আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ–৮

ওয়াশিংটন ডিসির ডায়েরি: অভিশপ্ত নীল হীরা আর স্মৃতির অলিগলি

ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর নবম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। প্রতি বুধবার চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ২৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

আমেরিকায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম, এখানে ইংরেজি নামের খুব অভাব। মানে কি-না একই নাম সারা দেশে ছড়িয়ে আছে! সবখানেই স্প্রিং ফিল্ড, আলেকজান্দ্রিয়া, ওকল্যান্ড, ম্যাপল ড্রাইভ ঘুরে ফিরে। ইংরেজির মতো এত সমৃদ্ধ ভাষায় ইংরেজিভাষী একটা দেশে নামের এই দৈন্যদশা কেন, তা এক রহস্য!

রহস্যের কথা যখন আসলই, তখন বলি এক নীল হীরার গল্প। রহস্যপত্রিকায় কৈশোরে পড়েছিলাম ৪৫ দশমিক ৫ ক্যারেটের এই রত্ন চুরি করা হয়েছিল ভারতের এক মন্দিরের দেবী মূর্তির চোখ থেকে। তারপর বিখ্যাত ফরাসি পর্যটক ও রত্ন ব্যবসায়ী তাভার্ণিয়ার রত্নটি কিনে ফ্রান্সের রাজা লুই-১৪ কে দিয়ে দেন।

এই নীল হীরার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত এক অভিশাপের কথা। বলা হয়, এই হীরার মালিক যে-ই হয়, সেই কোনো না কোনো দুর্ঘটনায় মারা যায় বা বাজে অবস্থার শিকার হন। এর শেষ মালিক ছিলেন আমেরিকান হেনরি ফিলিপ হোপ। তিনি অভিশাপের ভয়েই কি-না এই হীরা দান করে দেন স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউটকে। হীরাটি জগৎ জুড়ে বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয় ‘হোপ ডায়মন্ড’ নামে।

‘হোপ ডায়মন্ড’। ছবি লেখকের সৌজন্যে
‘হোপ ডায়মন্ড’। ছবি লেখকের সৌজন্যে

তিন গোয়েন্দার ‘রক্তচক্ষু’তেও ছিল এই নীলাভ অভিশাপের কথা। এই যে আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে এলাম, তার মূল কারণ ছিল দুইটা জিনিস চাক্ষুষ করা—চাঁদের পাথর আর হোপ ডায়মন্ড। সেটা আছে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের ন্যাচারাল হিস্ট্রি জাদুঘরে।

ওয়াশিংটন ডিসি শহরটা বেশ গোছানো। চওড়া রাস্তা সারা শহরে আড়াআড়িভাবে বিছানো, বিশাল সব মাঠ, সুদৃশ্য সব ভবন ছড়ানো রাজধানী জুড়ে, আর ছড়ানো সবুজ! সারা শহরেই যেন সবুজের পরশ বোলানো গাছের সারি। যদিও ডিসির বিখ্যাত চেরী ব্লসম দেখা গেল না ভুল সময়ে আসার জন্য।

হাঁটতে হাঁটতে গেলাম বিশ্বের সবচেয়ে নামি ও জনপ্রিয় ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ জাদুঘরে। ওহ, এই শহরের প্রায় সব জাদুঘরেই প্রবেশ ফি নেই, বিনামূল্যে ঘুরে দেখতে পারবেন অমূল্য সব সম্পদ। ঢুকতেই চোখে পড়ল সাগরের তলার এক অদ্ভুত জগৎ। বিশাল এক তিমির দেহ আলাদাভাবে নজর কাড়ে। আর রয়েছে সাগরের অতল আঁধারের প্রাণীরা, জাত-বেজাতের ঝিনুক-শঙ্খ। এরপর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিশাল সংগ্রহ—বিশাল হাতি থেকে শুরু করে বিশ্বের সব অঞ্চলের প্রাণীই সেখানে উপস্থিত। আর বিশাল গ্যালারি জুড়ে মানুষের বিবর্তনের সারি সারি অধ্যায়। খুব ভালো লাগল ১০ লাখ বছরের প্রাচীন পাথরের অস্ত্র দেখে।

অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী নারীরা। ছবি লেখকের সৌজন্যে
অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী নারীরা। ছবি লেখকের সৌজন্যে

দ্বিতীয় তলায় যেতেই দেখলাম রত্নপাথরের গ্যালারিতে উপচে পড়া ভিড়। সবাই সেই বিখ্যাত নীল হীরা বা হোপ ডায়মন্ড দেখতে ব্যস্ত। তার সঙ্গে শ’খানেক বর্ণহীন ঝকঝকে হীরার মিছিল। সবার কী আগ্রহ হোপ ডায়মন্ডকে ঘিরে! অভিশাপ বলে কিছু নেই, যেমন নেই আশীর্বাদ বলেও। তবু মানুষ খুঁজে ফেরে এমন জিনিস, যেখানে পাওয়া যায় রোমাঞ্চ। হোক সে ক্ষ্যাপার পরশপাথর বা তুতানখামেনের মমি।

সেখানে আরও দেখা মিলল রক্তলাল রুবি, সবুজ পান্না, নীল নীলা, বৈদুর্যমণির বিশাল সংগ্রহের সঙ্গে। এগুলো কেবল দামি পাথর হিসেবে এখানে ঠাঁই পায়নি, এসেছে ইতিহাসের অংশ হিসেবে। কোনোটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেপোলিয়নের নাম, কোনোটির সঙ্গে বিসমার্কের।

তবে সবচেয়ে সমৃদ্ধ মনে হলো স্ফটিক সংগ্রহটাকে। কত যে তাদের গড়ন, ধরণ ও বর্ণ, যেন পরীর রাজ্যের একটা অংশ সেই গ্যালারি।

এরপর ডাইনোসরদের দল! সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে মারা যাওয়া শিকারী টি-রেক্স জীবাশ্ম এখনো রোমাঞ্চ জাগায় মনে। তারপরেই ডাইনোসরদের টিকে থাকা বংশধর পাখিদের গ্যালারীতে যেতেই দেখা মার্থার সঙ্গে।

ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারির ওয়েস্ট গ্যালারিতে পল সেজানের আঁকা পোট্রেটের প্রদর্শনীর পোস্টার। ছবি লেখকের সৌজন্যে
ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারির ওয়েস্ট গ্যালারিতে পল সেজানের আঁকা পোট্রেটের প্রদর্শনীর পোস্টার। ছবি লেখকের সৌজন্যে

মার্থা পৃথিবীর শেষ ‘প্যাসেঞ্জার পিজিয়ন’। ঘুঘু-জাতীয় এই পাখি শত শত কোটি ছিল আমেরিকার আকাশে। মানুষ শিকার করে সেই পাখিকে বিলুপ্ত করে ফেলেছে। ১৯১৪ সালে এই শেষ প্যাসেঞ্জার পিজিয়নটি সিনসিনাটি চিড়িয়াখানায় মারা যায়। আরও দেখা মিলল মানুষের কারণে বিলুপ্ত হওয়া মরিশাসের ডোডো পাখির ও নিউজিল্যান্ডের মোয়া পাখির কঙ্কালের এবং আমেরিকার এক কালের অধিবাসী বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠঠোকরা আইভরি বিল্ড উডপেকারের, যা এখন বিলুপ্ত।

সেখানে আরও দেখলাম ‘কোকো ডে ম্যার’ নামের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বীজ। একমাত্র সেইসেলস দ্বীপপুঞ্জের দুইটা দ্বীপে এই তালজাতীয় গাছটি জন্মায়। অনেকেই একে জোড়া নারকেলও বলে থাকে। এই ফলটি একদিক থেকে দেখতে নারী নিতম্ব এবং অন্যদিক থেকে দেখতে যোনীদেশের মতো। এই ফল নিয়ে চালু আছে নানা গল্পগাথা ও কিংবদন্তি। এই ফলের কথা প্রথম জেনেছিলাম মাসুদ রানার ‘শ্বেত সন্ত্রাস’ বইতে।

জানতে পারলাম, এই বিশাল জাদুঘরের অঢেল সংগ্রহের মাত্র ২ শতাংশ দর্শকদের দেখার জন্য রাখা হয়েছে! তবে সত্যি বলতে, এই জাদুঘরের প্রাণীজগতের সংগ্রহ নিয়ে যতটা সুনাম শুনেছিলাম, বিশেষ করে বুনো পরিবেশে প্রাণীদের সাজিয়ে রাখার যে বর্ণনা শুনেছিলাম—বাস্তবে ততটা সমৃদ্ধ মনে হলো না। হয়ত অনেক আগের সংগ্রহ বলেই কর্তৃপক্ষ এটাকে নতুন করে আর সাজিয়ে তুলতে পারেনি।

এটা সারা আমেরিকার সংগ্রহে থাকা একমাত্র ভিঞ্চি শিল্পকর্ম। ছবি লেখকের সৌজন্যে
এটা সারা আমেরিকার সংগ্রহে থাকা একমাত্র ভিঞ্চি শিল্পকর্ম। ছবি লেখকের সৌজন্যে

সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’-এ। পুরো আমেরিকা মহাদেশের নেটিভ ইন্ডিয়ানদের জীবন নিয়ে সাজানো এই অসাধারণ জাদুঘরে আরামদায়ক মোকাসিন, সূক্ষ শিল্পকলার পরিচায়ক গহনা, পোশাক— সবকিছুর মাঝেও একটা কষ্টের সুর মিশে আছে। এই সবকিছুই ছাপিয়ে মনে করিয়ে দেয়, শত শত বছর ধরে আদিবাসীদের ওপর হওয়া অন্যায়ের কথা। ডি ব্রাউনের বিখ্যাত বই ‘বেরি মাই হার্ট অ্যাট উন্ডেড নি’-এর প্রতিটি কথা যেন এই জাদুঘরের প্রতিটি কোণ মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

এখানেই ঘটলো এক অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা। অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী নারীদের বড় একটা দল, তাঁরা এসেছেন আমেরিকার আদিবাসীদের জাদুঘর দেখতে। আমার বড় ভাই অপুর আগ্রহে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বললাম, অষ্ট্রেলিয়ায় তাঁদের দেখা পাইনি আমরা, অথচ আমেরিকা এসে দেখা হয়ে গেল। তাঁরা এসেছেন নর্দার্ন টেরিটরি থেকে। সাগ্রহে আমাদের সঙ্গে ছবিও তুললেন। এই স্মৃতি অনেক দিন মনে থাকবে।

আসার পথে ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারির ওয়েস্ট গ্যালারিতে পল সেজানের আঁকা পোট্রেটের এক চমৎকার প্রদর্শনীর পোস্টার দেখেছিলাম। ভাবলাম, সেটা না দেখে এই শহর ছাড়ি কীভাবে!

বৈকালিক আড্ডা। ছবি লেখকের সৌজন্যে
বৈকালিক আড্ডা। ছবি লেখকের সৌজন্যে

হাতে অল্প সময় নিয়েই ঢুঁ মারলাম সেখানে, শুরুতেই দেখা হলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা ‘জিনেভরা দ্য বেঞ্চি’। এটা সারা আমেরিকার সংগ্রহে থাকা একমাত্র ভিঞ্চি শিল্পকর্ম। এটা দেখার ফলে ভিঞ্চির প্রায় সব ছবিই আমার দেখা হয়ে গেল, শুধু ‘লেডি উইথ অ্যান আরমাইন’ বাদে। সেটা দেখতে হলে আবার পোল্যান্ড যেতে হবে।

এরপর গ্যালারিতে বিস্ময়ের পর বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। ভ্যান গগ, পল গগ্যাঁ, পল সেজান, মাতিস, মোনে, রেমব্রান্ট, রেঁনোয়া—একের পর এক প্রিয় সব বিশ্বখ্যাত চিত্রকরদের আঁকা ছবির ভিড়! আর মুগ্ধ হয়ে দেখলাম সেজানের আঁকা অনেক অনেক পোট্রেট!

সেখানেই বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় কাটিয়ে বৈকালিক আড্ডা জমল লেখক বড় ভাই মাহবুব লীলেনের সঙ্গে। সঙ্গে ছিলেন দীনা ভাবী আর তাঁদের ফুটফুটে সন্তান দেবদূত। পরে আড্ডায় যোগ দিল পরিবেশ নিয়ে অধ্যয়নরত মানসী এবং পলাশ। পটোম্যাক নদীর দূষণ নিয়ে মূল্যবান তথ্য পাওয়া গেল তাঁদের কাছে। রাতের ডিনার শেষে ভার্জিনিয়ায় গেলাম পুরোনো বন্ধু সুমনার বাড়িতে, তাঁকে হ্যালো বলার জন্য। সেখানে তাঁর ফুটফুটে কন্যা সামাইরা আমাদের পিয়ানো বাজিয়ে ‘500 miles’ গানটি শোনাল। পূর্ণিমার সেই রাতে ওর পিয়ানোর সুর আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করে দিল।

সম্পর্কিত