জাতীয় সাহিত্য থেকে বিশ্বসাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ যেভাবে পেরিয়ে যান সাহিত্যের সীমানা

তিয়াশা চাকমা
তিয়াশা চাকমা

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১৮: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা সাহিত্যকে ‘জাতীয় সাহিত্য’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, তখন বাংলা গদ্যসাহিত্যের যাত্রাই-বা কতদিন! তাঁর ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, প্রায় একশত বছরের বাংলা সাহিত্য তখন ‘নববঙ্গসাহিত্য’! তখনও বিখ্যাত তাত্ত্বিক রেনে ওয়েলেক আর অস্টিন ওয়ারেন তাঁদের জাতীয় সাহিত্য পৃথকীকরণ নিয়ে ধারণাই দেননি। তবে কি জাতীয় সাহিত্যের ধারণায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটু এগিয়েই ছিলেন বিশ্বের তাত্ত্বিকদের তুলনায়? তা বলা যায় বৈকি!

আজকাল বিশ্বসাহিত্য, জাতীয় সাহিত্য ও তুলনামূলক সাহিত্যের পারস্পরিক যে ধারণা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে চর্চিত হয়, সেখানে সবার আগে আসে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, তবে জাতীয় সাহিত্য সম্পর্কিত ভাবনা এখনও প্রায় পর্দার আড়ালেই রয়ে গেছে।

চলুন দেখি, রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সাহিত্যের ভাবনার গোড়ায় কী ছিল। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ সভার বার্ষিক অধিবেশনে ‘বাংলা জাতীয় সাহিত্য’ শিরোনামে যে প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন, সেখানে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় যে আসলে তিনি জাতীয় পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যকে কীভাবে দেখেছিলেন।

প্রথমত, তিনি সাহিত্য শব্দের অর্থ ‘সহিত’-কে আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ভাবনায় সাহিত্যের এই সংযোগ মূলত ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যেকার সম্পর্ক, যুগ থেকে যুগের মধ্যেকার সংযোগ এবং সর্বোচ্চ পরিসীমা পর্যায়ে সাহিত্যের বিস্তার। অর্থাৎ এককথায় বলতে গেলে, ‘সহিত’ শব্দের মূল অর্থ ধরেই রবির জাতীয় সাহিত্যের ভাবনা অগ্রসর হয়েছে।

তাঁর ভাবনাকে সরল করে বললে বলা যায় যে, এক, যে রচনা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পারস্পরিক বন্ধন তৈরি করে, সেই সাহিত্যই মূলত জাতীয় সাহিত্যের ভিত্তি তৈরি করে, দুই, এক কাল থেকে আরেক কালে রচিত সাহিত্যের মধ্যেকার সংযোগ তৈরি করে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সংযুক্ত করলে জাতীয় সাহিত্যের পরিধি বাড়বে এবং তিন, ভৌগোলিকভাবে যেকোনো সাহিত্য সর্বত্র কিংবা সর্বশেষ পরিসীমায় ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে যখন সকলের মধ্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করে, তখন সাহিত্য জাতীয় পরিসর তৈরি করে।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, ‘সম্মিলিত জাতীয় হৃদয়ের মধ্যে যখন সাহিত্য আপন উত্তপ্ত নীড়টি বাঁধিয়া বসে তখনই সে আপনার বংশ রক্ষা করিতে, ধারাবাহিকভাবে আপনাকে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত করিয়া দিতে পারে।’ মজার ব্যাপার হলো, এর পরের ধাপেই তিনি সাহিত্যের বিস্তৃতি প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘একসময় ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতিকেও বঙ্গসাহিত্য আপন জ্ঞানান্নবিতরণের অতিথিশালায়, আপন ভাবামৃতের অবারিত সদাব্রতে আকর্ষণ করিয়া আনিবে তাহার লক্ষণ এখন হইতেই অল্পে অল্পে পরিস্ফুট হইয়া উঠিতেছে।’

অর্থাৎ, বাংলা সাহিত্য কোথাও না কোথাও রবির সমকালে এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক হয়ে উঠছিল যে অন্য জাতির লোকেরাও অদূর ভবিষ্যতে এর মৌলিকত্ব ও রসের সন্ধানে আগ্রহী হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা করছেন। ধর্ম বিষয়কে কেন্দ্র করে যে সাহিত্যিক বিস্তারে ইংরেজরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল, তারই বিপরীতে এ এমন এক আশাবাদ যেখানে বাংলা সাহিত্যের ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ার মতো ব্যাপারকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। আজকালের তাত্ত্বিক শব্দ ব্যবহার করলে একে ‘সারকুলেশন’ বলা যায়।

এ প্রসঙ্গে একটি জাতীয় সাহিত্যের নিজস্ব ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়া বিষয়ে তত্ত্বগত ধারণা দিলেই বোঝা যাবে যে, আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন জায়গায় এগিয়ে ছিলেন। ১৯৪০ সালে থিওরি অব লিটারেচার নামে রেনে ওয়েলেক আর অস্টিন ওয়ারেন যে গ্রন্থ লিখেছিলেন, সেখানে সাধারণ সাহিত্য, তুলনামূলক সাহিত্য ও জাতীয় সাহিত্যের সংজ্ঞা ও পরিচয় দিতে গিয়ে ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, সিস্টেমিক সাহিত্যতত্ত্ব অধ্যয়নের মাধ্যমেই কেবল সাধারণ সাহিত্য, তুলনামূলক সাহিত্য ও জাতীয় সাহিত্য—এই তিন ধরনের সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব।

জাতিকেন্দ্রিক ভাষাকেন্দ্রিকতা যেভাবে বিভিন্ন জাতির জাতীয় সাহিত্যের শাখা নির্ধারণ করে, তাঁরা মূলত তার বিপরীতেই তাঁদের মত দিয়েছেন। অথচ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলা জাতীয় সাহিত্য’ প্রবন্ধে সাহিত্যের জাতীয় হয়ে ওঠা নিয়ে সবিস্তারে আলোকপাত করে গেছেন ১৯০৭ সালে। তিনি কখনও বলেছেন দেশীয় সাহিত্য, কখনও বলেছেন জাতীয় সাহিত্য। বলছেন, ‘দেশীয় সাহিত্যের সম্যক বিস্তার’-এর কথা। তখন কোথাও এই সুর যেন জাতীয় সাহিত্য-তত্ত্বকথা হিসেবে খুব দৃঢ় স্বরেই বেজে উঠেছিল। অথচ, আজও বিশ্বসাহিত্য পাঠের যে পূর্বপাঠ জাতীয় সাহিত্য, সে পাঠের আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের এই প্রসঙ্গ আড়ালেই রয়ে গেছে বিশ্ব-দরবারে।

তুলনামূলকভাবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বসাহিত্য ভাবনা পৃথিবীতে বেশ জোরালভাবেই ছড়িয়ে আছে। কম্পারেটিভ লিটারেচারের বাংলা হিসেবে তিনি বিশ্বসাহিত্য শব্দকে গ্রহণ করেছেন। আজ এমিলি এপ্টার কিংবা ঝ্যাং লংজির মতো আরও অনেক তাত্ত্বিক যখন তাঁদের বিশ্বসাহিত্য ভাবনা নতুন করে প্রকাশ করেন, তখন রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বসাহিত্যভাবনা অনেকের কাছেই ঠাঁই পায়। কী বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে? মূলত, সাহিত্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর কথা বলেছেন। বিশ্বমানব, সমগ্রতা ও সমগ্র মানবজাতির প্রকাশ চেষ্টা—এগুলোকে তাঁর বক্তব্যের চাবিশব্দ হিসেবে নিতে পারি। সাহিত্যে বিশ্বমানব খোঁজা—এই ভাবনাটি অনেকটাই তাঁর আধ্যাত্মিক-দার্শনিক-চিন্তা-সম্পর্কিত একটি ধাপ। তাঁর মতে, একজন লেখক সাধারণত সমগ্র বিশ্বের মানুষের ভাবকে অনুভব করে সাহিত্যে রূপ দেন। এই রূপ দিতে গিয়ে লেখক নিজস্বতার পরিচয়ও দেন নিজস্ব রচনাশৈলীর মধ্য দিয়ে। একে আরেকটু সরল করে বোঝা যাক।

একটি সাহিত্য যখন একটি একক কমনালিটি তৈরি করে, তখন এটি সর্বজনীন হয়। এই কমনালিটি হলো, একটি সাধারণ ক্ষেত্র যেখানে বিশ্বের মানুষ সকলেই নিজেকে একই জগতের একই অনুভবের বলে অনুভব করে। যেমন, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এটি যে কালে যে ভাষাতেই অনূদিত হয়ে ভৌগোলিক বিস্তৃতি লাভ করুক না কেন, এর বিদ্রোহী সুর সকলের হৃদয়ে সমান সুরেই বেজে উঠবে। অর্থাৎ, একটি সুর বিশ্বের যে কোনো মানুষের বিদ্রোহী সত্তার প্রকাশ হয়ে উঠবে। একটি সুর, একটি সাধারণ ক্ষেত্র।

আবার ধরা যাক, সমগ্রতা। ‘মহাকাল’ নামে যে শব্দ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, সে শব্দের অন্তরালে জগত-সৃষ্টিতত্ত্বের সমগ্রতাকেই কি বুঝানো হচ্ছে না? একটি সাহিত্য যখন মহাকালকে ধারণ করে প্রকাশ করতে সচেষ্ট হয়, তখন তা আর সাধারণ থাকে কোথায়? এখানেই বিশ্বসাহিত্যের সংজ্ঞায়নে রবীন্দ্রনাথের মৌলিকত্ব। দার্শনিকতা থেকে সাহিত্যতত্ত্বের দিকে যাত্রা।

এবার আসি, তাঁর শেষ চাবিশব্দ—সমগ্র মানবজাতির প্রকাশ চেষ্টা। সরল ও গভীর উভয় অর্থেই একে একজন সাহিত্যিকের শ্রেষ্ঠত্ব বা স্বতন্ত্র সাহিত্যশৈলী হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। অর্থাৎ, যেভাবে বিশ্বমানব ও বৈশ্বিক সমগ্রতা প্রকাশিত হয়, সেই প্রকাশ প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন আছে। ঠিক যেমনটা আরও প্রায় ৩০/৪০ বছর পরে এসে থিওরি অব লিটারেচার-এ সাধারণ সাহিত্য, জাতীয় সাহিত্য ও তুলনামূলক সাহিত্য ধারণাকে স্পষ্ট করার জন্য মূল বিষয় হিসেবে জোর দেওয়া হয়েছে। গোরা উপন্যাসের জাতীয়তাবোধ, সামগ্রিকতা এবং সর্বজনীনতার স্বরূপ মূলত তাঁর এই ভাবনাগুলোর পরিচায়ক।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই মৌলিক ভাবনাগুলোর উৎস-পাঠ সম্পর্কিত তথ্য আজও বিশ্বদরবারে অজানাই রয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব দর্শন কীভাবে বাংলা সাহিত্যকে জাতীয় সাহিত্য ভাবনায় অগ্রসর করেছে— তা আজও জাতীয় সাহিত্যতত্ত্বের মৌলিক পাঠ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে কমই দেখা যায়। তিনি বিশ্বসাহিত্যের তত্ত্বে সারকথা বলে গেছেন কত নিখুঁত বর্ণনায়— সেসব আজও বাংলা সাহিত্যের বিশ্বসাহিত্য পাঠে নিবিড়ভাবে পর্যালোচিত হয় খুব কম পরিসরে। জন্মবার্ষিকীতে বিশ্বসাহিত্য অধ্যয়নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যতাত্ত্বিক সত্তার অবদান-স্মরণে আজকের কথামালা।

সম্পর্কিত