জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কবি নজরুলের সন্তান কাজী অনিরুদ্ধ ছিলেন খ্যাতনামা গিটারিস্ট, আমরা কি জানি

আজ ২৪ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্র খ্যাতনামা গিটারিস্ট ও সুরকার কাজী অনিরুদ্ধের জন্মদিন। সুরের আকাশে গিটারযন্ত্রের শিল্পসাধনায় অনিরুদ্ধ আপন প্রতিভায় ছিলেন ভাস্বর। কিন্তু আমরা ক'জনই বা এই গুণী মানুষটির ব্যাপারে জানি? চলুন জেনে নিই এই নিভৃতচারী শিল্পীর কর্মজীবন ও সংগীতে তাঁর অবদানের কথা।

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ২০: ১৪
কাজী অনিরুদ্ধ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

কাজী অনিরুদ্ধের জন্ম ১৯৩১ সালের ২৪ ডিসেম্বর কলকাতায়। আদর করে বাবা নজরুল তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘লেনিন’। মা প্রমীলা দেবী ডাকতেন ‘নিনি’ নামে। বাড়িতে সব সময় গান-বাজনার পরিবেশ থাকায় ছোটবেলা থেকেই সুরের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল ঝোঁক। পিতার কাছেই তাঁর সংগীত শেখার হাতেখড়ি। তবে তিনি কণ্ঠের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন বাদ্যযন্ত্রকে। কলেজে পড়ার সময় তিনি প্রখ্যাত বাঙালি গিটারবাদক সুজিত নাথের কাছে গিটার শিক্ষার তালিম নেন।

কিন্তু সেই সময় নজরুল পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক অনটন। সঙ্গে যুক্ত হয় পিতা-মাতার অসুস্থতা। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর প্রথাগত সংগীত শিক্ষায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও, সুরের নেশা তাকে ছাড়েনি। ১৯৪৭ সালে অল ইন্ডিয়া মিউজিক কম্পিটিশনে অংশ নেন এবং ইনস্ট্রুমেন্টাল বা যন্ত্রসংগীত শাখায় প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন এই গুণী শিল্পী। এটি ছিল তাঁর সংগীত জীবনের প্রথম বড় স্বীকৃতি।

সংগীতচর্চা করছেন কাজী অনিরুদ্ধ। সংগৃহীত ছবি
সংগীতচর্চা করছেন কাজী অনিরুদ্ধ। সংগৃহীত ছবি

এরপর ১৯৫৩ সালে কাজী অনিরুদ্ধের জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়। ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’র উদ্যোগে অসুস্থ পিতা ও মাতার চিকিৎসার জন্য তিনি সঙ্গী হয়ে সমুদ্রপথে লন্ডন ও ভিয়েনায় যান। প্রায় দেড় বছর তিনি বিদেশে অবস্থান করেন। এই সময়টা তিনি শুধু পিতার চিকিৎসার কাজে ব্যয় করেননি, বরং পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি গিটার, পিয়ানো, অ্যাকর্ডিয়ন ও পারকাসনের সমন্বয়ে একটি অর্কেস্ট্রা দলের সদস্য হন এবং নিজের লব্ধ জ্ঞান কাজে লাগান।

সে সময়ে স্লাইড গিটার ছিল দারুণ অভিজাত ও জনপ্রিয় একটি বাদ্যযন্ত্র। কাজী অনিরুদ্ধ এই যন্ত্রটিতে দারুণ দক্ষতা অর্জন করেন। শ্রোতাদের কাছে তাঁর গিটার পরিচিত ছিল ‘সিংগিং গিটার’ ও ‘গোল্ডেন গিটার’ নামে। তাঁর আঙুলের ছোঁয়ায় গিটারের তারগুলো যেন কথা বলত। স্লাইড গিটার বাজানোতে তিনি এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে তাঁর রেকর্ডগুলোর নাম দেওয়া হতো ‘কাজী অনিরুদ্ধ অ্যান্ড হিজ সিংগিং গিটার’ বা ‘কাজী অনিরুদ্ধ অ্যান্ড হিজ গোল্ডেন গিটার’। বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিদেশী বাদ্যযন্ত্র গিটারকে পৌঁছে দিয়েছিলেন জনপ্রিয়তার অন্যতম শীর্ষে। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের জনপ্রিয় গিটারিস্টও ছিলেন তিনি। বেতার অনুষ্ঠান 'ফিলার'-এ তাঁর গিটারের সুর বাজত।

‘সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি’। সংগৃহীত ছবি
‘সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি’। সংগৃহীত ছবি

কাজী অনিরুদ্ধ বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি ‘এইচএমভি’-র সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি বহু গানের সুর সংযোজন ও মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টের কাজ করেছেন। এইচএমভি থেকে প্রকাশিত তাঁর বেশকিছু লং প্লে (এলপি) ও এক্সটেন্ডেড প্লে (ইপি) রেকর্ড দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। শুধু ইপি বা এলপি নয়, তিনি বেশ কিছু বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও সংগীত পরিচালনার কাজও করেছেন। তাঁর সুরেলা গিটারের মূর্ছনা সেই সময়ের বহু শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে।

তবে উপমহাদেশের সংগীত জগতে কাজী অনিরুদ্ধের অন্যমত অবদান হলো পিতা কাজী নজরুল ইসলামের গানগুলোর আসল সুর রক্ষায় কাজ করা। কাজী নজরুল ইসলাম যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তাঁর বহু গানের সুর হারিয়ে যাওয়ার বা বিকৃত হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। সেই সময় কাজী অনিরুদ্ধ বাবার গানের ‘স্বরলিপি’ বা নোটেশন তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। তিনি বাবার গানের প্রমিত সুর বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত স্বরলিপি গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি’ অন্যতম। তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নজরুলের গান আসল সুরে গাইতে পারে।

অত্যন্ত প্রতিভাবান এই শিল্পী খুব বেশি দিন সুর-সাধনা করার সুযোগ পাননি। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি পরলোকগমন করেন। অর্থাৎ কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর দুই বছর আগেই কাজী অনিরুদ্ধ পৃথিবীর মায়াত্যাগ করেন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত