বই আলোচনা

বাংলা পার্টিশন সাহিত্যে নতুন সংযোজন

লেখা:
লেখা:
সেলিম সারোয়ার

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ১৬: ৫৪
পাকিস্তান আন্দোলন: জিন্নাহ-মওদুদী-মাদানীদের ভূমিকা; পার্টিশন বিতর্কের পুনর্পাঠ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: লেখক

পাকিস্তান আন্দোলন শেষে ভারতবর্ষ ভেঙে পৃথক দেশ সৃষ্টি প্রায় আট দশক পুরোনো ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে বিস্তর লেখা হয়েছে বহু ভাষায়, বহু দেশে।

এ বিষয়ে আরেকটি নতুন বই বিশেষ খবর নয় মোটেও। কিন্তু ভারতভাগ দক্ষিণ এশিয়ার জনজীবনে, ইতিহাসে খুবই বড় ঘটনা। কারণ এখনও দেশভাগকালীন ঘটনাবলির অনেক দিক খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয়নি। অন্তত বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে এই বইটি (পাকিস্তান আন্দোলন: জিন্নাহ-মওদুদী-মাদানীদের ভূমিকা; পার্টিশন বিতর্কের পুনর্পাঠ, প্রথমা, ২০২৬) একটু বাড়তি মনোযোগ দিতে বলছে।

পাকিস্তান ও ভারতে পার্টিশন সাহিত্যের চর্চা যত ব্যাপক, বাংলাদেশে সেরকম নয়। এখানে দেশভাগের যেকোনো আলাপ ভারী হয়ে থাকে গান্ধী, জিন্নাহ, নেহরু প্রমুখকে নিয়ে। ভারত ভাগের সময়ে বাংলা তথা ভারতবর্ষজুড়ে ইসলামপন্থী দাবিদার দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে সামান্যই আলাপ হয়েছে এখানে। এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় সেটাই।

১৯৪০ এর আগে পরের তিন-চারটা বড় মুসলমান-প্রধান দলের ভূমিকা নিয়ে এই গ্রন্থে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে; যার মধ্যে আছে মুসলিম লীগ ছাড়াও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, জামায়াতে ইসলামী ইত্যাদি দল। এই তিন দলের মুখ্য নেতাদের তখনকার বক্তৃতা-বিবৃতিকে ভিত্তি করে সেসময় মুসলমান সমাজে দেশভাগ প্রশ্নে যে বিতর্ক দেখা দেয়, তার বৃত্তান্ত বলা যায় এই গ্রন্থ।

বইটির শুরু পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমি আলোচনার মাধ্যমে। ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধান হিসেবে যদি ‘পাকিস্তান আন্দোলন’কে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে খুঁজে দেখা দরকার এই সমস্যার পটভূমি কী। লেখক বিস্তারিতভাবে সেটা ব্যাখ্যা করেছেন।

গ্রন্থের শুরুতে তিনটি উপ-অধ্যায়ে মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র প্রত্যাশার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি আলোচনা করা হয়েছে। লেখকের দাবি, যদিও দেশভাগের জন্য জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের ভূমিকাই প্রধান, কিন্তু এর জন্য ভারতীয় সমাজে নানা ধরনের সক্রিয় পটভূমি তৈরি হয়েই ছিল।

এরপর গ্রন্থের মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে ভারতভাগ প্রশ্নে মুসলিম লীগ ও জিন্নাহ, জমিয়ত ও মাওলানা মাদানি এবং জামায়াতে ইসলামী ও মাওলানা মওদুদীর মতামত আলোচিত হয়েছে পৃথক তিনটি অধ্যায়ে। এসব আলোচনায় মুসলমান সমাজের এই তিন ঘরানার রাজনৈতিক অবস্থানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তুলনামূলকভাবে। প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে কবি ইকবালের তখনকার মতামত—যাঁকে ‘পাকিস্তান’ কল্পনার অন্যতম আদি স্বাপ্নিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইতিহাসের ওই সময়ে ভারতবর্ষজুড়ে মুসলমান সমাজে ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের যে তীব্র বিতর্ক ও সংঘাত চলছিল, লেখক তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।

পাকিস্তান আন্দোলন বিতর্কে মুসলমান-প্রধান দলগুলোর ভূমিকা আলোচনা করতে গিয়ে পাঞ্জাবকেন্দ্রিক খাকসার পার্টি, মজলিসে আহরার, বঙ্গের কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে জিন্নাহ ও লীগের সংঘাতপূর্ণ অবস্থার চিত্রও পাওয়া যায় এই গ্রন্থে। সেসময় বাংলায় বামপন্থীরা এবং নমশূদ্র সম্প্রদায় পাকিস্তান আন্দোলনে কীভাবে ভূমিকা রেখেছিল সেসবও সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে গ্রন্থের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা গেছে জিন্নাহ ও লীগের বিপরীতে মাওলানা মাদানী ও মাওলানা মওদুদীর দেশভাগ চিন্তার বৈপরীত্য তুলে ধরা। এরকম একটা আলোচ্য বিষয় নির্ধারণের কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে বইয়ের ভূমিকায়। লেখকের মতে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যেসব সংগঠন ও নেতৃবৃন্দকে পাকিস্তান আন্দোলন ও দেশভাগ নিয়ে নবআঙ্গিকে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতে দেখা গেছে, তাদের আট দশক আগের আদি নেতাদের রাজনৈতিক-দার্শনিক অবস্থান খতিয়ে দেখতে এবং দেখাতে চেয়েছেন তিনি।

এটা দেখাতে গিয়ে এখানে মাওলানা মাদানী ও মাওলানা মওদুদীর গ্রন্থরাজি থেকে ব্যাপক উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। পুরো গ্রন্থ লেখা হয়েছে বিপুল রেফারেন্স ও টীকাসহ। টীকাগুলোতে অনেক সময় বিবাদিত অনেক ঐতিহাসিক ঘটনায় নিজের মতামতও দিয়েছেন লেখক।

বইটির শেষে নির্ঘণ্ট রয়েছে। তবে এই গ্রন্থের একটা সীমাবদ্ধতা হলো আলোচ্য বিষয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধান এটা। ২২৫ পৃষ্ঠার মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলন প্রশ্নে মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক বিতর্ককে তুলে ধরা দুরূহ। তবে এই গ্রন্থের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের পার্টিশন সাহিত্যে এ বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্কের সূচনা ঘটল বলা যায়।

লেখক: একটা বেসরকারি সংগঠনে কর্মরত

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত