রাতুল আল আহমেদ

যখন থেকে পড়তে শিখেছি, তখন থেকেই বই নিয়ে বিশেষ ছুৎমার্গের বালাই ছিল না আমার মধ্যে। ক্লাস সিক্সে পড়ি, সে সময়ে এক আত্মীয়ের বাড়ি গেলাম। বুকশেলফে রাখা বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখছি, চোখ পড়ল কালবেলা নামে এক উপন্যাসের ওপর। হাতে নিতেই প্রায় ছোঁ মেরে আমার আত্মীয় বইটি তুলে নিলেন। ‘এসব বড়দের বই, পড়লে মানে বুঝবে না এসবের’। এভাবেই আমাদের অনেকের ‘বড়দের বই’য়ের সঙ্গে পরিচয়।
সন্দেহের অবকাশ নেই যে বারণ করার জন্যই হোক আর কৌতূহলী প্রবৃত্তি, আমি কিছুদিনের মধ্যেই ‘কালবেলা’ ম্যানেজ করে পড়ে ফেলেছিলাম। সে সময় অনেককিছুর পাশাপাশি এটাও বুঝেছিলাম, বই কিন্তু কেবল পড়ার জন্য না, বরং ঘরসজ্জারও অনুসঙ্গ।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এসে তা সম্ভবত আরও বেড়েছে। দেখবেন, কফিশপের টেবিলে রাখা বইটা এখন হয়তো পড়ার জন্য নয়, বরং সামান্য তেরছা করে রাখা—যাতে মলাটটা স্পষ্ট বোঝা যায়, লেখকের নামটা যেন আলোকচিত্রের কেন্দ্রে থাকে। বইটা যেন সেখানে মৌন হয়ে নেই, বরং মালিকের হয়ে এলান করছে— ‘দেখ, আমার কেমন রুচি।’
ঠিক এই বিন্দুতেই বইয়ের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের আদিম সম্পর্কটা বদলে যায়। বই তখন আর নিছক অক্ষরের সমষ্টি থাকে না, হয়ে ওঠে একটা আয়না—যেখানে আমরা নিজেদের সেই আদলটাকে দেখতে চাই, যা হয়তো আমরা এখনো হয়ে উঠতে পারিনি।
এই বদলটা খুব হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে আছে সময়ের এক ধীর, অথচ নিরবচ্ছিন্ন অদৃশ্য চাপ।
আমাদের চারপাশে এখন এমন এক বিনোদনের জগৎ, যেখানে অপেক্ষা করার কোনো ঘর নেই। ভিডিও বোতাম টিপলেই শুরু, আঙুলের ডগায় স্ক্রল করলেই নতুন দৃশ্য, একটু থামলেই অন্য কোনো উত্তেজনা। আমাদের মস্তিষ্ক চটজলদি পুরস্কার পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সে শিখছে, আনন্দ মানেই তাৎক্ষণিক কিছু।
অথচ বই ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। বইয়ের পাতা খুললে প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা প্রায়ই কিছুই দেয় না—না কোনো চটকদার উত্তেজনা, না কোনো নগদ প্রাপ্তি। সে বরং দাবি করে—সময় দাও, মগ্ন হও, খানিকটা ধৈর্য ধরো। আর এ ধৈর্যটাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য বস্তু। ফলে, বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা অনেক ক্ষেত্রে আত্মিক না হয়ে হয়ে উঠছে প্রতীকী। আমরা বইকে আর ধারণ করছি না, বইকে ব্যবহার করছি।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—এই ব্যবহারের লক্ষ্য কী? সম্ভবত এক ধরণের সামাজিক মর্যাদা।
সমাজে আজও ‘বইপড়া মানুষ’ মানেই এক বিশেষ গাম্ভীর্য, একটু গভীরতা, একটু ‘অন্যরকম’ কিছু। এই ভাবমূর্তিটা আজও বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু সেই গভীরতায় পৌঁছানোর পথটা দীর্ঘ এবং শ্রমসাধ্য। তাই আমরা অনেক সময় শর্টকাট খুঁজি।
বইয়ের গহীনে না ঢুকে আমরা তার অবয়বটাকে আঁকড়ে ধরি। বইয়ের তাক, মলাট কিংবা সুন্দর করে তোলা ছবি—সব মিলিয়ে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় তৈরি করি। যেন বইটা আর জ্ঞানের ফোয়ারা নয়, বরং আধুনিক সমাজের এলিট পাসপোর্ট।
তবে এই বিবর্তনকে পুরোপুরি ‘ভান’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়তো ঠিক হবে না। এর মধ্যে দুঃখজনক সত্যও লুকিয়ে আছে।
মানুষের একটা বিচিত্র স্বভাব আছে—সে অনেক সময় নিজের কাঙ্ক্ষিত সংস্করণের অভিনয় করতে করতে একসময় সেই সত্তাটাকেই ছুঁয়ে ফেলে। যে তরুণটি আজ কফিশপে শুধু ছবি তোলার জন্য বই খুলছে, তার অবচেতনেও কোথাও হয়তো একটা অস্বস্তি কাজ করে। সে জানে, সে আসলে পড়ছে না।
এই লুকোনো অস্বস্তিটাই কোনো কোনো নিঝুম দুপুরে তাকে বাধ্য করে মলাট উল্টে ভেতরে ঢুকতে। হয়তো সেই অস্বস্তি থেকেই সে পড়ে ফেলে দু-চার পাতা। অভিনয় আর বাস্তবের মাঝখানে যে সূক্ষ্ম ফাটল থাকে, সেই পথ দিয়েই কখনো কখনো সত্যের আলো প্রবেশ করে। সবাই পড়ে না, কিন্তু কেউ কেউ নিশ্চয়ই পড়ে।
তবুও একটা বড় বিপদের ছায়া থেকেই যায়। যদি এই অভিনয়টাই আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়? যদি বইয়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা চিরকাল বাহ্যিকই থেকে যায়?
তাহলে বই আর আমাদের বদলাবে না। আমরা বইকে সাজিয়ে রাখব, কিন্তু বই আমাদের সাজাতে পারবে না—যেভাবে একটা ভালো বই ধীরলয়ে একজন মানুষের ভেতরটা আমূল বদলে দেয়। তখন বই হয়ে উঠবে সুন্দর আসবাব, ঘর সাজানোর সামগ্রী মাত্র। আর প্রকৃত জ্ঞান? সে হয়তো অভিমানী কোনো নদীর মতো পথ বদলে দূরে চলে যাবে।
ফলে প্রশ্ন করা যেতেই পারে, আমরা কি সত্যিই পড়তে চাই, নাকি বইপড়া মানুষ হিসেবে কেবল পরিচিত হতে চাই? এই দুটির মাঝখানের যে ব্যবধান, সেটাই ঠিক করে দেয় বই আমাদের জীবনে কোথায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মলাটের জৌলুসে, নাকি শব্দের নিঃশব্দ বিপ্লবে।

যখন থেকে পড়তে শিখেছি, তখন থেকেই বই নিয়ে বিশেষ ছুৎমার্গের বালাই ছিল না আমার মধ্যে। ক্লাস সিক্সে পড়ি, সে সময়ে এক আত্মীয়ের বাড়ি গেলাম। বুকশেলফে রাখা বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখছি, চোখ পড়ল কালবেলা নামে এক উপন্যাসের ওপর। হাতে নিতেই প্রায় ছোঁ মেরে আমার আত্মীয় বইটি তুলে নিলেন। ‘এসব বড়দের বই, পড়লে মানে বুঝবে না এসবের’। এভাবেই আমাদের অনেকের ‘বড়দের বই’য়ের সঙ্গে পরিচয়।
সন্দেহের অবকাশ নেই যে বারণ করার জন্যই হোক আর কৌতূহলী প্রবৃত্তি, আমি কিছুদিনের মধ্যেই ‘কালবেলা’ ম্যানেজ করে পড়ে ফেলেছিলাম। সে সময় অনেককিছুর পাশাপাশি এটাও বুঝেছিলাম, বই কিন্তু কেবল পড়ার জন্য না, বরং ঘরসজ্জারও অনুসঙ্গ।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এসে তা সম্ভবত আরও বেড়েছে। দেখবেন, কফিশপের টেবিলে রাখা বইটা এখন হয়তো পড়ার জন্য নয়, বরং সামান্য তেরছা করে রাখা—যাতে মলাটটা স্পষ্ট বোঝা যায়, লেখকের নামটা যেন আলোকচিত্রের কেন্দ্রে থাকে। বইটা যেন সেখানে মৌন হয়ে নেই, বরং মালিকের হয়ে এলান করছে— ‘দেখ, আমার কেমন রুচি।’
ঠিক এই বিন্দুতেই বইয়ের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের আদিম সম্পর্কটা বদলে যায়। বই তখন আর নিছক অক্ষরের সমষ্টি থাকে না, হয়ে ওঠে একটা আয়না—যেখানে আমরা নিজেদের সেই আদলটাকে দেখতে চাই, যা হয়তো আমরা এখনো হয়ে উঠতে পারিনি।
এই বদলটা খুব হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে আছে সময়ের এক ধীর, অথচ নিরবচ্ছিন্ন অদৃশ্য চাপ।
আমাদের চারপাশে এখন এমন এক বিনোদনের জগৎ, যেখানে অপেক্ষা করার কোনো ঘর নেই। ভিডিও বোতাম টিপলেই শুরু, আঙুলের ডগায় স্ক্রল করলেই নতুন দৃশ্য, একটু থামলেই অন্য কোনো উত্তেজনা। আমাদের মস্তিষ্ক চটজলদি পুরস্কার পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সে শিখছে, আনন্দ মানেই তাৎক্ষণিক কিছু।
অথচ বই ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। বইয়ের পাতা খুললে প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা প্রায়ই কিছুই দেয় না—না কোনো চটকদার উত্তেজনা, না কোনো নগদ প্রাপ্তি। সে বরং দাবি করে—সময় দাও, মগ্ন হও, খানিকটা ধৈর্য ধরো। আর এ ধৈর্যটাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য বস্তু। ফলে, বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা অনেক ক্ষেত্রে আত্মিক না হয়ে হয়ে উঠছে প্রতীকী। আমরা বইকে আর ধারণ করছি না, বইকে ব্যবহার করছি।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—এই ব্যবহারের লক্ষ্য কী? সম্ভবত এক ধরণের সামাজিক মর্যাদা।
সমাজে আজও ‘বইপড়া মানুষ’ মানেই এক বিশেষ গাম্ভীর্য, একটু গভীরতা, একটু ‘অন্যরকম’ কিছু। এই ভাবমূর্তিটা আজও বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু সেই গভীরতায় পৌঁছানোর পথটা দীর্ঘ এবং শ্রমসাধ্য। তাই আমরা অনেক সময় শর্টকাট খুঁজি।
বইয়ের গহীনে না ঢুকে আমরা তার অবয়বটাকে আঁকড়ে ধরি। বইয়ের তাক, মলাট কিংবা সুন্দর করে তোলা ছবি—সব মিলিয়ে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় তৈরি করি। যেন বইটা আর জ্ঞানের ফোয়ারা নয়, বরং আধুনিক সমাজের এলিট পাসপোর্ট।
তবে এই বিবর্তনকে পুরোপুরি ‘ভান’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়তো ঠিক হবে না। এর মধ্যে দুঃখজনক সত্যও লুকিয়ে আছে।
মানুষের একটা বিচিত্র স্বভাব আছে—সে অনেক সময় নিজের কাঙ্ক্ষিত সংস্করণের অভিনয় করতে করতে একসময় সেই সত্তাটাকেই ছুঁয়ে ফেলে। যে তরুণটি আজ কফিশপে শুধু ছবি তোলার জন্য বই খুলছে, তার অবচেতনেও কোথাও হয়তো একটা অস্বস্তি কাজ করে। সে জানে, সে আসলে পড়ছে না।
এই লুকোনো অস্বস্তিটাই কোনো কোনো নিঝুম দুপুরে তাকে বাধ্য করে মলাট উল্টে ভেতরে ঢুকতে। হয়তো সেই অস্বস্তি থেকেই সে পড়ে ফেলে দু-চার পাতা। অভিনয় আর বাস্তবের মাঝখানে যে সূক্ষ্ম ফাটল থাকে, সেই পথ দিয়েই কখনো কখনো সত্যের আলো প্রবেশ করে। সবাই পড়ে না, কিন্তু কেউ কেউ নিশ্চয়ই পড়ে।
তবুও একটা বড় বিপদের ছায়া থেকেই যায়। যদি এই অভিনয়টাই আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়? যদি বইয়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা চিরকাল বাহ্যিকই থেকে যায়?
তাহলে বই আর আমাদের বদলাবে না। আমরা বইকে সাজিয়ে রাখব, কিন্তু বই আমাদের সাজাতে পারবে না—যেভাবে একটা ভালো বই ধীরলয়ে একজন মানুষের ভেতরটা আমূল বদলে দেয়। তখন বই হয়ে উঠবে সুন্দর আসবাব, ঘর সাজানোর সামগ্রী মাত্র। আর প্রকৃত জ্ঞান? সে হয়তো অভিমানী কোনো নদীর মতো পথ বদলে দূরে চলে যাবে।
ফলে প্রশ্ন করা যেতেই পারে, আমরা কি সত্যিই পড়তে চাই, নাকি বইপড়া মানুষ হিসেবে কেবল পরিচিত হতে চাই? এই দুটির মাঝখানের যে ব্যবধান, সেটাই ঠিক করে দেয় বই আমাদের জীবনে কোথায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মলাটের জৌলুসে, নাকি শব্দের নিঃশব্দ বিপ্লবে।

কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের একটি কবিতার দুটি পংক্তি—‘খোদা আমাকে মানুষ বানালো, আমি হতে চেয়েছিলাম বই।’ হ্যাঁ একজন সংবেদনীল, সৃষ্টিপ্রবণ মানুষের কাছে বইয়ের অস্তিত্ব একটা মানব জনমের চেয়েও অধিক মূল্যবান।
১ ঘণ্টা আগে
প্রত্যেকেরই শৈশব, কৈশোর বা যৌবনে চুরির ইতিহাস থাকে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে প্রতিবেশীর স্ত্রী এসে দুর্গাকে একটি পুঁতির মালা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করেন। আর সেই চুরির প্রবণতাকে উৎসাহ দেওয়ার অপরাধে সর্বজয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেন। দুর্গা যথারীতি সেই অভিযোগকে অস্বীকার করে।
২ ঘণ্টা আগে
জেমস বন্ড চরিত্রের স্রষ্টা, প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিং ১৯৫৬ সালে ‘কীভাবে বেস্টসেলার বই লিখতে হয়’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, বেস্টসেলার বই লেখার খুব সহজ একটা রেসিপি আছে। সেটি হচ্ছে পৃষ্ঠা ওলটানোর কৌশল। অর্থাৎ গল্পটি এমনভাবে বলতে হবে, যাতে পাঠক পরের পৃষ্ঠা ওলটাতে বাধ্য হয়।
৪ ঘণ্টা আগে
ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর দশম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
৭ ঘণ্টা আগে