বাড়ছে হামের রোগী, যা জানা জরুরি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৩: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। হাম বায়ুবাহিত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি খুব সহজেই হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে তার চারপাশের অসংখ্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। এই রোগটি সম্পর্কে এখনো অনেক ভুল ধারণা রয়ে গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

হাম নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে হাম নিয়ে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা বা কুসংস্কার দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, হাম অতি সাধারণ একটি রোগ। একবার জ্বর হয়ে গায়ে লাল দাগ উঠলে এটি এমনিতেই সেরে যায়। এর জন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। এটি অত্যন্ত ভুল ধারণা। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, অন্ধত্ব এবং এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তবে হাম হলে ঘাবড়াবার কিছু নেই। একটু সচেতন হলেই এই রোগ থেকে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

হাম সম্পর্কে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, টিকা নিলেই একশ ভাগ সুরক্ষা পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সরকারি সংস্থা সিডিসির তথ্যমতে, হামের টিকার দুটি ডোজ নিলে তা ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হয়। তবে সমাজের একটি বড় অংশ যদি টিকার আওতার বাইরে থাকে, তবে সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি নষ্ট হয় এবং টিকা নেওয়া মানুষেরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। তবে তাদের আক্রান্ত হওয়ার ধরনটি তেমন মারাত্মক নয়।

এছাড়া অনেকেই মনে করেন, বড়দের হাম হয় না। কিন্তু যাদের ছোটবেলায় হাম হয়নি বা যারা টিকার সম্পূর্ণ ডোজ নেননি, যেকোনো বয়সেই তারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন।

হাম নিয়ে যা জানা জরুরি

হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্যারামিক্সোভাইরাস পরিবারের একটি ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। হামে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি যদি হাঁচি বা কাশি দেন, তবে সেই জীবাণু বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। সেই বাতাসে শ্বাস নিলে বা জীবাণুযুক্ত কোনো পৃষ্ঠ স্পর্শ করে চোখে-মুখে হাত দিলে যে কেউ এতে সংক্রমিত হতে পারেন।

ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর সাধারণত দশ থেকে চোদ্দ দিন সময় লাগে লক্ষণ প্রকাশ পেতে।

হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর ও শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা বা শরীরে হালকা ব্যথা থাকা। প্রথম এক-দুই দিন তীব্র জ্বরও হতে পারে। চোখ-মুখ ফুলে ওঠার পাশাপাশি চোখ লাল হয়ে যেতে পারে, নাক ও চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে। অনেকের হাঁচির সমস্যাও দেখা দেয়। তবে শরীরে র‌্যাশ বা ছোট ছোট লালচে গুটি বা ফুসকুড়ি দেখার পরপরই চিকিৎসকেরা এটিকে ‘হাম’ বলে চিহ্নিত করেন।

এই র‌্যাশ বা ফুসকুড়ি দ্রুতই সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ সময় শিশুরা কিছুই খেতে চায় না এবং ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।

বয়স্ক ও শিশুদের চিকিৎসার ধরন কি একই রকম?

হামের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন হলো, শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসা কি একই রকম হয়?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাম ভাইরাসের সরাসরি কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা নিরাময় নেই। তবে বয়সভেদে চিকিৎসার ধরনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

শিশুদের হামের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। হাম হলে শিশুদের শরীরে ভিটামিন-এ এর ঘাটতি দেখা দেয়। তাই শিশুদের হাম শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্দিষ্ট মাত্রার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টের ততটা বাধ্যবাধকতা নেই, যদি না তাদের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি থাকে। তবে বয়স্কদের হাম হলে তা শিশুদের তুলনায় জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের ওষুধের মাত্রা এবং আনুষঙ্গিক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শিশুদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন হয়।

আক্রান্ত রোগীর যত্ন কীভাবে নিতে হবে

হাম হলে রোগীর সঠিক যত্ন নেওয়া চিকিৎসার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাইরাসের সরাসরি কোনো ওষুধ না থাকায় ঘরে বসে উপযুক্ত সেবাশুশ্রূষার মাধ্যমেই রোগীকে সারিয়ে তুলতে হয়। হাম হলে চোখের সংবেদনশীলতা অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে আলোর দিকে তাকাতে অনেক রোগীর কষ্ট হয়। তাই রোগীকে এমন একটি ঘরে রাখতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলেও সরাসরি তীব্র আলো চোখে না পড়ে। ঘরের আলো কিছুটা কমিয়ে রাখলে রোগী আরাম বোধ করবেন।

জ্বর কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়াতে হবে। এর পাশাপাশি কুসুম গরম পানি দিয়ে রোগীর শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। এই সময়ে শরীরে প্রচুর পানির ঘাটতি দেখা দেয়। তাই রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, খাওয়ার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস এবং তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।

হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় রোগীকে বাড়ির অন্য সদস্যদের কাছ থেকে, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত কাপড়চোপড়, তোয়ালে এবং থালাবাসন আলাদা করে গরম পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। রোগীর সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিকে অবশ্যই নিয়মিত ভালোভাবে হাত ধুতে হবে এবং মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

হামের লক্ষণ দেখা দিলে দুশ্চিন্তা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রোগীর যত্ন শুরু করতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাদ্য আর সেবাযত্ন পেলে হাম থেকে সেরে উঠতে বেশি সময় লাগে না।

হঠাৎ কেন বাড়ছে হামের রোগী

বাংলাদেশে হঠাৎ করে হামের রোগী বেড়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা শিশুদের টিকাদানে ঘাটতিকে দায়ী করছেন। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সেসময় অনেক শিশুই তাদের নয় মাস এবং পনেরো মাস বয়সে হাম ও রুবেলার টিকার নির্ধারিত ডোজগুলো নিতে পারেনি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।

টিকা না নেওয়া এই শিশুদের বড় একটি অংশ এখন ভাইরাসের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও অপুষ্টির কারণেও ভাইরাসের বিস্তার দ্রুত ঘটেছে।

সম্পর্কিত