জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

নারীর সাহিত্য: অন্দর থেকে বিশ্ব

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৪: ১৩
বর্তমানে সাহিত্য কিছুটা হলেও ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ তকমায় যাচাই না হয়ে, বরং কেবল ‘সাহিত্য’ হিসেবে মূল্যায়িত হয়ে অন্দর থেকে পৌঁছে যাচ্ছে পুরো বিশ্বে। এআই জেনারেটেড ছবি

​বিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ আধুনিকতাবাদী লেখক ভার্জিনিয়া উলফ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘কোনো নারী যদি সাহিত্য সৃষ্টি করতে চায়, তবে তার জন্য প্রয়োজন একটি নিজস্ব কক্ষ আর অর্থ’; নারীবাদী ভাষায় যাকে বলে ‘প্রাইভেট স্পেস’। নারীর প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘প্রাইভেট স্পেস’ যে তাঁদের নেই এমন নয়; ক্ষেত্রবিশেষে তা কেবল বিচরণ এবং সংসার যাপনের অন্দরমহল মাত্র। এই অন্দরে বসে যখন কোনো নারী কলম ধরেছেন সাহিত্য করার জন্য, তাঁকে তখন শুধু শব্দের সঙ্গে নয়, লড়াই করতে হয়েছে নিজের অপরাধবোধের সঙ্গেও।

সাহিত্য যেন এক ‘নিষিদ্ধ ফল’, আস্বাদন মাত্রই স্বর্গ থেকে পতন। এই স্বর্গ হতে পতনের ভয়ে মেরি অ্যান ইভান্সকে লিখতে হয়েছিল ‘জর্জ এলিয়ট’ নামে, আর শার্লট ব্রন্টি হয়েছিলেন ‘কারার বেল’। কেউ আবার ভারতবর্ষীয় রাসসুন্দরী দেবীর মতো রান্নাঘরের বেদিতে, বসার পিঁড়িতে অনুশীলন করেছেন অক্ষর; ফলিয়েছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত নুয়ে পড়া নিষিদ্ধ বৃক্ষে সাহসের ফুল। তাদের প্রতিকূলতা ছিল কাঠামোগত—সমাজ বিশ্বাসই করত না যে নারীরা বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্য রচনা করতে পারে।

সিমোন দ্য বোভোয়ারের মতে, ‘নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, বরং সমাজ তাঁকে নারী বানিয়ে তোলে।’ এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নারীর মানুষ হয়ে ওঠার পথে নারীর রচিত সাহিত্য ছিল নারীর অস্তিত্ব সংরক্ষণের হাতিয়ার। বোভোয়ার তাঁর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ বইতে নারীর চিরকাল ‘অন্য’ হয়ে থাকা বা রাখার মতো বিষয়গুলো যেভাবে তুলেছেন, তা কেবল নারীর সাহিত্য হিসেবে সংগ্রামী কৃতিত্ব বহন করে না, বরং নারীর বৃত্ত ভেঙে ‘কর্তা’ হয়ে ওঠার পথে তিনি নিজেও উদাহরণ হয়ে ওঠেন।

সিমোন দ্য বোভোয়ারের মতে, ‘নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, বরং সমাজ তাঁকে নারী বানিয়ে তোলে।’

অনুরূপ উদাহরণ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনও। তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ সমাজতাত্ত্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেই প্রশ্ন করে তৈরি হয়েছে নারীরাজ্য। তিনি নারীর অন্দরমহলে ‘মর্দানা’কে স্থানান্তর করে নারীকে বিশ্ব পরিচালনার কর্তৃত্বে বসিয়েছিলেন। এটি স্রেফ কল্পনা নয়, বরং নারীর অবদমিত আকাঙ্ক্ষার এক মনস্তাত্ত্বিক বহিঃপ্রকাশ। তবে এও সত্য, নারী সামর্থ্যবান হয়ে কেবল তাঁর অন্দরমহলের রাজত্ব করতে চেয়েছে এমন নয়, বরং বৈষম্য, যুদ্ধ, মানবাধিকার নিয়েও হতে চেয়েছে সোচ্চার; টেকসই সমাজ গঠনে যা প্রয়োজন, সে অধিকারটুকু নিয়েই বলতে চেয়েছে কথা। মূলত নারীরা দেখাতে চেয়েছে তাঁদের যেমনটা ভাবা হয় বা তাঁদের যেমনটা সামাজিক রূপ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা পুরোপুরি তেমন নয়। নারীর যে কিছু সুনির্দিষ্ট ছাঁচ চর্চিত হয়েছে বা হচ্ছে, তার জন্য নারীকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্যও কিয়দংশে দায়ী।

​ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষশাসিত সাহিত্যে নারীকে মূলত দুটি চরম প্রান্তিক রূপে ফুটিয়ে তোলা হয়। প্রথমত, দেবী বা আদর্শ নারী—যেখানে নারী কেবল ত্যাগী মা, পতিব্রতা স্ত্রী এবং সেবাদাসী। তার নিজস্ব কোনো কাম্য বস্তুর চেয়ে অন্যের প্রতি আত্মোৎসর্গই বড় পরিচয়। দ্বিতীয়ত চিত্রায়ণ—মোহিনীবেশ বা খলনায়িকা চরিত্র; যেখানে নারী স্বাধীনচেতা বা প্রতিবাদী হলে তাকে হয় ‘ডাইনি’ নয়তো ‘ঘর ভাঙানি’ বা পুরুষের পতনের কারণ হতে হয়েছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী কেবল গল্পের অলঙ্কার বা পুরুষের বীরত্ব প্রকাশের মাধ্যম। তার নিজস্ব কোনো মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা অস্তিত্বের সংকট সেখানে ঠাঁই পাওয়ার মতো উপলক্ষ তৈরি হয়নি। কিন্তু নারী যখন নিজেরা কলম ধরলেন, তখন নারী চরিত্রের চিত্রায়ণে একমাত্রিকতার বদলে এল বহুমাত্রিকতা; যুক্ত হলো অস্তিত্বের সংকট। নারী চরিত্রগুলো তখন থেকে কেবল অন্যের সম্পর্কের অনুষঙ্গ নয়, বরং নিজের পরিচয় ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা মানুষ হিসেবে চিত্রিত হতে শুরু করে। তাঁরা আর দয়া বা ত্রাণের পাত্রী নয়, বরং পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।

বিশ্বজুড়ে নারী সাহিত্যিকেরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অধিকারের নতুন বয়ান তৈরি করা শুরু করেন। মেরি উলস্টোনক্রাফটের মতো নারীবাদীদের রচনার মধ্য দিয়ে নারীর ভোটাধিকার ও সমঅধিকারের বৌদ্ধিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে নারীবাদের রাজনৈতিক আন্দোলনকে করেছে ত্বরান্বিত।

টনি মরিসন বা অ্যালিস ওয়াকার-এর মতো লেখিকারা সরব হয়েছেন বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে। মার্গারেট অ্যাটউড বা নওয়াল আল সাদাউয়িরা তাঁদের সাহিত্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নাগরিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক সংস্কারের জোয়ার এনেছেন।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী কেবল গল্পের অলঙ্কার বা পুরুষের বীরত্ব প্রকাশের মাধ্যম। তার নিজস্ব কোনো মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা অস্তিত্বের সংকট সেখানে ঠাঁই পাওয়ার মতো উপলক্ষ তৈরি হয়নি।

​নারী যখন নারীর কথা বলার জন্যই কলম ধরেছিলেন, তখন তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ‘ভাষা’। কারণ সাহিত্যের ভাষা ছিল শুরু থেকেই ‘পুরুষালি’ (Masculine), এবং তা নারীর সূক্ষ্ম অনুভূতি বা শরীরী রাজনীতিকে ধারণ করতে সক্ষম ছিল না। কিন্তু নারী সক্রিয় হওয়ার পর সেই ভাষায় প্রেমের সঙ্গে দ্রোহ যৌথ মিথস্ক্রিয়ায় মিশে এক নতুন রূপ পায়।

ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, নারী সাহিত্যিকেরা কেবল সত্য বলার অপরাধে বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। ইরানের শিরিন এবাদি ও নার্গিস মোহাম্মদী শাসনব্যবস্থার সমালোচনা ও জেলের ভেতরের নির্যাতনের কথা লিখে দীর্ঘ কারাভোগ করেছেন; চীনের কবি লিউ শিয়া কবিতায় গণতান্ত্রিক চিন্তা প্রকাশের দায়ে দীর্ঘ আট বছর থেকেছেন গৃহবন্দি; সোভিয়েত রাশিয়ার প্রখ্যাত কবি আনা আখমাতোভা স্ট্যালিন শাসনামলে সেন্সরশিপ ও মানসিক কারাবাসের শিকার হন; মিশরের সাহসী লেখক নওয়াল আল সাদাউয়ি ধর্মীয় অপব্যবহার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লিখে কারাবরণ করেন; এবং ইরানের মারজান সাতরাপি তাঁর ‘পারসেপোলিস’ গ্রাফিক নভেলের জন্য নিজ দেশে ফেরার অধিকার হারান।

ইরাকের কবি দুনিয়া মিখাইলও তাঁর কবিতায় ইরাকে চলমান যুদ্ধের সত্যতা ও ভয়াবহতা তুলে ধরায় প্রথমে তাঁর মৃত্যুর ফরমান জারি হওয়ায় তাকে জীবন রক্ষার্থে পালিয়ে যেতে হয় এবং পরে দেশ থেকে চিরদিনের জন্য নির্বাসিত হন। আরও বলা যায়, বাংলাদেশের তসলিমা নাসরিন তাঁর ‘লজ্জা’ উপন্যাস ও কিছু বিতর্কিত নারীবাদী কলামের জন্য প্রতিক্রিয়াশীলদের রোষানলে পড়ে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হন।

​নারীর অবদমন শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। নারী সাহিত্যে যা লেখা হয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যা ‘লেখা হয় না’ বা আড়ালে থাকে। সমাজ নারীকে শিখিয়েছে অভিযোগ না করতে। কিন্তু সাহিত্যে সেই অবদমিত হাহাকার ভাষা পেলে শুরু হয় তাঁকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে কম গুরুত্বপূর্ণ করার কৌশল।

নারী যখন নিজের অভিজ্ঞতা লেখেন, তখন তাকে সংকীর্ণ ‘উইমেনস ফিকশন’ তকমা দেওয়ার প্রচেষ্টা চলে তোড়জোড়ে। তাঁর বৈশ্বিক আবেদনকে অস্বীকার করে ‘পারসোনাল’ অন্ধকার টেনে আনা হয় আলোতে। উদাহরণস্বরূপ, ফরাসি লেখিকা আনি এরনো যখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও গর্ভপাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন, দীর্ঘকাল তাঁকে কেবল ‘ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ’ বলে অবজ্ঞা করা হয়েছে। অথচ ২০২২ সালে নোবেল কমিটি স্বীকার করেছে যে, তাঁর এই ‘ব্যক্তিগত’ লেখাই আসলে এক বিশাল সামাজিক ও রাজনৈতিক দলিল।

নাসরীন জাহান যখন তাঁর ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসে নারীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা তুলে ধরেন, তখন অনেকে একে কেবল ‘নারীর জবানবন্দি’ বলে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কোনো পুরুষ লেখক করলে তাঁর কর্মকে ‘কালজয়ী জীবনদর্শন’ হিসেবে প্রচার করা হয়।

নারী সাহিত্যে যা লেখা হয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যা ‘লেখা হয় না’ বা আড়ালে থাকে।

নারীর সাহিত্যকে কেবল নারী পাঠকদের জন্য পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করারও এক ধরনের বাণিজ্যিক অবদমন থাকে। মার্গারেট অ্যাটউড যখন ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ লিখেছিলেন, তখন অনেক সমালোচক একে কেবল ‘নারীবাদী ভীতি’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন; অথচ এটি ছিল একটি নিখুঁত রাজনৈতিক ডিস্টোপিয়া, যা আজ সারা বিশ্বের স্বৈরাচারী কাঠামোর বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ঢাল।

​বাংলাদেশে অমর একুশে বইমেলায় অনেক সময় নারী লেখকদের বইকে ‘রোমান্টিক’ বা ‘আবেগপ্রবণ’ ক্যাটাগরিতে ফেলে প্রচার করা হয়, যা তাঁদের সিরিয়াস বা তাত্ত্বিক লেখাকে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। এছাড়া গৃহবাস ও নিজস্ব একটি ঘরের অভাব, সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলে সাহিত্য করা নারীর জন্য এক নিরন্তর সংগ্রামের দিকটিও যেন থেকে যায় উপেক্ষায়।

ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ‘এ রুম অব ওয়ানস ওউন’ প্রবন্ধে পরিষ্কার বলেছিলেন যে শেক্সপিয়রের যদি একজন প্রতিভাবান বোন থাকত, তবে গৃহস্থালির চাপে তাঁর প্রতিভা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো। তাঁর পর্যবেক্ষণ নির্মম সত্য। আজও সিলভিয়া প্লাথের মতো লেখিকাদের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সৃজনশীলতা ও মাতৃত্বের দ্বন্দ্বে তাঁদের কতটা চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী লেখককে দিনের সিংহভাগ সময় গৃহকর্মে ব্যয় করার পর চালাতে হয় সাহিত্যকর্ম। সুফিয়া কামাল, রাবেয়া খাতুনরা তাঁদের সাহিত্যচর্চার জন্য অনেক সামাজিক ও পারিবারিক বাধা ডিঙিয়েছেন, যা তাঁর সমসাময়িক পুরুষ লেখকদের করতে হয়নি।

এছাড়া নারী সাহিত্যকে নানা প্রতিষ্ঠান, সম্পাদক ও প্রকাশকের ‘বড়লাটতান্ত্রিকতার’ মধ্য দিয়েও যেতে হয়। এমনকি পুরস্কার ও প্রচারণার নিয়ন্ত্রণ যখন নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তখন স্বাধীন নারীস্বর পড়ে যায় মাইনোরিটির দায়সারা প্রক্রিয়ায়। একজন কাউকে দিয়ে পরিস্থিতি সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার প্রয়াস বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে বিশেষ চর্চিত।

প্রায়শই কথা ওঠে ‘লিটারেরি গ্রুপিজম’ এ দেশে প্রবল বলেই সিন্ডিকেট নিপীড়নের কবলে পড়ে অনেক মেধাবী লেখিকাই নিষ্ক্রিয় হয়েছেন সাহিত্য করার মনোবাসনা থেকে। এর সঙ্গে রয়েছে সাইবার বুলিং ও সেলফ-সেন্সরশিপের সংকট। ডিজিটাল যুগে নারীর চরিত্রহনন করাই হলো তাকে থামিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ। ব্রিটিশ লেখিকা জে. কে. রাউলিং যখন তাঁর নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক মত প্রকাশ করেছিলেন, তখন তাঁকে যে পরিমাণ ‘অনলাইন হ্যারাসমেন্ট’ ও ‘ক্যানসেল কালচার’-এর শিকার হতে হয়েছে, তা অভূতপূর্ব।

এমনটি অন্য লেখকদের মনেও ভীতি সঞ্চার করে। বর্তমানে ফেসবুক-ভিত্তিক অনেক সাহসী নারী লেখক যখনই কোনো অসংগতি নিয়ে লেখেন, তখনই তাঁদের কমেন্ট বক্সে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও চারিত্রিক অপবাদ দেওয়া হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অপদস্থ হওয়া থেকে বাঁচতে অনেক লেখিকা এখন বিতর্কিত কিন্তু জরুরি বিষয়গুলো এড়িয়ে চলেন, যা সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

​বর্তমান সময়ের সাহিত্য কেবল ‘অশ্রু ও অভিযোগের’ গণ্ডি পেরিয়ে এক সাহসী ‘প্রতিবাদ ও নির্মাণের’ স্তরে উন্নীত হয়েছে, যেখানে নারীর কলমে মূর্ত হচ্ছে শরীর, যৌনতা, ইতিহাস এবং সমকালীন বিশ্বরাজনীতি। নারীরা সাহিত্যে তাঁদের কথা বলতে পেরেছেন বলেই সাহিত্যে নারীর যৌনতা ও আকাঙ্ক্ষার স্বাভাবিকীকরণও ঘটছে।

বর্তমানে নারীর প্রেম ও কামনার বিষয়টিকে অপরাধবোধ বা লুকোছাপা থেকে বের করে এনে স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি হিসেবে তুলে ধরার প্রক্রিয়াটি নারীর সাহিত্য দিয়েই এসেছে। এ প্রসঙ্গে আকিমুন রহমানের ‘রক্ত পুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’ উপন্যাসটির প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। উপন্যাসটি নারীর কামনা জর্জরিত মনের এমন এক বিকৃতির উপাখ্যান, যা পুরুষের বোধেও অস্বস্তি জাগায়। নারী এখন আর নিখুঁত ‘দেবী’ নয়; সে ভুল করে, সে স্বার্থপর হতে পারে, হতে পারে যুদ্ধ, রাজনীতি, ডিস্টোপিয়া এবং অস্তিত্ববাদের প্রধান কারিগরও। নারীকে এই শক্তিমান ‘মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করাটাই নারী লেখকদের সবচেয়ে বড় অবদান।

​যত সময় যাচ্ছে নারীর সাহিত্য প্রশংসিত হচ্ছে, মিলছে স্বীকৃতিও। পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যেও ঘটছে এমনটা। দক্ষিণ কোরিয়ার হান কাং যখন শরীরের ট্রমাকে কেন্দ্র করে নোবেল জয় করেন কিংবা গীতাঞ্জলি শ্রী যখন প্রান্তিক জনপদের গল্প শুনিয়ে আন্তর্জাতিক বুকার ছিনিয়ে নেন, তখন তা প্রমাণ করে যে অপেক্ষাকৃত অধিক অন্দরে থাকা নারী কণ্ঠস্বরও এখন বিশ্বমঞ্চে অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশ এখনো অতদূর যেতে না পারলেও শাহীন আখতার বা সেলিনা হোসেনের মতো লেখিকারা ইতিহাসের নির্মোহ বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন; তরুণ প্রজন্মের লেখিকারা অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের বাজারে করে নিচ্ছেন স্থান।

বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ এবং ই-বুক প্রকাশনার চিরাচরিত ‘দ্বারপাল’ বা গেটকিপিং প্রথা ভেঙে দিয়েছে; যার ফলে তৃণমূলের একজন নারীর সাহিত্যও আজ সরাসরি বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়া সহজ। আজ আর নারী কেবল ঘরোয়া সংকটে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো জটিল বিষয়েও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেওয়ার সঙ্গে আঁকড়ে রাখতে পারছে কলম। কিন্তু সভ্যতার এই বিবর্তন পুরোপুরি নারীর ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’র প্রতি সমতায় ন্যায় রক্ষা করছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

নিশ্চিত হওয়া যায় না আরও শত বর্ষ পার হলেও নারীর সাহিত্য আর পুরুষের সাহিত্য সমসংখ্যায় পৌঁছাতে পারবে কি না। তবু এটুকুও কম আশাব্যঞ্জক নয়—বর্তমানে সাহিত্য কিছুটা হলেও ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ তকমায় যাচাই না হয়ে, বরং কেবল ‘সাহিত্য’ হিসেবে মূল্যায়িত হয়ে অন্দর থেকে পৌঁছে যাচ্ছে পুরো বিশ্বে। সময়ের প্রবাহে হয়তো কিছুটা বদল হয়ে উঠবে পুরোটা। যিনি লেখেন তিনি লেখক হয়ে উঠবেন, তাকে ‘লেখিকা’ বলে ‘অপর’ অথবা ‘বিশেষ’ করে তুলবার প্রয়োজন হবে না; এবং নারী বলবে:

​‘I am not a female writer. I am a writer who happens to be a woman, and the world is finally learning to read the story, not the gender.’

লেখক: গল্পকার ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

সম্পর্কিত