আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস

আমাদের ধরিত্রী, আমাদের অস্তিত্ব

সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ১২: ১৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ ২২ মে, আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার এক অনন্য অঙ্গীকার। এ বছরের জন্য জাতিসংঘের ঘোষিত মূল প্রতিপাদ্য বা স্লোগান হচ্ছে, ‘বৈশ্বিক প্রভাবের জন্য স্থানীয় পদক্ষেপ’।

এই প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বৈশ্বিক স্তরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং প্রকৃতির ক্ষয় রোধ করার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের নিজ নিজ এলাকায় নেওয়া ছোট ছোট উদ্যোগের মধ্যে। নদী-নালা, পাহাড়-অরণ্য আর কোটি প্রাণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আমাদের এই অতি চেনা ধরিত্রীকে বাঁচাতে স্থানীয় পর্যায় থেকে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

জীববৈচিত্র্য কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পৃথিবীতে বাস করা উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীবসহ সব রকমের প্রাণের বৈচিত্র্য এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককেই জীববৈচিত্র্য বলা হয়। এই জীববৈচিত্র্য কোনো একক বিষয় নয়; এটি আমাদের বেঁচে থাকার মূল ভিত্তি।

আমাদের প্রতিদিনের শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন, পানের সুপেয় পানি এবং বেঁচে থাকার খাদ্য, সবই আসে প্রকৃতির এই নিখুঁত ইকোসিস্টেম থেকে।

কৃষি, ওষুধ শিল্প, পর্যটন এবং আরএমজি এর মতো বিশাল সব বৈশ্বিক শিল্প খাত সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

আমাজন রেইন ফরেস্ট, অন্যান্য বিশাল বনভূমি ও সমুদ্রের তলদেশের উদ্ভিদ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ঢাল হিসেবে কাজ করে।

আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসের ইতিহাস

আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উদযাপনের ইতিহাসটি পরিবেশ সংরক্ষণে বিশ্বনেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক অনন্য দলিল।

নাইরোবি কনভেনশন: ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ সম্মেলনে ‘কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি’-এর চূড়ান্ত পাঠ্য বা চুক্তিটি গৃহীত হয়।

প্রাথমিক দিন নির্ধারণ: ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রথমবার ২৯ ডিসেম্বর দিনটিকে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

তারিখ পরিবর্তন (২০০০): ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে পৃথিবীর অনেক দেশেই শীতকালীন বা বছর শেষের ছুটি থাকায় দিবসটি পালনে প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা দেখা দিত। ফলস্বরূপ, ২০০০ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে চুক্তি গ্রহণের মূল দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২২ মে তারিখটিকে চূড়ান্তভাবে ‘আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস’ হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করে। ফলে ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এই নির্দিষ্ট দিনেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপের কারণে প্রকৃতি আজ এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জীববৈচিত্র্য দিবস পালনের তাৎপর্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক: ২০২২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক বৈশ্বিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অন্তত ৩০ শতাংশ অবক্ষয়িত ইকোসিস্টেম, স্থলভাগ এবং জলভাগকে সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা (যা থার্টি ইনটু থার্টি টার্গেট নামে পরিচিত)। আমাদের হাতে আর মাত্র ৪ বছর সময় বাকি রয়েছে। তাই লক্ষ্য পূরণে প্রতিটি দেশের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য এই দিবসটি একটি বড় অনুস্মারক।

বিলুপ্তির হুমকি থেকে রক্ষা: জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মানুষের তৈরি নানা সংকটের কারণে বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ১০ লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই মারাত্মক ক্ষতির হাত থেকে ইকোসিস্টেমকে রক্ষা করার বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়াও এই দিবসের একটি উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম একটি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের দেশ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, এশিয়ার বৃহত্তম সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল, কিংবা দক্ষিণের সেন্টমার্টিন দ্বীপ এ দেশের প্রকৃতির অমূল্য রত্ন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার দিকে তাকালে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময়ের টইটুম্বুর স্রোতস্বিনী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা আজ শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণে মৃতপ্রায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাশয় ভরাটের কারণে ঢাকার বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চড়ুই, শালিক, কাঠবিড়ালি এমন কি কাকের মতো চেনা সব পাখপাখালি ও জীববৈচিত্র্য। অথচ ঢাকার মতো মেগাসিটিতে মানবজীবনকে সুস্থ রাখতে হলে ছাদবাগান, নগরের পার্ক এবং লেকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

বহমান স্রোতস্বিনী আর পাখির কলতানে ফিরুক প্রাণের স্পন্দন

প্রকৃতি কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এক পবিত্র আমানত এবং আগামী প্রজন্মের সম্মিলিত উত্তরাধিকার। নগরের বুক চিরে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী নদী আর ডানা মেলা পাখিদের কলতান স্তব্ধ করে মানুষের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ কখনোই টেকসই হতে পারে না। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান ও মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।

২০২৬ সালের এই আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসে আসুন, আমরা সবাই মিলে এক নতুন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হই। আমাদের ওয়ার্ডে আমাদের পাড়ায় আমাদের আঙিনায় নেওয়া প্রতিটি ছোট স্থানীয় পদক্ষেপই একদিন রাষ্ট্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিশালী ঢেউ তুলতে পারে।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সম্পর্কিত