সুন্দরবনের ঢাংমারীতে যা দেখলাম

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ১৮: ২১
সুন্দরবনের ঢাংমারীতে ইকো-রিসোর্ট। ছবি লেখকের সৌজন্যে

সুন্দরবনকে আমরা সাধারণত একটি বিশাল বনভূমি হিসেবেই চিনি। প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এক অপরূপ প্রাকৃতিক বিস্ময়। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছেই এক অনন্য পরিচয়ের নাম। কিন্তু এই বনের গল্প কেবল গাছ, নদী, বাঘ আর কাদামাটির নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আশপাশের লাখো মানুষের জীবন-সংগ্রাম, বেঁচে আর সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া জনপদের ইতিহাস।

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা গ্রামগুলোর মানুষ যুগের পর যুগ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই জীবন কাটাচ্ছে। দরিদ্রতা তাঁদের নিত্যসঙ্গী, অনিশ্চয়তা প্রতিটি সকালের বাস্তবতা। জীবিকার জন্য ভরসা কখনও মধু আহরণ, কখনও মাছ ধরা, কখনও গোলপাতা কাটা বা কাঠ সংগ্রহ। এই বনই অন্নদাতা, আবার একই সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

ঢাংমারী। ছবি লেখকের সৌজন্যে
ঢাংমারী। ছবি লেখকের সৌজন্যে

একসময় এই অঞ্চলের চিত্র ছিল আরো বেশি ভয়াবহ। সুন্দরবনের নদীপথে জলদস্যুদের তৎপরতা ছিল ভয়ংকরভাবে প্রকট। অসংখ্য মানুষ সেই দস্যু চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বাধ্য হয়ে, কেউ অভাবের তাড়নায় আর কেউ আবার অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে। বাঘ, হরিণসহ নানা বন্যপ্রাণী শিকার এবং পাচারও ছিল বহু মানুষের জীবিকার অংশ। বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বন উজাড় করে কাঠ কাটা, সব মিলিয়ে বেদনাময় বাস্তবতা ছিল এই অঞ্চলজুড়ে। মানুষ বেঁচে থাকার জন্য এমন সব পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল, যা প্রকৃতি ও সভ্যতা উভয়ের জন্যই ছিল ধ্বংসাত্মক।

গ্রামের মানুষ এখন রিসোর্টে মুরগি সরবরাহ করছে, স্থানীয় পুকুরের মাছ বিক্রি করছে, সবজি চাষ করে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
গ্রামের মানুষ এখন রিসোর্টে মুরগি সরবরাহ করছে, স্থানীয় পুকুরের মাছ বিক্রি করছে, সবজি চাষ করে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

সুন্দরবন এলাকার অজপাড়া গাঁ ঢাংমারী একসময় ছিল আর দশটা সাধারণ গ্রামের মতো। কিন্তু সময়ের প্রবাহে একদিন এই গ্রামের ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনা হয়। প্রথমদিকে এখানে ছোট পরিসরে ‘ইরাবতী’ নামে একটি গোলপাতার রিসোর্ট গড়ে ওঠে। বাঁশ, কাঠ আর স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি সেই প্রথম রিসোর্ট যেন এই গ্রামের ভবিষ্যতের নতুন দরজা খুলে দেয়। আমার বন্ধু ইমন ভাই ও হিরা ভাইয়ের মতো কিছু স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেন। তাঁরা চেয়েছিলেন শহরের মানুষকে বনের আরও কাছে নিয়ে যেতে, প্রকৃতিকে অনুভব করাতে।

সুন্দরবনের ঢাংমারী। ছবি লেখকের সৌজন্যে
সুন্দরবনের ঢাংমারী। ছবি লেখকের সৌজন্যে

এরপর আসে আরও বড় পরিবর্তন। ‘সুন্দরী ইকো রিসোর্ট’ চিত্র পাল্টে দেয়। একসময় যে গ্রামটি ছিল দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার প্রতীক, সেখানে ধীরে ধীরে নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠে। আমি নিজে পৃথিবীর নানা বনভূমিতে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বন আমাজনের গভীরে থেকেছি, সম্প্রতি চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কের বনের ভেতরে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে, বনকে দূর থেকে দেখে তার আসল সৌন্দর্য বোঝা যায় না। বনের প্রকৃত মহিমা উপলব্ধি করতে হলে তার ভেতরে যেতে হয়।

গত তিন বছরে ঢাংমারী গ্রামের পরিবর্তন যেন চোখে পড়ার মতো। এখন সেখানে প্রায় পনেরোটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
গত তিন বছরে ঢাংমারী গ্রামের পরিবর্তন যেন চোখে পড়ার মতো। এখন সেখানে প্রায় পনেরোটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

গত তিন বছরে ঢাংমারী গ্রামের পরিবর্তন যেন চোখে পড়ার মতো। এখন সেখানে প্রায় পনেরোটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এই পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রার, অর্থনীতির এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নের পরিবর্তন। আগে যেসব মানুষ জীবন বাজি রেখে বাঘের ভয় মাথায় নিয়ে বনে মধু সংগ্রহ করতে যেত, মাছ ধরতে যেত, কিংবা অবৈধ শিকার ও কাঠ কাটার সঙ্গে যুক্ত থাকত, তাঁদের অনেকেই এখন রিসোর্ট ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট চাকরি করছে।

গ্রামের মানুষ এখন রিসোর্টে মুরগি সরবরাহ করছে, স্থানীয় পুকুরের মাছ বিক্রি করছে, সবজি চাষ করে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। কেউ আবার ছোট দোকান খুলেছে, কেউ পরিবহন সেবায় যুক্ত হয়েছে।

সুন্দরবনের ঢাংমারীতে ইকো-রিসোর্টে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
সুন্দরবনের ঢাংমারীতে ইকো-রিসোর্টে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

সেখানের নতুন প্রজন্ম এখন অন্যরকম স্বপ্ন দেখতে শিখছে। তারা বুঝতে পারছে বনকে ধ্বংস করে নয়, বনকে রক্ষা করেই জীবিকা অর্জন করা সম্ভব। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই উন্নয়ন সম্ভব। এটাই এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সুন্দরবনের এই রূপান্তর আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। আমি সত্যিই আশা করি, যেমন মানুষ কক্সবাজারে ছুটে যায় সমুদ্রের টানে, তেমনি একদিন আরও বেশি মানুষ সুন্দরবনের টানে এই গ্রামে আসবে। তাঁরা বনের সান্নিধ্য পাবে, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাবে, এখানকার মানুষের জীবনসংগ্রামকে কাছ থেকে দেখবে, উপলব্ধি করবে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এসে তাঁরা বুঝতে পারবে, জীবনের আরেকটি রূপও আছে।

সুন্দরবনের ঢাংমারীতে ইকো-রিসোর্ট। ছবি লেখকের সৌজন্যে
সুন্দরবনের ঢাংমারীতে ইকো-রিসোর্ট। ছবি লেখকের সৌজন্যে

সুন্দরবনের মানুষদের জীবন যে কতটা কঠিন, কতটা সংগ্রামময়, তা দূর থেকে বোঝা যায় না। তাঁদের প্রতিটি দিনের পেছনে থাকে লড়াই, সাহস এবং টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি। এই বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখা, অনুভব করা এবং তাঁদের গল্পকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।

এই পরিবর্তনের গল্প শুনলে মনে হয়, প্রকৃতি কখনও কাউকে নিরাশ করে না, যদি তাকে ভালোবাসা যায়, রক্ষা করা যায়।

সম্পর্কিত