রাজধানীর পশুর হাটে ‘সমঝোতার’ ইজারা, দুটিতে নামমাত্র বাড়তি দর

পশুর হাট ইজারায় কাটেনি পুরনো সিন্ডিকেট ও সমঝোতার সংস্কৃতি। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পশুর হাটের ইজারায় নতুন সমীকরণ দেখা গেছে। পুরনো আধিপত্য ভেঙে এসব হাট নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়েছেন বিএনপি ও জামায়াত নেতারা। তবে কাটেনি সিন্ডিকেট ও সমঝোতার সংস্কৃতি। অন্তত দুটি হাটে সরকারি দরের চেয়ে নামমাত্র বেশিতে ইজারা সম্পন্ন হয়েছে।

এর পেছনে অপরাধ জগতের প্রভাব ও রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। ডিএসসিসি সূত্র জানায়, এবার ১১টি স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটের মধ্যে আটটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি নেতারা অন্তত ছয়টি এবং জামায়াত নেতারা একটি হাটের ইজারা পেয়েছেন। বাকি একটি পেয়েছেন অরাজনৈতিক এক ব্যবসায়ী।

শ্যামপুর থানা বিএনপির সদস্যসচিব কাজী মাহবুব মওলা হিমেল পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের হাটের ইজারা পেয়েছেন। উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের হাটের ইজারা পাওয়া আনিসুর রহমান টিপু নিজেকে অরাজনৈতিক দাবি করে বলেন, জেদ করে চড়া দামে হাট নিয়েছেন তিনি। ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীন রতন আমুলিয়া মডেল টাউনের হাটের ইজারা পেয়েছেন।

কাজলা ব্রিজ এলাকার হাটের ইজারা পাওয়া কে বি ট্রেড-এর স্বত্বাধিকারী শামীম খান বলেন, ‘হাটটি মূলত জামায়াত নেতা পেয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁরা বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করেছেন।’ সূত্রমতে, ওই হাটের ৩০ শতাংশ শেয়ার বিএনপি এবং ৭০ শতাংশ জামায়াত নেতাকর্মীদের। গুঞ্জন রয়েছে, এর নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য।

বনশ্রী হাউজিংয়ের ইজারা পেয়েছেন বিএনপির সাবেক কমিশনার গোলাম হোসেন। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব সংলগ্ন হাট পেয়েছেন মতিঝিল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, জামায়াত নেতারা ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা দর দিলেও ৩ কোটি ১ লাখ টাকায় তিনি হাট পেয়েছেন।

হাজারীবাগ হাটের ইজারা পেয়েছে নাফিজ কবিরের সাফি এন্টারপ্রাইজ। অভিযোগ রয়েছে, এই হাটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি খালিদ মাহমুদ জ্যাকি এবং বিএনপি নেতা মো. সুমন। এর নেপথ্যে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর প্রভাব রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। গোলাপবাগ হাটের ইজারা পাওয়া আমির হোসেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কয়েক হাটে বড় ব্যবধান, দুই হাটে ‘নামমাত্র’ বাড়তি দর

সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিকদার মেডিকেল সংলগ্ন হাটের সরকারি মূল্য ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা হলেও ইজারা হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ২০ লাখ ১০ হাজার টাকায়। ব্যবধান মাত্র ১০ হাজার টাকা বা ০.০২ শতাংশ। গ্রিন বনশ্রী হাটের সরকারি মূল্য ৭০ লাখ টাকার বিপরীতে ইজারা মূল্য ৭০ লাখ ২০ হাজার টাকা।

বিপরীতে, আমুলিয়া মডেল টাউনের হাটে সরকারি মূল্যের চেয়ে ২৭৯ শতাংশ বেশি দর পাওয়া গেছে। পোস্তগোলা শ্মশানের হাটেও বাড়তি রাজস্ব এসেছে ৪৮ শতাংশ। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব সংলগ্ন হাটে ইজারা মূল্য বেড়েছে ১১৫ শতাংশ। উত্তর শাহজাহানপুর ও যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজ এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য বাড়তি দর পাওয়া গেছে।

আটটি হাটের নির্ধারিত মূল্য ছিল ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ২০ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব পেয়েছে ৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তবে কিছু হাটে মাত্র কয়েক হাজার টাকার ব্যবধানে ইজারা সম্পন্ন হওয়াকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘নামমাত্র’ বাড়তি দরের নেপথ্যে

জিঞ্জিরার গরু ব্যবসায়ী টিপু মিয়া জানান, হাজারীবাগ হাট বেশ বড়। আগে এটি ৫ কোটি টাকার আশপাশে ইজারা হতো। তাঁর ধারণা, এখানে ৭-৮ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। সূত্র জানায়, হাজারীবাগ হাটের পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমন রয়েছেন। হয়তো এ কারণেই কেউ দর দেয়নি। বনশ্রী হাটের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা কম থাকাকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পশুর হাট নিয়ে ঢাকার অপরাধ জগতের হর্তাকর্তাদের আগ্রহ নতুন নয়। গত ২৮ এপ্রিল শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুনের নেপথ্যেও বছিলার পশুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়। তবে কেন বেশি মূল্যে কেউ দর দেয়নি, এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁরা জানান, দরপত্র প্রক্রিয়া উন্মুক্ত ছিল।

ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘সব দলের মানুষ মিলেমিশে হাট পরিচালনা করলে তো অসুবিধা নেই।’ দুটি হাটে নামমাত্র বাড়তি দরের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি উন্মুক্ত দরপত্র ছিল এবং তিনবার টেন্ডার খোলা হয়েছে। অপরাধ জগতের প্রভাবের কোনো অভিযোগ তিনি পাননি বলে জানান।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত