জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সময়ের সঙ্গে কি স্বাধীনতা দিবস উদযাপনও পাল্টে যাচ্ছে?

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১৬: ৩২
স্বাধীনতা দিবসে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিসৌধে সাধারণ মানুষের ঢল। স্ট্রিম ছবি

২৬ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই থেকে প্রতি বছর ২৬ মার্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উদযাপিত হয় স্বাধীনতা দিবস। তবে বিগত বছরগুলোতে জাতীয় দিবসের রদবদল থেকে প্রশ্ন আসে, স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন কি শুরু থেকে একই রকম আছে, নাকি সময়ের সঙ্গে এর ধরন ও গুরুত্বে পরিবর্তন এসেছে? বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর যখন দেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন নিয়েও কৌতূহল দেখা দিয়েছে।

শুরুর দিকে স্বাধীনতা দিবস যেমন ছিল

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ২৬ মার্চ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সাধারণত দিনটি শুরু হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে। এরপর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের শীর্ষ নেতারা জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে।

স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনী, কুচকাওয়াজ, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা। টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্র।

সময়ের সঙ্গে উদযাপনে পরিবর্তন

যদিও স্বাধীনতা দিবসের মূল তাৎপর্য অপরিবর্তিত রয়েছে, তবে উদযাপনের ধরনে সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীনতার প্রথম দশকগুলোতে অনুষ্ঠানগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত ও সরল। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার, গণমাধ্যমের বিস্তার এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে উদযাপন আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে সরকার বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করে। সেই সময় দেশ-বিদেশে নানা আয়োজনের মাধ্যমে স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী স্বাধীনতা দিবস

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনে। এই আন্দোলনের ফলেই ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম নেয়। ফলে জাতীয় দিবসগুলোর তালিকা ও কিছু আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পরিপত্রও জারি করে। এতে কিছু দিবস বাদ পড়লেও নতুন কিছু দিবস যুক্ত হয়। যেমন: জুলাই আন্দোলনের স্মরণে ৫ই আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে বা জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া এই আন্দোলনে আবু সাইদসহ আরও অনেক নিহত জুলাই যোদ্ধাদের স্মরণে ১৬ই জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য সরকারিভাবে পরিপত্র জারি করা হয়।

স্বাধীনতা দিবস কি পরিবর্তিত হয়েছে

এসব পরিবর্তনের মধ্যেও ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা একটুও কমেনি। বরং এটি এখনো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় দিবস হিসেবেই পালিত হচ্ছে। সরকারি ছুটি, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, সাংস্কৃতিক আয়োজন সবই আগের মতোই রয়েছে।

তবে ২০০৮ সালের পর স্বাধীনতা দিবসে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়নি। এমনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কুচকাওয়াজ বন্ধ ছিল। এবার ১৮ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় কুচকাওয়াজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এবারের স্বাধীনতা দিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে এ বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়া পরিবর্তন বলতে মূলত অনুষ্ঠান আয়োজনের ধরণ, অংশগ্রহণের পরিধি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। যেমন: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান সম্প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, অনলাইন আলোচনা বা ওয়েবিনার এখন নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ

স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, নাটক, চিত্রাঙ্কন এবং গবেষণামূলক আলোচনার আয়োজন করা হয়। এর ফলে তরুণদের মধ্যে ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস আরও গভীরভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা ও মূল্যবোধ তুলে ধরায় দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জাতীয় দিবসের উদযাপন সময়ের সাথে কিছুটা পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি বদলালে উদযাপনের ধরনেও তার প্রভাব পড়ে। কিন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, স্বাধীনতা দিবস যেন তার ইতিহাস ও চেতনা হারিয়ে না ফেলে।’

উদযাপনের চেতনা কতটা অটুট

স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম এবং ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক পরিবর্তন বা সময়ের প্রবাহে উদযাপনের ধরন কিছুটা বদলালেও এর মূল চেতনা একই থাকে।

২৬ মার্চ আজও বাংলাদেশের মানুষের কাছে গর্ব, আবেগ এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণ করা, স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

সম্পর্কিত