জন্মের পর থেকেই আমরা একটা কথা শুনতে শুনতে বড় হই। আমাদের উচ্চতা কেমন হবে, গায়ের রং কী হবে বা ভবিষ্যতে কোন অসুখ আমাদের ভোগাবে তা সব লেখা আছে জিনে। মানুষ যেন এক পূর্বনির্ধারিত চিত্রনাট্যের অভিনেতা। ডিএনএ-এর ভেতরে থাকা কোডগুলোকে আমরা ভাবতাম পাথরে খোদাই করা ভাগ্যলিপি। বংশপরম্পরায় আমরা যা পেয়েছি তার বাইরে যাওয়ার কোনো পথ নেই বলে বিশ্বাস করা হতো।
বহু বছর ধরে বিজ্ঞান আমাদের এই ধারণাটাই দিয়ে এসেছে। আমাদের শরীরকে তুলনা করা হতো কম্পিউটারের হার্ডওয়্যারের সঙ্গে। আর জিন ছিল সেই হার্ডওয়্যারে দেওয়া অপরিবর্তনীয় সফটওয়্যার। কিন্তু বিজ্ঞানের নতুন শাখা ‘এপিজেনেটিক্স’ সেই পুরোনো বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষণার টেবিলে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর সত্য। জিন আমাদের সম্ভাবনার কথা বলে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাবে কি না তা নির্ভর করে অন্য কিছুর ওপর।
হার্ডওয়্যারের ওপর সফটওয়্যারের খেলা
বিষয়টা খুব সহজে বোঝা যাক। জিন যদি হয় কোনো বিশাল লাইব্রেরি, তবে এপিজেনেটিক্স হলো সেই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। লাইব্রেরিতে হাজার হাজার বই থাকতে পারে। কিন্তু সব বই সবাই পড়ে না। লাইব্রেরিয়ান ঠিক করেন কোন বইটা শেলফ থেকে নামানো হবে আর কোনটা ধুলোমাখা অবস্থায় পড়ে থাকবে। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে ডিএনএ বা জিনের লম্বা চেইন থাকে। সেখানে শরীরের সব কাজের নির্দেশাবলি লেখা আছে। এতদিন ভাবা হতো এই নির্দেশাবলি অমান্য করার ক্ষমতা কারো নেই।
জিন শুধু সম্ভাবনা, সিদ্ধান্ত নেয় আপনার জীবনযাপন। সংগৃহীত ছবিএপিজেনেটিক্স আমাদের দেখাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। জিন হলো পিয়ানোর রিডের মতো। রিডগুলো বাটন হিসেবে সাজানো থাকে। কিন্তু সেই রিড থেকে সুর বের করতে হলে কাউকে না কাউকে তা বাজাতে হয়। পিয়ানোবাদক ঠিক করেন কোন রিড কখন বাজবে বা কত জোরে বাজবে। একইভাবে আমাদের পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক অবস্থা জিনের ওপর এক রাসায়নিক আস্তরণ তৈরি করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মিথাইলেশন’। এই রাসায়নিক সংকেতগুলো জিনের সুইচ অন বা অফ করে দেয়। আপনার ডিএনএতে হয়তো ডায়াবেটিসের সংকেত আছে। কিন্তু আপনার জীবনাচরণ সেই সুইচটি অফ করে রাখতে পারে। অর্থাৎ জন্মগতভাবে পাওয়া জিনই শেষ কথা নয়। জিন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে; জীবনযাপন বা পরিবেশ সেই ঝুঁকি বাড়াতেও পারে, কমাতেও পারে—সব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নাও থাকতে পারে।
ইঁদুরের গায়ের রঙ ও অবাক করা ফল
বিজ্ঞানীরা এই ধারণা প্রমাণের জন্য ইঁদুরের ওপর চমকপ্রদ কিছু গবেষণা চালিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘আগুটি ইঁদুর’ বা হলুদ ইঁদুরের পরীক্ষা। গবেষণাগারে একই জিনের দুটি ইঁদুর নেওয়া হলো। জিনগতভাবে তারা একে অপরের যমজ। এদের মধ্যে ‘আগুটি জিন’ নামে একটি বিশেষ জিন ছিল। এই জিন সক্রিয় থাকলে ইঁদুরের লোম হলুদ হয়ে যায়। পাশাপাশি এরা ভীষণ মোটাসোটা হয় এবং ডায়াবেটিস বা ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিজ্ঞানিরা গর্ভবতী ইঁদুর মায়েদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলেন। এক দলকে সাধারণ খাবার দেওয়া হলো। অন্য দলকে দেওয়া হলো ফলিক এসিড ও ভিটামিন বি-১২ সমৃদ্ধ কিছু পুষ্টি উপাদান। ফলাফলের দিন সবাই অবাক হয়ে গেল। জিনগতভাবে একই হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ ডায়েট খাওয়া মায়ের ইঁদুরছানারা জন্মাল বাদামি রঙের এবং সম্পূর্ণ সুস্থ। তাদের শরীরে সেই ক্ষতিকর আগুটি জিন ছিল ঠিকই। কিন্তু পুষ্টিকর খাবারের প্রভাবে রাসায়নিকভাবে সেই জিনের সুইচ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেবল খাবারের গুণাগুণ একটি প্রাণীর জিনের প্রকাশকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। এর থেকে বোঝা যায় আমরা যা খাই তা শুধু আমাদের পেটই ভরায় না।
ইতিহাসের জঠরে খোদাই করা স্মৃতি
মানুষের ওপরেও পরিবেশের প্রভাব যে কত গভীর তা জানা যায় ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে নেদারল্যান্ডসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। একে বলা হয় ‘ডাচ হাঙ্গার উইন্টার’। হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছিল। তখন যেসব গর্ভবতী মা অনাহারে দিন কাটিয়েছিলেন তাঁদের সন্তানেরা পরবর্তী জীবনে নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো সেই সন্তানদের ঘরের নাতি-নাতনিদের মধ্যেও সেই দুর্ভিক্ষের প্রভাব দেখা গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এটার মাত্রা ও ঠিক কোন মেকানিজমে হয় তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
দাদি বা নানিরা যে অভুক্ত ছিলেন সেই তথ্য তাঁদের ডিম্বাণু বা জিনের ওপর এক ধরনের রাসায়নিক দাগ রেখে গিয়েছিল। সেই দাগ বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হয়েছে। এর মানে হলো আপনার আজকের দিনের মানসিক চাপ বা পুষ্টিহীনতা শুধু আপনার ক্ষতি করছে না। অনাগত প্রজন্মের জিনেও আপনি এর ছাপ রেখে যাচ্ছেন। ট্রমা বা ভয়ের স্মৃতি এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জিনের মাধ্যমে বাহিত হতে পারে। জিন এখানে কেবল শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বাহক নয়। জিন হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতার সংরক্ষণাগার। তবে আশার কথা হলো ভালো অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই খারাপ দাগগুলো মুছে ফেলাও সম্ভব।
মন ও মস্তিষ্কের জাদুকরি প্রভাব
এপিজেনেটিক্সের সবচেয়ে জাদুকরি দিক হলো আমাদের মনের প্রভাব। ধ্যান, যোগব্যায়াম বা ইতিবাচক চিন্তা শরীরকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন নিয়মিত যারা ধ্যান করেন তাঁদের শরীরে প্রদাহ সৃষ্টিকারী জিনের সক্রিয়তা কমে যায়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ আমাদের শরীরে কর্টিসল হরমোনের বন্যা বইয়ে দেয়। এই অতিরিক্ত কর্টিসল আমাদের ভালো জিনগুলোকে কাজ করতে বাধা দেয় এবং খারাপ জিনগুলোকে জাগিয়ে তোলে। ফলে শরীর দ্রুত বুড়িয়ে যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে।
অন্যদিকে সচেতন জীবনযাপন জিনের স্বাস্থ্য রক্ষা করে। আপনি যখন ব্যায়াম করেন তখন পেশিগুলোতে এক ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন সরাসরি জিনের কাজকে প্রভাবিত করে। রাতে ভালো ঘুম, প্রিয়জনের সঙ্গে হাসিঠাট্টা বা প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো—সবই জিনের সুইচবোর্ডে ইতিবাচক সংকেত পাঠায়। আমাদের মস্তিষ্ক তখন দেহকে সুস্থ থাকার নির্দেশ দেয়। একজন মানুষ নিজের চিন্তার জগত পরিবর্তন করে নিজের শারীরিক গঠনে প্রভাব ফেলতে পারেন। এপিজেনেটিক্স আমাদের সেই ক্ষমতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। আপনি কেবল জিনের যাত্রী নন। আপনি এই গাড়ির চালকও হতে পারেন।
নিজের জীবনের চিত্রনাট্যকার
মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আমাদের স্বাধীন সত্তা। এপিজেনেটিক্স বিজ্ঞানের মোড়কে আমাদের সেই স্বাধীনতার কথাই নতুন করে বলছে। আমাদের পিতামাতা বা পূর্বপুরুষরা আমাদের একটি জিনের সেট উপহার দিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই উপহারকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করব তা সম্পূর্ণ আমাদের হাতে। কোনো খারাপ জিন থাকা মানেই সেই রোগের শিকার হওয়া নয়। আমাদের রোজকার অভ্যাস, খাবারের প্লেটের পছন্দ আর দুশ্চিন্তা মোকাবিলার পদ্ধতি ঠিক করে দেবে জিনের সেই নির্দেশ পালন করা হবে কি না।
জিন আমাদের শুরুর বিন্দু ঠিক করে দেয়। কিন্তু গন্তব্য ঠিক করার ভার আমাদের। আমরা চাইলেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে ক্ষতিকর জিনের প্রভাব দমিয়ে রাখতে পারি। আবার অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে সুপ্ত খারাপ জিনকে জাগিয়ে তুলতে পারি। আমাদের প্রতিটা সিদ্ধান্ত কোষের গভীরতম স্তরে গিয়ে প্রভাব ফেলে। মানুষ আর জিনের অসহায় দাস নয়। নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনের গল্পের লেখক হওয়ার কলমটি প্রকৃতি আমাদের হাতেই তুলে দিয়েছে। সচেতনতা ও সঠিক পরিচর্যার কালিতে আমরা চাইলেই আমাদের জীবনের গল্পটি নতুন করে লিখতে পারি।