ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর ১৪তম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
তারেক অণু

সকালে যাত্রা শুরু করতেই দেখা পেলাম মিসিসিপির! যাযাবরদের দায়িত্ব গঙ্গা থেকে মিসিসিপি হয়ে ভলগার রূপ দেখা। আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা পদ্মাপাড়েই। তবে এই মিসিসিপি পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশ দেরিই হয়ে গেল। প্রিয় লেখক মার্ক টোয়েনের কল্যাণে মিসিসিপি আমাদের কাছে বড্ড চেনা। তাঁর ‘লাইফ অন মিসিসিপি’ বইতে এই নদীতে মাল্লার কাজ করার অভিজ্ঞতা তিনি এঁকেছেন শব্দনদী দিয়ে।
চোখের সামনে দেখলাম মাঝারি চওড়া এক নদী, যার দুপাশে সবুজের সমারোহ আর উপরে সুদৃশ্য সেতু। ইতস্তত পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। ভালো লাগল। বড় ভালো লাগল! মনে পড়লো বেশ ক'বছর আগে লিখেছিলাম,

‘নদীপ্রধান দেশের মানুষ আমি। শৈশব, কৈশোর কেটেছে পদ্মাতীরের রাজশাহীতে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কর্ণফুলী, ব্রহ্মপুত্র, নাফ, ইছামতী, ধলেশ্বরী কত সুন্দর নদীগুলো আমাদের চিরসবুজ পলিমাটির দেশটা তৈরি করেছে লক্ষ হাজার বছর ধরে। তাই কোনো দেশে গেলেই সেখানকার স্থানীয় নদী দেখার জন্য মন আনচান করে। হয়তো সেই নদীর তীরে ইতস্তত পথ ভুলে বেড়ানো কোনো শিশুকে দেখে রোমন্থন করি নিজের শৈশব। পৃথিবীর সব নদীর জেলেকেই মনে হয় অতি আপন পদ্মাপারের জেলে। সোজা কথাই বলি—আমি নদী জমাই। বিভিন্ন চিত্র-বিচিত্র নদী, তার বাঁক, লোকজন, জীবনযাত্রার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করি।'

আজ জীবনের টানে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসখ্যাত এই মিসিসিপি। যার সঞ্জীবনী অমৃত সুধা দিয়ে প্রাণ সঞ্চালন করেছে এই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনো একা, কখনো মিসৌরিকে সাথী করে। আমার অনেক দিনের পুরোনো শখ পূরণ হলো। নদীর পাড়ে বসেই শুনলাম পল রবসনের সেই বিখ্যাত গান—
Let me go 'way from the Mississippi,
Let me go 'way from de white man boss;
Show me dat stream called de river Jordan,
Dat's de ol' stream dat I long to cross.
O' man river,
Dat ol' man river,
He mus'know sumpin'
But don't say nuthin'
He jes' keeps rollin'
He keeps on rollin' along.
Long ol' river forever keeps rollin' on...

এই গানের সুরটা আমাদের খুব চেনা, কারণ কিংবদন্তি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার ‘বিস্তীর্ণ দুপারের’ কিংবা ‘ও গঙ্গা তুমি’ গানটির সুর নেওয়া হয়েছিল পল রবসনের এই গান থেকেই।
এরপর টানা কয়েক ঘণ্টা পথ চলে আমরা পৌঁছালাম ছোট্ট জনপদ ওয়ালনাট গ্রোভে। এর কাছেই বয়ে চলেছে ‘প্লাম ক্রীক’ নামের ছোট্ট এক নদী। এই নদীর তীরেই একসময় ঘাস-মাটির কুটিরে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন বিশ্বখ্যাত লেখিকা লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘অন দ্য ব্যাঙ্কস অফ প্লাম ক্রীক’ বইতে এই কুটিরের কথা তিনি দারুণভাবে লিখে গেছেন।

অবশ্য সারা পৃথিবী তাঁকে এক নামে চেনে ‘লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি’ সিরিজের জন্য, যেখানে এই ওয়ালনাট গ্রোভের কথা বারবার এসেছে। মূলত এখানে থাকা ‘লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার জাদুঘর’ দেখার জন্যই আমাদের আসা।
জাদুঘরে ঢুকেই চোখে পড়ল চমৎকার এক গিফট শপ। সেখানে লরার সব বইয়ের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের দুর্লভ ছবি আর নানা স্মারক সাজানো রয়েছে। পুরো জাদুঘরটি মূলত কয়েকটি আলাদা আলাদা ঘরে ভাগ করা, যেখানে সেই আমলের জীবনযাত্রাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রান্নাঘর, স্কুল, ঘাসের কুটির থেকে শুরু করে উপাসনালয়—সবই খুব পরিপাটি।

আর আছে লরার ব্যবহৃত লেখার চেয়ার-টেবিল। সেই সঙ্গে নানা ভাষায় অনূদিত তাঁর বইগুলো। সেখানে বাংলা এবং ফিনিশ সংস্করণ না দেখে জাদুঘরের এক কর্মকর্তাকে বললাম, কয়েকটা বই আমি পাঠাতে চাই। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লরার কয়েকটি বই অনুবাদ করেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধেরও আগে। কয়েক বছর আগে সেবা প্রকাশনী থেকে কাজী আনোয়ার হোসনের অনুবাদেও কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও অন্যদের অনুবাদ তো বাজারে আছেই।

আমি কয়েকটা বই পাঠাতে চাই শুনে সেই কর্মকর্তা ভীষণ খুশি হলেন। তিনি আমাদের রাস্তার ঠিক উল্টো পাশের এক তালাবন্ধ দোতলা বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এই বাড়িটি তৈরির সময় লরার বাবা মিস্টার ইঙ্গলস নিজে প্রধান মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই ভবনের দোতলাতেই সেই ঐতিহাসিক বাইবেল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হয়েছিল, যেখানে চমৎকার পারফরম্যান্সের জন্য লরা পুরস্কার পেয়েছিলেন।
সেখানে তিনি আমাদের আরও একটি দারুণ জিনিস দেখালেন। শীতের কনকনে হাওয়া থেকে বাঁচতে সেই কাঠের বাড়িটির দেওয়ালে খবরের কাগজ সাঁটানো হয়েছিল। অবাক করার মতো বিষয় হলো, ১৮৯০ সালে লাগানো সেই কাগজের কিছু অংশ এখনো দেওয়ালে টিকে আছে!

লরার বইতেও এই খবরের কাগজের কথা বেশ কয়েকবার উল্লেখ আছে। কর্মকর্তা জানালেন, ভবিষ্যতে এই বাড়িটিও জাদুঘরের অংশ হিসেবে দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
তবে একটা মন খারাপ করা খবরও পেলাম। কিছুদিন আগেই প্লাম ক্রীকে বন্যা হওয়ায় সেখানে যাওয়ার রাস্তা এখন বন্ধ। লরাদের সেই ঘাস-মাটির কুটির বহু আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে, এখন কেবল বইয়ের পাতাতেই তার অস্তিত্ব। তবুও খুব ইচ্ছে ছিল মাত্র এক কিলোমিটার দূরের সেই সংরক্ষিত এলাকা আর নদীটি দেখার। দেখা হলো না, তবে ভবিষ্যতে আবার এখানে আসার একটা বড় কারণ রয়ে গেল।

জাদুঘরের কর্মকর্তা জানালেন, এর আগে বাংলাদেশ থেকে কেউ এখানে আসেনি; তাই আনন্দের সাথে বিশ্বম্যাপে বাংলাদেশের ওপর একটি পিন গেঁথে দিলেন তিনি।
শহরেই এক রেস্তোরাঁয় বসে বীফ টাকো দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে রওনা দিলাম সাউথ ডাকোটার ডি-স্মেট শহরে। নামটা কি পরিচিত? হ্যাঁ, এখানেই প্রথম স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল লরা এবং তাঁর বোন মেরি। শুধু তাই না, এখানের স্কুলে পড়িয়েছিলেন লরা! ছোট্ট এই জনপদে এখনো মাত্র হাজারখানেক মানুষের বাস।

শহরের একটু আগেই চোখে পড়ল ‘ইঙ্গলস হোমস্টেড’। ধূ ধূ প্রেইরির মাঝে ছিমছাম এক খামারবাড়ি বা র্যাঞ্চ। এখানে লরার পরিবার ছয় বছর কাটিয়েছিল। চারদিকের ঘাসের প্রান্তর আর অদ্ভুত এক নীরবতা দেখে মনে হলো, এখানেই ক্যাম্প ফেলে থেকে যাই আজ রাতে।
এখানে সেই আমলের ওয়াগনের মতো থাকার জায়গাও আছে, যার ভাড়া প্রতি রাতে ৬০ ডলার। তবে ডি-স্মেটে আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল লরার সেই স্কুল আর তাঁদের প্রথম দিকের বাড়িটি, যেখানে ইঙ্গলস পরিবার সার্ভেয়ার হিসেবে থাকত।

আসলে এই জায়গাগুলো ঘুরে দেখার আসল মজা পেতে হলে লরার বইগুলো পড়া থাকা চাই (নিদেনপক্ষে টিভি সিরিজগুলো দেখা থাকতে হবে)। প্রিয় কাজীদাকে (কাজী আনোয়ার হোসেন, লরার বইয়ের অনুবাদক, মাসুদ রানার জনক) যখন জানিয়েছিলাম, লরার স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলোতে যাচ্ছি, তিনি বলেছিলেন তাঁদের পরিবারের খবর জানিয়ো। বিশেষ করে বোন মেরী অন্ধ হয়ে যাবার পর তাঁর কী হয়েছিল, বাবা-মা কী করলেন জীবনে!
সেই টানেই খুঁজে বের করলাম শহরের এক প্রান্তের কবরস্থান। সেখানে এপিটাফ দেখে নিশ্চিত হলাম—এখানেই শুয়ে আছেন লরার বাবা-মা আর তিন বোন। এমনকি লরা ও আলমানযোর প্রথম সন্তানের কবরও এখানে। তবে লরা আর আলমানযোর কবর অন্য অঙ্গরাজ্যে (সম্ভবত মিসৌরিতে), আশা করছি সেখানেও যাওয়া হবে।

কাজী দাকে যখন ফোন করে এই জায়গাগুলোর কথা জানালাম, তাঁর কণ্ঠ শুনেই বুঝলাম তিনি কতটা খুশি আর স্মৃতিকাতর হয়েছেন।
আর এখানে, সেই সঙ্গে ওয়ালনাট গ্রোভেও ফি বছর অনুষ্ঠিত হয় লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার মেলা। সেখানে অনেক মানুষ আসে অভিনয় ও বেশভূষার মাধ্যমে সেই আমলকে ফুটিয়ে তুলতে, যাদের অন্যতম অনুষঙ্গ হয় ঘোড়ার গাড়ি!

আমাদের চারদিকে তখন প্রেইরির তৃণভূমি। রাস্তায় জোর গতিতে চলার সময় এক কচ্ছপকে রাস্তা পেরোতে দেখে সাবধানে গাড়ী সাইড করলাম। যাতে প্রাণীটির কোনো ক্ষতি না হয়। আমাদের এই বিশাল ভ্রমণে অবশ্যই আমরা চেষ্টা করব, কোনো প্রাণীর প্রত্যক্ষ ক্ষতি না করতে।
সেই সঙ্গে ময়লা তো ফেলবই না। এবং আমরা ঠিক করেছি এমনিতেই তেল পুড়িয়ে গাড়িতে করে ঘুরে পরিবেশের অনেক ক্ষতি করছি, তাই অন্য ক্ষতি যত পারি কম করব! যেমন প্লাস্টিক কম ব্যবহার করব। দরকার না হলে পানীয়তে স্ট্র ব্যবহার করব না।
আর হ্যাঁ, এর মাঝে আমরা আরেক টাইম জোনে প্রবেশ করেছ। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সময়ের পার্থক্য এখন ১১ ঘণ্টা!

সকালে যাত্রা শুরু করতেই দেখা পেলাম মিসিসিপির! যাযাবরদের দায়িত্ব গঙ্গা থেকে মিসিসিপি হয়ে ভলগার রূপ দেখা। আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা পদ্মাপাড়েই। তবে এই মিসিসিপি পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশ দেরিই হয়ে গেল। প্রিয় লেখক মার্ক টোয়েনের কল্যাণে মিসিসিপি আমাদের কাছে বড্ড চেনা। তাঁর ‘লাইফ অন মিসিসিপি’ বইতে এই নদীতে মাল্লার কাজ করার অভিজ্ঞতা তিনি এঁকেছেন শব্দনদী দিয়ে।
চোখের সামনে দেখলাম মাঝারি চওড়া এক নদী, যার দুপাশে সবুজের সমারোহ আর উপরে সুদৃশ্য সেতু। ইতস্তত পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। ভালো লাগল। বড় ভালো লাগল! মনে পড়লো বেশ ক'বছর আগে লিখেছিলাম,

‘নদীপ্রধান দেশের মানুষ আমি। শৈশব, কৈশোর কেটেছে পদ্মাতীরের রাজশাহীতে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কর্ণফুলী, ব্রহ্মপুত্র, নাফ, ইছামতী, ধলেশ্বরী কত সুন্দর নদীগুলো আমাদের চিরসবুজ পলিমাটির দেশটা তৈরি করেছে লক্ষ হাজার বছর ধরে। তাই কোনো দেশে গেলেই সেখানকার স্থানীয় নদী দেখার জন্য মন আনচান করে। হয়তো সেই নদীর তীরে ইতস্তত পথ ভুলে বেড়ানো কোনো শিশুকে দেখে রোমন্থন করি নিজের শৈশব। পৃথিবীর সব নদীর জেলেকেই মনে হয় অতি আপন পদ্মাপারের জেলে। সোজা কথাই বলি—আমি নদী জমাই। বিভিন্ন চিত্র-বিচিত্র নদী, তার বাঁক, লোকজন, জীবনযাত্রার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করি।'

আজ জীবনের টানে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসখ্যাত এই মিসিসিপি। যার সঞ্জীবনী অমৃত সুধা দিয়ে প্রাণ সঞ্চালন করেছে এই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনো একা, কখনো মিসৌরিকে সাথী করে। আমার অনেক দিনের পুরোনো শখ পূরণ হলো। নদীর পাড়ে বসেই শুনলাম পল রবসনের সেই বিখ্যাত গান—
Let me go 'way from the Mississippi,
Let me go 'way from de white man boss;
Show me dat stream called de river Jordan,
Dat's de ol' stream dat I long to cross.
O' man river,
Dat ol' man river,
He mus'know sumpin'
But don't say nuthin'
He jes' keeps rollin'
He keeps on rollin' along.
Long ol' river forever keeps rollin' on...

এই গানের সুরটা আমাদের খুব চেনা, কারণ কিংবদন্তি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার ‘বিস্তীর্ণ দুপারের’ কিংবা ‘ও গঙ্গা তুমি’ গানটির সুর নেওয়া হয়েছিল পল রবসনের এই গান থেকেই।
এরপর টানা কয়েক ঘণ্টা পথ চলে আমরা পৌঁছালাম ছোট্ট জনপদ ওয়ালনাট গ্রোভে। এর কাছেই বয়ে চলেছে ‘প্লাম ক্রীক’ নামের ছোট্ট এক নদী। এই নদীর তীরেই একসময় ঘাস-মাটির কুটিরে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন বিশ্বখ্যাত লেখিকা লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘অন দ্য ব্যাঙ্কস অফ প্লাম ক্রীক’ বইতে এই কুটিরের কথা তিনি দারুণভাবে লিখে গেছেন।

অবশ্য সারা পৃথিবী তাঁকে এক নামে চেনে ‘লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি’ সিরিজের জন্য, যেখানে এই ওয়ালনাট গ্রোভের কথা বারবার এসেছে। মূলত এখানে থাকা ‘লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার জাদুঘর’ দেখার জন্যই আমাদের আসা।
জাদুঘরে ঢুকেই চোখে পড়ল চমৎকার এক গিফট শপ। সেখানে লরার সব বইয়ের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের দুর্লভ ছবি আর নানা স্মারক সাজানো রয়েছে। পুরো জাদুঘরটি মূলত কয়েকটি আলাদা আলাদা ঘরে ভাগ করা, যেখানে সেই আমলের জীবনযাত্রাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রান্নাঘর, স্কুল, ঘাসের কুটির থেকে শুরু করে উপাসনালয়—সবই খুব পরিপাটি।

আর আছে লরার ব্যবহৃত লেখার চেয়ার-টেবিল। সেই সঙ্গে নানা ভাষায় অনূদিত তাঁর বইগুলো। সেখানে বাংলা এবং ফিনিশ সংস্করণ না দেখে জাদুঘরের এক কর্মকর্তাকে বললাম, কয়েকটা বই আমি পাঠাতে চাই। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লরার কয়েকটি বই অনুবাদ করেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধেরও আগে। কয়েক বছর আগে সেবা প্রকাশনী থেকে কাজী আনোয়ার হোসনের অনুবাদেও কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও অন্যদের অনুবাদ তো বাজারে আছেই।

আমি কয়েকটা বই পাঠাতে চাই শুনে সেই কর্মকর্তা ভীষণ খুশি হলেন। তিনি আমাদের রাস্তার ঠিক উল্টো পাশের এক তালাবন্ধ দোতলা বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এই বাড়িটি তৈরির সময় লরার বাবা মিস্টার ইঙ্গলস নিজে প্রধান মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই ভবনের দোতলাতেই সেই ঐতিহাসিক বাইবেল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হয়েছিল, যেখানে চমৎকার পারফরম্যান্সের জন্য লরা পুরস্কার পেয়েছিলেন।
সেখানে তিনি আমাদের আরও একটি দারুণ জিনিস দেখালেন। শীতের কনকনে হাওয়া থেকে বাঁচতে সেই কাঠের বাড়িটির দেওয়ালে খবরের কাগজ সাঁটানো হয়েছিল। অবাক করার মতো বিষয় হলো, ১৮৯০ সালে লাগানো সেই কাগজের কিছু অংশ এখনো দেওয়ালে টিকে আছে!

লরার বইতেও এই খবরের কাগজের কথা বেশ কয়েকবার উল্লেখ আছে। কর্মকর্তা জানালেন, ভবিষ্যতে এই বাড়িটিও জাদুঘরের অংশ হিসেবে দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
তবে একটা মন খারাপ করা খবরও পেলাম। কিছুদিন আগেই প্লাম ক্রীকে বন্যা হওয়ায় সেখানে যাওয়ার রাস্তা এখন বন্ধ। লরাদের সেই ঘাস-মাটির কুটির বহু আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে, এখন কেবল বইয়ের পাতাতেই তার অস্তিত্ব। তবুও খুব ইচ্ছে ছিল মাত্র এক কিলোমিটার দূরের সেই সংরক্ষিত এলাকা আর নদীটি দেখার। দেখা হলো না, তবে ভবিষ্যতে আবার এখানে আসার একটা বড় কারণ রয়ে গেল।

জাদুঘরের কর্মকর্তা জানালেন, এর আগে বাংলাদেশ থেকে কেউ এখানে আসেনি; তাই আনন্দের সাথে বিশ্বম্যাপে বাংলাদেশের ওপর একটি পিন গেঁথে দিলেন তিনি।
শহরেই এক রেস্তোরাঁয় বসে বীফ টাকো দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে রওনা দিলাম সাউথ ডাকোটার ডি-স্মেট শহরে। নামটা কি পরিচিত? হ্যাঁ, এখানেই প্রথম স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল লরা এবং তাঁর বোন মেরি। শুধু তাই না, এখানের স্কুলে পড়িয়েছিলেন লরা! ছোট্ট এই জনপদে এখনো মাত্র হাজারখানেক মানুষের বাস।

শহরের একটু আগেই চোখে পড়ল ‘ইঙ্গলস হোমস্টেড’। ধূ ধূ প্রেইরির মাঝে ছিমছাম এক খামারবাড়ি বা র্যাঞ্চ। এখানে লরার পরিবার ছয় বছর কাটিয়েছিল। চারদিকের ঘাসের প্রান্তর আর অদ্ভুত এক নীরবতা দেখে মনে হলো, এখানেই ক্যাম্প ফেলে থেকে যাই আজ রাতে।
এখানে সেই আমলের ওয়াগনের মতো থাকার জায়গাও আছে, যার ভাড়া প্রতি রাতে ৬০ ডলার। তবে ডি-স্মেটে আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল লরার সেই স্কুল আর তাঁদের প্রথম দিকের বাড়িটি, যেখানে ইঙ্গলস পরিবার সার্ভেয়ার হিসেবে থাকত।

আসলে এই জায়গাগুলো ঘুরে দেখার আসল মজা পেতে হলে লরার বইগুলো পড়া থাকা চাই (নিদেনপক্ষে টিভি সিরিজগুলো দেখা থাকতে হবে)। প্রিয় কাজীদাকে (কাজী আনোয়ার হোসেন, লরার বইয়ের অনুবাদক, মাসুদ রানার জনক) যখন জানিয়েছিলাম, লরার স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলোতে যাচ্ছি, তিনি বলেছিলেন তাঁদের পরিবারের খবর জানিয়ো। বিশেষ করে বোন মেরী অন্ধ হয়ে যাবার পর তাঁর কী হয়েছিল, বাবা-মা কী করলেন জীবনে!
সেই টানেই খুঁজে বের করলাম শহরের এক প্রান্তের কবরস্থান। সেখানে এপিটাফ দেখে নিশ্চিত হলাম—এখানেই শুয়ে আছেন লরার বাবা-মা আর তিন বোন। এমনকি লরা ও আলমানযোর প্রথম সন্তানের কবরও এখানে। তবে লরা আর আলমানযোর কবর অন্য অঙ্গরাজ্যে (সম্ভবত মিসৌরিতে), আশা করছি সেখানেও যাওয়া হবে।

কাজী দাকে যখন ফোন করে এই জায়গাগুলোর কথা জানালাম, তাঁর কণ্ঠ শুনেই বুঝলাম তিনি কতটা খুশি আর স্মৃতিকাতর হয়েছেন।
আর এখানে, সেই সঙ্গে ওয়ালনাট গ্রোভেও ফি বছর অনুষ্ঠিত হয় লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার মেলা। সেখানে অনেক মানুষ আসে অভিনয় ও বেশভূষার মাধ্যমে সেই আমলকে ফুটিয়ে তুলতে, যাদের অন্যতম অনুষঙ্গ হয় ঘোড়ার গাড়ি!

আমাদের চারদিকে তখন প্রেইরির তৃণভূমি। রাস্তায় জোর গতিতে চলার সময় এক কচ্ছপকে রাস্তা পেরোতে দেখে সাবধানে গাড়ী সাইড করলাম। যাতে প্রাণীটির কোনো ক্ষতি না হয়। আমাদের এই বিশাল ভ্রমণে অবশ্যই আমরা চেষ্টা করব, কোনো প্রাণীর প্রত্যক্ষ ক্ষতি না করতে।
সেই সঙ্গে ময়লা তো ফেলবই না। এবং আমরা ঠিক করেছি এমনিতেই তেল পুড়িয়ে গাড়িতে করে ঘুরে পরিবেশের অনেক ক্ষতি করছি, তাই অন্য ক্ষতি যত পারি কম করব! যেমন প্লাস্টিক কম ব্যবহার করব। দরকার না হলে পানীয়তে স্ট্র ব্যবহার করব না।
আর হ্যাঁ, এর মাঝে আমরা আরেক টাইম জোনে প্রবেশ করেছ। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সময়ের পার্থক্য এখন ১১ ঘণ্টা!

সীমা কেরমানির কথা মনে আছে আপনাদের? অনেকেই নাম না জানলেও চেনেন তাঁকে। কোক স্টুডিও পাকিস্তানের তুমুল জনপ্রিয় গান ‘পাসুরি’-তে তিনি ধ্রুপদী নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন। কী অনবদ্য পরিবশনা! তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের দিকে গেলে আমরা দেখতে পাই, ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম নেওয়া সীমা কেরমানি পেশা হিসেবে
৫ ঘণ্টা আগে
একটি ইন্সটাগ্রাম প্রোফাইলে ভিডিও আছে মাত্র ৪টি, আর ফলোয়ার সংখ্যা মাত্র ১৮৪ জন। কিন্তু সেখানকার একটি ভিডিও এরই মধ্যে আড়াই লাখ বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, রাস্তায় একটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর আড়ালে থেকে কেউ একজন তাঁর ভিডিও করছে। ভিডিও ধারণকারী বলছে, ‘আমাগো বাংলাদেশে আইছে দেখছেন এম্রিকাত্তে। আপু এ
১ দিন আগে
বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে একা বসে থাকা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে জমজমাট আড্ডা—চায়ের উপস্থিতি যেন সবখানেই। তবে চা কেবল তৃষ্ণা মেটায় না। এর রয়েছে অসংখ্য স্বাস্থ্যগুণ।
১ দিন আগে
এবারের কোরবানি ঈদে থাকতে পারে গরমের তীব্রতা। তাই এমন পোশাক নির্বাচন করা উচিত যা দেবে গরমে আরাম, থাকবে ফ্যাশনের ছোঁয়াও। তাই ‘কমফোর্ট’ বা আরামকে বেশি গুরুত্ব দিলে সারাদিন স্বস্তিতে কাটবে।
১ দিন আগে