leadT1ad

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

শতাব্দী পেরিয়ে আজও ‘শিখা’র প্রজ্বলিত আলো আমাদের পথ দেখায়

১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। সংগঠনের মূল স্লোগান ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় 'শিখা' পত্রিকা।

এক শতাব্দী পেরিয়ে আজও ‘শিখা’র প্রজ্বলিত আলো আমাদের পথ দেখায়। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মনির্ভরতার ইতিহাসে ‘শিখা’ পত্রিকার নাম উচ্চারণ মানেই এক আলোকবর্তিকার স্মরণ। এই পত্রিকা ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মুখপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১৯২৭ সালে এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় অধ্যাপক আবুল হুসেনের সম্পাদনায়।

কাজী নজরুল ইসলাম ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের’ আবির্ভাবকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালি।’ আবার কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই মুসলিম সাহিত্য সমাজ এর উত্তর আমরা পাই সম্পাদক আবুল হুসেনের বার্ষিক বিবরণীতে সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘যে জাতির সাহিত্য নাই তাহার প্রাণ নাই, আবার যে জাতির প্রাণের অভাব সে জাতির ভিতর সত্যিকার সাহিত্য জন্মলাভ করতে পারে না। এ কথাটি ভালো করে বুঝবার মত শক্তি বোধহয় বাঙালি মুসলমানের এখনো হয় নাই...এই সমাজের প্রধান উদ্দেশ্য চিন্তাচর্চা ও জ্ঞানের জন্য আকাঙ্ক্ষা, রুচি সৃষ্টি এবং তদুদ্দেশে জাতিধর্ম নির্বিশেষে নবীন পুরাতন সর্বপ্রকার চিন্তা ও জ্ঞানের সমন্বয় এবং সংযোগ সাধন।’

১৯২৭ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর প্রকাশিত হয় এটি। প্রথম সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি লেখার মধ্যে ছিলো অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা’, আবুল হুসেনের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের শিক্ষা-সমস্যা’, আবদুর রশীদের ‘আমাদের নবজাগরণ ও শরিয়ত’, আবদুস সালাম খাঁর ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ এবং আবদুল কাদেরের ‘বাঙলার লোক-সঙ্গীত’।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় 'শিখা' পত্রিকা।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় 'শিখা' পত্রিকা।

দ্বিতীয় সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি লেখা হলো খান বাহাদুর মৌলভী কমরুদ্দীন আহমদের ‘সমবায় আন্দোলনে মুসলমানের কর্তব্য’, অধ্যাপক রকীবউদ্দিন আহমদের ‘বাংলার লুপ্ত শিল্প’, সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদের ‘বাংলায় পীর পূজা’, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের ‘মানব মনের ক্রমবিকাশ’ এবং মিস ফজিলাতুন নেসার ‘নারীজীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ’।

তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ: অধ্যাপক মোহিতলাল মজুমদার’, ইউরোপের শিক্ষার আদর্শের ক্রমবিকাশ: খানসাহেব আবদুর রহমান খাঁ এম.এ.বি.টি., মানব প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধি: মৌলভী নাজিরুল ইসলাম, ধর্ম ও সমাজ: অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন। ফলে এর থেকে শিখা পত্রিকার মূল উদ্দেশ্যগুলো আমাদের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠে।

শিখা পত্রিকার মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি মুসলিমের জাগরণ এবং সেই জাগরণের মূল প্রভাবক ছিল শিক্ষা, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। বাঙালি মুসলমানের এই রেনেসাঁ নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন, ‘এতকাল আমরা যেটাকে বাংলার রেনেসাঁস বলে ঠিক করেছি বা ভুল করেছি সেটা ছিল অবিভক্ত বাংলার ব্যাপার। পার্টিশনের পর পূর্ব বাংলা এখন তো বাংলাদেশ-নতুন করে জেগে ওঠে। সেখানে দেখা দেয় দ্বিতীয় এক রেনেসাঁস। প্রথম রেনেসাঁসে নায়কদের মধ্যে ইউরোপীয় ছিলেন, খ্রিষ্টান ছিলেন কিন্তু মুসলমান ছিলেন না। দ্বিতীয় রেনেসাঁসের নায়করা প্রায় সকলেই মুসলমান। প্রথম রেনেসাঁস ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক, দ্বিতীয় রেনেসাঁস হচ্ছে ঢাকাকেন্দ্রিক।...গত শতাব্দীর ডিরোজিও ও তাঁর ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠীর সঙ্গেই এঁদের তুলনা। এঁরাও গোঁড়াদের বিষ নজরে পড়েন। এক্ষেত্রে প্রবাহিত হচ্ছিলো রিভাইভালের স্রোত। মুসলিম রিভাইভালের।’

এই পত্রিকা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এক অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মুখ, যার মূলমন্ত্র ছিল—‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ অর্থাৎ, জ্ঞানের বিস্তার, বুদ্ধির স্বাধীনতা ও যুক্তির প্রয়োগ ছাড়া সমাজ কখনোই প্রকৃত মুক্তি পেতে পারে না। শিখা জন্ম নেয় এমন এক সময়ে, যখন বাঙালি মুসলমান সমাজে ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাসের শেকল ছিল গভীরভাবে প্রোথিত।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় 'শিখা' পত্রিকা।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় 'শিখা' পত্রিকা।

এই পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী আবুল হুসেন (১ম সংখ্যা), কাজী মোতাহার হোসেন (২য় ও ৩য় সংখ্যা), মোহাম্মদ আবদুর রশিদ (৪র্থ সংখ্যা), আবুল ফজল (৫ম সংখ্যা) একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, মুসলমান সমাজকে যদি নবজাগরণের পথে এগিয়ে নিতে হয়, তবে তাকে প্রথমে মুক্ত করতে হবে চিন্তায়, যুক্তিতে ও মানবিকতায়। তারা বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা যতটা জরুরি, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি, কারণ চিন্তার স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের মুক্তি কেবল কল্পনা মাত্র।

শিখা তাই ধর্মীয় বিভাজন, সামাজিক কুসংস্কার, নারীর প্রতি অবিচার, জাতপাতের বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিল এবং এক নতুন অসাম্প্রদায়িক সমাজদর্শনের ভিত গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিল মানুষ, মানবতা ও যুক্তি। পত্রিকাটি সাহসের সঙ্গে বলেছিল—‘ধর্ম মানুষকে বিভাজিত করে না, বরং অজ্ঞতাই করে।’ তাদের লেখায় প্রকাশ পেত বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয়, যা সেই সময়কার প্রচলিত মুসলিম সমাজে এক বিরল বুদ্ধিবৃত্তিক ঘটনা ছিল। আবুল হুসেন ও তাঁর সহযাত্রীদের এই আন্দোলনকে অনেকে বলেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’—যেখানে লক্ষ্য ছিল ইসলামি সংস্কৃতিকে যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের আলোয় নতুনভাবে পাঠ করা, এবং শিক্ষাকে আধুনিকতার ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা।

শিখা কেবল সাহিত্য বা প্রবন্ধের পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল সমাজের আত্মজাগরণের অগ্নিশিখা, যা মানুষকে প্রশ্ন করতে, সন্দেহ করতে এবং প্রমাণ খুঁজে নিতে শিখিয়েছিল। মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হলেও, শিখার চিন্তা বাঙালি মুসলমান সমাজে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এর প্রভাব দেখা যায় পরবর্তী সময়ে সাহিত্য, শিক্ষানীতি, এমনকি মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির চিন্তাধারাতেও, যেখানে যুক্তিবাদ, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ছিল প্রধান। শিখা পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যার অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতির অভিভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মুসলিম সাহিত্য নিয়ে বলেন, ‘সাহিত্য যদি সত্যিকার সাহিত্য হয় সে মুক্তি দিবেই, দেহের মুক্তি, মনের মুক্তি, আত্মার মুক্তি .........আমাদের ঘর ও পর, আমাদের সুখ ও দুঃখ, আমাদের আশা ও ভরসা, আমাদের লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে যে সাহিত্য তাই আমাদের সাহিত্য। কেবল লেখক মুসলমান হলেই মুসলমান সাহিত্য হয় না। হিন্দুর সাহিত্যের অনুপ্রেরণা পাচ্ছে বেদান্ত ও গীতা, হিন্দু ইতিহাস ও হিন্দু জীবনী থেকে। হিন্দু সাহিত্য রস সংগ্রহ করবে হিন্দু সমাজ থেকে, আমাদের সাহিত্য করবে মুসলিম সমাজ থেকে। এই সাহিত্যের ভেতর দিয়েই বাংলা হিন্দু-মুসলমানের চেনা পরিচয় হবে। চেনা হলেই ভাব হবে।’

সেই ভাবের সেতুবন্ধন যা সাহিত্য ও এর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে হওয়ার কথা ছিল তা না হওয়ার ফলে আমরা এখনো বিভাজিতই হয়ে আছি এবং ক্রমাগত এর সংকট আরও তীব্রতর হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে আমরা দেখি যে শিখা ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকল মনীষীর কাছে পৌঁছেছে। ‘এম্যানসিপেশন অব দ্য ইন্টেলেক্ট’—এই মন্ত্র তাঁরা গ্রহণ করেছে বহু জায়গা থেকে, কামাল আতাতুর্কের কাছ থেকে, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ ও রোম্যাঁ রোলার কাছ থেকে আর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কাছ থেকে।

আজ যখন বাংলাদেশ আবারও ধর্মীয় উগ্রবাদ, সামাজিক বিভাজন ও তথ্যের বিভ্রান্তির মুখোমুখি, তখন ‘শিখা’-র বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বর্তমান সমাজে জ্ঞানের বিস্তার ঘটলেও যুক্তি ও নৈতিকতার প্রয়োগ সীমিত হয়ে পড়েছে; মানুষ তথ্যের প্রাচুর্যে বাস করলেও সত্য যাচাই করার বুদ্ধিবৃত্তিক সততা হারাচ্ছে। এমন সময় শিখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘চিন্তা মানেই সাহস’—কারণ প্রশ্নহীন সমাজই আসলে অন্ধকারে বন্দি সমাজ। শিখা আমাদের শেখায়, বিশ্বাসকে নয়, যুক্তিকে ভিত্তি করে জীবন ও সমাজ গড়ে তোলা যায়; ধর্ম ও বিজ্ঞান একে অন্যের বিরোধী নয়, বরং উভয়েই মানুষের মুক্তির পথ। আজকের বাংলাদেশে, যেখানে শিক্ষা, রাজনীতি ও ধর্ম অনেক সময় বিভ্রান্তির উপকরণ হয়ে উঠছে, সেখানে শিখার মতো একটি মননচর্চার প্ল্যাটফর্ম অপরিহার্য। শিখা আজও আমাদের শেখায়, জ্ঞানকে পবিত্র মনে করো, যুক্তিকে সাহসী করো, আর মানবিকতাকে জীবনের কেন্দ্র করো।

এক শতাব্দী পেরিয়ে আজও ‘শিখা’র প্রজ্বলিত আলো আমাদের পথ দেখায়। এটি আমাদের ইতিহাসের একটি প্রমাণ যে, সত্য ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য সাহস প্রয়োজন, এবং সেই সাহসই বুদ্ধিবৃত্তির প্রথম শর্ত। তাই শিখা আজও শুধু অতীতের পত্রিকা নয় এ এক জাগ্রত চেতনা, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে চিন্তার মৃত্যু, সেখানেই দাসত্বের সূচনা; আর যেখানে যুক্তি জাগে, সেখানেই মুক্তির ভোর।

লেখক: প্রাবন্ধিক; শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250

সম্পর্কিত