আরিফ রহমান

এই উপমহাদেশের ইতিহাস জটিল। সেই ইতিহাসে রাজনৈতিক সহিংসতা কম ঘটেনি। এই ইতিহাসের বাঁকবদলগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই আন্দাজ হয়। কিন্তু ইতিহাস তো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমাহার নয়। এটি বরং দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। সেখানে অন্তর্নিহিত থাকে জনগোষ্ঠীর অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির স্পৃহা। সহুল আহমদ তার ইতিহাস ও বয়ান: পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান গ্রন্থে ঠিক এই জায়গাটিতেই হাত দিয়েছেন। গ্রন্থিক প্রকাশন থেকে আসা এই বইটি প্রচলিত আধিপত্যশীল বয়ানের বিনির্মাণ এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পাঠ। লেখক অত্যন্ত সাহসিকতা ও মুনশিয়ানার সাথে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এই তিনটি আপাত বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তকে একসূত্রে গেঁথেছেন।
পূর্বখণ্ড: শেকড়ের সন্ধান ও বয়ানের রাজনীতি
বইটির প্রথম ভাগ বা ‘পূর্বখণ্ড’ সাজানো হয়েছে পাকিস্তান আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চারটি মৌলিক ও গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ দিয়ে।
প্রথম অধ্যায় ‘পাকিস্তান’ থেকে ‘বাংলাদেশ’: দুই বাংলার বয়ানের রকমফের-এ লেখক নিপুণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে কলকাতার বিদ্বৎসমাজ এবং পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদীরা ভিন্ন ভিন্ন বয়ানে পাঠ করেছেন। কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা যেখানে পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘ভ্রম’ বা ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার বাইনারিতে দেখেছেন। একাত্তরকে সেই ‘ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের’ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সেখানে পূর্ব বাংলার মানুষ একে দেখেছেন তাদের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানীর রাজনীতি কীভাবে এই ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য দেন–তা তুলে ধরেছেন লেখক।
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা কায়েম করুন: পাকিস্তান আমলে বামপন্থি রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ’-এ সহুল আহমদ বাম ধারার রাজনীতির এক বস্তুনিষ্ঠ পাঠ হাজির করেছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বামপন্থিদের জেল-জুলুম, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের মতো নির্মম নিপীড়ন এবং মওলানা ভাসানীর কৃষক রাজনীতির নানা বাঁক অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে এই অধ্যায়ে। জাতীয়তাবাদের বিকাশে বামপন্থিদের যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক অবদান ছিল, তা মূলধারার ইতিহাস প্রায়শই এড়িয়ে যায়। লেখক এখানে সেই প্রান্তিক ও লড়াকু রাজনৈতিক স্বরগুলোকে সগৌরবে সামনে নিয়ে এসেছেন।
তৃতীয় অধ্যায় ‘দেশের সম্পদ দেশেই রাখুন: বিজ্ঞাপনে অসহযোগ আন্দোলন’ লেখকের কিছু অভিনব দিক এনেছেন। একাত্তরের মার্চ মাসে পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনগুলো কীভাবে স্বাধিকার আন্দোলন ও 'সোনার বাংলা'র রাজনৈতিক রেটরিককে ধারণ করেছিল তার চমৎকার ডিসকোর্স বিশ্লেষণ হাজির করেছেন তিনি। বুর্জোয়া ও ধনিক শ্রেণি কীভাবে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলনের সাথে নিজেদের একাত্ম করেছিল, এটি তার অনন্য দৃষ্টান্ত।
চতুর্থ অধ্যায়ে ‘যুগান্তর’-এর রাজনৈতিক কার্টুন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ভারতীয় বয়ান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কার্টুন বা ভিজ্যুয়াল মাধ্যম কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় বয়ানকে রূপ দিয়েছিল এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তা এই অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।
উত্তরখণ্ড: স্মৃতি, সহিংসতা এবং ইনসাফের সন্ধানে
বইটির ‘উত্তরখণ্ড’ আবর্তিত হয়েছে জেনোসাইড, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, স্মৃতি নির্মাণ এবং সদ্য সংঘটিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে। বইটির পঞ্চম অধ্যায় ‘জেনোসাইড, স্মৃতি ও রাজনীতি’-তে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে জেনোসাইডের স্মৃতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ক্ষমতা কীভাবে তার নিজস্ব বয়ান নির্মাণ করে এবং সুবিধামতো ইতিহাসকে স্মরণ বা বিস্মৃত হয়, তার এক নিখুঁত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই অধ্যায়।
ষষ্ঠ অধ্যায় ‘ইতিহাস বিকৃতি ও নির্মিতি: আইন, আর্কাইভ ও জাদুঘর’-এ বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে কীভাবে আইন, আদালত এবং জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট দলীয় বয়ানকে আধিপত্যশীল করা হয়েছিল, লেখক তার অকাট্য প্রমাণ হাজির করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ উপন্যাসের ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপ কিংবা সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের বিচার—এসব ঘটনা কীভাবে ইতিহাসচর্চাকে রুদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, তার বয়ান পাওয়া যায় এই অধ্যায়ে।
বইটির সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায় যথাক্রমে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সহিংসতাবিষয়ক বয়ানের রকমফের’ এবং ‘সহিংসতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও সাংগঠনিকতা’-তে লেখক ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ব্যবচ্ছেদ করেছেন। কীভাবে একটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিল, কীভাবে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সহিংসতার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল এবং কীভাবে আগের সব প্রতিষ্ঠিত বয়ানকে ধূলিসাৎ করে দিল—তার এক তাত্ত্বিক ও বাস্তবসম্মত বয়ান পাওয়া যায় এখানে। লেখক নিজেও এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় লেখাগুলোতে যেমন রয়েছে তাত্ত্বিক গভীরতা, তেমনি রয়েছে মাঠের উত্তাপ।
নবম অধ্যায় ‘সহিংসতা, পরিচয় এবং ক্রান্তিকালীন ইনসাফের সন্ধানে’। এখানে লেখক বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি একটি প্রস্তাবনা রেখেছেন। লেখক একে বলছেন ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা ক্রান্তিকালীন ইনসাফ। দশকের পর দশক ধরে চলা ‘খণ্ডিত শোকপালন’ এবং ‘মজলুমিয়াতের রাজনীতি’র দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কীভাবে সকল মজলুমের প্রতি ইনসাফ নিশ্চিত করতে হবে, তার কৌতুহলউদ্দিপক রূপরেখা তিনি এখানে এঁকেছেন।
শেষ অধ্যায় ‘জহির রায়হানের সৃষ্টিকর্মে ঐতিহাসিক ঘটনার বিচার’। এই অধ্যায়ে লেখক জহির রায়হানের 'স্টপ জেনোসাইড', 'সময়ের প্রয়োজনে' প্রভৃতি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইতিহাসের বিচার করার পদ্ধতিগত আলোচনা করেছেন।
বইটির একটি বড় বৈশিষ্ট হল সাবলীল অথচ কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী গদ্যশৈলী। ইতিহাস ও রাজনীতির মতো গুরুগম্ভীর ও জটিল বিষয় নিয়ে লেখা অথচ কোনো আড়ষ্টতা নেই। প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি প্রচুর তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন। তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব উদাহরণ এবং প্রামাণ্য দলিলের সন্নিবেশ বইটির গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সহুল আহমদের ‘ইতিহাস ও বয়ান’ বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর দৃষ্টিভঙ্গি। পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে একে অপরের বিরোধী বা অ্যান্টিথিসিস হিসেবে দেখেননি তিনি। তার বদলে এই ভূখণ্ডের মানুষের নিরন্তর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের এক অবিচ্ছিন্ন ধারা হিসেবে দেখার যে প্রস্তাব লেখক দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশেষ করে এই জনপদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার শেকড় সন্ধানে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। সমস্ত সতর্কতা সত্বেও বলা যায়— ইতিহাস ও বয়ান আগামী দিনের বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এক ধ্রুপদী গ্রন্থ হিসেবে নিজের স্থান করে নেবে।

এই উপমহাদেশের ইতিহাস জটিল। সেই ইতিহাসে রাজনৈতিক সহিংসতা কম ঘটেনি। এই ইতিহাসের বাঁকবদলগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই আন্দাজ হয়। কিন্তু ইতিহাস তো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমাহার নয়। এটি বরং দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। সেখানে অন্তর্নিহিত থাকে জনগোষ্ঠীর অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির স্পৃহা। সহুল আহমদ তার ইতিহাস ও বয়ান: পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান গ্রন্থে ঠিক এই জায়গাটিতেই হাত দিয়েছেন। গ্রন্থিক প্রকাশন থেকে আসা এই বইটি প্রচলিত আধিপত্যশীল বয়ানের বিনির্মাণ এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পাঠ। লেখক অত্যন্ত সাহসিকতা ও মুনশিয়ানার সাথে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এই তিনটি আপাত বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তকে একসূত্রে গেঁথেছেন।
পূর্বখণ্ড: শেকড়ের সন্ধান ও বয়ানের রাজনীতি
বইটির প্রথম ভাগ বা ‘পূর্বখণ্ড’ সাজানো হয়েছে পাকিস্তান আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চারটি মৌলিক ও গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ দিয়ে।
প্রথম অধ্যায় ‘পাকিস্তান’ থেকে ‘বাংলাদেশ’: দুই বাংলার বয়ানের রকমফের-এ লেখক নিপুণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে কলকাতার বিদ্বৎসমাজ এবং পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদীরা ভিন্ন ভিন্ন বয়ানে পাঠ করেছেন। কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা যেখানে পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘ভ্রম’ বা ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার বাইনারিতে দেখেছেন। একাত্তরকে সেই ‘ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের’ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সেখানে পূর্ব বাংলার মানুষ একে দেখেছেন তাদের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানীর রাজনীতি কীভাবে এই ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য দেন–তা তুলে ধরেছেন লেখক।
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা কায়েম করুন: পাকিস্তান আমলে বামপন্থি রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ’-এ সহুল আহমদ বাম ধারার রাজনীতির এক বস্তুনিষ্ঠ পাঠ হাজির করেছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বামপন্থিদের জেল-জুলুম, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের মতো নির্মম নিপীড়ন এবং মওলানা ভাসানীর কৃষক রাজনীতির নানা বাঁক অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে এই অধ্যায়ে। জাতীয়তাবাদের বিকাশে বামপন্থিদের যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক অবদান ছিল, তা মূলধারার ইতিহাস প্রায়শই এড়িয়ে যায়। লেখক এখানে সেই প্রান্তিক ও লড়াকু রাজনৈতিক স্বরগুলোকে সগৌরবে সামনে নিয়ে এসেছেন।
তৃতীয় অধ্যায় ‘দেশের সম্পদ দেশেই রাখুন: বিজ্ঞাপনে অসহযোগ আন্দোলন’ লেখকের কিছু অভিনব দিক এনেছেন। একাত্তরের মার্চ মাসে পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনগুলো কীভাবে স্বাধিকার আন্দোলন ও 'সোনার বাংলা'র রাজনৈতিক রেটরিককে ধারণ করেছিল তার চমৎকার ডিসকোর্স বিশ্লেষণ হাজির করেছেন তিনি। বুর্জোয়া ও ধনিক শ্রেণি কীভাবে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলনের সাথে নিজেদের একাত্ম করেছিল, এটি তার অনন্য দৃষ্টান্ত।
চতুর্থ অধ্যায়ে ‘যুগান্তর’-এর রাজনৈতিক কার্টুন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ভারতীয় বয়ান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কার্টুন বা ভিজ্যুয়াল মাধ্যম কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় বয়ানকে রূপ দিয়েছিল এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তা এই অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।
উত্তরখণ্ড: স্মৃতি, সহিংসতা এবং ইনসাফের সন্ধানে
বইটির ‘উত্তরখণ্ড’ আবর্তিত হয়েছে জেনোসাইড, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, স্মৃতি নির্মাণ এবং সদ্য সংঘটিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে। বইটির পঞ্চম অধ্যায় ‘জেনোসাইড, স্মৃতি ও রাজনীতি’-তে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে জেনোসাইডের স্মৃতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ক্ষমতা কীভাবে তার নিজস্ব বয়ান নির্মাণ করে এবং সুবিধামতো ইতিহাসকে স্মরণ বা বিস্মৃত হয়, তার এক নিখুঁত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই অধ্যায়।
ষষ্ঠ অধ্যায় ‘ইতিহাস বিকৃতি ও নির্মিতি: আইন, আর্কাইভ ও জাদুঘর’-এ বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে কীভাবে আইন, আদালত এবং জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট দলীয় বয়ানকে আধিপত্যশীল করা হয়েছিল, লেখক তার অকাট্য প্রমাণ হাজির করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ উপন্যাসের ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপ কিংবা সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের বিচার—এসব ঘটনা কীভাবে ইতিহাসচর্চাকে রুদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, তার বয়ান পাওয়া যায় এই অধ্যায়ে।
বইটির সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায় যথাক্রমে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সহিংসতাবিষয়ক বয়ানের রকমফের’ এবং ‘সহিংসতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও সাংগঠনিকতা’-তে লেখক ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ব্যবচ্ছেদ করেছেন। কীভাবে একটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিল, কীভাবে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সহিংসতার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল এবং কীভাবে আগের সব প্রতিষ্ঠিত বয়ানকে ধূলিসাৎ করে দিল—তার এক তাত্ত্বিক ও বাস্তবসম্মত বয়ান পাওয়া যায় এখানে। লেখক নিজেও এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় লেখাগুলোতে যেমন রয়েছে তাত্ত্বিক গভীরতা, তেমনি রয়েছে মাঠের উত্তাপ।
নবম অধ্যায় ‘সহিংসতা, পরিচয় এবং ক্রান্তিকালীন ইনসাফের সন্ধানে’। এখানে লেখক বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি একটি প্রস্তাবনা রেখেছেন। লেখক একে বলছেন ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা ক্রান্তিকালীন ইনসাফ। দশকের পর দশক ধরে চলা ‘খণ্ডিত শোকপালন’ এবং ‘মজলুমিয়াতের রাজনীতি’র দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কীভাবে সকল মজলুমের প্রতি ইনসাফ নিশ্চিত করতে হবে, তার কৌতুহলউদ্দিপক রূপরেখা তিনি এখানে এঁকেছেন।
শেষ অধ্যায় ‘জহির রায়হানের সৃষ্টিকর্মে ঐতিহাসিক ঘটনার বিচার’। এই অধ্যায়ে লেখক জহির রায়হানের 'স্টপ জেনোসাইড', 'সময়ের প্রয়োজনে' প্রভৃতি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইতিহাসের বিচার করার পদ্ধতিগত আলোচনা করেছেন।
বইটির একটি বড় বৈশিষ্ট হল সাবলীল অথচ কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী গদ্যশৈলী। ইতিহাস ও রাজনীতির মতো গুরুগম্ভীর ও জটিল বিষয় নিয়ে লেখা অথচ কোনো আড়ষ্টতা নেই। প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি প্রচুর তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন। তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব উদাহরণ এবং প্রামাণ্য দলিলের সন্নিবেশ বইটির গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সহুল আহমদের ‘ইতিহাস ও বয়ান’ বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর দৃষ্টিভঙ্গি। পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে একে অপরের বিরোধী বা অ্যান্টিথিসিস হিসেবে দেখেননি তিনি। তার বদলে এই ভূখণ্ডের মানুষের নিরন্তর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের এক অবিচ্ছিন্ন ধারা হিসেবে দেখার যে প্রস্তাব লেখক দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশেষ করে এই জনপদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার শেকড় সন্ধানে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। সমস্ত সতর্কতা সত্বেও বলা যায়— ইতিহাস ও বয়ান আগামী দিনের বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এক ধ্রুপদী গ্রন্থ হিসেবে নিজের স্থান করে নেবে।

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর শপিংমল ও বিপণিবিতানগুলোতে এখন জমজমাট কেনাকাটা। বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কসহ বড় বড় শপিং মলগুলোতে দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়।
৫ ঘণ্টা আগে
ছেলেদের শখ খুব অল্প। সুন্দর কেডস বা জুতা, সানগ্লাস, মানিব্যাগ বা পারফিউম ছাড়িয়ে সবার পছন্দ এক জায়গায় মেলে। তা হলো ফ্যাশনেবল হাতঘড়ি। ছেলেরা আবার এসব জিনিস উপহার পেতেই পছন্দ করে। যেমন আমার। বৈবাহিক সূত্রে যেসব ঘড়ি পেয়েছিলাম তা উচ্চমূল্যের এবং এগুলো নিজের টাকা দিয়ে কেনার সামর্থ্য ছিল না। নিজের টাকায় যে
৯ ঘণ্টা আগেব্রিটেনের গণতন্ত্রের ইতিহাস যেখানে কয়েক শতাব্দীর, সেখানে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে আমাদের যাত্রা তো কেবল শুরু। ১৯৫৬ থেকে ২০২৬—দীর্ঘ ৭০ বছর তাই সংসদীয় গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থার বিবর্তন নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংবিধানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার একটি দীর্ঘ ইতিহাস।
১ দিন আগে
দুনিয়ার এত এত ভাষায় কবিতাচর্চা হচ্ছে। কিন্তু আমরা ঘুরেফিরে চেনাপরিচিত কয়েকটি ভাষার কবিতার সঙ্গেই তুলনামূলক আলোচনা করে বিশ্বসাহিত্য বিষয়ক বোধের ঢেঁকুর তুলি। একদেড়শো বছর আগেকার বিশ্বকবিতার সমান্তরালে আমরা বাংলা কবিতাকে প্রায়শই তুলনা করি এবং সিদ্ধান্তে আসি।
১ দিন আগে