এক্সপ্লেইনার

ককরোচ পার্টি কি নির্বাচনে লড়তে পারবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ২১: ৪৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারতের প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে গড়ে ওঠা ব্যঙ্গাত্মক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সামাজিক মাধ্যমে নজিরবিহীন জোয়ার এনেছে। প্রশ্ন উঠছে, অনলাইন ম্যাজিক পেরিয়ে প্রথাগত রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে লড়তে পারবে সিজেপি?

হিন্দুস্তান টাইমসের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুনেত্রা চৌধুরী ও ধ্রুব জ্যোতির মতে, ভারতে নতুন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে রেজিস্টার্ড আনরিকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি (আরইউপিপি) হিসেবে আবেদন করতে হয়।

রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট, ১৯৫১-এর ২৯এ ধারা অনুযায়ী, ভারতের যেকোনো নাগরিক অ্যাসোসিয়েশন গঠনের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের আবেদন করতে পারে। এ জন্য ১০ হাজার রুপি ফির পাশাপাশি সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের মূলনীতি মেনে নেওয়ার অঙ্গীকারপত্র দিতে হয়।

এ ছাড়া দলের অন্তত ১০০ সদস্যকে নিবন্ধিত ভোটার এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন—এমন হলফনামা দিতে হয়। এই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সিজেপির জন্য অসম্ভব নয়, তবে আসল জটিলতা তৈরি হবে প্রতীক নির্বাচন নিয়ে।

তেলাপোকা কি উড়তে পারবে

ককরোচ জনতা পার্টির পরিচয়ের ভিত্তি হলো তেলাপোকা প্রতীক। তবে ভারতীয় নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, আরইউপিপি দল ইচ্ছামতো নির্বাচনী প্রতীক নিতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ‘মুক্ত প্রতীক’ বেছে নিতে হয়।

সম্প্রতি তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে সুপারস্টার বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেটরি কাজগম’ (টিভিকে) প্রথমবার অংশ নিয়ে ১০৮ আসন পেয়ে জোট সরকার গঠন করেছে। তবে নির্বাচনের আগে দলটির পছন্দের প্রতীকের বদলে সাধারণ ‘বাঁশি’ প্রতীক বরাদ্দ করেছিল ইসি।

মোদি সরকারের তোপের মুখে সিজেপি

সিজেপির জনপ্রিয়তা ও যুবসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে বর্তমান মোদি সরকার নিজেদের ক্ষমতার জন্য প্রচ্ছন্ন ‘হুমকি’ হিসেবে দেখছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আইবি সিজেপির অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন দেয়।

এরপরই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯(এ) ধারার অধীনে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এক্সে সিজেপির অ্যাকাউন্ট ব্লক বা ‘উইথহেল্ড’ করে দেওয়া হয়। এরপর গত ২৩ মে সকাল থেকে সিজেপির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটটিও অফলাইনে চলে যায়।

এই আন্দোলনের মূল কারিগর অভিজিৎ দীপক অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ২ কোটি ২০ লাখের বেশি অনুসারী থাকা ইনস্টাগ্রাম পেজ এবং তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টটিও হ্যাক করা হয়েছে। এমনকি মেটা কর্তৃপক্ষ তাঁদের ব্যাক-আপ অ্যাকাউন্টও ডিলিট করে দিয়েছে।

এই ক্র্যাকডাউনের প্রতিবাদে দীপক এক্সে লিখেছেন, ‘মোদি সরকার আমাদের ওয়েবসাইট ও অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে পারে, কিন্তু আমাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে হ্যাক করা যাবে না। স্বৈরাচারী আচরণ ভারতের তরুণদের চোখ খুলে দিচ্ছে।’

বোস্টনে পড়াশোনা করা ৩০ বছরের এই যুবক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি ভারতে ফিরলে বিমানবন্দর থেকেই দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে তিহার জেলে নিয়ে যেতে পারে।

সিজেপির ভবিষ্যৎ

সিজেপির এই আন্দোলনকে অনেকেই ২০১১-১২ সালের আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং পরে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির (আপ) উত্থানের সঙ্গে তুলনা করছেন।
দীপক নিজেও অতীতে আম আদমি পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রচারণার দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন।

তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নীলা চন্দকের মতে, সিজেপি বা আপের মতো দলগুলো মূলত ‘পোস্ট-আইডিওলজিক্যাল’ বা আদর্শহীন দল।

এই আন্দোলনের মূল কারিগর অভিজিৎ দীপক। ছবি: সংগৃহীত
এই আন্দোলনের মূল কারিগর অভিজিৎ দীপক। ছবি: সংগৃহীত

তারা দুর্নীতি বা সুশাসনের মতো সাধারণ বিষয়কে সামনে এনে মানুষের নৈতিক ক্ষোভকে পুঁজি করে, কিন্তু বড় বড় জাতীয় সমস্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা ধর্মীয় মেরুকরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিতে পারে না।

কেজরিওয়ালের দল যেভাবে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), ৩৭০ ধারা বাতিল বা দিল্লির দাঙ্গা নিয়ে নীরব ছিল, সিজেপির ক্ষেত্রেও একই ধরনের আদর্শিক শূন্যতার আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক আদর্শ ছাড়া কেবল সামাজিক মাধ্যমের ক্ষোভ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন।

ভার্চ্যুয়াল বনাম বাস্তব লড়াইয়ের ফারাক

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সরায়ু পানি এবং অক্ষয় চন্দ্র মাধবের মতে, সিজেপি মূলত শহুরে, ইংরেজি জানা এবং অনলাইন দুনিয়ায় বুঁদ রাজনীতি-বিমুখ তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের উপভোগ্য মাধ্যম কিন্তু ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দলিত, বহুজন, আদিবাসী এবং কৃষকদের লড়াইয়ের সঙ্গে সিজেপির এই অনলাইন প্রতিবাদের বিস্তর ফারাক রয়েছে।

লাদাখের পরিবেশবাদী আন্দোলন বা কৃষকদের ঐতিহাসিক লংমার্চের পেছনে যে হাজার মাইল পদযাত্রা ও জীবন উৎসর্গ করার মতো সাংগঠনিক বাস্তবতা ছিল, সিজেপির মিম-ভিত্তিক বা তেলাপোকা সাজার আন্দোলনের মধ্যে সেই গভীরতা নেই।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য প্রিন্ট, ইন্ডিয়া টুডে এবং দ্য হিন্দু

সম্পর্কিত