সীমা কারমানি: রাষ্ট্র বনাম নারী

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ১৫: ০৩
ইতিহাসের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সত্য হলো নারীর কণ্ঠ কখনও পুরোপুরি স্তব্ধ করা যায়নি। এআই জেনারেটেড ছবি

সীমা কেরমানির কথা মনে আছে আপনাদের? অনেকেই নাম না জানলেও চেনেন তাঁকে। কোক স্টুডিও পাকিস্তানের তুমুল জনপ্রিয় গান ‘পাসুরি’-তে তিনি ধ্রুপদী নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন। কী অনবদ্য পরিবশনা! তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের দিকে গেলে আমরা দেখতে পাই, ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম নেওয়া সীমা কেরমানি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শাস্ত্রীয় নৃত্যকে, বিশেষ করে ভরতনাট্যম। এ ছাড়া তিনি কোরিওগ্রাফি ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

থিয়েটার, নৃত্য ও পরিবেশন শিল্পকে কাজে লাগিয়ে নারী অধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে সীমা প্রতিষ্ঠা করেন ‘তেহরিক-ই-নিসওয়ান’ নামের কালচারাল অ্যাকশন গ্রুপ। ‘আওরাত মার্চ’ নামে একটি সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। জেনারেল জিয়া-উল-হকের শাসনামলে যখন নৃত্য নিষিদ্ধ ছিল, তখন তিনি ছিলেন পাকিস্তানের একমাত্র নৃত্যশিল্পী।

২০১৭ সালে সেহওয়ানে লাল শাহবাজ কালান্দারের মাজারে হামলার পর সীমা কেরমানি সেখানে উপস্থিত হয়ে সুফি ঘরানার ধামাল নৃত্য পরিবেশন করেন। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে তিনি সংগীত ও নৃত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। এটি আসলে নারীর কণ্ঠ, দেহ, প্রতিবাদ ও স্বাধীন সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক কৌশলেরই নতুন সংস্করণ।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যে নারী প্রশ্ন করে, যে নারী নাচে, লেখে, উচ্চারণ করে, প্রতিবাদ করে, তাঁকে সমাজ ভয় পায়। যে নারী নাচকে প্রতিরোধের ভাষা বানান, যে নারী সংস্কৃতিকে জীবনের পক্ষে দাঁড় করান, তাঁকে রাষ্ট্র ও সমাজ দুদিক থেকেই শাস্তি পেতে হয়। কারণ, স্বাধীন নারী সবসময় ক্ষমতার কাছে বিপজ্জনক। সীমা কেরমানির বিরুদ্ধে এই আচরণ আসলে সকল নারীর প্রতি একটি বার্তা দেয়, আর তা হলো ‘চুপ থাকো, নইলে তোমাকেও দমন করা হবে।’

সীমা কেরমানি। সংগৃহীত ছবি
সীমা কেরমানি। সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাস যদি ক্ষমতার ইতিহাস হয়, তবে সেই ইতিহাসের ছায়াপথে সমান্তরালভাবে লেখা আছে আরেকটি দীর্ঘ অন্ধকার উপাখ্যান। আর তা নারীকে নীরব করার উপাখ্যান। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সভ্যতা, প্রতিটি ধর্মীয় কাঠামো, প্রতিটি সামাজিক বিন্যাস এবং প্রতিটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে নারীকে ভয় পেয়েছে। এই ভয় কখনও প্রকাশ পেয়েছে ধর্মীয় বিধিনিষেধে, কখনও সামাজিক নৈতিকতায়, কখনও রাষ্ট্রীয় দমননীতিতে, কখনও বা শিল্প ও সংস্কৃতির উপর নিষেধাজ্ঞায়। কারণ নারীতো শুধুমাত্র একটি জৈবিক সত্তা নয়, নারী হলো ভাষা, স্মৃতি, জন্ম, প্রতিবাদ, শিল্প, দেহরাজনীতি এবং বিকল্প সত্যের আধার। যে মুহূর্তে নারী নিজের শরীর, নিজের কণ্ঠ, নিজের শিল্প কিংবা নিজের স্বাধীনতার উপর অধিকার দাবি করে, সেই মুহূর্তেই পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার ভিত কেঁপে ওঠে।

পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো নারীকে ‘অপর’ বানিয়ে রাখা। সিমোন দ্য বোভোয়ার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Second Sex-এ লিখেছিলেন, ‘One is not born, but rather becomes, a woman’, অর্থাৎ নারী জন্মগত কোনো পরিচয় নয়; বরং সমাজ নারীকে নির্দিষ্ট এক ভূমিকায় নির্মাণ করে। এই নির্মাণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ক্ষমতার রাজনীতি। বোভোয়ার আরও লিখেছিলেন, ‘No man would consent to being a woman, but all want there to be women’, পুরুষকে ধরা হয় ‘মানুষ’-এর আদর্শ রূপ, আর নারীকে তার বিচ্যুতি, পরিপূরক, তার অধীনস্ত সত্তা। ফলে নারী কখনও পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠতে পারে না; তাঁকে হতে হয় মা, স্ত্রী, কন্যা, দেবী কিংবা ভোগ্যবস্তু। কিন্তু ব্যক্তি নয়। এই ‘অপরীকরণ’-এর শিকড় এত গভীরে প্রোথিত যে তা পৌরাণিক কাহিনি থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাংলার খনা সেই ইতিহাসের আরেক নির্মম অধ্যায়। খনার জ্ঞান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সহ্য করতে পারেনি। ফলে তাঁর জিভ কেটে ফেলা হয়েছিল, এই কিংবদন্তি নিছক কল্পকথা নয়, এটি জ্ঞানী নারীর কণ্ঠরোধের সাংস্কৃতিক প্রতীক। যে নারী জ্ঞান উৎপাদন করবে, ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যা করবে, কৃষি ও সমাজ নিয়ে মত দেবে পিতৃতন্ত্র তাঁকে ভয় পায়।

মহাভারতের দ্রৌপদীকে মনে করলে আমরা দেখি, তাঁকে অপমান করার জন্য জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব কিংবা রাজনৈতিক বোধকে আক্রমণ করা হয়নি; আক্রমণ করা হয়েছিল তাঁর শরীরকে। সভামধ্যে বস্ত্রহরণ ছিল এক নারীর অপমানের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন। দ্রৌপদীর দেহকে উন্মোচনের চেষ্টা আসলে ছিল রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করার প্রয়াস। কারণ পিতৃতন্ত্র জানে, নারীর শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মানেই তার আত্মমর্যাদাকে ধ্বংস করা। আজও যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ষণ, সামাজিক মাধ্যমে নারীর চরিত্রহনন, শিল্পী নারীদের পোশাক নিয়ে নৈতিকতার বিচার সবকিছুর শিকড় সেই দ্রৌপদীর সভাতেই নিহিত।

অহল্যার কাহিনিও একইভাবে নারীর উপর আরোপিত ‘পবিত্রতার শাস্তি’-র প্রতীক। প্রতারণার শিকার হয়েও তাঁকেই পাথর হয়ে থাকতে হয়েছে যুগের পর যুগ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী ভুক্তভোগী হলেও দোষী হয়ে ওঠে। ধর্ষিত নারীকে সমাজ প্রশ্ন করে, কিন্তু ধর্ষককে নয়। প্রতারিত নারীকে সমাজ নির্বাসিত করে, কিন্তু প্রতারক পুরুষকে নয়। অহল্যার পাথর হয়ে যাওয়া আসলে নারীর অনুভূতি, ভাষা ও জীবনীশক্তিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার রূপক।

বাংলার খনা সেই ইতিহাসের আরেক নির্মম অধ্যায়। খনার জ্ঞান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সহ্য করতে পারেনি। ফলে তাঁর জিভ কেটে ফেলা হয়েছিল, এই কিংবদন্তি নিছক কল্পকথা নয়, এটি জ্ঞানী নারীর কণ্ঠরোধের সাংস্কৃতিক প্রতীক। যে নারী জ্ঞান উৎপাদন করবে, ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যা করবে, কৃষি ও সমাজ নিয়ে মত দেবে পিতৃতন্ত্র তাঁকে ভয় পায়। যে পিতৃতন্ত্র টিকেই আছে নারীর অধীনতায় সেই পিতৃতন্ত্র নারীর স্বাধীনতা ও প্রতিবাদকে নিজ অস্তিত্বের জন্য অবশ্যই হুমকি মনে করবে এবং সেই প্রসঙ্গে আবারো বোভোয়ারের কাছেই যেতে হয় । তিনি The second Sex বইয়ে বলছেন, ‘No one is more arrogant toward women, more aggressive or scornful, than the man who is anxious about his virility’, যে জ্ঞানকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে দেখা হয়, সেই জ্ঞান যেন নারী অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে চায় পিতৃতন্ত্র।

মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রীয় দমন নয়, জ্ঞান, ভাষা, শরীর ও নৈতিকতার ভেতর দিয়েও ক্ষমতা কাজ করে। খনার জিভ কেটে ফেলা তাই একটি নারীর উপর সহিংসতার পাশাপাশি নারীর জ্ঞানচর্চার বিরুদ্ধে ক্ষমতার ঘোষণা।

পৌরাণিক অন্যান্য নারীদের জীবনেও পুরুষতন্ত্রের ভয় ও দম্ভ প্রলিপ্ত। যেমন মহাভারতে গান্ধারী স্বেচ্ছায় নিজেকে চাদরের আড়ালে আড়াল করে নেন, যেন মনে হয় স্বামীর অন্ধত্বে অংশ নিয়েছিলেন অথচ যুদ্ধ শেষে যখন তিনি কৃষ্ণকে অভিশাপ দেন, তখন দীর্ঘ নিরবতার পর পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে কাঁপিয়ে দেন। অথচ আমাদের পিতৃতন্ত্রিক সমাজ গান্ধারীকে পতিব্রতা নারীর উদাহরণ করে তুলেছে। অন্যদিকে গান্ধারীর চোখ বাঁধা যে একই সঙ্গে প্রতিবাদ, আত্মদমন, রাজনৈতিক নীরবতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে অভিশাপ তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রচলিত ব্যাখ্যায় বলা হয়, ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ছিলেন বলে গান্ধারীও স্বেচ্ছায় নিজের চোখ বেঁধেছিলেন, যেন স্বামীর ভাগ্যে নিজেকেও অংশীদার করতে পারেন। এই ব্যাখ্যা ভারতীয় পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ‘আদর্শ স্ত্রী’-র ধারণাকে মহিমান্বিত করে। এখানে নারীকে শেখানো হয় স্বামীর দুঃখই তাঁর দুঃখ, স্বামীর সীমাবদ্ধতাই তাঁর সীমা। ফলে গান্ধারীর চোখ বাঁধাকে আত্মত্যাগ ও পতিব্রতার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন একজন নারীকেই নিজের আলো ত্যাগ করতে হবে? কেন স্বামীর অন্ধত্বকে ভাগ করে নেওয়ার দায় কেবল স্ত্রীর? সেই প্রশ্ন পুরুষতন্ত্র এড়িয়ে যায়। গান্ধারীর চোখ বাঁধা নিছক আনুগত্য ছিলো না, এটি নীরব প্রতিবাদ। অজান্তে তাঁকে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ইচ্ছা, পছন্দ বা মতামতের কোনো মূল্য দেয়া হয়নি। তাঁকে রাজ্যের সুরক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই প্রতারণার বিরুদ্ধে গান্ধারীর প্রকাশ্য বিদ্রোহ করার ক্ষমতা ছিল না। কারণ সে যুগে নারীর কণ্ঠের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না। ফলে সে নিজের শরীরকেই প্রতিবাদের ভাষা বানাল। যে সমাজ তাকে সত্য জানার অধিকার দিল না, সেই সমাজের আলো সে প্রত্যাখ্যান করেছিলো। গান্ধারীর চোখ বাঁধা হয়ে ওঠে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী প্রত্যাখ্যান।

গান্ধারীর মতো কুন্তীও ছিল নিজেদের আবেগ ও শক্তিকে গোপন করার প্রতিমূর্তি।কর্ণের জন্মকে সাধারণভাবে ‘কুন্তীর ভুল’ বা ‘অবিবাহিত মাতৃত্বের কলঙ্ক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এটিতো কুন্তীর কোনো ব্যক্তিগত পাপের গল্প নয়; বরং তা আমাদের এমন এক সমাজব্যবস্থার নির্মমতা দেখায় যেখানে নারীকে দেবতার আশীর্বাদ গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু ফল বহনের অধিকার দেওয়া হয় না। পুরাণ অনুযায়ী, কুন্তী ঋষি দুর্বাসার কাছ মন্ত্র পেয়েছিলেন, যার মাধ্যমে যেকোনো দেবতাকে আহ্বান করা সম্ভব। কৈশোরের কৌতূহল, বিস্ময় এবং নিজের শক্তি পরীক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি সূর্যদেবকে আহ্বান করেন। কিন্তু আহ্বানের পর সেই শক্তির বাস্তব পরিণতি সম্পর্কে তাঁর কোনো প্রস্তুতি ছিল না। দেবতা আবির্ভূত হলেন, এবং কুন্তী মাতৃত্বের ভার পেলেন।

একুশ শতকের তথাকথিত উত্তর-আধুনিক পৃথিবীতেও কেন নারীর স্বাধীনতা সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ক্ষমতার মনস্তত্ত্বে।

এখানে প্রশ্ন হলো, একজন কিশোরী মেয়ের উপর এই পরিস্থিতির নৈতিক দায় কতটা চাপানো যায়? দেবতা, ঋষি, ধর্ম এবং পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের এই জটিল ক্ষমতাকাঠামোকে এই দায় কেন দেয়া হয় না? কর্ণের জন্মের দায় কখনো সূর্যদেবের উপর বর্তায় না। সমাজ প্রশ্ন তোলে না সেই দেবতার নৈতিকতা নিয়ে, যিনি এক কিশোরীর জীবনে এমন অনিবার্য পরিস্থিতি তৈরি করলেন। প্রশ্ন ওঠে শুধু কুন্তীকে ঘিরে। কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সন্তান জন্মের নৈতিক দায় প্রায় সবসময় নারীর শরীরেই এসে পড়ে। পুরুষ বা দেবতা সেখানে ক্ষমতাবান, নারী সেখানে দায়বাহী। কুন্তী সারাজীবন এই যন্ত্রণা বহন করেন কারণ সমাজ নারীর স্মৃতিকে কখনো মুক্তি দেয় না। পুরুষের অতীত অভিজ্ঞতা ‘অভিযান’, ‘বীরত্ব’ বা ‘দেবলীলা’ হয়ে যায়; নারীর অতীত হয়ে যায় অপরাধবোধ। কুন্তী রাজমাতা হয়েও নিজের প্রথম সন্তানকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারেননি। যুদ্ধের আগে কর্ণের কাছে গিয়ে সত্য বলা শুধু মাতৃত্বের আর্তি থেকে নয়, দীর্ঘ সময় ধরে বহন করা যন্ত্রণার নীরবতায় ভাঙন ধরানো ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য।

গ্রীক পুরাণের ক্যাসান্দ্রা আরও ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করে। তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন, কিন্তু তাঁর কথাকে কেউ বিশ্বাস করত না। এই মিথ আজও ভীষণ প্রাসঙ্গিক। নারী যখন সত্য উচ্চারণ করে, যখন সে ধর্ষণের কথা বলে, নিপীড়নের কথা বলে, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার কথা বলে, সমাজ প্রথমেই তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ক্যাসান্দ্রা পুরাণ থেকে বাস্তব, প্রাচীন থেকে সাম্প্রতিক প্রতিটি নারীর প্রতীক, যার সত্যকে সমাজ ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করেছে।

মেডুসাকেও কম মূল্য চুকাতে হয়নি। একসময় সুন্দরী নারী মেডুসা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, কিন্তু শাস্তি পেয়েছিলেন তিনিই। তাঁকে দানবে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এই মিথ সমাজের অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করে যেখানে পুরুষতন্ত্র প্রায়শই নির্যাতিত নারীকে ভয়ংকর, বিপজ্জনক কিংবা অশুভ হিসেবে নির্মাণ করে। আধুনিক সমাজেও আমরা দেখি, প্রতিবাদী নারীকে ‘উগ্র’, ‘অশালীন’, ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বা ‘বিপজ্জনক’ বলা হয়। যেন প্রতিবাদ করাটাই অপরাধ।

ফিলোমেলার জিভ কেটে দেওয়া হয়েছিল যাতে সে ধর্ষণের কথা বলতে না পারে। কিন্তু সে সুতোয় গল্প বুনে সত্য প্রকাশ করেছিল। নারীর ভাষাকে যতই স্তব্ধ করা হোক, শিল্প শেষ পর্যন্ত কথা বলে। তাই পিতৃতন্ত্র শিল্পী নারীকে ভয় পায়। কারণ গান, নাচ, কবিতা, চিত্রকলা কিংবা থিয়েটার নিছক নান্দনিকতার বিষয় নয়। এগুলো প্রতিরোধের ভাষা। পাকিস্তানের সীমা কেরমানির নৃত্যচর্চা বা শিল্পচর্চা মৌলবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর নাচকে যারা ভয় পায়, তাঁরা আসলে নারীর স্বাধীন শরীরকে ভয় পায়। কারণ নৃত্যশীল নারী নিয়ন্ত্রিত নারী নয়, সে নিজের শরীরের উপর নিজের অধিকার ঘোষণা করে।

একুশ শতকের তথাকথিত উত্তর-আধুনিক পৃথিবীতেও কেন নারীর স্বাধীনতা সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ক্ষমতার মনস্তত্ত্বে। পিতৃতন্ত্র নারীর উপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের আধিপত্য বজায় রাখে। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মানে পুরুষের উপর নির্ভরশীলতার অবসান। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ মানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব। নারীর শিল্পচর্চা মানে বিকল্প ভাষার জন্ম। আর নারীর শরীরের উপর নারীর নিজস্ব অধিকার মানে পুরুষতান্ত্রিক নৈতিকতার পতন। ফলে সমাজ নারীকে ক্রমাগত ‘অপর’ হিসেবে নির্মাণ করে রাখে, যাতে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

জুডিথ বাটলার দেখিয়েছেন, জেন্ডার বেসড আচরণ আসলে সামাজিক অভিনয়। সমাজ আমাদের নির্দিষ্ট আচরণে অভ্যস্ত করে তোলে। নারীকে শেখানো হয় কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে হাঁটতে হবে, কীভাবে হাসতে হবে, কী পরতে হবে, কতটুকু উচ্চস্বরে কথা বলা যাবে। যে নারী এই অভিনয়ের নিয়ম ভেঙে ফেলে, সমাজ তাঁকে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করে। তাই শিল্পী নারী, স্বাধীনচেতা নারী কিংবা রাজনৈতিকভাবে সচেতন নারীকে সমাজ সহজে মেনে নিতে পারে না।

নারীর ইতিহাস দেখলে মনে হয়, নারী কথা বলতে পারলেও তাঁর কথা শোনা হয় না। কণ্ঠকে বিকৃত করা হয়, অবিশ্বাস করা হয়, অথবা চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। ফলে নারীবাদ অনেক সময় পাঠ্যপুস্তক, সেমিনার ও শহুরে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। কারণ বাস্তব সামাজিক কাঠামো এখনও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্র, ধর্মীয় মৌলবাদ, পরিবার, পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা সবকিছু মিলে নারীর উপর জটিল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করেছে।

বিশেষত দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের অবস্থান আরও ভয়াবহ। সমাজে শ্রেণি, ধর্ম, জাত, লিঙ্গ সব ধরনের বৈষম্য এসে তাঁদের উপর জমা হয়। ফলে নারী কেবল নিম্নবর্গ নয়; অনেক ক্ষেত্রে ‘নিম্নবর্গেরও নিম্নবর্গ’ হয়ে ওঠে। একজন ধনী নারীরও যে স্বাধীনতা নেই, তা সত্য; কিন্তু একজন দরিদ্র শিল্পী নারীর স্বাধীনতা আরও সংকুচিত। কারণ তাঁর শরীর, শ্রম ও শিল্প সবকিছুই সমাজের নিয়ন্ত্রণাধীন।

এই কারণেই নারীকে ভয় পাওয়ার ইতিহাস আসলে ক্ষমতা হারানোর ভয়। পিতৃতন্ত্র জানে, যে মুহূর্তে নারী নিজের ভাষা, নিজের শরীর, নিজের শিল্প ও নিজের জ্ঞানকে পুনরুদ্ধার করবে, সেই মুহূর্তেই ক্ষমতার পুরোনো স্থাপত্য ভেঙে পড়বে। তাই যুগে যুগে দ্রৌপদীকে অপমান করা হয়েছে, অহল্যাকে পাথর বানানো হয়েছে, খনার জিভ কাটা হয়েছে, ক্যাসান্দ্রাকে অবিশ্বাস করা হয়েছে, মেডুসাকে দানব বানানো হয়েছে, ফিলোমেলার কণ্ঠ ছিন্ন করা হয়েছে। আর আজকের পৃথিবীতে শিল্পী নারীদের নাচ, গান, প্রতিবাদ কিংবা স্বাধীনতাকে ‘অশ্লীলতা’ ও ‘সংস্কৃতিবিরোধিতা’-র নামে দমন করা হচ্ছে।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সত্য হলো নারীর কণ্ঠ কখনও পুরোপুরি স্তব্ধ করা যায়নি। দ্রৌপদীর প্রশ্ন এখনও প্রতিধ্বনিত হয়, খনার বচন এখনও বাংলার মাটিতে বেঁচে আছে, ফিলোমেলার গল্প এখনও শিল্পে ফিরে আসে, আর সীমা কেরমানির নৃত্য এখনও ঘোষণা করে যে শরীরও এক ভাষা, শিল্পও এক প্রতিরোধ। মানবসভ্যতা যতবার নারীর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে, ততবার সে নিজের মানবিকতাকেই ক্ষতবিক্ষত করেছে। কারণ নারীকে নীরব করা মানে একটি লিঙ্গকে দমন করা নয়, তা সত্য, শিল্প, জ্ঞান ও মুক্তির সম্ভাবনাকে হত্যা করা। তবু নারীরা থামেনি। থামবেও না।

লেখক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত