আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস

বৈশ্বিক সংকট, বাংলাদেশের বাস্তবতা ও টেকসই ভবিষ্যতের রূপরেখা

স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ ২২ মে, আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী আর অণুজীবের যে মেলবন্ধন এই পৃথিবীকে সচল রেখেছে, তাকে উদযাপনের এবং তা রক্ষায় আত্মদর্শনের দিন আজ। এবারের দিবসে জাতিসংঘের ঘোষিত প্রতিপাদ্য হলো—‘বৈশ্বিক প্রভাব সৃষ্টিতে স্থানীয় স্তরে পদক্ষেপ’।

প্রতিপাদ্যটি বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ, বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার মহাসংগ্রাম কোনো আকাশকুসুম পরিকল্পনা নয়, বরং এর মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতিমালার সফল বাস্তবায়নের ওপর।

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য একে অপরের পরিপূরক। এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে আজ আমাদের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন জীববৈচিত্র্যের বৈশ্বিক ও জাতীয় গতিপ্রকৃতি কেমন, সাম্প্রতিক উপাত্ত কী বলছে এবং বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যতের স্বার্থে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত।

বিশ্বজুড়ে আজ প্রকৃতির ওপর মানুষের লাগামহীন আগ্রাসনের খতিয়ান অত্যন্ত নির্মম রূপ ধারণ করেছে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, মানবজাতি বর্তমানে একটি ভয়ংকর ‘ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমান বিলুপ্তির হার প্রায় ১০০ থেকে ১ হাজার গুণ বেশি এবং প্রায় ১০ লাখ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্তির তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান) যেখানে মাঝারি বা উচ্চ মাত্রায় প্রকৃতির ওপর এবং বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ স্থলভাগ ও ৬৬ শতাংশ সামুদ্রিক পরিবেশ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের কারণে আমূল পরিবর্তিত বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০২২ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্কের লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অন্তত ৩০ শতাংশ স্থল ও জলভাগ সম্পূর্ণ সংরক্ষণ করা। তবে ২০২৬ সালে এসেও দেখা যাচ্ছে, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থানীয় স্তরে সঠিক সমন্বয় ও বৈজ্ঞানিক কৌশলের অভাবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখনো অনেক দূরে রয়ে গেছে।

বিপন্ন বন্যপ্রাণী হত্যার দায়ে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে নগরায়নের থাবায় গত দুই দশকে ঢাকার সবুজ অঞ্চল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গত তিন দশকে ৫৭ শতাংশের বেশি জলাভূমি চিরতরে হারিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট ‘ইন্দো-বার্মা’ অঞ্চলের অংশ হিসেবে অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী হলেও বিপুল জনসংখ্যার কারণে এ দেশের বাস্তুতন্ত্র চরম সংকটে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন এবং সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ৪৪ হাজার ১৭৪ হেক্টর প্রাকৃতিক বনে মাত্র ৫০০টি মাতৃবৃক্ষ বা বীজ উৎপাদনকারী প্রবীণ গাছ টিকে আছে, যা আমাদের বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারানোর এক অপূরণীয় সংকেত।

সুন্দরবনে সবশেষ শুমারি অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ১১৪টি থেকে সামান্য বেড়ে ১২৫টি হওয়া কিছুটা আশাব্যঞ্জক হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও আবাসস্থল সংকটে তারা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি মানুষের পাতা ফাঁদে ও নির্বিচার গুলিতে প্রতি বছর বহু হাতির করুণ মৃত্যু ঘটছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ২০২৬ সালের শুরুতে ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি করেছে, যেখানে বিপন্ন বন্যপ্রাণী হত্যার দায়ে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে নগরায়নের থাবায় গত দুই দশকে ঢাকার সবুজ অঞ্চল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গত তিন দশকে ৫৭ শতাংশের বেশি জলাভূমি চিরতরে হারিয়ে গেছে, যা মৎস্য বৈচিত্র্য, জলজ অণুজীব এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

একজন কৃষি জীবপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, জীববৈচিত্র্যের এই ক্রমাগত অবক্ষয় আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান সংকট। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের মতে, এ দেশে একসময় ৮ হাজারের বেশি ধানের জাত এবং হাজারো ফসলের বৈচিত্র্য ছিল, যা উচ্চফলনশীল জাতের একচেটিয়া ব্যবহারের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এবং ফসলের ‘জেনেটিক ক্ষয়’ ডেকে আনছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায়, যেমন তীব্র দাবদাহ, খরা কিংবা লবণাক্ততায় ফসলের সম্পূর্ণ ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে টেকসই ধান উৎপাদন অনেকাংশে সিন্থেটিক রাসায়নিক ইনপুটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা মারাত্মক পরিবেশগত অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। এর অর্থনৈতিক বোঝাও আকাশচুম্বী। শুধু রাসায়নিক সারের ভর্তুকি দিতেই রাষ্ট্রকে প্রতি বছর ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।

এই জটিল ও ব্যয়বহুল সংকট উত্তরণে আমাদের ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং উদ্ভিদের ‘দ্বিতীয় জিনোম’ অর্থাৎ রাইজোস্ফিয়ার, ফাইলোস্ফিয়ার এবং এন্ডোস্ফিয়ারে বসবাসকারী উপকারী অণুজীবের বৈচিত্র্যময় জগত বা বাংলাদেশের নিজস্ব "Biogold" (জীবস্বর্ণ) নিয়ে গবেষণা শুরু করে, যা প্রাকৃতিকভাবেই বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন সংবন্ধন, খনিজ দ্রবীভূতকরণ এবং উদ্ভিদের হরমোন উৎপাদনের মাধ্যমে ফসলের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম।

আমাদের গবেষণার অংশ হিসেবে দেশের প্রধান প্রধান ফসলের বীজ এবং রাইজোস্ফিয়ার মাটি থেকে ৭৫০টিরও বেশি ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেন পৃথক করার পর আমরা ব্যাসিলাস, প্যারাবুরখোল্ডেরিয়া, সেরাশিয়া, এন্টারোব্যাকটার, লাইসোব্যাকটার এবং স্টেনোট্রোফোমোনাস জেনাসের সমন্বয়ে অত্যন্ত কার্যকর প্রোবায়োটিক কনসোর্টিওম তৈরি করেছি। মাঠপর্যায়ে ‘প্যারাবুরখোল্ডেরিয়া ফাংগোরাম’ এবং ‘ডেলফটিয়া সুরুহাতেনসিস’ নামক প্রোবায়োটিকের প্রয়োগে দেখা গেছে যে, ফসলের আশানুরূপ ফলন বজায় রেখেও নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সারের ব্যবহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করা সম্ভব।

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশের অনন্য স্থলজ ও সামুদ্রিক অণুজীব এবং বন্যপ্রাণীর জিনগত সম্পদ সুরক্ষায় একটি বৃহৎ জাতীয় প্রকল্প গ্রহণ করে সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করা এবং একটি অত্যাধুনিক ‘জাতীয় জিন ব্যাংক’ (National Gene Bank) প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যা দেশের টেকসই বায়ো-ইকোনমি বা জৈব-অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

দানাদার শস্যের বাইরেও, এই প্রোবায়োটিক ব্যবহারে স্ট্রবেরির ফলন ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি ফলে স্বাস্থ্য সুরক্ষাকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যেমন ফেনোলিক্স, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং অ্যান্থোসায়ানিনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। হাই-থ্রুপুট ওমিক্স পদ্ধতি এবং মেটাজেনোমিক প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, এই প্রোবায়োটিকগুলো মাটির অণুজীবের গঠনকে এমনভাবে পুনর্গঠন করে যা পুরো কৃষি-বাস্তুতন্ত্রকে জলবায়ু সহনশীল করে তোলে।

উদ্ভিদের পুষ্টি জোগানোর পাশাপাশি ফসলের মরণঘাতী রোগবালাই জৈবিকভাবে দমনের ক্ষেত্রেও আমাদের দেশীয় ‘বায়োগোল্ড’ এক যুগান্তকারী সাফল্য এনে দিয়েছে, যার উজ্জ্বল উদাহরণ হলো গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ। ছত্রাকনাশকের বিরুদ্ধে রোগজীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্লাস্ট-প্রতিরোধী জাতের স্বল্পতার কারণে আমরা গমের বীজের এন্ডোফাইটিক মাইক্রোবায়োম থেকে শক্তিশালী ব্যাসিলাস সাবটিলিস এবং ব্যাসিলাস ভেলেজেনসিস পৃথক করেছি, যা ধ্বংসাত্মক গমের ব্লাস্ট রোগের জীবাণু ম্যাগনাপোর্টে ওরাইজি প্যাথোটাইপ ট্রিটিকামের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

আমাদের গবেষণার অন্যতম প্রধান যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ‘ব্যাসিলাস সেফেনসিস’ থেকে নিঃসৃত একটি উদ্বায়ী জৈব যৌগ, যা ‘৩-মিথাইলপেন্টানয়িক অ্যাসিড’ নামে পরিচিত। আমাদের ২০২৬ সালের সর্বশেষ আণবিক ও কার্যপ্রণালিগত গবেষণায় দেখা গেছে, এই যৌগটি মাত্র ১০০ থেকে ১২৫ মাইক্রোমূলার মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ঘনত্বের উপস্থিতিতেই ব্লাস্ট ছত্রাকের কোষপ্রাচীর গঠনের মূল এনজাইম ‘ইউডিপি-গ্লুকোজ ৪-এপিমারেজ’-কে সুনির্দিষ্টভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে এই ক্ষতিকর প্যাথোজেনটি আর গম গাছকে সংক্রমিত করার শক্তি পায় না। গমের ব্লাস্ট রোগের অন্যতম প্রধান ‘হটস্পট’ মেহেরপুরে টানা তিন বছরের মাঠ পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রণ বা কনসোর্টিওম দিয়ে বীজ শোধন এবং পাতায় স্প্রে করার ফলে গমের লিফ ব্লাস্ট ৮৯.৮৮ শতাংশ এবং স্পাইক ব্লাস্ট ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সাথে ফসলের ফলন বেড়েছে ৩১.৬ শতাংশ পর্যন্ত, যা বাজারের প্রচলিত যেকোনো রাসায়নিক ছত্রাকনাশকের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব।

কৃষি ও মাটির গণ্ডি পেরিয়ে এই জিনোমিক বিপ্লব এখন আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও সুনীল অর্থনীতির সুরক্ষায় সমানভাবে অবদান রাখছে। আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল, যা মূলত আঁশযুক্ত গঠনের কারণে বিশ্বজুড়ে ‘ভেগান মিট’ (Vegan Meat) হিসেবে সমাদৃত, তার সংক্ষিপ্ত ফলনকাল ও বাজারজাতকরণ-পরবর্তী বিশাল অপচয় দূর করতে আমরাই প্রথমবারের মতো বারোমাসি জাত ‘বারি কাঁঠাল-৩’-এর পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেছি। কাঁঠালের ৯৮১.৮ মেগাবেসের এই জিনোমে ৩৫,০১৪টি জিন এবং ১১.২ মিলিয়ন এসএনপি (SNP) শনাক্ত করার মাধ্যমে আমরা এর অবিরাম ফুল ফোটা এবং হরমোন সংশ্লেষণের জন্য দায়ী মূল জিনগুলো উন্মোচন করেছি, যা উদ্ভিদের ঋতুভিত্তিক সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেয়। এই অমূল্য জিনোমিক তথ্য ব্যবহার করে এখন ‘মার্কার-অ্যাসিস্টেড প্রিসিশন ব্রিডিং’-এর মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত জলবায়ু-সহনশীল ও উন্নত জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হচ্ছে।

একইভাবে, দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে হারিয়ে যাওয়া ঢাকাই মসলিনের সেই ঐতিহাসিক সুতা তৈরির তুলা গাছ ‘ফুটি কার্পাস’-এর জেনেটিক ব্লুপ্রিন্ট আমরা ডিকোড করেছি, যা মসলিন সুতার চরম সূক্ষ্মতা ও অনন্য দৃঢ়তার আণবিক রহস্য উন্মোচন করেছে। এই বন্য উদ্ভিদের দীর্ঘ আকৃতি ও কম ফলনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে আমরা গামা-রশ্মি বিকিরণের মাধ্যমে মিউটেশন ব্রিডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি। এর মাধ্যমে সফলভাবে ১০টি সম্ভাবনাময় মিউট্যান্ট লাইন স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়েছে, যা আকারে বামন বা খাটো হলেও উচ্চ ফলনশীল।

আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের জটিল পরিযায়ী স্বভাব ও নির্দিষ্ট খাদ্য চাহিদার কারণে একে কৃত্রিম জলাশয়ে চাষ করার চ্যালেঞ্জ দূর করতে আমরা দেশের সামুদ্রিক, মোহনা এবং মিঠাপানি থেকে ইলিশের অন্ত্রের ব্যাকটেরিওমের একটি বিশদ মেটাজেনোমিক বিশ্লেষণ পরিচালনা করেছি। ইলিশের অন্ত্র থেকে সংগৃহীত এই শক্তিশালী প্রোবায়োটিক উপাদানগুলোকে অ্যাকুয়াফিড বা মাছের খাবারে রূপান্তর করার মাধ্যমে আমরা কৃত্রিম চাষে ইলিশের উচ্চ মৃত্যুর হার কমিয়ে একে টিকিয়ে রাখার ও মাছের সামগ্রিক উৎপাদনকে অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত উপায়ে বাড়ানোর এক দুর্দান্ত বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছি।

মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতার মূল চালিকাশক্তি হলো তার অণুজীবের বৈচিত্র্য, আর তাই কৃষিতে এই অণুজীবের কার্যকারিতা মানচিত্রায়নের জন্য আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশের আটটি প্রধান কৃষি-বাস্তুতান্ত্রিক অঞ্চলের ওপর একটি বৃহৎ আকারের টপসয়েল মাইক্রোবায়োম গবেষণা সম্পন্ন করেছি। শটগান মেটাজেনোমিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা এই মাটিগুলোতে ৩,৮৫০টি ব্যাকটেরিয়া, ১১৫টি আর্কিয়া, ৮০টি ভাইরাস এবং ৪৪টি ছত্রাকের প্রজাতি শনাক্ত করে দেশের প্রথম ‘সয়েল মাইক্রোবায়োম ম্যাপ’ প্রস্তুত করেছি, যেখানে দেখা গেছে যে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলভুক্ত এইজেড-৪ (AEZ-4)-এ অণুজীবের সমৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি এবং বরেন্দ্র অঞ্চলভুক্ত এইজেড-২৮ (AEZ-28)-এ সবচেয়ে কম। এই অমূল্য ডিজিটাল মানচিত্রটি আমাদের ডেল্টা অঞ্চলের মাটির অণুজীবগুলোকে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী রি-ইঞ্জিনিয়ারিং করার এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যা আমাদের জলবায়ু-স্মার্ট কৃষির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসের মূল বাণী ‘স্থানীয় পদক্ষেপ’ সার্থক করতে হলে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের যৌথভাবে একটি কৌশলগত রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রথমত, বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশের অনন্য স্থলজ ও সামুদ্রিক অণুজীব এবং বন্যপ্রাণীর জিনগত সম্পদ সুরক্ষায় একটি বৃহৎ জাতীয় প্রকল্প গ্রহণ করে সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করা এবং একটি অত্যাধুনিক ‘জাতীয় জিন ব্যাংক’ (National Gene Bank) প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যা দেশের টেকসই বায়ো-ইকোনমি বা জৈব-অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। দ্বিতীয়ত, ‘বন্যপ্রাণী অধ্যাদেশ ২০২৬’ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে সেন্ট মার্টিন, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং সুন্দরবন অঞ্চলে পর্যটনের নামে সব ধরনের বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ অবিলম্বে নিষিদ্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, দেশের শিল্প ও কর্পোরেট সেক্টরকে তাদের বাণিজ্যিক নৈতিকতার অংশ হিসেবে শতভাগ কার্যকর ইটিপি (ETP) নিশ্চিত করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের প্রণোদনার সাথে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের সরাসরি সংযোগ ঘটাতে হবে।

সর্বোপরি, উপকূলীয় অঞ্চলে কৃত্রিম ও ব্যয়বহুল কংক্রিটের বাঁধের চেয়ে ম্যানগ্রোভ বনায়নের মতো প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বাড়াতে হবে এবং কৃষি খাতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে আইবিজিই (IBGE) আবিষ্কৃত প্রোবায়োটিক ও প্রাকৃতিক বায়োফাঙ্গিসাইডের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণন নিশ্চিত করতে হবে।

জীববৈচিত্র্য কোনো বিলাসী পরিবেশবাদী এজেন্ডা নয়। এটি মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম ও জীবনের বিমা। আইবিজিই-এর ল্যাব-টু-ফিল্ড উদ্ভাবনগুলো প্রমাণ করেছে যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার। আসুন, আমরা আমাদের নিজের এলাকা, নিজের কারখানা, নিজের কৃষি জমিতে ছোট ছোট পরিবেশগত ত্রুটিগুলো দূর করার মাধ্যমে স্থানীয় পদক্ষেপ নিই এবং প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে, তার অদৃশ্য ‘বায়োগোল্ড’ বা জৈব সম্পদকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কাজে লাগিয়েই আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করি। নয়তো যে প্রবৃদ্ধি আমরা অর্জন করব, তা হবে আত্মঘাতী।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং; ডিন, গ্রাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি।

সম্পর্কিত