আজ সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী
আজ সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিনে তাঁর অনুরাগীরা নানা কাজের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করেন। তিনি অসামান্য প্রতিভাবান একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেই সবচেয়ে পরিচিত। স্বল্প যন্ত্রপাতি ও বাজেটে তিনি বানিয়েছেন অসাধারণ সব সিনেমা। রেখে গিয়েছেন হাতে করা নিখুঁত ইলাস্ট্রেশন। তবে গল্পকার সত্যজিৎ যেন অনেকটাই আলোচনার বাইরে।
মাহজাবিন নাফিসা

আজ সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিনে তাঁর অনুরাগীরা নানা কাজের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করেন। তিনি অসামান্য প্রতিভাবান একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেই সবচেয়ে পরিচিত। স্বল্প যন্ত্রপাতি ও বাজেটে তিনি বানিয়েছেন অসাধারণ সব সিনেমা। রেখে গিয়েছেন হাতে করা নিখুঁত ইলাস্ট্রেশন। তবে গল্পকার সত্যজিৎ যেন অনেকটাই আলোচনার বাইরে।
চলচ্চিত্রের আলো কখনও কখনও এতটাই তীব্র হয় যে তার আড়ালে থেকে যায় সৃষ্টিশীলতার অন্য দিকগুলো। তাঁর ক্ষেত্রেও যেন সেটাই ঘটেছে। সত্যজিতের প্রধান সৃষ্টির জগৎ চলচ্চিত্রের। কিন্তু শুধু চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সাহিত্যভাবনাতেও ব্যাপ্ত হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মন দিয়েছিলেন অন্য এক দিগন্ত রচনায়। আর তাই পাঠকের বড় অংশ তাঁকে মনে রাখে ফেলুদা বা প্রফেসর শঙ্কুর স্রষ্টা হিসেবে।
এতসব পরিচয়ের বাইরে যে বিশাল ছোটগল্পভুবন তিনি নির্মাণ করে গেছেন, তা এখনও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। এই দিকটাই আজ নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
সাহিত্যিক হিসেবে সত্যজিতের যাত্রা শুরু পারিবারিক উত্তরাধিকার ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় লিখতে গিয়ে। সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের মতে, ‘ওঁর বাপ্-পিতামহেরর মতো, সত্যজিৎ রায়ের সোনার কলমেও যে বেপরোয়া জাদু থাকবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!’ ১৯৪১ সালে ‘অ্যাবস্ট্রাকশান’ নামে একটি ইংরেজি গল্প দিয়ে লেখার জগতে সত্যজিতের আত্মপ্রকাশ। ষাটের দশকে লেখালেখির বিস্তার ঘটে, প্রথমে কিশোরদের জন্য।

কিন্তু ধীরে ধীরে সেই গণ্ডি পেরিয়ে তিনি নির্মাণ করেন বহুমাত্রিক গল্পজগৎ। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত প্রফেসর শঙ্কুর ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’ এবং ১৯৬৫ সালে ফেলুদার আবির্ভাব তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। কিন্তু এর মাঝেই, প্রায় অপ্রচলিত এক ধারায় তিনি লিখে যেতে থাকেন অসংখ্য ছোটগল্প। যার অনেকগুলোই আজও পাঠক জনপ্রিয়তার আড়ালেই রয়ে গেছে।
নিজের লেখা নিয়ে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘যখন আমি মৌলিক কোনো গল্প লিখি তখন আমি এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে লিখি যাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি এবং এমন পরিস্থিতির কথা লিখি যার সঙ্গে আমি পরিচিত। আমি উনিশ শতকের কোনো গল্প লিখি না।’ তাঁর বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় তিনি পুরোনো কোনো আবহে গল্প বসাননি বরং তাঁর গল্পে শহুরে মধ্যবিত্ত জীবন, দৈনন্দিনতা এবং সেই বাস্তবতার ভেতর হঠাৎ প্রবেশ করা অস্বাভাবিক বা অজানা উপাদানই হয়ে ওঠে প্রধান চালিকাশক্তি।
ফলে তাঁর গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় এই ঘটনাগুলো যেন খুব দূরের নয়, বরং আমাদের আশপাশেই কোথাও ঘটে যেতে পারে। কারো পোষা কুকুর, বা কারো বিরল গাছ সংগ্রহের বাতিক, কিন্তু গল্প হতে গিয়ে যে সেই গাছ কুকুরসুদ্ধ খেয়ে ফেলছে, এই ঘটনা তো আর প্রতিদিন ঘটে না!
সত্যজিতের ছোটগল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে তার বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন রহস্য ও থ্রিলারের টানটান উত্তেজনা, অন্যদিকে আছে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কৌতূহল, অতিপ্রাকৃতের শীতল স্রোত, আবার কখনও ব্যঙ্গাত্মক বা রূপকধর্মী গল্প। সাপ হত্যা করে প্রকৃতির প্রতিশোধে নিজেই সাপ হয়ে যাওয়া ‘খগম’ বা একজনই নাকি দুইজন মানুষ সেই প্রশ্নের হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেয়া থ্রিলার ‘রতনবাবু আর সেই লোকটা’ অথবা ‘ব্রাউন সাহেবের বাড়ি’র মত গল্প, যেগুলো সাধারণ এক ঘটনা থেকেই হুট করে পাহাড় থেকে ফেলে দেয়ার মত মোড় ঘুরিয়ে হয়ে যায় এক অন্য গল্প।

আবার, ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’ কিংবা ‘পুরষ্কার’ এর মতো হাস্যরসের গল্প। আবার তিনি লিখেছেন, ‘রতন আর লক্ষ্মী’ বা ‘সুজন হরবোলা’র মত রূপকথার সব গল্প যেখানে আছে রাজা, রাজকন্যা, রাখাল ছেলে। প্রতিটি গল্প আলাদা স্বাদের, আলাদা অভিজ্ঞতার। এই ধারাবাহিক বৈচিত্র্য বাংলা ছোটগল্পে খুব কম লেখকের ক্ষেত্রেই এত স্বাচ্ছন্দ্যে দেখা যায়।
গল্প রচনায় সূচনালগ্ন থেকেই সত্যজিৎ পাঠকের মন জয় করে নিয়েছিলেন। শুরু থেকেই তিনি লিখেছেন জমজমাট গল্প। তবে কোনও জটিল তত্ত্ব নয় জগৎ ও জীবনকে সত্যজিৎ শিল্পীস্বভাবে দেখেছেন আগাগোড়া। তাঁর লেখায় তাই মহাকাশ বা অতল সমুদ্র, মরু থেকে মেরু বা একেবারেই সাধারণ একজন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া অসাধারণ গল্প—কিছুই বাদ যায়নি। ফলে তাঁর গল্পের কিশোর ও বয়স্ক পাঠকের বিভাজন রেখা মুছে গেছে অনায়াসে। সব বয়সী পাঠককে তাঁর গল্পের জগতে সত্যজিৎ টেনে আনতে পেরেছেন। এই কৃতিত্ব খুব কম সংখ্যক গল্প লেখকেরই আছে।
এখানে প্রভাবের কথাও আসে। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের প্রতি সত্যজিতের অনুরাগ সুপরিচিত, এবং তা তাঁর লেখাতেও কিছুটা প্রতিফলিত। শার্লক হোমস ও ফেলুদার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক মিল কিংবা প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ও শঙ্কুর মধ্যে বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে। তবে এই প্রভাব কখনই অনুকরণে আটকে থাকেনি। বরং তিনি তা আত্মস্থ করে নিজের মতো করে নির্মাণ করেছেন নতুন এক তাকালে। ডয়েলের দ্য টেরর অব ব্লু জন গ্যাপ, দ্য ব্রাজিলিয়ান ক্যাট-এর অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে ‘ব্লু জন গহ্বরের বিভীষিকা’ এবং ‘ব্রেজিলের কালো বাঘ’ নামে। এছাড়াও, মোল্লা নাসিরুদ্দিনের অনেক কৌতুক তিনি অনুবাদ করেছেন সন্দেশের জন্য। লিখেছেন ‘ফটিকচাঁদ’ ও ‘মাস্টার অংশুমান’ নামে উপন্যাস এবং নাটক ‘হাউই।’

সত্যজিতের ছোটগল্পের নির্মাণশৈলীও আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। সংক্ষিপ্ত পরিসরের মধ্যে গল্পকে টানটান রেখে এগিয়ে নেওয়া, শেষে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী মোড়, আর এমন ভিজ্যুয়াল বর্ণনা—যা পড়তে পড়তেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে—এগুলো তাঁকে শুধু জনপ্রিয় লেখক নয়, বরং দক্ষ গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর অনেক গল্পেই হাস্যরস ও বিদ্রূপের মিশেল থাকে, যা পাঠের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এই ছোটগল্প এত কম আলোচিত কেন? এর একটি বড় কারণ সম্ভবত তাঁর নিজেরই তৈরি আইকনিক চরিত্রগুলো। ফেলুদা বা শঙ্কুর জনপ্রিয়তা এতটাই বিস্তৃত যে তা অন্য লেখাগুলোকে আড়াল করে ফেলে। পাশাপাশি, ‘কিশোর সাহিত্য’ হিসেবে তাঁর অনেক গল্পকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ফলে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের একটি অংশ সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পড়েন না। অথচ বাস্তবে, তাঁর গল্পের স্তরবিন্যাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপাদান এমন যে তা বয়সের সীমা অতিক্রম করে যায়। সেখানে এমন এক সত্যজিৎ রায়কে পাওয়া যায়, তিনি আরও বিস্ময়কর। সম্ভবত সময় এসেছে তাঁকে নতুন করে পড়ার—ক্যামেরার আলোয় নয়, বরং তাঁর কলমের সূক্ষ্ম খোঁচায়।

আজ সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিনে তাঁর অনুরাগীরা নানা কাজের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করেন। তিনি অসামান্য প্রতিভাবান একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেই সবচেয়ে পরিচিত। স্বল্প যন্ত্রপাতি ও বাজেটে তিনি বানিয়েছেন অসাধারণ সব সিনেমা। রেখে গিয়েছেন হাতে করা নিখুঁত ইলাস্ট্রেশন। তবে গল্পকার সত্যজিৎ যেন অনেকটাই আলোচনার বাইরে।
চলচ্চিত্রের আলো কখনও কখনও এতটাই তীব্র হয় যে তার আড়ালে থেকে যায় সৃষ্টিশীলতার অন্য দিকগুলো। তাঁর ক্ষেত্রেও যেন সেটাই ঘটেছে। সত্যজিতের প্রধান সৃষ্টির জগৎ চলচ্চিত্রের। কিন্তু শুধু চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সাহিত্যভাবনাতেও ব্যাপ্ত হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মন দিয়েছিলেন অন্য এক দিগন্ত রচনায়। আর তাই পাঠকের বড় অংশ তাঁকে মনে রাখে ফেলুদা বা প্রফেসর শঙ্কুর স্রষ্টা হিসেবে।
এতসব পরিচয়ের বাইরে যে বিশাল ছোটগল্পভুবন তিনি নির্মাণ করে গেছেন, তা এখনও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। এই দিকটাই আজ নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
সাহিত্যিক হিসেবে সত্যজিতের যাত্রা শুরু পারিবারিক উত্তরাধিকার ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় লিখতে গিয়ে। সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের মতে, ‘ওঁর বাপ্-পিতামহেরর মতো, সত্যজিৎ রায়ের সোনার কলমেও যে বেপরোয়া জাদু থাকবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!’ ১৯৪১ সালে ‘অ্যাবস্ট্রাকশান’ নামে একটি ইংরেজি গল্প দিয়ে লেখার জগতে সত্যজিতের আত্মপ্রকাশ। ষাটের দশকে লেখালেখির বিস্তার ঘটে, প্রথমে কিশোরদের জন্য।

কিন্তু ধীরে ধীরে সেই গণ্ডি পেরিয়ে তিনি নির্মাণ করেন বহুমাত্রিক গল্পজগৎ। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত প্রফেসর শঙ্কুর ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’ এবং ১৯৬৫ সালে ফেলুদার আবির্ভাব তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। কিন্তু এর মাঝেই, প্রায় অপ্রচলিত এক ধারায় তিনি লিখে যেতে থাকেন অসংখ্য ছোটগল্প। যার অনেকগুলোই আজও পাঠক জনপ্রিয়তার আড়ালেই রয়ে গেছে।
নিজের লেখা নিয়ে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘যখন আমি মৌলিক কোনো গল্প লিখি তখন আমি এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে লিখি যাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি এবং এমন পরিস্থিতির কথা লিখি যার সঙ্গে আমি পরিচিত। আমি উনিশ শতকের কোনো গল্প লিখি না।’ তাঁর বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় তিনি পুরোনো কোনো আবহে গল্প বসাননি বরং তাঁর গল্পে শহুরে মধ্যবিত্ত জীবন, দৈনন্দিনতা এবং সেই বাস্তবতার ভেতর হঠাৎ প্রবেশ করা অস্বাভাবিক বা অজানা উপাদানই হয়ে ওঠে প্রধান চালিকাশক্তি।
ফলে তাঁর গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় এই ঘটনাগুলো যেন খুব দূরের নয়, বরং আমাদের আশপাশেই কোথাও ঘটে যেতে পারে। কারো পোষা কুকুর, বা কারো বিরল গাছ সংগ্রহের বাতিক, কিন্তু গল্প হতে গিয়ে যে সেই গাছ কুকুরসুদ্ধ খেয়ে ফেলছে, এই ঘটনা তো আর প্রতিদিন ঘটে না!
সত্যজিতের ছোটগল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে তার বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন রহস্য ও থ্রিলারের টানটান উত্তেজনা, অন্যদিকে আছে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কৌতূহল, অতিপ্রাকৃতের শীতল স্রোত, আবার কখনও ব্যঙ্গাত্মক বা রূপকধর্মী গল্প। সাপ হত্যা করে প্রকৃতির প্রতিশোধে নিজেই সাপ হয়ে যাওয়া ‘খগম’ বা একজনই নাকি দুইজন মানুষ সেই প্রশ্নের হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেয়া থ্রিলার ‘রতনবাবু আর সেই লোকটা’ অথবা ‘ব্রাউন সাহেবের বাড়ি’র মত গল্প, যেগুলো সাধারণ এক ঘটনা থেকেই হুট করে পাহাড় থেকে ফেলে দেয়ার মত মোড় ঘুরিয়ে হয়ে যায় এক অন্য গল্প।

আবার, ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’ কিংবা ‘পুরষ্কার’ এর মতো হাস্যরসের গল্প। আবার তিনি লিখেছেন, ‘রতন আর লক্ষ্মী’ বা ‘সুজন হরবোলা’র মত রূপকথার সব গল্প যেখানে আছে রাজা, রাজকন্যা, রাখাল ছেলে। প্রতিটি গল্প আলাদা স্বাদের, আলাদা অভিজ্ঞতার। এই ধারাবাহিক বৈচিত্র্য বাংলা ছোটগল্পে খুব কম লেখকের ক্ষেত্রেই এত স্বাচ্ছন্দ্যে দেখা যায়।
গল্প রচনায় সূচনালগ্ন থেকেই সত্যজিৎ পাঠকের মন জয় করে নিয়েছিলেন। শুরু থেকেই তিনি লিখেছেন জমজমাট গল্প। তবে কোনও জটিল তত্ত্ব নয় জগৎ ও জীবনকে সত্যজিৎ শিল্পীস্বভাবে দেখেছেন আগাগোড়া। তাঁর লেখায় তাই মহাকাশ বা অতল সমুদ্র, মরু থেকে মেরু বা একেবারেই সাধারণ একজন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া অসাধারণ গল্প—কিছুই বাদ যায়নি। ফলে তাঁর গল্পের কিশোর ও বয়স্ক পাঠকের বিভাজন রেখা মুছে গেছে অনায়াসে। সব বয়সী পাঠককে তাঁর গল্পের জগতে সত্যজিৎ টেনে আনতে পেরেছেন। এই কৃতিত্ব খুব কম সংখ্যক গল্প লেখকেরই আছে।
এখানে প্রভাবের কথাও আসে। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের প্রতি সত্যজিতের অনুরাগ সুপরিচিত, এবং তা তাঁর লেখাতেও কিছুটা প্রতিফলিত। শার্লক হোমস ও ফেলুদার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক মিল কিংবা প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ও শঙ্কুর মধ্যে বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে। তবে এই প্রভাব কখনই অনুকরণে আটকে থাকেনি। বরং তিনি তা আত্মস্থ করে নিজের মতো করে নির্মাণ করেছেন নতুন এক তাকালে। ডয়েলের দ্য টেরর অব ব্লু জন গ্যাপ, দ্য ব্রাজিলিয়ান ক্যাট-এর অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে ‘ব্লু জন গহ্বরের বিভীষিকা’ এবং ‘ব্রেজিলের কালো বাঘ’ নামে। এছাড়াও, মোল্লা নাসিরুদ্দিনের অনেক কৌতুক তিনি অনুবাদ করেছেন সন্দেশের জন্য। লিখেছেন ‘ফটিকচাঁদ’ ও ‘মাস্টার অংশুমান’ নামে উপন্যাস এবং নাটক ‘হাউই।’

সত্যজিতের ছোটগল্পের নির্মাণশৈলীও আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। সংক্ষিপ্ত পরিসরের মধ্যে গল্পকে টানটান রেখে এগিয়ে নেওয়া, শেষে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী মোড়, আর এমন ভিজ্যুয়াল বর্ণনা—যা পড়তে পড়তেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে—এগুলো তাঁকে শুধু জনপ্রিয় লেখক নয়, বরং দক্ষ গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর অনেক গল্পেই হাস্যরস ও বিদ্রূপের মিশেল থাকে, যা পাঠের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এই ছোটগল্প এত কম আলোচিত কেন? এর একটি বড় কারণ সম্ভবত তাঁর নিজেরই তৈরি আইকনিক চরিত্রগুলো। ফেলুদা বা শঙ্কুর জনপ্রিয়তা এতটাই বিস্তৃত যে তা অন্য লেখাগুলোকে আড়াল করে ফেলে। পাশাপাশি, ‘কিশোর সাহিত্য’ হিসেবে তাঁর অনেক গল্পকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ফলে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের একটি অংশ সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পড়েন না। অথচ বাস্তবে, তাঁর গল্পের স্তরবিন্যাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপাদান এমন যে তা বয়সের সীমা অতিক্রম করে যায়। সেখানে এমন এক সত্যজিৎ রায়কে পাওয়া যায়, তিনি আরও বিস্ময়কর। সম্ভবত সময় এসেছে তাঁকে নতুন করে পড়ার—ক্যামেরার আলোয় নয়, বরং তাঁর কলমের সূক্ষ্ম খোঁচায়।

বিশ্ব বই দিবসে এই শিরোনামটি দেখে আপনি হয়তো চমকে উঠছেন। কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, সস্তা একটা ক্লিকবেইট, ফোকাস কমে যাওয়া আর অনন্ত কন্টেন্টের যুগে স্রেফ পাঠক ধরার ধান্দা। কেউ হয়তো ভ্রু কুঁচকে বা হেসে ভাবছেন, বই কীভাবে পড়তে হয় মানে? অক্ষরের পর অক্ষর গড়গড় করে পড়ে যাব। ব্যাস! বই পড়া আবার শিখতে হয় নাকি?
২ ঘণ্টা আগে
কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের একটি কবিতার দুটি পংক্তি—‘খোদা আমাকে মানুষ বানালো, আমি হতে চেয়েছিলাম বই।’ হ্যাঁ একজন সংবেদনীল, সৃষ্টিপ্রবণ মানুষের কাছে বইয়ের অস্তিত্ব একটা মানব জনমের চেয়েও অধিক মূল্যবান।
৪ ঘণ্টা আগে
ক্লাস সিক্সে পড়ি, সে সময়ে এক আত্মীয়ের বাড়ি গেলাম। বুকশেলফে রাখা বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখছি, চোখ পড়ল কালবেলা নামে এক উপন্যাসের ওপর। হাতে নিতেই প্রায় ছোঁ মেরে আমার আত্মীয় বইটি তুলে নিলেন। ‘এসব বড়দের বই, পড়লে মানে বুঝবে না এসবের’। এভাবেই আমাদের অনেকের ‘বড়দের বই’য়ের সঙ্গে পরিচয়।
৪ ঘণ্টা আগে
প্রত্যেকেরই শৈশব, কৈশোর বা যৌবনে চুরির ইতিহাস থাকে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে প্রতিবেশীর স্ত্রী এসে দুর্গাকে একটি পুঁতির মালা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করেন। আর সেই চুরির প্রবণতাকে উৎসাহ দেওয়ার অপরাধে সর্বজয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেন। দুর্গা যথারীতি সেই অভিযোগকে অস্বীকার করে।
৫ ঘণ্টা আগে