বেদান্ত ও গীতা, হিন্দু ইতিহাস ও হিন্দু-জীবনী থেকে। আমাদের সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাবে কুরআন ও হাদিস, মুসলিম ইতিহাস ও মুসলিম জীবনী থেকে। হিন্দু সাহিত্য রস সংগ্রহ করে হিন্দু সমাজ থেকে, আমাদের সাহিত্য করবে মুসলিম সমাজ থেকে। এই সাহিত্যের ভেতর দিয়েই বাংলা হিন্দু-মুসলমানের চেনা-পরিচয় হবে। চেনা হলেই ভাব হবে।
এভাবে সাহিত্য বিষয়ে স্পষ্ট এবং দিকদর্শী উদ্দিষ্ট নিয়ে শিখা আবির্ভূত হয়েছিল আজ থেকে শতবর্ষ আগে। কাজী আবদুল ওদুদের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা’, ‘বাংলার জাগরণ’, ‘বাংলা সাহিত্যের চর্চা’, ‘গ্যেটে’; আনওয়ারুল কাদিরের ‘ইংরেজি সাহিত্যে রোমান্টিক যুগ’, মোহিতলাল মজুমদারের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’, মি. ফসীহর ‘আরবী ভাষা ও কাব্য’, আবুল কাসেমের ‘আরবী কাব্য’, করুণাকণা গুপ্তার ‘বর্তমান বাংলার মহিলা ঔপন্যাসিক’, সুরেন্দনাথ মৈত্রের ‘সাহিত্যে শুচিতা’, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথ ও বৈরাগ্যবিলাস’ প্রভৃতি প্রবন্ধে সাহিত্য ও ভাষা বিষয়ক বিচিত্র-ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে।
মুসলমানের সঙ্গীতচর্চা, নাট্যাভিনয় ও শিল্পকলায় অবদানের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে আবদুল কাদেরের ‘বাঙলার লোক-সঙ্গীত’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘ সঙ্গীত চর্চায় মুসলমান’ আবদুস সালাম খাঁর ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ’, আবদুস সালামের ‘মোগল যুগের চিত্র চর্চা’, মৌলভী আবদুল মঈদ চৌধুরীর ‘স্থাপত্য চর্চায় মুসলমান’, মৌলবী মোসলেমউদ্দীন খাঁর ‘ময়মনসিংহের গীত’ প্রভৃতি প্রবন্ধে।
মুসলমান সমাজ, ধর্ম ও জাগরণ বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় শিখায়। কাজী আনোয়ারুল কাদিরের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’, শামসুল হুদার ‘হজরত মুহম্মদের প্রতিভা’, আবদুর রশীদের ‘আমাদের নবজাগরণ ও শরীয়ত’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘ধর্ম ও সমাজ’, সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদের ‘বাংলায় পীর পূজা’, ফজিলাতুন নেসার ‘নারীজীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ’, কালিকারঞ্জন কানুনগোর ‘দারার ধর্মমত’, মোখতার আহমদ সিদ্দিকীর ‘ফিকাহর উদ্ভব ও পরিণতি’, মৌলভী আকবর উদ্দীনের ‘চলার কথা’, নাজিরুল ইসলামের ‘মানব প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধি’, মৌলবী শামসুল হুদার ‘কুসংস্কারের একটা দিক’, আবুল ফজলের ‘তরুণ আন্দোলনের গতি’, ফাতেমা খানমের ‘তরুণের দায়িত্ব’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘ধর্ম ও শিক্ষা’, নাজির উদ্দীন আহমদের ‘মুসলিম জাগরণ’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘নাস্তিকের ধর্ম’ আবুজ-জোহা নূর আহমদের ‘মোহাদ্দেস প্রসঙ্গ’, শামস্ উদ্দীন আহমদের ‘মুসলিম নারীর কথা’ প্রবন্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, প্রস্তাবনা, পরামর্শ প্রকাশিত হয়।
কাজী আনোয়ারুল কাদিরের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’ প্রবন্ধটি রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে জীবনরস কীভাবে পান করবে বাঙালি মুসলমান; ইবাদতে মজা পায় না, খেতে ভাল লাগেনা; তাই অপুষ্টি এদের মনে-মগজে! যাঁরা ধর্মগুরু হওয়ার দাবী রাখেন, উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে তাঁদের অনেকের জীবন সুন্দর নয়। তাঁরা নিজেরা খুব সুস্থ চিত্ত, জ্ঞানবান, বলবান বুদ্ধিমান মানুষ নন। তাঁদের মুখের কথার দামও তাই খুব বেশী নয়। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও আমাদের মৌলবী মৌলানারা জনগণের উপযুক্ত আহার যোগাতে পারছেন না। ফলে ধর্মের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জন্মাচ্ছে না। বিয়ের ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, অনাচার ও কুসংস্কার ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজে। প্রয়োজনে একাধিক বিয়ের কথা প্রচলিত হলেও সেখানে নানা শর্ত মানার প্রয়োজন আছে। স্বল্পবিদ্যার বাঙালি মুসলমান তাই নিজের সুবিধামত অনেক বিধি বানিয়ে নিয়েছে; প্রাবন্ধিক কাজী আনোয়ারুল কাদিরের সেখানেই ক্ষোভ।
শিখার তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত পরিশিষ্ট থেকে জানা যায় যে কয়েকটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। বাংলার মুসলমান নরনারীকে বিশেষভাবে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালিকে কোরানের সহিত পরিচিত হবার জন্য অনুরোধ করা হয়। বাংলার পল্লীর বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠাগার ও গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠায় বিশেষভাবে উদ্যোগী হওয়ার জন্য দেশের কর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। বাংলার বিভিন্ন মক্তব ও মাদ্রাসায় যাতে বাধ্যতামূলক ব্যায়ামশিক্ষার ব্যবস্থা হয় তজ্জন্য গভর্নমেন্টকে অনুরোধ জানানো হয় এবং কর্মীবৃন্দকে মুসলিম ইতিহাস দর্শন ও ধর্ম বিষয়ক আরবি ও ফারসি গ্রন্থ অনুবাদ করার জন্য একটি অনুবাদ কমিটি গঠন করতে অনুরোধ করা হয়।
বাঙালি মুসলমানের শিক্ষাসমস্যা একটি ব্যাপক বিষয়। শিক্ষা নিয়েও শিখায় প্রকাশিত হয়েছিল অনেক প্রবন্ধ। মমতাজউদ্দীন আহমদের ‘শিক্ষা-সমস্যা’, আবুল হুসেনের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের শিক্ষা-সমস্যা’, আতাউর রহমানের ‘মুসলিম ভারতে শিক্ষা-চর্চা’, আবদুর রহমান খাঁয়ের ‘ইউরোপে শিক্ষার আদর্শের ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
বাঙালি মুসলমানের আর্থিক সমস্যা নিয়েও অনেকে লিখেছেন। এ.কে. আহমদ খাঁ লেখেন ‘বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাংলার মুসলমান’ শীর্ষক প্রবন্ধ। রকীবউদ্দীন আহমদের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের আর্থিক সমস্যা’, আনোয়ার হোসেনের ‘মুসলমানের আর্থিক সমস্যা’, খানবাহাদুর মৌলভী কমরুদ্দীন আহমদের ‘সমবায় আন্দোলনে মুসলমানের কর্তব্য’, রকীবউদ্দীন আহমদের ‘বাংলার লুপ্ত শিল্প, খানবাহাদুর কমরুদ্দীন আহমদের ‘কোরানে মানবের স্থান ও অর্থনীতি’, আবদুল ওহাবের ‘পাটের কথা’ প্রভৃতি প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। আবুল হুসেনের ‘আমাদের রাজনীতি’ প্রবন্ধে রাজনীতি বিষয়ে আলোচনা আছে।
সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেনের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে সাহিত্য সমাজ একদল শক্তিশালী সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল লেখক তৈরী করতে সমর্থ হয়েছে। শরীরচর্চা থেকে শুরু করে ইতিহাস, আইন এমনকি ভ্রমনের বিষয়েও কিছু প্রবন্ধ লিখিত হয়েছিল। যেমন : কাজী মোতাহার হোসেন- ‘মানব মনের ক্রমবিকাশ’, মমতাজউদ্দীন আহমদ- ‘দার্শনিক ইবনে রোশদ’, বিলায়েত আলি খাঁ- ‘ইসলাম ও শরীরচর্চা’, আবুল হুসেন- ‘স্যার সৈয়দ আহমদ’, উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য- ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনে জগৎ ও জীবন’, কামাল উদ্দীন- ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্য’, আবুল হুসেন- ‘বৃটিশ ভারতে মুসলমান আইন’, কামাল উদ্দীন- ‘সভ্যতার উত্তরাধিকার’, আলী নূর- ‘ভারতের আদর্শ’, মোহাম্মদ আবদুল ওদুদ- ‘আল বেরুনী’, আবদুল হাকিম- ‘ইউরোপে এখানে ওখানে কিছুদিন’, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ- ‘হিন্দু মুসলমানের কথা’, নাজির উদ্দীন আহমদ- ‘স্বাধীন ভারতের দাস’, মোসলেম উদ্দীন খাঁ- ‘মিলন সৌধ প্রভৃতি। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঙালি মুসলমানকে জাগাতে, ‘স্বাধীন চিন্তা’র হাওয়া নিয়ে মুসলিম সাহিত্য-সমাজের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং তারা লেখার মাধ্যমে তা করেছেন।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ তথা শিখাগোষ্ঠী চেয়েছিলেন সত্যপ্রীতি ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা সমাজের কাছে তুলে ধরতে। তারা সমাজ বলতে সমগ্র বাঙালি সমাজকেই মনে করতেন। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা, শিক্ষা-ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক সমস্যা, ললিতকলা চর্চা ও ধর্মীয় রীতিনীতির ব্যাখ্যা প্রভৃতি নিয়ে এঁরা আলোচনা করেছেন, লিখেছেন। আধুনিক জগতের চিন্তাধারার পরিপ্রেক্ষিতে এবং যুক্তিবাদের আলোকে বাঙালি মুসলমানের তৎকালীন সমাজ-চিন্তা, ধর্মচিন্তা ও মূল্যবোধের বিচার করাই ছিল ‘শিখা গোষ্ঠী’র লেখনীর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা সম্বন্ধেও এঁদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। এঁদের দৃষ্টি ছিল যুক্তিবাদীর দৃষ্টি, চিন্তা-সংস্কারের দৃষ্টি এবং সমাজ-সংস্কারের দৃষ্টি। তাঁদের ছিল রেনেসাঁর দৃষ্টি। চিন্তার গতানুগতিকতা থেকে এবং ঐতিহ্যের অন্ধ-অনুবর্তিতা থেকে তাঁরা বাঙালি মুসলিম সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন; তাঁরা চেয়েছিলেন বাঙালি মুসলমান বিশ্বজনীন চিন্তার অংশীদার হোন; আধুনিক জগতের প্রাগ্রসর সমাজ ও জাতিসমূহের সমপর্যায়ে সৃষ্টিচঞ্চল হোক বাঙালি মুসলমান। শতবর্ষ অতিবাহিত; আজও শিখার আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয়তা ম্লান হয়ে যায়নি।

১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। সংগঠনটি মুসলমান সমাজকে আধুনিক মনন, বহুমাত্রিক চিন্তা ও বৃহত্তর মানবিক জগতে প্রবেশের পথ সুগম করে। মুসলিম সমাজের শিক্ষিত অংশ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে নিজেদের বাঙালি
২ ঘণ্টা আগে
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। সংগঠনের মূল স্লোগান ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় 'শিখা' পত্রিকা।
৪ ঘণ্টা আগে
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তার জগতে এক অভাবনীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল মুসলিম সাহিত্য সমাজের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’। ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একঝাঁক প্রগতিশীল তরুণ শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিকের হাত ধরে যে চিন্তার সংস্কার শুরু হয়েছিল
৪ ঘণ্টা আগে
জেনে অবাক হবেন যে শত বছর আগে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে বন্যপ্রাণী বাস করত। কোন কোন বন্যপ্রাণী সেখানে ছিল? নদী, জলাভূমি ও পুকুরে কী কী মাছ পাওয়া যেত? ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এল এস এস ওম্যালি-এর বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ফরিদপুর) থেকে অনুবাদ করেছেন ভূ-পর্যটক তারেক অণু।
২০ ঘণ্টা আগে