দেখা থেকে লেখা
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

ঈদের ছুটিতে কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল অনেক দিন ধরে। বছরের পর বছর রূপপুরের নাম পড়েছি, শুনেছি, খবরে দেখেছি। কিন্তু নিজের চোখে দেখা হয়নি। এবার ঠিক করলাম, এই ছুটিতে যাবই। পরিবার রাজি হলো। গাড়ি বের হলো। রাজশাহী থেকে রূপপুর।
আমার ছোটভাই সাজ্জাদ স্টিয়ারিংয়ে বসল। সে আমার খুবই কাছের মানুষ। সঙ্গে স্ত্রী শারমিন, পুত্র শারাফ সিদ্দিক, আর শ্যালিকা বৃষ্টি। রাজশাহী থেকে রূপপুরের দূরত্ব পঁয়ষট্টি থেকে সত্তর কিলোমিটার। দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ। রাস্তাটা যেন নিজেই টেনে নিয়ে যেতে লাগল পদ্মার দিকে। পথে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ছাত্রজীবন থেকে এই ব্রিজের উপর দিয়েই খুলনায় দেশের বাড়ি যাওয়া-আসা। কিন্তু আজকের যাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। পদ্মার ওপারে কোথাও একটা পরমাণু চুল্লি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে! গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে ভাবলাম, এইবার দেখব সেটা।
রূপপুরে ঢুকতেই বুঝলাম, এটা সাধারণ কোনো জায়গা নয়। আকাশছোঁয়া ক্রেন, বিশাল কংক্রিটের কাঠামো, দিগন্তজুড়ে কর্মযজ্ঞ। এতটুকু জায়গায় এত মানুষ কাজ করছেন যে মাথা ঘুরে যায়। রাশিয়ান পল্লিতে পা দিতেই মনে হলো অন্য এক পৃথিবীতে এসে পড়েছি। চশমার দোকান, সবজির দোকান, মুরগির দোকান, সব জায়গায় বাংলাদেশি বিক্রেতারা রাশিয়ান ভাষায় অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। যেন জন্মের পর থেকে এই ভাষাই শিখেছেন। সাড়ে ছয় ফুট বা তারও বেশি উচ্চতার সুঠামদেহী মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তায়। রাশিয়ান, বেলারুশ আর দাগেস্তানের ইঞ্জিনিয়ার আর প্রজেক্ট ওয়ার্কাররা, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে বুকে, গলায়, পায়ের কাফ মাসলে উল্কি দিয়ে সাটা। একটুকরো রাশিয়া যেন উঠে এসেছে পদ্মার পাড়ে।

একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা দৃশ্য, যা মনে রাখার মতো। পথের ধারে কয়েকজন ভিক্ষুক, পাশে এতিমখানার মাদ্রাসার কিছু সাহায্যপ্রার্থী শিশু, তাঁরাও রাশিয়ান প্রকৌশলীদের সঙ্গে দেদারসে রুশ ভাষায় কথা বলে যাচ্ছে। কোনো জড়তা নেই, কোনো ইতস্তত নেই, যেন অনেক দিনের পরিচিত।
দুপুরে গেলাম এলাকার সবচেয়ে বড় রেস্টুরেন্টে। ঝকঝকে পরিষ্কার, বড় হলঘর। টেবিলে টেবিলে রাশিয়ানরা খাচ্ছেন গোগ্রাসে। দেখলাম নিমিষেই পুরো প্লেট ভর্তি লাঞ্চ সাবাড় করে আবার অর্ডার দিচ্ছেন অন্য কোনো ডিশ। ওয়েটার জানাল, এই মানুষগুলো ঝাল একদমই খেতে পারেন না। তাঁদের পছন্দ বয়েল্ড ভেজিটেবল, শূকরের মাংসের স্টেক, বিফ স্টেক। দেশি ওয়েটারগুলো মহানন্দে সেসব পরিবেশন করছেন, কেউ কেউ গুনগুন করে গাইছেনও। ক্যাশ কাউন্টারে থরেথরে সাজানো নানান ডিজাইনের রঙিন বোতল, ভেতরে কী আছে সেটা না বললেও চেহারা দেখেই বোঝা যায় এগুলো শুধু শরবতের জন্য রাখা হয়নি! একই টেবিলে আমাদের সামনে এলো চিকন চালের ভাত, লোভনীয় কোরাল মাছের দো-পিয়াজী, মিক্সড ভেজিটেবল আর পাতলা ডাল। ভিন্ন ঘরানার খাবার পাশাপাশি দেখতেই মজা লাগল।
সেই টেবিলেই পরিচয় হলো প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আলেক্সান্দার ভালকভের সঙ্গে। দেখতে পাহাড়ের মতো। উচ্চতায়, গড়নে, ওজনে, সব দিক দিয়ে বিশাল। কিন্তু কথা বলতে বসলে বুঝলাম, মানুষটা বিনয়েরও একটা আলাদা নমুনা। প্রজেক্টের শুরু থেকেই এখানে আছেন। ইংরেজিটা দুর্দান্ত বলেন। কথায় কথায় বললাম, তোমাদের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। ভালকভের অট্টহাসিতে পুরো রেস্টুরেন্ট যেন কেঁপে উঠল। আনন্দে চোখ চিকচিক করতে লাগল।
খাবার টেবিলে বসেই ভালকভ অনেক কিছু বললেন রূপপুর নিয়ে। মাস গেলে তাঁর বেতন কত, সেটা সংখ্যায় না বললেও বুঝলাম বিশাল। এই মানুষগুলো দেশ ছেড়ে এসেছেন কারণ এখানে কাজটা বড়, চ্যালেঞ্জটা বড়। পৃথিবীর যেখানে পারমাণবিক প্রযুক্তি যায়, সেখানেই এই পেশাদার দলটা যায়। রূপপুর তাঁদের কাছে আরেকটি দেশ, আরেকটি প্রকল্প।

ভালকভের কাছে যা জানলাম, সেটা থেকে নিজের পড়া হিসাবটা মেলাতে বসলাম মনে মনে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার কোটি টাকায়। শুরুতে ধরা হয়েছিল এক লাখ তেরো হাজার কোটি। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় বেড়েছে। রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংক মোট খরচের নব্বই ভাগ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে এগারো বিলিয়ন ডলার যেখানে বাংলাদেশ দিচ্ছে মাত্র দশ ভাগ। এটা কি বেশি বিনিয়োগ? কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু রিটার্নের হিসাবটা আগে দেখা দরকার।
দুটো ইউনিট মিলিয়ে উৎপাদন হবে দুই হাজার চারশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিট পাঁচ টাকা ধরলেও বার্ষিক রাজস্ব আসবে প্রায় দশ হাজার পাঁচশো কোটি টাকা। এই কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে কমপক্ষে ষাট বছর, সরকারি প্রক্ষেপণে একশ বছর পর্যন্ত। ষাট বছরের উৎপাদনকাল ধরলে মোট বিনিয়োগ উঠে আসার পরেও দীর্ঘ একটা লাভজনক পর্ব বাকি থাকে। সরাসরি বিদ্যুৎ পাবে প্রায় আঠারো লাখ পরিবার। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত দশ ভাগ পূরণ করবে কেবল এই একটি কেন্দ্র।
প্রশ্ন আসে, দাম কি বেশি পড়ছে না? আন্তর্জাতিক তুলনায় রূপপুরের প্রতি কিলোওয়াট নির্মাণব্যয় অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এই প্রশ্ন তোলা জরুরি, এই হিসাব চাওয়া দরকার। কিন্তু একটু পেছনে তাকালেও বোঝা যায়, যে দেশ প্রথমবার পারমাণবিক প্রযুক্তিতে পা দেয়, তাকে সক্ষমতা তৈরির জন্য বাড়তি খরচ গুনতে হয়। ভারত, পাকিস্তান, চীন, সবাই একদিন এই পথ দিয়েই হেঁটেছে। আর বিকল্পটা কী? গ্যাসের মজুত শেষ হচ্ছে। তেল আমদানির খরচ বাড়ছে। সৌরবিদ্যুৎ রাতে চলে না। বড় সুবিধা হলো—এই বিদ্যুৎ দিন-রাত থামে না, অন্য অনেক উৎসের মতো না।
তবে ছবিটা পুরো উজ্জ্বল না। গবেষণা বলছে, রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ পড়বে ৯ দশমিক ৩৬ সেন্ট প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা। যেখানে ভারতের একই ধরনের কুদানকুলাম প্ল্যান্টে এই খরচ মাত্র ৫ দশমিক ৩৬ সেন্ট। পার্থক্যটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। আর ঋণের বোঝাটাও ছোট না—সাড়ে এগারো বিলিয়ন ডলার শোধ করতে হবে সুদসহ, দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচশো মিলিয়ন ডলার। এই টাকা আসবে বিদ্যুৎ বিক্রির রাজস্ব থেকেই। হিসাবটা আঁটোসাটো হলেও কঠিন নয়।

বৃষ্টি একটু চুপ ছিল সব শুনে। তারপর বলল, ‘ভাইয়া, আমি যখন ভার্সিটি পাশ করব, তখন কি এই বিদ্যুৎ চলে আসবে?’ বললাম, ‘তুই যখন মাস্টার্স করবি, তখন এই কেন্দ্র পুরোদমে চলবে।’ ভার্সিটিতে ভর্তিচ্ছু একটা মেয়ে যখন পারমাণবিক বিদ্যুতের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ মেলায়, তখন বুঝি প্রজেক্টটা শুধু কাগজে-কলমের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে।
সাইটে ঢোকার পাস ছিল আমার কাছে। কিন্তু শারমিনের সিদ্ধান্ত, কেনাকাটা বাকি। বাইরে থেকেই দেখলাম মহাযজ্ঞ! আকাশছোঁয়া প্রচুর আবাসিক ভবন, পাশেই বাঙালির হাট-বাজার। ইঞ্জিনিয়ারদের আবাস আর স্থানীয় চায়ের দোকান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, দুটো জগৎ একসাথে বাঁচছে। দোকানদার থেকে পুলিশ, সবাই বাঙালি। এই প্রকল্পকে ঘিরে পুরো একটা অর্থনীতি গড়ে উঠেছে অত্র এলাকায়।
বিকেলে পদ্মার পাড়ে গেলাম। বাঁশের বেঞ্চে পা ছড়িয়ে বসলাম। গরুর দুধের ঘন চা। সামনে পদ্মা। বিকেলের আলোয় নদীর রং তামাটে হয়ে যায়। শারমিন ও বৃষ্টি, দুই বোন ক্যামেরা হাতে পটাপট ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেল। শারাফ মাটিতে বসে কী খুঁজছে, সাজ্জাদ চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে। পরিবারের এই মুহূর্তগুলো কোনো ক্যামেরায় ধরা যায় না। মনের ভেতরে তুলে রাখতে হয়। ছবি তোলা হলো অনেক। কিন্তু সবচেয়ে দামি ছবিটা তোলা হলো না। ঘন চায়ের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দেখা পদ্মার সূর্যাস্ত।
ফেরার পথে গাড়িতে সবাই চুপ। শারাফ কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝিনি। শারমিন কাচের গায়ে মাথা হেলান দিয়েছে। সাজ্জাদ নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে। ঈশ্বরদী ছেড়ে আসছি, আর একটু একটু করে রূপপুর পেছনে পড়ছে। রাস্তার দুই পাশে গাছের ফাঁকে ফাঁকে জ্যোৎস্না। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় রূপপুর মায়াকাড়া টানে আমাদের সবাইকে ফেলে দিয়েছে, বুঝলাম।
পদ্মা পেছনে ফেলে আসতে আসতে মাথায় ঘুরছিল ভালকভের কথা, বৃষ্টির প্রশ্ন, আর সেই হিসাবটা। এক লাখ চল্লিশ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। বিপরীতে প্রতি বছর দশ হাজার কোটির রাজস্ব। আঠারো লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ। ষাট থেকে একশ বছরের আয়ু।
হয়ত কিছুদিন পরে রাতের পাবনা, ঈশ্বরদীর আলো আরেকটু উজ্জ্বল হবে। কারখানার চাকা নিরবচ্ছিন্ন ঘুরবে। গ্রামে গ্রামে লোডশেডিং কমবে। রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ দিলে যে বাংলাদেশটা দেখা যাবে, সেটার একটা ঝলক দেখলাম পদ্মার ওপাড়ে ওই বিশাল কাঠামোর মধ্যে।
রাত হয়ে গেছে। গাড়ির জানালায় রাজশাহীর আলো ফুটে উঠছে। ছেলেটা ঘুমের মধ্যে আমার কাঁধে মাথা রেখেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় তার মুখের দিকে তাকালাম। এই ছেলে যখন বড় হবে, যখন পড়াশোনা শেষ করে কাজে নামবে, তখন রূপপুরের বিদ্যুৎ তাঁর ল্যাপটপে আলো দেবে, ফ্যাক্টরির চাকা ঘোরাবে, তাঁর শহরের রাত উজ্জ্বল রাখবে। শারাফ হয়ত জানবেও না, তাঁর বাবা একদিন পদ্মার পাড়ে বসে ঘন চায়ের কাপ হাতে এই স্বপ্নের কাছে গিয়েছিল।
এটাই তো দেশ। এটাই তো আমাদের প্রজন্মের স্বপ্ন। রূপপুর তার হিসাব মেটাবে নিজের মতো করে, তার নিজের সময়ে। আমরা শুধু স্বপ্নটা দেখে রাখি।

ঈদের ছুটিতে কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল অনেক দিন ধরে। বছরের পর বছর রূপপুরের নাম পড়েছি, শুনেছি, খবরে দেখেছি। কিন্তু নিজের চোখে দেখা হয়নি। এবার ঠিক করলাম, এই ছুটিতে যাবই। পরিবার রাজি হলো। গাড়ি বের হলো। রাজশাহী থেকে রূপপুর।
আমার ছোটভাই সাজ্জাদ স্টিয়ারিংয়ে বসল। সে আমার খুবই কাছের মানুষ। সঙ্গে স্ত্রী শারমিন, পুত্র শারাফ সিদ্দিক, আর শ্যালিকা বৃষ্টি। রাজশাহী থেকে রূপপুরের দূরত্ব পঁয়ষট্টি থেকে সত্তর কিলোমিটার। দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ। রাস্তাটা যেন নিজেই টেনে নিয়ে যেতে লাগল পদ্মার দিকে। পথে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ছাত্রজীবন থেকে এই ব্রিজের উপর দিয়েই খুলনায় দেশের বাড়ি যাওয়া-আসা। কিন্তু আজকের যাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। পদ্মার ওপারে কোথাও একটা পরমাণু চুল্লি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে! গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে ভাবলাম, এইবার দেখব সেটা।
রূপপুরে ঢুকতেই বুঝলাম, এটা সাধারণ কোনো জায়গা নয়। আকাশছোঁয়া ক্রেন, বিশাল কংক্রিটের কাঠামো, দিগন্তজুড়ে কর্মযজ্ঞ। এতটুকু জায়গায় এত মানুষ কাজ করছেন যে মাথা ঘুরে যায়। রাশিয়ান পল্লিতে পা দিতেই মনে হলো অন্য এক পৃথিবীতে এসে পড়েছি। চশমার দোকান, সবজির দোকান, মুরগির দোকান, সব জায়গায় বাংলাদেশি বিক্রেতারা রাশিয়ান ভাষায় অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। যেন জন্মের পর থেকে এই ভাষাই শিখেছেন। সাড়ে ছয় ফুট বা তারও বেশি উচ্চতার সুঠামদেহী মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তায়। রাশিয়ান, বেলারুশ আর দাগেস্তানের ইঞ্জিনিয়ার আর প্রজেক্ট ওয়ার্কাররা, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে বুকে, গলায়, পায়ের কাফ মাসলে উল্কি দিয়ে সাটা। একটুকরো রাশিয়া যেন উঠে এসেছে পদ্মার পাড়ে।

একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা দৃশ্য, যা মনে রাখার মতো। পথের ধারে কয়েকজন ভিক্ষুক, পাশে এতিমখানার মাদ্রাসার কিছু সাহায্যপ্রার্থী শিশু, তাঁরাও রাশিয়ান প্রকৌশলীদের সঙ্গে দেদারসে রুশ ভাষায় কথা বলে যাচ্ছে। কোনো জড়তা নেই, কোনো ইতস্তত নেই, যেন অনেক দিনের পরিচিত।
দুপুরে গেলাম এলাকার সবচেয়ে বড় রেস্টুরেন্টে। ঝকঝকে পরিষ্কার, বড় হলঘর। টেবিলে টেবিলে রাশিয়ানরা খাচ্ছেন গোগ্রাসে। দেখলাম নিমিষেই পুরো প্লেট ভর্তি লাঞ্চ সাবাড় করে আবার অর্ডার দিচ্ছেন অন্য কোনো ডিশ। ওয়েটার জানাল, এই মানুষগুলো ঝাল একদমই খেতে পারেন না। তাঁদের পছন্দ বয়েল্ড ভেজিটেবল, শূকরের মাংসের স্টেক, বিফ স্টেক। দেশি ওয়েটারগুলো মহানন্দে সেসব পরিবেশন করছেন, কেউ কেউ গুনগুন করে গাইছেনও। ক্যাশ কাউন্টারে থরেথরে সাজানো নানান ডিজাইনের রঙিন বোতল, ভেতরে কী আছে সেটা না বললেও চেহারা দেখেই বোঝা যায় এগুলো শুধু শরবতের জন্য রাখা হয়নি! একই টেবিলে আমাদের সামনে এলো চিকন চালের ভাত, লোভনীয় কোরাল মাছের দো-পিয়াজী, মিক্সড ভেজিটেবল আর পাতলা ডাল। ভিন্ন ঘরানার খাবার পাশাপাশি দেখতেই মজা লাগল।
সেই টেবিলেই পরিচয় হলো প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আলেক্সান্দার ভালকভের সঙ্গে। দেখতে পাহাড়ের মতো। উচ্চতায়, গড়নে, ওজনে, সব দিক দিয়ে বিশাল। কিন্তু কথা বলতে বসলে বুঝলাম, মানুষটা বিনয়েরও একটা আলাদা নমুনা। প্রজেক্টের শুরু থেকেই এখানে আছেন। ইংরেজিটা দুর্দান্ত বলেন। কথায় কথায় বললাম, তোমাদের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। ভালকভের অট্টহাসিতে পুরো রেস্টুরেন্ট যেন কেঁপে উঠল। আনন্দে চোখ চিকচিক করতে লাগল।
খাবার টেবিলে বসেই ভালকভ অনেক কিছু বললেন রূপপুর নিয়ে। মাস গেলে তাঁর বেতন কত, সেটা সংখ্যায় না বললেও বুঝলাম বিশাল। এই মানুষগুলো দেশ ছেড়ে এসেছেন কারণ এখানে কাজটা বড়, চ্যালেঞ্জটা বড়। পৃথিবীর যেখানে পারমাণবিক প্রযুক্তি যায়, সেখানেই এই পেশাদার দলটা যায়। রূপপুর তাঁদের কাছে আরেকটি দেশ, আরেকটি প্রকল্প।

ভালকভের কাছে যা জানলাম, সেটা থেকে নিজের পড়া হিসাবটা মেলাতে বসলাম মনে মনে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার কোটি টাকায়। শুরুতে ধরা হয়েছিল এক লাখ তেরো হাজার কোটি। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় বেড়েছে। রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংক মোট খরচের নব্বই ভাগ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে এগারো বিলিয়ন ডলার যেখানে বাংলাদেশ দিচ্ছে মাত্র দশ ভাগ। এটা কি বেশি বিনিয়োগ? কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু রিটার্নের হিসাবটা আগে দেখা দরকার।
দুটো ইউনিট মিলিয়ে উৎপাদন হবে দুই হাজার চারশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিট পাঁচ টাকা ধরলেও বার্ষিক রাজস্ব আসবে প্রায় দশ হাজার পাঁচশো কোটি টাকা। এই কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে কমপক্ষে ষাট বছর, সরকারি প্রক্ষেপণে একশ বছর পর্যন্ত। ষাট বছরের উৎপাদনকাল ধরলে মোট বিনিয়োগ উঠে আসার পরেও দীর্ঘ একটা লাভজনক পর্ব বাকি থাকে। সরাসরি বিদ্যুৎ পাবে প্রায় আঠারো লাখ পরিবার। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত দশ ভাগ পূরণ করবে কেবল এই একটি কেন্দ্র।
প্রশ্ন আসে, দাম কি বেশি পড়ছে না? আন্তর্জাতিক তুলনায় রূপপুরের প্রতি কিলোওয়াট নির্মাণব্যয় অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এই প্রশ্ন তোলা জরুরি, এই হিসাব চাওয়া দরকার। কিন্তু একটু পেছনে তাকালেও বোঝা যায়, যে দেশ প্রথমবার পারমাণবিক প্রযুক্তিতে পা দেয়, তাকে সক্ষমতা তৈরির জন্য বাড়তি খরচ গুনতে হয়। ভারত, পাকিস্তান, চীন, সবাই একদিন এই পথ দিয়েই হেঁটেছে। আর বিকল্পটা কী? গ্যাসের মজুত শেষ হচ্ছে। তেল আমদানির খরচ বাড়ছে। সৌরবিদ্যুৎ রাতে চলে না। বড় সুবিধা হলো—এই বিদ্যুৎ দিন-রাত থামে না, অন্য অনেক উৎসের মতো না।
তবে ছবিটা পুরো উজ্জ্বল না। গবেষণা বলছে, রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ পড়বে ৯ দশমিক ৩৬ সেন্ট প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা। যেখানে ভারতের একই ধরনের কুদানকুলাম প্ল্যান্টে এই খরচ মাত্র ৫ দশমিক ৩৬ সেন্ট। পার্থক্যটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। আর ঋণের বোঝাটাও ছোট না—সাড়ে এগারো বিলিয়ন ডলার শোধ করতে হবে সুদসহ, দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচশো মিলিয়ন ডলার। এই টাকা আসবে বিদ্যুৎ বিক্রির রাজস্ব থেকেই। হিসাবটা আঁটোসাটো হলেও কঠিন নয়।

বৃষ্টি একটু চুপ ছিল সব শুনে। তারপর বলল, ‘ভাইয়া, আমি যখন ভার্সিটি পাশ করব, তখন কি এই বিদ্যুৎ চলে আসবে?’ বললাম, ‘তুই যখন মাস্টার্স করবি, তখন এই কেন্দ্র পুরোদমে চলবে।’ ভার্সিটিতে ভর্তিচ্ছু একটা মেয়ে যখন পারমাণবিক বিদ্যুতের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ মেলায়, তখন বুঝি প্রজেক্টটা শুধু কাগজে-কলমের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে।
সাইটে ঢোকার পাস ছিল আমার কাছে। কিন্তু শারমিনের সিদ্ধান্ত, কেনাকাটা বাকি। বাইরে থেকেই দেখলাম মহাযজ্ঞ! আকাশছোঁয়া প্রচুর আবাসিক ভবন, পাশেই বাঙালির হাট-বাজার। ইঞ্জিনিয়ারদের আবাস আর স্থানীয় চায়ের দোকান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, দুটো জগৎ একসাথে বাঁচছে। দোকানদার থেকে পুলিশ, সবাই বাঙালি। এই প্রকল্পকে ঘিরে পুরো একটা অর্থনীতি গড়ে উঠেছে অত্র এলাকায়।
বিকেলে পদ্মার পাড়ে গেলাম। বাঁশের বেঞ্চে পা ছড়িয়ে বসলাম। গরুর দুধের ঘন চা। সামনে পদ্মা। বিকেলের আলোয় নদীর রং তামাটে হয়ে যায়। শারমিন ও বৃষ্টি, দুই বোন ক্যামেরা হাতে পটাপট ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেল। শারাফ মাটিতে বসে কী খুঁজছে, সাজ্জাদ চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে। পরিবারের এই মুহূর্তগুলো কোনো ক্যামেরায় ধরা যায় না। মনের ভেতরে তুলে রাখতে হয়। ছবি তোলা হলো অনেক। কিন্তু সবচেয়ে দামি ছবিটা তোলা হলো না। ঘন চায়ের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দেখা পদ্মার সূর্যাস্ত।
ফেরার পথে গাড়িতে সবাই চুপ। শারাফ কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝিনি। শারমিন কাচের গায়ে মাথা হেলান দিয়েছে। সাজ্জাদ নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে। ঈশ্বরদী ছেড়ে আসছি, আর একটু একটু করে রূপপুর পেছনে পড়ছে। রাস্তার দুই পাশে গাছের ফাঁকে ফাঁকে জ্যোৎস্না। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় রূপপুর মায়াকাড়া টানে আমাদের সবাইকে ফেলে দিয়েছে, বুঝলাম।
পদ্মা পেছনে ফেলে আসতে আসতে মাথায় ঘুরছিল ভালকভের কথা, বৃষ্টির প্রশ্ন, আর সেই হিসাবটা। এক লাখ চল্লিশ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। বিপরীতে প্রতি বছর দশ হাজার কোটির রাজস্ব। আঠারো লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ। ষাট থেকে একশ বছরের আয়ু।
হয়ত কিছুদিন পরে রাতের পাবনা, ঈশ্বরদীর আলো আরেকটু উজ্জ্বল হবে। কারখানার চাকা নিরবচ্ছিন্ন ঘুরবে। গ্রামে গ্রামে লোডশেডিং কমবে। রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ দিলে যে বাংলাদেশটা দেখা যাবে, সেটার একটা ঝলক দেখলাম পদ্মার ওপাড়ে ওই বিশাল কাঠামোর মধ্যে।
রাত হয়ে গেছে। গাড়ির জানালায় রাজশাহীর আলো ফুটে উঠছে। ছেলেটা ঘুমের মধ্যে আমার কাঁধে মাথা রেখেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় তার মুখের দিকে তাকালাম। এই ছেলে যখন বড় হবে, যখন পড়াশোনা শেষ করে কাজে নামবে, তখন রূপপুরের বিদ্যুৎ তাঁর ল্যাপটপে আলো দেবে, ফ্যাক্টরির চাকা ঘোরাবে, তাঁর শহরের রাত উজ্জ্বল রাখবে। শারাফ হয়ত জানবেও না, তাঁর বাবা একদিন পদ্মার পাড়ে বসে ঘন চায়ের কাপ হাতে এই স্বপ্নের কাছে গিয়েছিল।
এটাই তো দেশ। এটাই তো আমাদের প্রজন্মের স্বপ্ন। রূপপুর তার হিসাব মেটাবে নিজের মতো করে, তার নিজের সময়ে। আমরা শুধু স্বপ্নটা দেখে রাখি।

আজ চার্লি চ্যাপলিনের জন্মদিন। হাসির আড়ালে সমাজের বেদনা তুলে ধরা তাঁর ‘ট্রাম্প’ চরিত্র কীভাবে হয়ে উঠল গণমানুষের প্রতীক? শিল্পবিপ্লব থেকে বলিউড পর্যন্ত এই ভবঘুরের যাত্রা, প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতার গল্প জানতে পড়ুন এই লেখা।
৫ ঘণ্টা আগে
ক্যানসার নিরাময়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে চেষ্টা করছেন। কখনো অপারেশন, কখনো যন্ত্রণাদায়ক কেমোথেরাপি কিংবা রেডিয়েশন। তবে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ‘ইমিউনোথেরাপি’ নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।
৬ ঘণ্টা আগে
আনোয়ার পাশার (১৯২৮-৭১) ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ (১৯৭৩ প্রকাশকাল) উপন্যাস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন চিত্রের এক অনন্য দলিল। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর যে-নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনি, এর নজির পাওয়া যায় এই উপন্যাসে।
১ দিন আগে
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন অনেকেই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। কিন্তু সবাই কি সফল হতে পারছে? এর উত্তর কেবল ভালো এডিটিং, আকর্ষণীয় রঙ বা ঝকঝকে গ্রাফিক্সে লুকিয়ে নেই। এর পেছনে কাজ করে মানুষের মন, আবেগ, অভ্যাস, কৌতূহল এবং সামাজিক আচরণ। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে কন্টেন্ট তৈরি করা আসলে শুধু প্রযুক্তির কাজ নয়, মানুষের মন বোঝ
১ দিন আগে